শুক্রবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬

সন্তান কেন কথা শোনে না?

প্রকাশিতঃ শনিবার, মার্চ ১৬, ২০১৯, ১২:৩৭ অপরাহ্ণ

মিরাজুল হক : আমরা অনেক প্যারেন্ট-এর সাথে কথা বলেছি। তারা অভিযোগ করছেন, আমাদের সন্তান আমাদের কথা শোনে না। সন্তান কথা না শোনার পেছনে আমরা যে কারণগুলি খুঁজে পাই তাকে আমরা বলি 4Ts প্রথম T হচ্ছে – ট্যালেন্ট।

রবিদের বাসার সবাই একটি মিটিং-এ বসেছে। রবির বাবা-মা, দাদু, চাচা আর একজন ইন্টিরিয়র ডিজাইনার। রবিদের বাসাটা আবার সুন্দর করে সাজানো হবে। নতুন করে রঙ করা হবে, জানালার পর্দা, ফার্নিচার সব বদলানো হবে, তাই এই মিটিং। আলোচনা খুব সুন্দরভাবে এগোচ্ছিল, এমন সময় বাসার কাজে সাহায্য করে যে মহিলাটি, ঝাড়ু দিতে দিতে ড্রয়িংরুমে ঢুকলো। কিছুক্ষণ সবার কথা শুনলো, তারপর হঠাৎ বলে উঠলো, ”খালাম্মা আপনাদের ডিজাইন আমার পছন্দ হয় নাই”! সবাই খুব অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো, সে বলে যাচ্ছে “জানালাায় গোলাপী রঙয়ের পর্দা দিলে খুব সুন্দর লাগত, আর দেয়ালে হলুদ রঙ…”

প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি রবির মায়ের জায়গায় হলে কী করতেন, তার মতামত আপনি গ্রহণ করতেন? যদি গ্রহণ না করে থাকেন, তবে কেন গ্রহণ করতেন না। আপনি অনেক কথাই বলতে পারেন যেমন – আমাদের ঘর তাই আমাদের পছন্দ মতোই আমরা করবো, আবার বলতে পারেন ওর সামাজিক মর্যাদা… ইত্যাদি। এর একটাও আসলে ঠিক নয়। আচ্ছা চিন্তা করে দেখুন তো, আপনি এক ধরনের রঙ দেয়ালে দেবেন বলে ঠিক করলেন, আর রঙয়ের মিস্ত্রী যার সামাজিক স্ট্যাটাস আপনার ঘরের কাজের লোকের মতোই, সে যদি বলে ম্যাডাম, এই রঙটা ক্যাটালগে দেখতে ভাল লাগে কিন্তু দেয়ালে লাগালে ভাল লাগবে না, আচ্ছা আপনি কি তার কথা শুনবেন না? উত্তর হচ্ছে-অবশ্যই শুনবেন। কারণ, এই লোকটির রঙ-এর ব্যাপারে জ্ঞান বা ট্যালেন্ট আছে। বাসার কাজের লোকের কথায় পাত্তা দেবেন না কারণ তার মধ্যে রঙ করা বিষয়ে কোন ট্যালেন্ট বা যোগ্যতা নেই। তাহলে আপনি যদি আপনার কাজের মানুষের কথা না শোনেন বা তাকে পাত্তা না দেন তবে আপনার কোনো দোষ নেই। ঠিক?

এবার একই রকমের আরো একটি ব্যাপার আমরা লক্ষ করি, আপনার সন্তানের এখন যে বয়স, আপনার সে বয়সে, সেই আপনি এবং আপনার সন্তানের বুদ্ধি বা ট্যালেন্ট-এর কথা যদি বলা হয়- এ দু’জনের বুদ্ধি সমান নাকি বেশি? কার ট্যালেন্ট বেশি? আপনার নাকি আপনার সন্তানের? অবশ্যই আপনার সন্তানের। শুধু বেশি নাকি অনেক বেশি। অনেক অনেক বেশি। তাহলে কম বুদ্ধির আপনার কথা যদি বেশী বুদ্ধির মানুষ (আপনার বাচ্চা) না শোনে, তাহলে এখানে তার কোনো দোষ নেই, একথা আপনিই একটু আগে স্বীকার করেছেন।

