রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

আগামীর বাংলাদেশ : স্বপ্ন, বাস্তবতা ও সম্ভাবনা

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, জুলাই ২৬, ২০১৯, ৫:৩৮ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী : বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে। বাংলাদেশের মানুষ বেশ আবেগতাড়িত। এ আবেগকে কাজে লাগিয়ে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করলে যে এগোনো যায়, বিগত দশকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রার গতি-প্রকৃতি লক্ষ করলে তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।

আমরা পারবো এবং পারি’-এ বিশ্বাস হৃদয়ে গেঁথে ধারাবাহিক শ্রমের ফসল আজকের বাংলাদেশ। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া আজ বিশ্বময় একটি আলোচনার বিষয় এবং সেরা সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণার বিষয়ও। তবে এখনও আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ, অনেক বাঁধা।

আশার কথা এই যে, আমাদের সম্ভাবনার যে নীল আকাশ তার বিস্তৃতি চ্যালেঞ্জের পরিধির চেয়ে বেশী। তাই চ্যালেঞ্জগুলো উতরিয়ে যাবার প্রচেষ্টায় সবাই সচেষ্ট থাকলে সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়া সম্ভব হবে। সম্ভব হবে স্বপ্নময় বাংলাদেশ গড়ার। বিশ্বের সব নামীদামী আর্থিক বিশ্লেষণধর্মী সংস্থা এক বাক্যে এ কথা বলেছে যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারণা অন্য দেশের অনুকরণীয়। বাংলাদেশ বিশ্বের ৮ম জনবহুল একটি দেশ, যেখানে জনসংখ্যার ঘণত্ব প্রতি কিলোমিটারে ১,১০৩ জন। এত বেশী জনসংখ্যার ঘনত্বের এমন আরেকটি দেশ বিশ্বের কোথাও আপনি খুঁজে পাবেন না, যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ বা তার অধিক। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩২তম দেশ। বিশ্ব প্রবৃদ্ধির গতি বিবেচনায় আইএমএফ-এর প্রতিবেদন মতে দ্রুততম উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় ২য় স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। অবকাঠামো উন্নয়নকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতকি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক উন্নয়ন ঘটবে এ কথা নি:সন্দেহে বলা যায়।

সমসাময়িক উন্নত রাষ্ট্রসমূহ ভূমির ব্যবহারকে যেভাবে কার্যকর করেছে সেদিকে আমাদের জোর দিতে হবে। মাটির উপরে আকাশছোঁয়া দালান যেমন তারা গড়েছে তেমনি মাটির নীচে পাতাল রেল, সাব-ওয়ে, পার্কিংলট গড়ে সেখানেও একটি (সমান্তরাল সেবামূলক) শহর গড়ে তুলেছে। এতে করে সমতল ভূমিতে মানুষের/গাড়ীর চলাচলের ভার তথা যানজট যেমন কমানো গেছে, তেমনি অনেক খোলা জায়গার সংস্থান করা গেছে –যা আবার পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, পানির আঁধার ইত্যাদি হিসাবে ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। গণপরিবহন ব্যবস্থার সফল ব্যবস্থাপনা অর্থনীতির চাকার গতিতে যেমন দ্রুততর করবে, তেমনি এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসাবে মানুষের জীবনমান, আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি, বিনোদন, নিরাপদ যাত্রা ইত্যাদি নিশ্চিত হবে। ফলশ্রুতিতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে মাথাপিছু খরচ কমে আসবে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় সমূহ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে ‘গবেষণা’র উপর গুরুত্ব দিতে হবে, দিতে হবে পর্যাপ্ত বাজেট সংস্থান। আমাদের গর্বের যে কৃষি খাত এবং সেখাতে নিয়োজিত কৃষি কর্মীরা যারা আমাদের ১৬ কোটিরও বেশী মানুষকে তিনবেলা আহার জোগানের প্রাণান্তবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা সম্ভব হচ্ছে এ খাতে গবেষণার উপর জোর দেয়ার কারণেই।

এখন সময় এসেছে অন্যান্য মৌলিক খাতে গবেষণা বাড়ানোর। অন্য দেশের গবেষণার প্রাপ্তি অনেক সময় নিজ দেশের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হয় না। এর কারণ হচ্ছে প্রতিটি দেশেরই ভূমি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত ধারণা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনার ভিন্নতা রয়েছে। তাই প্রয়োজন প্রায়োগিক গবেষণা ও লাগসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন, যা দেশের মাটি ও মানুষের ব্যবহার-উপযোগী হবে। তাই প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিটি সেক্টর সংশ্লিষ্ট টার্গেট ভিত্তিক গবেষণা চালানোর কার্যক্রম, প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় অর্থবরাদ্দ জরুরিভাবে বিবেচনা করা উচিত। অর্থনীতির বহি:খাত যেমন বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকল খাত/প্রতিষ্ঠানে গবেষণা খুবই জরুরি। নিম্ন আয়ের দেশ হতে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের ক্ষেত্রে এবং উত্তরণের পর সেস্থানে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে পৌছানোর জন্য উৎপাদনশীলতা (Productivity) বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তাই এ ক্ষেত্রে যান্ত্রিকতার সংযোজন (Automation) যেমন জরুরি, তার চেয়ে বেশি জরুরি সেই Automation যাতে বাংলাদেশের বিবেচনায় লাগসই ও ব্যবহারোপযোগী হয় তা নিশ্চিত করা। তবেই পাওয়া যাবে কাক্ষিত ফল।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানোর লক্ষ্যে ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ‘প্রত্যাশিত পরিবর্তন’। ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’ ও ‘প্রত্যাশিত পরিবর্তন’- এ দুইয়ের সম্মিলনে অর্জিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন-ই শুধুমাত্র টেকসই হতে পারে। যেনতেনভাবে মুনাফা অর্জন-ই শুধুমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ নয়। খেয়াল রাখতে হবে যাতে করে অধিক মুনাফার আশা যেন ভোক্তা/সেবাগ্রহীতার জন্য ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। আমি দ্রব্য/পণ্য/সেবা উৎপাদন করবো, বাজারজাত করবো – কিন্তু সেটা অবশ্যই করবো পণ্যের/সেবার গুণগত মান বজায় রেখে – যাতে করে ভোক্তাশ্রেণী পণ্য/সেবা গ্রহণ করার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। না হয় সে পুরান গল্পের মতো ‘স্বপ্নের ডিম প্রসবকারী হাঁসটি মারা পড়বে (যদিও বাস্তবে কোনো হাঁসই স্বর্ণডিম প্রসব করে না)’।

পরিশেষে বলবো, গতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাই, সেই সাথে চাই মানবিক, সামাজিক উৎকর্ষতা বা উচ্চতর বোধের উদ্ভব বা সে মুখী পরিবর্তন। তবেই কাক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে-যা দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই হবে। বাংলাদেশের এখন এগিয়ে যাওয়ার সময় আর এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত এবং কার্যকর অংশগ্রহণ।

লেখক : কাউন্সেলর (বাণিজ্য উইং), বাংলাদেশ দূতাবাস , সিউল।