শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

অনন্তকালের খেয়ায় ভালো থেকো ‘মা’

| প্রকাশিতঃ ২ জানুয়ারী ২০১৯ | ৩:১৯ অপরাহ্ন

ওমর ফারুক হিমেল : ২০১২ সালের ২ জানুয়ারি রাতে কোরিয়ার স্থানীয় সময় ভোর পাঁচটায় বাংলাদেশ থেকে আসা একটি ফোন আমার ছন্দময় জীবনের গতি পাল্টে দিলো। অবিশ্বাস্য, অপ্রস্তুত ফোনটি আমার অনুজ নোমানের। এপার থেকে ফোনটি ধরার সাথে সাথেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে নোমান বলল, তোমার আর কোরিয়া থাকার আর প্রয়োজন নেই। প্রশ্ন করলাম কেন? কী হলো? সে জানাল যার জন্য তুমি, যিনি তোমার পৃথিবী। সেই ত্রিভুবনসম মা আর নেই। পৃথিবীর বুকে মাথা ঠেকিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলাম। মা আর নেই, আর কখনো ‌’মা’ বলে ডাকতে পারব না। কে আমাকে বাপ বলে ডাকবে?

মায়ের সাথে শেষ দেখার স্মৃতি, বাসার গ্রিলের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে ২০ মিনিট কেঁদেছিলেন। সেই দেখাই শেষ দেখা। সেই দৃশ্যখানি চোখে-মুখে ভাসছে। কক্ষ থেকে বের হয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে, অসীম আবেগে স্রষ্টাকে বললাম হৃদয় নিংড়ানো মাকে, পবিত্র মা ডাকখানি কেন তুমি কেড়ে নিলে? সেই আরাধনার, আশ্রয়ের, নিরাপত্তার বাতিঘর প্রিয় জনম দুঃখিনী মা আর নেই। কষ্টাতীত এই দুঃসংবাদের জন্য কখনোই প্রস্তুত ছিলাম না, হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম। মনের গহীনে, বুকে চরম ব্যথা অনুভব করলাম।

আমার প্রাণের ছায়া চলে গেল। পায়ের মাটি সরে গেল। মন উজাড় করে কাঁদলাম মাকে হারিয়ে। কিছুক্ষণ পর অপ্রস্তুত দুঃসংবাদটি শুনে অযু করে নামাজে দাঁড়ালাম। নামাজ শেষ করে বিমানের টিকেটের জন্য বন্ধু তারেককে সাথে নিয়ে সিউলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বিধিবাম সেদিন যুৎসই কোনো টিকেট পেলাম না। যে টিকেটটি পেলাম তাও সিউল থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগবে দুইদিন। কীভাবে মায়ের জানাজা পড়বো অহর্নিশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। বাড়ি থেকে সৌদি প্রবাসী আবু বক্কর ভাই ফোন করে বলল কষ্ট করে তুমি আসিও না দুইদিন তোমার আম্মাকে হিমঘরে রাখা ঠিক হবে না, কারণ তিনিতো মোটা মানুষ। আজকের মধ্যে আসতে পারলে এসো। বন্ধু তারেক আমাকে অনবরত সান্ত্বনা দিতে থাকল- কারো মা চিরদিন বেঁচে থাকবে না। তোর মাতো আল্লাহর মেহমান, টেনশন করিস না। দুইদিন হিমঘরে রেখে মাকে কষ্ট দিস না, সবাইকে বলে দেয়, যেন তোর মাকে সহসা দাফন করে ফেলে।

মাকে হারিয়ে সত্যিই সেদিন থেকে আমি গরিব। চূড়ান্ত গরিব। আমার সব আছে, কিন্তু মা নেই। সেজন্যই আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন পৃথিবীতে যার মা নেই সে দরিদ্র। আমার মা ছিল আমার দার্শনিক, চিন্তা মননের বাতিঘর। মা ছিল আমার নিরাপত্তার, আমার নিরাপদ আশ্রয়; জীবনের আধার, শীতল শান্তির প্রেরণার জায়গা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার বিমূর্ত প্রতীক। আমার বিদগ্ধ মায়ের অকৃপণ স্নেহমমতা, অকৃত্রিম ভালোবাসায় আমার জন্ম বেড়ে উঠা, শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যর জলমাখা জীবন। সত্যিই মাকে হারিয়ে আমি নিঃস্ব অসহায়। দহনে দহনে দগ্ধ, প্রতিদিন নিজেকে পুড়ি, ভোগি মায়ের শূন্যতা। মায়ের প্রত্যাশাহীন, প্রাপ্তিহীন নির্ভেজাল ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত আজ দুই হাজার পাঁচ শত পঞ্চান্ন দিন।

