২৬ জুন ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬, মঙ্গলবার

সাজাপ্রাপ্ত ‘ডাকাত’ ছালামকে বাঁচাতে রায়ের নথি গায়েব!

প্রকাশিতঃ বুধবার, এপ্রিল ১০, ২০১৯, ৭:৩১ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে রাঙ্গুনিয়ার একটি ডাকাতির মামলা ১৯৯১ সালের ৩২ নম্বর দায়রা মামলা হিসেবে বিচার শেষ হয়েছে ২৬ বছর আগে। তবে আদালতে আবেদন করেও মামলাটির ফলাফল জানা যাচ্ছে না। এই রায়ের নথি নিয়ে লুকোচুরি চলছে আদালতে।

এই মামলায় আবদুস ছালাম নামের একজনের সাজা হয়। তিনি চট্টগ্রামের পঞ্চম সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী আবুল কালাম আজাদের ছোট ভাই। অভিযোগ রয়েছে, উক্ত ডাকাতি মামলাটির রায়ে আবদুস ছালামের ১৮ বছর সাজা হয়েছিল। সাজাপ্রাপ্ত এই আসামিকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে সেই মামলার নথিপত্র নিয়ে লুকোচুরির অভিযোগ উঠেছে।

ডাকাতি মামলায় সাজা পাওয়া আবদুস ছালাম এখন রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের মেম্বার। স্থানীয় রাজাভুবন উচ্চ বিদ্যালয়, রাজাভুবন দেবাশীষ কিন্ডারগার্ডেন ও রাজারহাট বাজার কমিটির সভাপতি। ছালামের স্ত্রী দায়িত্বপালন করছেন স্থানীয় ইউপির সংরক্ষিত নারী সদস্য হিসেবে।

এদিকে চট্টগ্রামের জেলা জজ আদালতে ১৯৯১ সালের ৩২ নাম্বার দায়রা মামলার রায়ের নথি না থাকলেও আগে ও পরের সিরিয়ালের ৩১ ও ৩৩ নাম্বার মামলার রায়সহ সব তথ্য ‘স্যুট রেজিস্ট্রারে’ উল্লেখ আছে। ব্যতিক্রম কেবল ওই ৩২ নাম্বার মামলাটি। উক্ত মামলার রায়ের নকল পাওয়ার জন্য ২০১৭ সালের ১৯ মে আবেদন (নম্বর ১৬০০/১৭) করেছিলেন চট্টগ্রাম আদালতের একজন আইনজীবী। এরপর ‘দরখাস্তে বর্ণিত নথি নিষ্পত্তি মতে রুল বইতে না থাকায় প্রসেস দেওয়া গেল না’ উল্লেখ করে নকল আবেদন খারিজ করা হয়েছিল।

আদালতের মহাফেজখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সোলায়মান বলেন, ‘রায়ের তারিখ ও সাল অনুযায়ী আমরা রেকর্ড সংরক্ষণ রাখি। ১৯৯১ সালের ৩২ নাম্বার এই দায়রা মামলার রায়ের তারিখ অনুযায়ী নথি পাওয়া যাচ্ছে না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডাকাতির অভিযোগে আবদুস ছালামসহ চারজনের বিরুদ্ধে ১৯৮৭ সালের নভেম্বর মাসে রাঙ্গুনিয়া থানায় দন্ডবিধির ৩৯৫, ৩৯৭ ও ১১২ ধারায় একটি মামলা হয়। যার মামলা নং ০৮(১১)৮৭। পরবর্তীতে ওই মামলা ১৯৯১ সালে ৩২ নম্বর দায়রা মামলা হিসেবে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বিচার শুরু হয় ১৯৯১ সালের ১৬ মার্চ। ১৯৯২ সালের ২৮ অক্টোবর মামলাটি বিচার নিষ্পত্তি হয়। তবে রুল বইয়ে মামলাটির নথি ২০০০ সালের ১৮ মে ৩৬ নম্বর স্মারকে ‘ক্যাপট নথি’ হিসেবে জেলা রেকর্ড রুমে প্রেরণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে নিয়ম অনুযায়ী চট্টগ্রামের দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতের রুল বইয়ে মামলার রায় ঘোষণার তারিখ ও নথির সর্বশেষ অবস্থান লিপিবদ্ধ থাকার কথা। একইভাবে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের স্যুট রেজিস্ট্রারেও রায়ের ফলাফলের নোট থাকার কথা। কিন্তু রহস্যজনক কারণে রায় ঘোষণার দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় পার হলেও এখনো ‘স্যুট রেজিস্ট্রার ও রুল বইয়ে’ মামলার ফলাফল নোট লেখা হয়নি।

