বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

বান কি মুন ‘৭২ সালেই বুঝেছিলেন বাঙালি জাতি নিজের পায়ে দাঁড়াবে

প্রকাশিতঃ বুধবার, জুন ২৬, ২০১৯, ৯:২৮ অপরাহ্ণ

ওমর ফারুক হিমেল, দক্ষিণ কোরিয়া : মুক্তিযুদ্ধের কয়েক সপ্তাহ পর দক্ষিণ কোরিয়ার দিল্লি মিশনের একজন জুনিয়র অফিসারকে ঢাকায় পাঠানো হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখার জন্য। তেজগাঁওয়ে নেমে ধংসস্তুপ ঠেলে তিনি রিক্সায় চেপে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান। এশিয়া বিভাগের একজন কর্মকর্তার সাথে বৈঠক শেষে তার নাম আর ঢাকার টেলিফোন নম্বরটা চাইলেন। স্বাভাবিকভাবে তখন কোনো ভিজিটিং কার্ড থাকার কথা নয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই কর্মকর্তা সযত্নে টেবিলের একপাশে রাখা একটা এ-৪ সাইজের কাগজ হাতে তুলে নিয়ে তার এক কোণায় যত ছোট করে নাম আর টেলিফোন নাম্বার লেখা যায় তা লিখে শুধু সেই অংশটুকু সাবধানে ছিঁড়ে কোরিয়ান ব্যক্তিটিকে দিলেন। ধংসস্তুপের মধ্যে দিয়ে রিক্সায় আবার ফিরতে ফিরতে সেইদিন তিনি ভাবছিলেন সেই সামান্য একটা সাদা কাগজ বাঁচানোর চেষ্টার কথা এবং সেদিনই তিনি বুঝেছিলেন এই জাতি একসময় নিজের পায়ে দাঁড়াবেই।

১৯৭৩ সালে তিনি ফের ঢাকায় আসেন দিল্লিস্থ কোরিয়ান অ্যাম্বাসেডরকে নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় তার অ্যাম্বাসেডরের কলমটা কাজ করছিলো না, সেই তরুণ কোরিয়ান কর্মকর্তা তার কলমটি এগিয়ে দিয়েছিলেন স্বাক্ষর করার জন্য। খুব সযত্নে সেই কলমটি এখনও সংরক্ষণে রেখেছেন তিনি।

বাংলাদেশ নিয়ে গল্প দুটি জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব, দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বান কি মুনের। কিছুদিন আগে সেই দুটি গল্প তিনি তুলে ধরেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের কাছে। গল্প দুটি নিজের কাছে জমা না রেখে শাহরিয়ার আলম তুলে দিলেন ফেসবুকে।

শাহরিয়ার আলম খাবার টেবিলে বসে বান কি মুনের কাছে জানতে চাইলেন কলমটি কেন সংরক্ষণে রেখেছিলেন? উত্তর আসলো, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সফর তাকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছিলো। আর নতুন দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষণের সাক্ষী হয়ে থাকার অভিজ্ঞতা তো একজন কূটনীতিকের জীবনে বারবার আসে না। ১৯৭২ এর সেই তরুণ কূটনীতিক জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব, বিশ্বনন্দিত ব্যক্তিত্ব।