প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ তিনি আমার চোখে ভাসেন, তার স্মৃতিগুলো খুঁজে ফিরি। দশ মাস দশ দিন পেটে ধারণ করে অসহনীয় কষ্ট, অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে যে মা আমায় জন্ম দিয়েছেন তার জন্য কিছু করতে না পারার বেদনা আমাকে তিলে তিলে পোড়ায়। মা নিজে না খেয়ে আমাকে খাইয়েছেন, তার ঋণ অপরিশোধ্য, অপরিমেয়। অনেকেই মায়ের সেবা করার সুযোগ পেয়েছে, দিল ভরা মায়ের দোয়া নিয়েছে। আমি তা পারিনি। এখানে আমার কষ্টটা বেশি। মা তুমি শৈশবে কত শৌর্য, কত সাহস জুগিয়েছিলে। নানা বিপদে সান্ত্বনা দিয়েছিলে। প্রতিটি সংকটে পাশে ছিলে। সারাক্ষণ দীক্ষা দিতে অসৎ আনন্দের চেয়ে পবিত্র কষ্ট আরামদায়ক। সোফেক্লিসের মতো তুমি বলতে আমি তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। তোমার সংসারের নোঙর। মা আমি নই, স্রষ্টার দেয়া তুমিই ছিলে আমার শ্রেষ্ঠ উপহার, শ্রেষ্ঠ দান। মা তুমি আমার দুচোখে দেখা পৃথিবীর সেরা মানুষ। তোমার জন্যিই এ পৃথিবীতে আমার আগমন, তোমার হাত ধরেই একটু একটু করে পথচলা, জীবনকে বুঝতে শেখা, জীবনকে জানতে শেখা।

প্রখ্যাত দার্শনিক মিচ অ্যালবোম বলেছিলেন, তোমার সকল গল্পের পিছনে র‍য়েছে তোমার মায়ের গল্প। কারণ সেখান থেকেই তুমি শুরু করেছো। সত্যিই আমার সকল গল্পের পিছনের প্রেরণাদায়ী উদ্ভাবক তুমি। তুমিতো আমার চমৎকার অভিভাবক, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও অকৃত্রিম বন্ধু। মা তুমিতো সেই মা নিজে না খেয়েও আমাকে খাইয়েছো, বিনীত রজনী থেকে আমার সুস্থতার জন্য রবের কাছে ধর্না দিয়েছো, সেবা শুশ্রূষা করেছো। মমতা আর ভালবাসা দিয়ে চলতে শিখিয়েছো। অপরকে সম্মান করতে শিখিয়েছো। কোনো বিনিময় ছাড়া অন্যদের উপকার করতে শিখিয়েছো। শাসন আর আদরে লেখাপড়া শিখিয়ে সমাজে মাথা উচুঁ করে সবার সামনে কথা বলার কৌশল শিখিয়ে দিয়েছো। মা এখনো তোমার প্রেরণাময় বাণীগুলো জীবনের পাথেয় করে রেখেছি। সেই পথেই চলছি, সততাকে পুঁজি করে। তুমিই শিখিয়েছিলে চিত্তবান মানুষ হতে। তোমার শেখানো মতে, চিত্তবান হয়ে বেঁচে থাকতে চাই। অনন্তকালের সেই খেঁয়ায় তুমি ভালো থেকো মা।

লিংকনের ভাষায় বলি, আমি যা হই না কেন বা যা হওয়ার আশা করি না কেন, আমি সদা আমার স্বর্গীয় মমতাময়ী মায়ের কাছে ঋণী। আমার মায়ের প্রার্থনা সব সময় আমার সঙ্গে ছিল।