মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

ম্যাজিক নাকি মিরাকল?

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, মার্চ ১৪, ২০১৯, ১:১৯ অপরাহ্ণ

খন রঞ্জন রায় : প্রধানমন্ত্রী হিসাবে চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো বিদেশ সফরে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জার্মানির মিউনিখে “হেলথ ইন ক্রাইসিস-ডব্লিউ এইচ ও কেয়ার্স” শীর্ষক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলনে ভাষণে ইবোলা, কলেরা, যক্ষার মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ প্রতিকারে আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও সহযোগিতার আহ্বান জানান। তার সরকারের নেয়া সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা অবহিত করেন। মূল বিষয়ের বাইরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক নিয়েও খোলামেলা কথাবার্তা হয়েছে।

উন্নত বিশ্বের সরকারপ্রধানরা জানতে চেয়েছেন ‘বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক উন্নয়ন আসলে ম্যাজিক, নাকি মিরাকল!’ উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘যা অর্জন তা আমার জনগণের প্রচেষ্টার ফসল’। প্রধানমন্ত্রী গোটা কৃতিত্ব জনগণকে দিয়েছেন। জনগণকে সামনে তুলে ধরতে তার কোনো কার্পণ্য নেই।
তাত্ত্বিক বিচারে অর্থনীতিতে ম্যাজিক কিংবা মিরাকল বলে কিছু নেই। কোন জাদুর কল্যাণে অর্থনীতিকে পাল্টে দেওয়া কিংবা দৈবকল্যাণে ‘আলাদীনের চেরাগ’ পেয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনেরও সুযোগ নেই। অনেক কষ্টের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়েছে। রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক পথে পরিচালনার ষড়যন্ত্রের শিকার হলে উন্নয়ন অগ্রযাত্রার সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়তে হয়। উন্নয়নের মহাসড়ক থেকে কোনো রকম একবার ছিটকে পড়লে নতুন করে সংকট তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি উত্তরণে চাই ইস্পাতসম, স্বাধীনচেতা দৃঢ় নেতৃত্ব। স্বাধীন বাংলাদেশ অনেক হোঁচট খেয়েছে। যেমনটা ঘটেছে ‘৭৫-এর আগস্ট ট্রাজেডিতে। এরপর পলকে পলকে বাধা এসেছে। শতবাধা বিপত্তি আর ষড়যন্ত্র পেরিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এখন বিশ্বের বিস্ময়।

২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। যা গত অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতে সব চেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) বার্ষিক হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে। শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি নয়, সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এখন বিশ্ব দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে।

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, আশ্রয়নপ্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষাসহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও শিশুবিকাশ এবং সামষ্টিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং বিনিয়োগ বিকাশ কর্মসূচি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছায় এসব কর্মসূচি বিভিন্ন সময়ে গ্রহণ করা হয়েছিল এবং সেসব কর্মসূচি দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে নিয়ে এসেছে তা প্রমাণিত হয়েছে। সরকারের দূরদর্শিতার ফসল এই সব কর্মকাণ্ড। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি আগামি ১৫ বছরের মধ্যে পূরণ করতে হলে এসব কর্মসূচি সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষির অবিরাম উন্নয়ন ঘটছে। ১৯৯৬ সালে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার দেশের কৃষির উন্নয়নের জন্য, কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল, এরপরের বিশেষ উদ্যোগ হচ্ছে আশ্রয়ন প্রকল্প। এ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে দেশের মাথাগোঁজার ঠাইহীন মানুষের নিরাপদ আশ্রয় জুটছে। ১৯৯৭ সালের ১৯ মে কক্সবাজার জেলাসহ পাশের এলাকা ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হওয়ায় বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই এলাকা পরিদর্শনে যান। তিনি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে অত্যন্ত সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন এবং সব গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালে ‘আশ্রয়ন’ নামের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন, ঋণপ্রদান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে সক্ষম করে তোলা এবং আয়বর্ধক কার্যক্রম সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের উদ্দেশ্য নিয়ে এ প্রকল্প কার্যক্রম এখন অসহায় দরিদ্রদের নির্ভরতার প্রতীক।

‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের দর্শনের জনপ্রিয়তা এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। উৎপাদনশীলতার সম্ভাবনা এখন ইঞ্চি পরিমাণ ভূমিতে গিয়ে ঠেকেছে। সরকারের গৃহীত নীতি ও কর্মপরিকল্পনার কারণে বাংলাদেশের সব ধরনের আর্থ-সামাজিক সূচকে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়ে ২০১৭ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। অতি দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা এবং বর্তমান সময়ের অগ্রগতি বিবেচনায় ২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৪ শতাংশের নিচে নেমে আসবে।

মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মাথাপিছু আয় ২০০৫-২০০৬ সালের ৫৪৩ ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে এক হাজার ৭৪২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। গত ৭ বছরে প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ৫ কোটি মানুষ নিম্ন আয়ের স্তর থেকে মধ্যম আয়ের স্তরে উন্নীত হয়েছে। গত ৭ বছরে ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৮ জনের বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্তমানে ৯৬ লাখ বাংলাদেশি কাজ করছেন। গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স আয় এক হাজার ৫৯০ কোটি ডলার। রিজার্ভে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ দ্বিতীয়। রফতানি আয় বর্তমানে ৩২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এক বছরের ব্যবধানে ৫৮ তম স্থান থেকে ১৬ ধাপ এগিয়ে এখন ৪২ তম অবস্থানে। বিশ্ব জ্বালানি সূচকে বাংলাদেশ ১০ ভাগ এগিয়েছে। ক্রয়ক্ষমতার সমতা বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৩২ তম।

বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২০ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। ২০২১ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় আসবে। এর মধ্যে ৪৪ লাখ সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। উন্নয়ন অর্থনীতিতে অবকাঠামো হচ্ছে মানুষের দেহের শিরা-উপশিরার মতো। ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন যেমন জরুরি, তেমনি নীতি-কাঠামোরও আধুনিকায়ন জরুরি। ঢাকায় দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিল প্রকল্প, কুড়িল-বিশ্বরোড বহুমুখী উড়াল সেতু, মিরপুর-বিমানবন্দর জিল্লুর রহমান উড়াল সেতু, চট্টগ্রামে আক্তারুজ্জামান উড়াল সেতুসহ বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার চালু হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলেছে। পদ্মা সেতু, মেট্টোরেল, কর্ণফুলীর সমুদ্রে বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নতুন নতুন চিন্তা ও দিন-দিনান্ত টানা পরিশ্রম দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা বদলে দিয়েছে। গ্রামে এখন কোনো মানুষ খালি গা কিংবা খালি পায়ে থাকে না। আজ কেউ আর অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটায় না। কৃষিজমিতে শ্রমিক পাওয়া অনেক দুষ্কর হয়ে পড়েছে। কর্মপরিধি বেড়ে যাওয়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্রমিকের দুষ্প্রাপ্যতাও রয়েছে। শেখ হাসিনার এই কর্ম-অলঙ্কার আমাদের প্রাণশক্তি। এখানে ম্যাজিক কিংবা মিরাকল বলে কিছু নেই। পরিশ্রমই মূলধন। আর লাগসই নীতি, পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে ব্যাপক জনগণকে সম্পক্ত করে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়াই বড় কথা। জনগণকে কর্মমুখর করতে পারাটাই এখানে বড় চ্যালেঞ্জ।

মিউনিখ সম্মেলন শেষ করেই তিনি পৌঁছান সংযুক্ত আরব আমিরাতে। আবুধাবিতে তাঁর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ আরব আমিরাত চারটি সমঝোতা চুক্তি সম্পাদিত হয়। এর বাস্তবায়ন হলে শুধু বাংলাদেশে বিনিয়োগ নয়। আরব বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সর্ম্পকের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। ক্লান্তিহীন পথচলা, জনমুখী নীতি প্রণয়ন, চিন্তার গভীরতা সবাইকে তার প্রতি আরও মনোযোগী করে তুলছে। তিনি যে কোনো সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান ছাড়াও গভীরভাবে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করেন।
নারীর ক্ষমতায়নে ও নারীর যথাযথ মূল্যায়নে বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনার ভূমিকা যুগান্তকারী।

‘৯৬ সালের আগে কোনো মেয়ে সচিব, এসপি, ইউএনও ছিল না। শেখ হাসিনার সরকারই প্রথম মেয়ে সচিব নিয়োগ দেয়, প্রথম এসপি বানানো হয়, প্রথম ইউএনও বানানো হয়। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রায় ২৫টি ক্ষেত্রে সরকার পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশে নারীদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালাচ্ছে। এতে নারীরা আত্মকর্মসংস্থান প্রক্রিয়ায় স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। কেবল নারীদের অবস্থানই শক্ত করেনি, মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ পূর্ণ গড় বেতনে ৪ মাস থেকে ৬ মাসে বর্ধিত হয়েছে। সন্তানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে পিতার নামের পাশাপাশি মায়ের নাম লেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নারীর প্রতি পারিবারিক সংসিহতা প্রতিরোধ এবং নারীকে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইন করা হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে যুগব্যাপী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১৩-২৫) প্রণয়ন করা হয়েছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৪, যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০ সংশোধন করে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৫ প্রণীত হয়েছে।

