২৩ মে ২০১৯, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, বুধবার

ধান কাটতেন-বিক্রি করতেন, এখন বড় শিল্পপতি

প্রকাশিতঃ রবিবার, মে ১২, ২০১৯, ১১:২২ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : স্কুল-কলেজে পড়ার সময় বাবা ও ভাইদের সঙ্গে ধান কাটতে যেতেন তিনি। মাথায় তুলে সেই ধান নিয়ে বাড়িতে ফিরতেন। পরে বিক্রি করতে যেতেন হাট-বাজারে। মায়ের স্বপ্ন পূরণে নিয়েছেন উচ্চশিক্ষাও। বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এখন তিনি বড় শিল্পপতি। তাঁর পোশাক কারখানায় কাজ করছেন ৮ হাজারের বেশি মানুষ। তিনি চট্টগ্রামের স্বনামধন্য ওয়েল গ্রুপের পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

চট্টগ্রাম নগরের মোহরা ওয়ার্ডে জন্ম ও বেড়ে উঠা সৈয়দ নজরুল ইসলামের। বাবা আবদুর রশিদ ছিলেন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী; পাশাপাশি কৃষিকাজও করতেন তিনি। হালদা নদীতে লম্ফঝম্ফ করে বেড়ে উঠা নজরুল অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজকের এ অবস্থানে এসেছেন। তাঁর এ পর্যন্ত আসার পেছনে মাথার উপর বটবৃক্ষের ছায়া হয়ে ছিলেন বড় ভাই আবদুচ ছালাম (ওয়েল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান)।

স্মৃতি হাতড়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার আব্বা ছোট ছোট ব্যবসা ও চাষাবাদ করতেন। আমাদের অনেক নারিকেল গাছ ছিল। সুপারি বাগানও ছিল। নারিকেল-সুপারি বিক্রি হতো। জমি ছিল, সেখানে চাষাবাদ হতো। ধান-চাল বিক্রি করতে হতো। আমি যখন মহসীন কলেজে ডিগ্রিতে পড়ি, পড়াশোনার ফাঁকে ধান কাটতে গেছি। মাথায় করে ধান বাড়িতে এনেছি, দিনমজুরদের সাথে।’

‘যেদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকতো সেদিন মাঠে যেতাম অথবা স্কুল-কলেজ থেকে ফিরে। আমার মা এবং বাবা কখনোই স্কুল-কলেজ বন্ধ করে কাজ করতে দেননি। আমরা যা করতাম সেটা বন্ধের দিনই করতাম। মায়ের স্বপ্ন ছিল তার ছেলেরা মাস্টার্স ডিগ্রি পাশ করবে। পড়ালেখা ছাড়া অন্য স্বপ্ন ছিল না। আমার মায়ের ইচ্ছের কারণে আমাদের পড়ালেখা করা, উচ্চশিক্ষা নেয়া। আমরা ছয়টা ভাই মাস্টার্স ডিগ্রি পাশ।’

তিনি বলেন, ‘কষ্ট আমরা অনেক করেছি। তবে আমার বড় ভাই কষ্ট বেশিই করেছে। বড় ভাইও ধান বিক্রি করেছেন, যেটা সত্যি কথা। বড় ভাইও লজিং থেকে পড়াশোনা করেছেন। আমাদের আয় বেশি ছিল না- এটা ঠিক। তবে একেবারে অস্বচ্ছলও বলা যাবে না। আমরা মোটামুটি স্বচ্ছল ছিলাম। এখনকার মতো বিলাসী ছিলাম না।’

এদিকে ১৯৮৬ সালে অষ্ঠম শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ১৯৮৮ সালে মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার সময় মোহরা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এরপর সিটি কলেজ ও মহসীন কলেজে পড়ার সময়ও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতেন নজরুল। শিক্ষাজীবন শেষে পুরোদমে ব্যবসায় জড়িয়ে পড়লেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়েননি তিনি।