শাহরিয়ার আলম লিখেন, জেনেভায় দুপুরের খাবার টেবিলে এই স্মৃতিচারণ। বলাবাহুল্য, সিউল-ঢাকার সম্পর্ক পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা ও সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সুদৃঢ় হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া বরাবরই বাংলাদেশের অত্যন্ত পরীক্ষিত বন্ধু, উন্নয়ন অংশীদার। কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের বহু স্থাপনা নির্মাণে দক্ষতার সাথে ভূমিকা রেখে চলেছে। দু’দেশের বেসরকারি খাতগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সুসম্পর্ক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার হচ্ছে। রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক দিন দিন বাড়ছে। ১৯৭৩ সাল থেকেই বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, বিনিয়োগের বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা প্রদান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন করে আসছে। দুদেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সুসংহত করতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রীগণ ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে মোট দুবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের মে মাসে এক সরকারি সফরে সিউল যান। দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লী মুং-বাক-এর সময়কালে প্রধানমন্ত্রী এই সফর করেন। এই সফরে কিছু সমঝোতা স্মারক চুক্তি সই হয়। নয় বছর পর বাংলাদেশে ১৩ জুলাই আসবেন কোরীয় প্রধানমন্ত্রী লি নাক ইয়োন। একই মাসের ৮ জুলাই আসছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বর্তমান কোরিয়ার ইয়েনসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বান কি মুন। তিনি জাতিসংঘের মহাসচিব থাকাকালীন সময়ে অগ্রসরমান বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বনেতাদের সামনে সুনাম করেন। তাছাড়া তিনি জলবায়ু পরিবর্তনে বিষয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।

প্রসঙ্গত, বিদেশে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার ফেরিওয়ালা এর আগে ২০০৮, ২০১১, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে আসেন। আগামী ৮-১১ জুলাই জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেবেন।

বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু জাতির জনকের শততম জন্মবার্ষিকীতেও উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

একনজরে বান কি মুন : ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট, বিশ্ব নন্দিত আইকন, দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব, কোরিয়ার খ্যাতিমান ইয়েনসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বান কি মুন ১৯৪৪ সালের ১৩ জুন কোরিয়ার উত্তর জাংজিয়ং-এর ইয়ামসিয়ংয়ে জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৭০ সালে সিউল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন এফ কেনেডি স্কুল অফ গভর্নমেন্ট থেকে ১৯৮৫ সালে লোকপ্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। কোরিয়ান ভাষার পাশাপাশি তিনি ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষায় যথেষ্ট পারঙ্গম। স্কুলে পড়ার সময় ১৯৬০ সালের প্রথমদিকে আমেরিকান রেডক্রস আয়োজিত একটি ইংরেজি ভাষা প্রতিযোগিতায় জিতেন বান কি মুন৷ সেই সুবাদে তৎকালীন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির সঙ্গে তার দেখা হয়৷ এই সাক্ষাতের পরই বান কূটনীতিক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। ১৯৭০ সালে মে মাসে বান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগদান করে। বিদেশে তার প্রথম নিয়োগ হয় নয়াদিল্লীত।৷ তারপরই তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র দফতরে জাতিসংঘ বিভাগে কাজ করেন। পার্ক চুং হি (Park Chung Hee)-এর গুপ্তহত্যার পর বান নিউইয়র্কে জাতিসংঘের দক্ষিণ কোরিয়ার স্থায়ী পর্যবেক্ষকের ফার্স্ট সেক্রেটারি পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৯১ সালে ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কোরিয়া জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য হয়। একই সময়ে বান কি মুন জাতিসংঘ বিভাগের পরিচালক পদে নিয়োগ পান। রিপাবলিক অফ কোরিয়ার ওয়াশিংটন ডিসির দূতাবাসে তিনি দু’বার নিয়োগ পা। ১৯৯০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্য বিষয়ক মহাপরিচালক হিসেবে কাজ করে। ১৯৯৫ সালে বান কি মুন পলিসি প্ল্যানিং অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের ডেপুটি মিনিস্টার পদে উন্নীত হন। তার পরের বছরই তিনি রাষ্ট্রপতির ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজর হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন৷

১৯৯২ সালে নিউক্লিয়ার কন্ট্রোল কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন। মন্ত্রীত্ব থাকাকালে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে নর্থ কোরিয়ান নিউক্লিয়ার ইস্যু সমাধানে কূটনৈতিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। এ সম্পর্কে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত সিক্স-পার্টি আলোচনা অনুষ্ঠানেও বান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

বান কি মুন ১ নভেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। খ্যাতিমান এই ডিপ্লোম্যাট কখনোই তার দেশের কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি। তবে তিনি ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রয়াত প্রেসিডেন্ট রোহ মুন-হিয়ুনের অধীনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

একুশে/ওএফএইচ/এটি