২৬ জুন ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬, মঙ্গলবার

আম্মুকে খুঁজছে শিশুটি, গ্রেপ্তার হচ্ছে না খুনি

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, এপ্রিল ৫, ২০১৯, ১২:০০ অপরাহ্ণ

শরীফুল রুকন : ‘আমার আড়াই বছরের মেয়েটা মা ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না। তাকে নিয়ে আমার বেশি সমস্যা হচ্ছে। রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত আম্মু, আম্মু করছে। আম্মু কই, আম্মু কই বলতে থাকে শুধু, আমি তাকে কীভাবে বুঝাবো আম্মু যে আর নেই। অনেক কষ্টে তাকে ঘুম পাড়াতে হয়।’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন শ্রীলংকার নাগরিক শান মুগাম।

তার স্ত্রী লাকী আক্তার (৩৩) গত ১৮ মার্চ রাতে নগরের হালিশহর আবাসিক এলাকার কে ব্লকের ৩ নম্বর সড়কের কেএস স্পাইসি ক্যাফে নামের নিজের একটি খাবারের দোকানে খুন হয়েছেন। চার সন্তানের জননী লাকি আক্তারের ছোট দুই সন্তানের মধ্যে একজনের বয়স আড়াই বছর, আরেকজন ৩ মাস বয়সী।

শৈশবে মা-বাবা হারিয়েছেন বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ থানাধীন গুয়াতলা এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা লাকী আক্তার। ১৪ বছর আগে চট্টগ্রাম ইপিজেডে কর্মস্থলে পরিচয়ের সুবাদে বিয়ে করেন শ্রীলঙ্কান নাগরিক শান মুগামকে। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে হালিশহর কে-ব্লকে লার্জ ডিজাইন বুটিক হাউজ নামে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন লাকি আক্তার।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে হালিশহর কে-ব্লকে কেএস স্পাইসি ক্যাফে চালু করেন লাকী আক্তার। এটি পরিচালনার জন্য উখিয়ার পূর্ব মরিচা এলাকার খালেদ নূরকে (২৭) দায়িত্ব দেন তিনি। উক্ত দোকানের লাভ-ক্ষতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলে আসছিল।

দিনের আয়-ব্যয়ের হিসাব করার জন্য গত ১৮ মার্চ রাতে কেএস স্পাইসি ক্যাফেতে যান লাকী। সেদিন রাত সাড়ে ৯টা থেকে লাকীকে ফোন দিয়ে পাচ্ছিলেন না তার ভাই মামুন ও স্বামী শান মুগাম। এরপর বোনের খোঁজে রাত ১১ টার দিকে বাসার অদূরে দোকানটিতে যান মামুন। তখন কর্মচারী খালেদকে দোকানের পেছন দিক থেকে বের হতে দেখে মামুন জানতে চায়, তার বোন কোথায়। খালেদ জবাব দেয়, তিনি বাসায় চলে গেছেন।

এরপর বাসায় ফিরে লাকীকে পাননি মামুন। এরই মধ্যে রাত পৌনে ১২টার দিকে মামুনকে ফোন করে খালেদ বলে, ‘তোর বোনকে দোকানে মেরে ফেলছি। এখানে বাচ্চাটা কান্নাকাটি করতেছে, নিয়ে যা।’

এরপর দোকানের পূর্ব দিকের জানালা দিয়ে ভেতরে লাকীর রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান মামুন। মৃত মায়ের পাশে পড়ে ছিল তিন মাসের শিশুটি। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।

খুনের কারণ আঁচ পাওয়া গেছে লাকীর ছোট ভাই বাগেরহাটের বাসিন্দা বাদল হাওলাদারের কথায়; তিনি বলেন, ‘আপা আমাকে ফোন করে বলেছেন, খালেদ ঠিকমতো টাকা-পয়সার হিসেব দেয় না। মামুনের এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলে তাকে নিয়ে তুই বাড়ি থেকে চট্টগ্রামে চলে আসবি। এরপর আমরা সবাই এক জায়গায় থেকে দোকানটা চালাবো।’

একই কথা জানিয়ে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (ডবলমুরিং) আশিকুর রহমান বলেন, ‘ছোট ভাই মামুনকে আগে লাকী আক্তার বলেছিল যে, রেডি হও। সামনের দোকানটা তোকে চালাতে হবে। লাকীর মধ্যে হয়তো পরিকল্পনা ছিল, খালেদকে আর রাখবে না।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণ চোখে অনেকেই মনে করবেন, মাথার মধ্যে শক্ত কিছু দিয়ে বাড়ি দিয়ে মেরে ফেলেছে। প্রকৃতপক্ষে ঘটনা তা নয়। প্রথমে শ্বাসরোধ করে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। এরপরই লোহার তৈরী মশলার ছেচনী দিয়ে মাথায় আঘাত দিয়েছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনটা এখনো আমাদের হাতে আসেনি।’

নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম) ফারুক উল হক বলেন, ‘দোকানের পেছনে মালামাল ছিল। কর্ণারে খালেদের একটা চৌকি টাইপের ছিল থাকার জন্য। প্রতিদিন কেনাবেচা যখন শেষ হয়ে যায়, মানুষ তো হিসাব করতে বসে। প্রতিদিন দোকান বন্ধের পর হিসাব-নিকাশ করার জন্য লাকি সেখানে যায়। সেদিন রাতেও হিসাব-নিকাশ হচ্ছিল। আর কিছু না। স্পটে কোন একটা বিষয়ে রাগারাগির প্রেক্ষিতে গলা টিপে ধরেছে। পরে হয়তো মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য সে মাথায় আঘাত করেছে। খুন একজনই করেছে এটা নিশ্চিত।’

