
ঢাকা: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের (আইআর) ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী প্রমিতি রহমানের উপর মানসিক নির্যাতনের দায়ে তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এক শিক্ষকের পদোন্নতি স্থগিতসহ দুই শিক্ষককে সতর্ক করা হয়। এতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ফয়সালের পদোন্নতি আবেদনের পর থেকে দুই বছর স্থগিত রাখা হয়েছে। এছাড়া তৎকালীন প্রীতিলতা হলের প্রভোস্ট মাহবুবুর রহমান ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মুনমুন নেছা চৌধুরীকে সতর্ক করা হয়েছে।
এই দণ্ডকে গুরু অপরাধে লঘু শাস্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আইআর বিভাগের বেশ কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী।
জানা গেছে, চবি আইআর বিভাগের ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী প্রমিতি রহমান গত ২০১৫ সালে ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকার রমনা এলাকায় বাসায় মারা যায়। পরে ২০১৫ সালের ২৬ অক্টোবর প্রমিতি রহমানের মা তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়ের যুগ্ম সচিব (বাজেট ও অডিট) আলম আরা বেগম ওই বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ ফয়সাল, প্রীতিলতা হলের তৎকালীন প্রভোস্ট ও ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর মাহবুবুর রহমান এবং ওই হলের হাউস টিউটর ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মুনমুন নেছা চৌধুরী তিনজনের বিরুদ্ধে প্রমিতিকে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ও চবি উপাচার্য বরাবর লিখিত অভিযোগও করেন প্রমিতির মা।
এ অভিযোগ তদন্তে চবি উপাচার্য সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. এ. এফ এম. ইমাম আলীকে দিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এর আগে ২০১৫ সালের ২ জুলাই শিক্ষক মোহাম্মদ ফয়সালের বিরুদ্ধে প্রমিতি রহমানসহ চার শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে উল্লেখ করে আইআর বিভাগের পরীক্ষা কমিটি বরাবর আরও একটি অভিযোগ করেন। এ অভিযোগটিও বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে তদন্তের দায়িত্ব দেন। এ দুটি অভিযোগ তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মোহাম্মদ ফয়সালকে দোষী সাব্যস্ত করে তার পদোন্নতি স্থগিতের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া তৎকালীন প্রীতিলতা হলের প্রভোস্ট মাহবুবুর রহমান ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মুনমুন নেছা চৌধুরীকে সতর্ক করার সুপারিশ করা হয়।
এদিকে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও প্রমিতির মায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে, বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের হেনস্থা করতেন শিক্ষক মোহাম্মদ ফয়সাল। কিছু ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আক্রোশ মূলক মনোভাব পোষণ করে বিভাগের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পালন করেছেন তিনি। ছাত্রীদের নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে অশালীন কথা বলার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে। ছাত্রীর মায়ের বিরুদ্ধেও বলতেন অশালীন কথাবার্তা। প্রমিতি রহমান নামে এক ছাত্রীকে টার্গেট করে তার উপর চালিয়েছেন মানসিক নির্যাতন।
ব্যক্তিগত আক্রোশের বর্শবর্তী হয়ে পরীক্ষা হলে প্রমিতিসহ চার শিক্ষার্থীর খাতা রেখে দিয়েছেন ৪৫ মিনিট। ছাত্রী প্রমিতিকে নিয়মিত মানসিক অত্যাচারও করেছেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে বিভাগের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ও পরীক্ষার হলে ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করার আশংকার কথা উল্লেখ করে ওই শিক্ষকের কাছ থেকে কোর্স পরিবর্তনেরও আবেদন জানিয়েছেন। এমনকি তার মানসিক নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে প্রমিতি রহমান মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ তার মায়ের।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে, তার বিরুদ্ধে ছাত্রীকে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এ অভিযোগ তদন্তে চবি উপ উপাচার্য প্রফেসর শিরীণ আখতারের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অধ্যাপক পদে আবেদনের পর থেকে দুই বছর পর্যন্ত পদোন্নতি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ^বিদ্যালয়ের ৫১৯ তম সিন্ডিকেট।