২০১২ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু ছাত্র-যুব উন্নয়ন পরিষদ নামে একটি সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও চিন্তা-চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ‘নতুন প্রজন্মের যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব। তাদের মাঝে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, চেতনা ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে বঙ্গবন্ধু ছাত্র-যুব পরিষদ। এই সংগঠন শুরু করেছি খেলাধুলা আয়োজনের মাধ্যমে। এলাকাভিত্তিক ফুটবল, ক্রিকেট খেলা আয়োজন করতাম। এখন প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে চিত্রাঙ্কন, রচনা, আবৃত্তি, বিতর্ক ও সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে।’

এদিকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করছে বঙ্গবন্ধু ছাত্র-যুব উন্নয়ন পরিষদ। ‘৫২ এর ভাষা আন্দোলন ও ‘৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে চলছে চিত্রাঙ্কন, রচনা ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। ২০০৮ সালের আগের বাংলাদেশ ও ২০০৮ সালের পরের বাংলাদেশ নিয়ে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে চলছে বিতর্ক প্রতিযোগিতা। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, মহান মুক্তিযোদ্ধের প্রেক্ষাপট, ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের প্রেক্ষাপট নিয়ে চলছে সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা। চট্টগ্রাম নগরে সবই হচ্ছে বঙ্গবন্ধু ছাত্র-যুব উন্নয়ন পরিষদের আয়োজনে।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এসব প্রতিযোগিতা আয়োজনের লক্ষ্য হচ্ছে, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা ও আওয়ামী লীগের উন্নয়ন-কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা। এছাড়া প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মানুষ জেনে যাবে ২০০৮ এর আগের বাংলাদেশে কিছুই হয়নি। সব আয়োজন আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রচারের জন্য। আমার পরিচয় হচ্ছে, আমি দলের মানুষ। আমার মুখ দিয়ে দলের কথাই বের হবে। তাই আমি সবকিছু দলীয়করণই করছি।’

এদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই চলছে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের কার্যক্রম। এখন অনেকটাই অগোছালো অবস্থায় রয়েছে যুবলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম। তবে আশার কথা, মহানগর যুবলীগের নতুন কমিটি গঠনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। নতুন কমিটিতে সৎ ও যোগ্য নেতাদের স্থান হবে বলেই জানিয়ে দিয়েছেন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী।

এ বিষয়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, সত্যি বলতে, আমি আগে কমিটির রাজনীতি করতাম না। এখন হয়তো আমি কিছুটা চিন্তা করছি। যেহেতু যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েছি। তাই আমরা কমিটির জন্য অপেক্ষা করছি। যুবলীগ চেয়ারম্যান যদি মনে করেন আমার সাংগঠনিক দক্ষতা আছে, তাহলে আমি তো আশা করতেই পারি।’

সৈয়দ নজরুল ইসলামরা ছয় ভাই, চার বোন। সবার বড় আবদুচ ছালাম টানা ১০ বছর সিডিএ চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। সম্প্রতি তিনি সিডিএ চেয়ারমানের পদ থেকে বিদায় নিয়ে ওয়েল গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বড় ভাই আমাদের সবকিছু। উনি এক কথায় আমাদের মা-বাবা। ওনার হাতে ধরেই আমাদের বেড়ে ওঠা। উনার স্বপ্ন বাস্তবায়নই আমাদের কাজ।’

মেঝ ভাই সৈয়দ নুরুল ইসলাম ওয়েল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের পরিচালক। সম্প্রতি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)-এর পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এ ব্যবসায়ী।

পরিবারে নজরুলের ইমিডিয়েট বড় ভাই সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম ওয়েল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সবকিছু দেখাশোনা করেন। আর ওয়েল গ্রুপের গার্মেন্টস ব্যবসাটা দেখাশোনা করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম নিজেই। সবার ছোট সৈয়দ শহীদুল ইসলাম ওয়েল গ্রুপের পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠানের গার্মেন্টস এক্সেসরিজ ব্যবসা দেখাশোনা করেন।

এদিকে ওয়েল গ্রুপকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা ওয়েল ফুডের কার্যক্রম পরিচালনা করেন আবদুচ ছালামের সন্তান সৈয়দ আসিফ হাসান। বর্তমানে ওয়েল গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজে কাজ করছেন অন্তত ২২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী।