সরকারের সামগ্রিক আরেকটি বিশেষ উদ্যোগ হচ্ছে সামষ্টিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এর আওতায় মানুষকে সামাজকি নিরাপত্তা দেয়ার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। দুর্যোগের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও মোকাবেলায় আওয়ামী লীগ সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণবিষয়ক স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। এতে দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমানোসহ খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান, দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারের দৃঢ় ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর উল্লেখযোগ্য অংশ দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে। হতদরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বিস্তৃত করতে বয়স্ক, বিধবা, স্বামীপরিত্যক্তা ও দুস্থ মহিলা ভাতা, অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ ভাতার হার ও আওতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ২০০৮-২০০৯ সালে এ খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা, বর্তমানে এ কার্যক্রমে বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

রাজনৈতিক বৈরিতা, মিথ্যা প্রচারণা, দালালি-নাফরমানিসহ নানা কুচক্রী ষড়যন্ত্রেও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিতে থাকে। শতভাগ বৈদেশিক সমতা বিনিয়োগের সুবিধা, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের আয়কর রেয়াত, কর অবকাশ, দ্বৈত কর থেকে সুরক্ষা, মুনাফার শতভাগ রিপ্যাট্রিয়েশন, দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণসুবিধা, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য শুল্কমুক্ত যন্ত্রপাতি আমদানিসহ বিভিন্ন সুবিধা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রদান করা হয়েছে।

জাতীয় শিল্পনীতিও বিনিয়োগবান্ধব করা হয়েছে। ভারত, চীন, জাপান ও কোরিয়ার বিনিয়োগ বাড়াতে ওই দেশগুলোর জন্য পৃথক অর্থনৈতিক অঞ্চল সংরক্ষণ করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে আগামী ১৫ বছরে সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন হচ্ছে। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম শিল্প জোন।

বিনামূল্যে বই, উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং প্রভৃতি কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্বাক্ষরতার হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বিদ্যালয়ে শতভাগ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত, ঝরেপড়া রোধ করা হয়েছে। এ সমস্ত কারণে বাংলাদেশের উত্থানকে এখন বিস্ময়কর বলা হচ্ছে সবদিক থেকে। এরপরও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে তাঁর বাবার মতো আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিতে হয়েছে। সেটি হলো দুর্নীতি নির্মূল ও দখলধার উদ্ধার। এটি অবশ্য অস্ত্রের যুদ্ধ নয়। এটা চূড়ান্ত রাজনৈতিক যুদ্ধ। এটাও শেখ হাসিনার জন্য এক মহাচ্যালেঞ্জ। তিনি রাজনৈতিক শক্তিকে মজবুত সংহত করার জন্য সাংস্কৃতিক সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করেছেন। এখন সময় ও সুযোগ এসেছে তরুণরা এ প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা হতে। একাত্তরের মতোই তাদের মাঠে নামাতে হবে। এটাই হবে নতুন মুক্তিযুদ্ধের জনসম্পৃক্ততা। আর তরুণদের সম্পৃক্ত করতে পারে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ক কাজে আত্মনিয়োগের মাধ্যমে। তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান, মানবিক শিক্ষার ভিত্তি রচনা করতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি মাত্র নতুন পদ ‘অতিরিক্ত সচিব ডিপ্লোমা শিক্ষা’।

ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীরা আধুনিক প্রযুক্তির ধারক-বাহক। তাদের সংখ্যা দ্রুত বাড়াতে হবে। প্রতিবছর গড়ে ১৪ লাখ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এর অর্ধেক তরুণকে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে ১০টি সরকারি/বেসরকারিভাবে কৃষি, ভেটেরিনারি, লেদার, পলিটেকনিক, টেক্সটাইল, মেডিক্যাল টেকনোলজি, নার্সিং, প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, মেডিক্যাল ও ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

রাবার, মোবাইল ব্যাংকিং, এয়ারহোস্টেজ, পর্যটন, সাংবাদিকতা, বিমান পরিচালনা, সাবমেরিন, মহাকাশযান, নিউক্লিয়াস ইত্যাদি বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্সসহ সকল পণ্য ও পেশায় কমপক্ষে ৫০০ (পাঁচশত) নতুন ডিপ্লোমা কোর্স চালু করতে হবে। ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ ও ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর জাতীয়ভাবে ‘জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস’ পালনের নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। আর তা হলে বাংলার মাটি থেকে বেকার সমস্যা চিরতরে দূর করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এই অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করতে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য প্রশাসনিক ৮টি বিভাগে ‘ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’ প্রতিষ্ঠার আইন পবিত্র জাতীয় সংসদে পাশ করতে হবে।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মত প্রধানমন্ত্রীকে আর একটি যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে হবে। এই যুদ্ধ হলো প্রতিটি গ্রামে আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে দিয়ে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগান বাস্তবে পরিণত করার এবং বেকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়া। আপামর জনগণের বিশ্বাস জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সকল অসাধ্য সাধন করা সম্ভব।
একুশে/কেআরআর/এটি