এখনো প্রধান অভিযুক্ত খালেদ গ্রেপ্তার না হওয়া নিয়ে ফারুক উল হক বলেন, ‘এখানে কোনো ধরনের জটিলতা নেই, গ্যাপ নেই। অভিযুক্ত খালেদ প্রতিনিয়ত অবস্থান পরিবর্তন করছে। খালেদের বাবা-মা, বোন সৌদি আরব থাকেন। তার পাসপোর্টটা আমরা জব্দ করেছি। সে বাইরে যেতে পারবে না। দেশে তার উল্লেখযোগ্য আত্মীয় নেই। এটাও একটা চ্যালেঞ্জ।’

মামলার তদারক কর্মকর্তা নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (ডবলমুরিং) আশিকুর রহমান বলেন, ‘খালেদের সঙ্গে আরো একজন বিবাহিত নারীর সম্পর্ক ছিল। তাকেও আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। নারীঘটিত ব্যাপার, আর্থিক বিষয় নিয়েই ঘটনা। মোটিভ যেটা আমরা ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছি সেটা নিশ্চিত হবো খালেদকে পাওয়ার পর।’

নিহত লাকীর স্বামী শান মুগাম বলেন, ‘ঘটনার কয়েকদিন আগে লাকী আমাকে বলেছিল, আমার ১ লাখ টাকার লোন দরকার। এখানে একটা লোক আছে, আপনি গ্যারান্টি দিলে টাকা দেবে। তবে আমার খুব অনীহা ছিল। বলেছি, পারবো না। এত টাকা নিয়ে গিয়ে নষ্ট করেন, জমা কিছু নাই। তারপর আবার লোন নিলে শোধ করতে কষ্ট হবে না? তারপরও মাল্টিপারপাসের ওই লোককে দোকানে নিয়ে আসে। তারপর আমাকে আবারও অনুরোধ করায় আমি ১৭ মার্চ সাইন করে দিয়েছি। ১৮ মার্চ টাকা পাওয়ার কথা। সে হিসেবে ১ লাখ টাকা ছিল। ওই টাকাটা ধারণা করছি, খালেদের হাতে আছে।’

এদিকে লাকী হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানতে গত মঙ্গলবার নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম) ফারুক উল হকের কার্যালয়ে যান ফাইট ফর উইমেন রাইটস এর সভাপতি অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু; তিনি বলেন, মেরে পালিয়ে যায় শুনেছি। মেরে ফোন দিয়ে জানায় শুনিনি। পরেরদিন আবার ফোন করে জানতে চায় দাফন হয়েছে কিনা! কী অদ্ভুত মানসিক দৃঢ়তা খুনির! হত্যাকাণ্ডের ১৯ দিন অতিবাহিত হলেও আত্মস্বীকৃত খুনি গ্রেপ্তার হয়নি; এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

আত্মস্বীকৃত খুনি খালেদ নূরের ব্যাপারে নিহত লাকীর স্বামী শান মুগাম বলেন, ‘২০১৭ সালের দিকে খালেদ ও আরো তিন-চারজন একটা বাসায় থাকতো। তারা তখন প্রাণ কোম্পানীতে কাজ করতো। তাদের বাসার তিন রুম পাশে ছিল লাকীর টেইলার্স। সেখানে পরিচয়। খালেদের মা-বাবা সৌদিতে থাকে। দেশে কেউ নেই। সে আমাদের কাপড়ের দোকানে মাঝে মাঝে আসে। আমার বাচ্চাদের নিয়ে খেলে। আমাদের সাথে কথা-বার্তা বলে, এভাবে পরিবারের সদস্যের মত হয়ে গেছে। কোনো কোনো সময় বাসায় এসে খাবার খায়, ঘুমায়।

তিনি আরো বলেন, তারপর দুজনে মিলে খাবারের দোকান নিতে হবে বলে পরিকল্পনা করে। আমি একেবারে রাজী ছিলাম না। কারণ একটা মহিলা মানুষ এরকম খাবার দোকান করা অনেক কঠিন, চালাতে পারবে না। তারপরও লাকীকে কেমনে কেমনে ম্যানেজ করে দোকান নিয়ে ফেলেছে। দোকানের জন্য টাকা-পয়সা সব আমি দিয়েছি। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে উদ্বোধনের জন্য আমাকে ডাকলে, আমি যাই। এরপর আর যাইনি।’

‘ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর লাকী যখন দোকনের হিসাব নিতে বের হচ্ছিল, তখন বলেছিলাম, আড়াই বছরের মেয়েটাকেও নিয়ে যেতে। সে নেয়নি। মামুনের কাছে বাসায় রেখে গেছে। মেয়েটা মাকে ছাড়া ঘুমাচ্ছিল না। বড় ছেলে দুটি ঘুমিয়ে গেছে খাবার খেয়ে। আমি মেয়েকে নিয়ে বাসায় আছি। দুই-তিনবার কল করেছি, ঢোকেনি। এরপর মামুন দোকানে গিয়েও পায়নি। ’

‘পরে মামুনকে ফোন করে খালেদ বলে, ‘মেরে ফেলেছি, লাশ নিয়ে যাও।’ ৩ মাসের শিশুকে পাশে রেখে আম্মুকে মেরেছে, কেমন মানুষ সে। আম্মুকে মারলে বাচ্চার কী হবে? মানুষ না, ও মানুষ না।’ বলতে বলতে গলা ধরে আসে শান মুগামের।

একুশে/এসআর/এটি