বড় ভাই আবদুচ ছালামের সিডিএ চেয়ারম্যান হওয়া ও চট্টগ্রামের আমূল পরিবর্তন আনাকে কীভাবে দেখেন প্রশ্নে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে ভিশন দিয়েছেন, বাঙালি জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ করবেন, উন্নত দেশ করবেন- সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অবশ্যই চট্টগ্রামকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক হাব, চালিকাশক্তি। চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী, উন্নত বিশ্বের রাজধানী বানাতে চান প্রধানমন্ত্রী। সেজন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আমার বড় ভাইকে কাজে লাগিয়েছেন। আমার বড় ভাইও ওই সুযোগটি কাজে লাগান। এজন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন। ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সিডিএতে পড়ে থাকতেন। সকালে যেতেন, গভীর রাতে বাসায় ফিরতেন। অফিসিয়াল কাজের বাইরে নিয়মিত প্রজেক্ট পরিদর্শনে যেতেন।

‘শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর চাওয়াটাকে পূর্ণ করতে গিয়ে তিনি কাজ করেছেন। যদিও সেই চাওয়াটা প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বলেননি। বললে সহজ কাজ করতে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করে করে ওনার মন থেকে বের করে নিয়েছেন। সেজন্য অনেক বাধা-বিপত্তি তোয়াক্কা না করে প্রধানমন্ত্রী ওনাকে ১০ বছর রেখেছেন। উনি পরিবারকে সময় না দিয়ে, নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সময় না দিয়ে চট্টগ্রামের মানুষের জন্য, দেশের জন্য, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার জন্য যা যা করার সব পরিকল্পনা শুরু করেন। আমরা যতটুকু জানি, আইনে সম্ভব হলে ওনাকে আরো রেখে দিতেন প্রধানমন্ত্রী।’ যোগ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

বড় ভাই আবদুচ ছালামকে আরো গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখতে চান কিনা প্রশ্নে নজরুল বলেন, ‘আমাদের তেমন প্রত্যাশা নেই। প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি বেশি হয়ে গেছে। বড় ভাই কখনো ভাবেননি, ভাগ্যের জোরে উনাকে প্রধানমন্ত্রী সিডিএ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমার বড় ভাই সুযোগ পেয়ে কাজে লাগিয়েছেন। আমরা নিজের জন্য সুযোগ খুঁজি না। ছোটকাল থেকে শুনতাম, উনি সুযোগ খুঁজেন অন্যের জন্য কিছু করতে। উনি সুযোগ খুঁজছেন ভাইদের জন্য কিছু করতে, সুযোগ খুঁজেছেন দেশের জন্য কিছু করতে।’

ভবিষ্যতে বড় ভাই আবদুচ ছালামকে সিটি মেয়র পদে দেখার স্বপ্ন দেখেন কিনা- প্রশ্নে নজরুল উত্তর দেন, ‘আমরা মেয়র পদের জন্য আগ্রহী না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দলের সভানেত্রী যদি বলেন, ছালামই যোগ্য মেয়রের জন্য। তাহলে তিনি করবেন। সত্যি বলতে কি পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা মেয়রের স্বপ্ন দেখি না। তবে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি করার স্বপ্ন অবশ্যই দেখি। আমরা যেহেতু দল করি। আমরা চাই আমাদের বড় ভাই মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হোক।’

‘আমার বড় ভাই চট্টগ্রামের জন্য যা করেছেন, মানুষ অনেক বছর মনে রাখবে। দলের জন্য কিছু করতে গেলে দলীয় পদ লাগে। সেটা যদি উনি পান, আমরা মনে করি, এটা মেয়রের পদ থেকেও বড়। এটা আমাদের আদর্শিক ব্যাপার। আমরা কখনো ব্যক্তিগত শখ-আহ্লাদের জন্য রাজনীতি করিনি। আমরা মন্ত্রী-এমপি হওয়ার জন্যও দল করি না। আমরা দল করি, দলের আদর্শ এবং দলকে ক্ষমতায় রাখার জন্য।’ বলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।’

ছবি- আকমাল হোসেন