এদিকে শনিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় মোহাম্মদ ফয়সাল তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া পদোন্নতি স্থগিতের সিদ্ধান্ত বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু সিন্ডিকেট তাঁর এই আবেদন গ্রহণ করেনি।
প্রমিতি রহমানের মায়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ ফয়সাল প্রমিতি রহমানকে বিভিন্ন সময় হয়রানি করতেন। পরীক্ষার হলে অসদুপায় অবলম্বন না করার পরও প্রমিতির খাতা ৪৫ মিনিট আটকে রেখে দিয়েছেন। এছাড়া প্রমিতি রহমানকে বিভিন্ন সময় মোহাম্মদ ফয়সাল তার কক্ষে ডেকে নিয়ে গিয়ে প্রমিতির বাবা-মা সম্পর্কে অপমানজনক কথাবার্তাও বলেছেন বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি তাদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে, মোহাম্মদ ফয়সাল তদন্ত কমিটির সামনে প্রমিতির বিরুদ্ধে নানা ধরণের নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। এমনকি কমিটির সদস্যদের সামনে মোহাম্মদ ফয়সাল তার ব্যক্তিগত ল্যাপটপ খুলে তাতে প্রমিতি রহমানের ব্যক্তিগত বিষয়ে রক্ষিত একটি ফোল্ডার ওপেন করেন। এ ফোল্ডারে প্রমিতির ব্যক্তিগত জীবনের নানা ছবি কমিটির সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করেন। কমিটি মনে করে, মোহাম্মদ ফয়সাল একজন শিক্ষক হিসেবে নিজ বিভাগের একজন ছাত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়াদির ছবি তার ব্যক্তিগত ল্যাপটপে পৃথকভাবে সংরক্ষণ করাটা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও গর্হিত অপরাধ।
কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী ও সাবেক বিভাগীয় সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ ফয়সালের বিরুদ্ধে তার মা আলম আরা বেগমের উত্থাপিত প্রমিতি রহমানকে অন্যায়ভাবে টার্গেটে পরিণত করা, বিভিন্ন সময়ে বিভাগে ডেকে নিয়ে গিয়ে আজেবাজে কথা বলা, প্রমিতির মা সম্পর্কে অশালীন ইঙ্গিত করা, উদ্দেশ্যে প্রণোদিতভাবে পরীক্ষার খাতা কেড়ে নিয়ে ৪৫ মিনিট আটকে রাখা, ক্রমাগত মানসিক চাপ সৃষ্টির করাসহ নানান অভিযোগ সাক্ষ্য প্রমানের ভিত্তিতে সন্দেহাতীতভাবে কমিটির কাছে প্রমাণিত হয়েছে। তাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যামপ্লয়িজ স্ট্যাটাসের (ইফিসিয়েন্সি অ্যান্ড ডিসিপ্লিন) ৪(১)(বি) ধারা অনুযায়ী মোহাম্মদ ফয়সালের উচ্চতর পদে পদোন্নতির শর্তাদি পূরণ করে আবেদনের তারিখ থেকে দুই বছর স্থগিত রাখার সুপারিশ করেছে। এবং দায়িত্ব পালনের সময় ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আক্রোশমূলক কোনো আচরণ ভবিষ্যতে যাতে না সে জন্য তাকে সতর্ক করারও সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইআর বিভাগের সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থী একুশে পত্রিকাকে বলেন, শিক্ষার্থীদের উপর নিয়মিত অত্যাচার চালাতেন মোহাম্মদ ফয়সাল। পরীক্ষা খাতায় ব্যক্তিগত ক্ষোভ চরিতার্থ করতেন কম নম্বর দিয়ে। শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর চালাতেন মানসিক নির্যাতন। সর্বশেষ প্রমিতির উপর যে মানসিক নির্যাতন তিনি চালিয়েছেন তা প্রমাণিত হওয়ার পর, তিনি শিক্ষক হিসেবে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার রাখেন না। গুরু অপরাধের জন্য তাকে লঘু শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে স্মারকলিপি দিব।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আইআর বিভাগের সাবেক সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ফয়সালের মুঠোফোনে মঙ্গলবার রাতে একাধিকবার কল করা হয় একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে; তবে তিনি ফোন ধরেননি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কে. এম নুর আহমদ একুশে পত্রিকাকে জানান, প্রমিতি রহমানের মায়ের করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত একাধিক তদন্ত কমিটি তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করে। এর প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য ওই তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিয়েছেন।