দ্বিতীয় ‘টি’ হচ্ছে ‘টার্গেট’। আমরা যখন ছোট ছিলাম, সবাই জিজ্ঞেস করতো বড় হয়ে তুমি কী হবে? বাবা যেহেতু ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, আমরাও বলতাম ইঞ্জিনিয়ার হবো। ইঞ্জিনিয়ার মানে বুঝতাম না, এ সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। অনেকটা বড় হবার পর আমরা পেশা কী জিনিস সেটা চিনতে শিখলাম, আমাদের পেশা কী হবে সেটা আমাদেরকে পছন্দ করতে দেয়া হতো। আমাদেরও আগের যুগে যারা ছিলেন, বেশীর ভাগ সময়ে তাদের কোনো পছন্দ থাকতো না। অবধারিতভাবে মুচির ছেলে মুচি হতো, আর ডাক্তারের ছেলে ডাক্তার, দরজির ছেলে দরজি আর, স্বর্ণকারের ছেলে স্বর্ণকার। আর এখন ঘটনা বদলে গেছে। আজ ডাক্তারের ছেলে ফ্যাশন ডিজাইনার হতে চায় আর দরজির ছেলে লেখাপড়া করে ডাক্তার হতে চায়। মুচির ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যায়, আর ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে হেয়ার ড্রেসার হয়ে যায়। ঘরের মেয়েরা আর তার মায়ের মতো ঘরে কাজ করতে চায় না। ছেলের টার্গেটে তার বাবা আর নেই, আর মেয়ের টার্গেটে তার মা নেই। আগে যেহেতু পেশাগত টার্গেট একই ছিল তাই সন্তানেরা তাদের মা-বাবাকে হুবহু ফলো করতো। আজ টার্গেট ভিন্ন হবার কারণে সেটা করার আর দরকার নেই।

তৃতীয় ‘টি’ হচ্ছে-টেকনোলজি। আজ যেসব প্রযুক্তি আমাদেরকে ঘিরে রয়েছে, তার কিছুই আমাদের মা-বাবা তার তার আগে ছিল না। এ সমস্ত প্রযুক্তির কারণে আজ আমাদের সন্তানেরা আমাদের থেকে অনেক বেশি জেনে গিয়েছে। আর আমরা জ্ঞানার্জনে তাদের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছি। আগে আমাদের যা কিছু জানার প্রয়োজন হতো আমাদের মা-বাবা ছাড়া খুব বেশি মানুষ ছিল না যাদের আমরা জিজ্ঞেস করতে পারি। আজ আমাদেরকে আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে শিখতে হয় অনেক জিনিস। প্রযুক্তির এ অভাবনীয় উৎকর্ষ এবং আমাদের আপডেটেড না থাকার কারণেও আমাদের সন্তাান আমাদের কথা শুনতে আর বাধ্য নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের নিজেদের আচরণের কারণেই তারা আমাদের কথা আর শোনে না।

চতুর্থ ‘টি’ হচ্ছে ট্রেন্ড বা প্রথা। একসময় এ অঞ্চলে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। এটা তখন শুধু একটা প্রথাই নয় বরং উপাসনা মনে করে আচরিত হত। হঠাৎ নবীন একদল মানুষের কাছে মনে হলো-এটা অমানবিক। পুরোনোরা ভয়ানক প্রতিবাদ করলেন, তারা বললেন, এটা বন্ধ করা অধর্ম হবে। তারপর কী হলো? এ যুদ্ধে কে জিতল? অবশ্যই নতুনেরা। কারণ পুরোনো মানুষেরা দুর্বল এবং দিনে দিনে দুর্বলতর হতে থাকেন আর একসময় এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তখন এ পৃথিবীতে শুধু নতুনদের কথাই চলে। ক্রমে নতুনেরা পুরাতন হন আরো নতুনেরা আসে এবং অবধারিতভাবে পুরোনোদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। তারপর কী হয়? এ যুদ্ধে কে জেতে? একদম ঠিক, আবার নতুনেরাই জেতে, সবসময় নতুনরাই জিতবে এবং এটিই স্বাভাবিক। একসময় প্রতি ৫০ বছরে জেনারেশন গ্যাপ তৈরি হতো এখন ১০-১৫ বছরেই হয়ে যায়। বিশেষ করে বড়রা ছোটদের চিন্তার সাথে সিংক্রানাইজ না করতে পারার কারণে এ গ্যাপগুলো তৈরি হয় আর আমাদের সন্তাানেরা আমাদের কথা আর শোনে না।

লেখক : পরিচালক, পজিটিভ প্যারেন্টস ক্লাব