১৯৯১ সালের ৩২ নাম্বার মামলার রায়ের তথ্য না থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সেরেস্তাদার আবু তাহের বলেন, ‘স্যুট রেজিস্টারে সব মামলার ফলাফল কলামে তথ্য থাকলেও ৩২ নাম্বার মামলাটির তথ্য নেই। তবে নিয়ম অনুযায়ী তথ্য থাকার কথা। ১৯৯১ সালের ৩১ ও ৩৩ নাম্বার মামলার তথ্য আছে। শুধু ৩২ নাম্বার মামলার তথ্য না থাকার কারণ আমি জানি না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রায় প্রদানকারী দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতের পেশকার মো. সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী রায় ঘোষণার পর আদালতের রুল বইয়ে রায়ের তারিখসহ ফলাফলের নোট থাকে। কিন্তু ৩২ নাম্বার মামলায় কেন নেই সেটি আমরা সঠিক বলতে পারছি না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট সন্ত্রাসমূলক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হয় পেশকার আবুল কালামের ছোট ভাই আবদুস ছালামের। একই মামলায় তার অপর ভাই আলমগীরের সাজা হয় ১০ বছর। রায় ঘোষণার সময় তারা পলাতক ছিলেন। পরে তারা ওই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ২০০১ সালে একটি রিট আবেদন করেন উচ্চ আদালতে; যার নম্বর ৬৯২৩।

অভিযোগ আছে, নানা কূট-কৌশলে রিটটি করা হয়। ফলে ১৮ বছর ধরে এই রিটের রুল নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর। ওই মামলায় শুরুতে ৬ মাসের স্থগিতাদেশ নেয় আসামিরা। নিয়ম অনুযায়ী স্থগিতাদেশ বর্ধিত করার কথা। অথচ কোনো ধরনের বর্ধিত স্থগিতাদেশ ছাড়াই এই মামলা ১৮ বছর ধরে বিচারাধীন আছে।

উত্তর রাঙ্গুনিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা সোবহান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন আইয়ুব ও শামসু। এই দুইজন আবদুস ছালামের নাম জড়িয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। কিন্তু আইয়ুব ও শামসুরের সাজা হলেও খালাস পেয়ে যান আবদুস ছালাম। মুক্তিযোদ্ধা সোবহানের দুই সন্তান ছবুর ও কবিরকে এসিড নিক্ষেপ করার ঘটনায়ও আবদুস ছালাম ও তাদের অপর ভাই জাহাঙ্গীর জড়িত ছিলেন বলে আইয়ুব ও শামসুর স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে। কিন্তু তারা দুইজনও খালাস পান।

ছালাম ও তার দুই ভাই আলমগীর, জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি, এসিড নিক্ষেপসহ বিভিন্ন অপরাধের প্রায় দুই ডজনেরও বেশি মামলা আছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

অভিযুক্ত আবদুস ছালাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ৩২ নাম্বার মামলাটির পৃথক তিনটি ধারায় ১০ বছর করে ৩০ বছর সাজা হয়েছিল আমার। তবে সবগুলো সাজা একসাথে শুরু হওয়ার কারণে সাজা দাঁড়ায় ১০ বছরে। এ মামলায় আপিল করে ২০০২ বা ২০০৩ সালে হাইকোর্ট থেকে খালাস পেয়েছি আমি।

মামলার নথি না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপিল করার পর মামলার সব নথি হাইকোর্টে চলে গিয়েছিল। হাইকোর্টের রেকর্ড রুমে গেলে পাবেন।

রায় হলে সেটা জজ আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় সংরক্ষণের নিয়মের বিষয়টি তুলে ধরলে আবদুস ছালাম বলেন, এখন নথি পাওয়া যাচ্ছে না কেন সে বিষয়ে আমি জানবো না। এটা কোর্ট জানবে। খালাস পাওয়ার কাগজ চাইলে আমি দিতে পারবো।

এরপর রায়ের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে প্রতিবেদককে পাঠানোর অনুরোধ করা হলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেন, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর আমার প্রতিপক্ষরা এসব নিয়ে থানা, ইউএনও, ডিসি অফিস, নির্বাচন কমিশনে অনেক দৌড়েছিল। আমি সেখানে চ্যালেঞ্জ করে একে একে তিনবার প্রার্থীতা বাছাইয়ে টিকেছি। এই হচ্ছে আমার বক্তব্য।

### চোরের পক্ষ নিয়ে ‘প্রবাসী’ ইমামকে পুলিশের সামনেই পেটালেন মেম্বার

একুশে/এসআর/এটি