সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬

‌’ভালো মানুষেরা বেশি বুদ্ধিমান হন না’

প্রকাশিতঃ রবিবার, আগস্ট ৪, ২০১৯, ৭:৩৩ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান বলেছেন, ‘সমস্ত সৃষ্টিশীল মানুষেরই একটু-আধটু পাগলামি থাকে। অন্যদিকে পৃথিবীর ভালো মানুষেরা বেশি বুদ্ধিমান হন না। অতি বুদ্ধিমান মানুষেরা কোনোদিনই ভালো মানুষ হয় না। পৃথিবীতে যে সব মেধাবী মানুষ ভালো কাজ করে অমরত্ব লাভ করেছেন, তাঁরা কোনোদিন অংক করে কিছু করেননি। তাঁরাই সবসময় মানুষের মনে থেকে যান। রবীন্দ্রনাথ একটা কথা বলেছিলেন, মানুষের প্রতি দরদ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি স্নেহ- একেবারে আত্মিক একটা টান। এগুলো কখনো অতীত হয় না। সবসময় বর্তমান।’

গত বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) সন্ধ্যায় একুশে পত্রিকা কার্যালয় পরিদর্শনে এসে একুশে পত্রিকার সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে প্রসঙ্গক্রমে এসব বিষয়ের অবতারণা করেন তিনি।

পত্রিকা চালানো কঠিন কাজ মন্তব্য করে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘মানুষ একটি পৃষ্ঠা মনোযোগ দিয়ে পড়তে চায় না। ফেলে রাখে। মানুষের এত ধৈর্য্যর অভাব! লম্বা অফিসিয়াল চিঠি দেখলে হেডলাইন বা বিষয়টা দেখে, এরপর এমতাবস্থায়… বলে উপসংহারে যেটা লেখা হয় সেটা দেখে। ভেতরে কিছুই পড়লো না। অথচ মধ্যে অনেক কাহিনী লেখা আছে। সংবেদনশীলতা এতটাই হ্রাস পেয়েছে, সেই জায়গায় একটা পত্রিকা বের করে, নিউজের প্রত্যেকটা লাইন দেখা সত্যিই কঠিন কাজ। একটা নিউজ ভুল হলে আমার ইমেজ নষ্ট হবে এমনটা ভেবে কাজ করেন আজাদ তালুকদার। এজন্য কতটা ধৈর্য্য, পরিশ্রম করতে হচ্ছে, তা আমি ভাবছি।’

এসময় একুশে পত্রিকা সম্পাদক আজাদ তালুকদার নিজের মতামত যোগ করেন। বলেন, আপনি যথার্থ বলেছেন, ইমেজ রক্ষার যুদ্ধ করছি আমি। তবুও আমার কষ্ট নেই। পাঠক যখন একুশে পত্রিকার সুনাম করে, তখন এই কষ্ট ভুলে যাই, নিজেকে স্বার্থক মনে হয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ হিসেবে বিবেচিত আহমদ ছফাকে নিয়েও আলোচনা করেন বিভাগীয় কমিশনার। বহুমাত্রিক লেখক আহমদ ছফা শোষিত মানুষের পক্ষে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, চিন্তাবিদ ও বিশিষ্ট কলামিস্ট।-বলেন বিভাগীয় কমিশনার।

আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে চট্টগ্রাম নগরের একটি এমপিওভুক্ত কলেজের প্রসঙ্গ টানেন বিভাগীয় কমিশনার, যিনি পদাধিকার বলে কলেজটির সভাপতি। কলেজটিতে সদ্য ভর্তি হওয়া প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ছাত্র সংসদের নাম দিয়ে ২০০ টাকা করে আদায়ের ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করেন বিভাগীয় কমিশনার।

বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘দুই মাস আগে কলেজটিতে উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রিতে আড়াই হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। প্রত্যেকের কাছ থেকে ছাত্র সংসদের নামে বাধ্যতামূলকভাবে ২০০ করে টাকা আদায় করা হয়েছে। অথচ ২০০৫ সালের পর থেকে কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। ১৫ বছর পরও ছাত্র সংসদের নামে টাকা তোলা হচ্ছে। এই টাকাটা কিছু মাস্তানের পকেটে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহে আমি কলেজটি পরিদর্শনে গিয়ে বিষয়টি শুনে প্রিন্সিপালকে বললাম, এই কাজটা করলো কে? ভর্তি চলছিল তিন-চারদিন যাবত। তখন আমাকে কাহিনীটা বলা হলো। এটা নাকি ছাত্রনেতাদেরকে দিতে হয়। শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে বের হচ্ছে, আর দুইশ করে টাকা দিতে হচ্ছে। কলেজের গেইট দিয়ে বের হওয়ার সময় আটকে টাকাটা নেয়া হচ্ছে।’

‘প্রিন্সিপালকে বললাম, আপনি কাজটা বন্ধ করতে না পারলে আমাকে ফোনে জানাননি কেন? আপনি তো গোপনে বলতে পারতেন। আমি তো চট্টগ্রামেই ছিলাম। জানলে আমি পুলিশ কমিশনারকে বলতাম, র‌্যাব-ডিজিকে বলতাম, পুলিশ-র‌্যাব দিয়ে পুরো কলেজটা আমি ঘেরাও দিতাম।’ যোগ করেন বিভাগীয় কমিশনার।

‘আমি শুনলাম, সন্তান ভর্তি করিয়ে যাওয়ার পথে এক মহিলা নাকি বলেছেন, আমার আর টাকা নেই। যা আছে তা যাওয়ার গাড়ি ভাড়া। তারপরও নাকি বলেছে, টাকা দিন। মানুষ টাকা দিতে বাধ্য হয়েছে। প্রিন্সিপালকে বললাম রেজুলেশন বইয়ে লিখুন, বিষয়টা আমাকে তাৎক্ষণিক না জানানোয় আপনাকে আমি ভর্ৎসনা করলাম। আপনি জানাননি কেন? আপনার কোন ভয় আছে? আড়াই হাজার পরিবার কষ্ট পেয়ে কেন সরকারের বিরুদ্ধে বলবে? সরকার কেন এর দায় নেবে?

মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘কলেজে সেদিন একজনকে পায়জামা-পাঞ্জাবি পড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ড্রেস পায়জামা-পাঞ্জাবী কেন? তুমি জামাই? এখানে কী করো? বলে বড় ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। বড় ভাইয়ের নামও বললো। এই বড় ভাইয়ের সংস্কৃতিটা দেশ থেকে দূর করতে হবে। এখন বড় ভাই সংস্কৃতি চলছে দেশে। বড় ভাই তো সব শেষ করে দিচ্ছে।’
‘বড় ভাইয়ের জন্য অপেক্ষায় থাকা কয়েকজনকে বলেছি, বড় ভাইয়ের জন্য দুই ঘণ্টা ধরে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছো। যে মা সকালের নাশতা করিয়ে এখানে পাঠিয়েছে, সেই মায়ের জন্য কী করেছো? তোমাকে যখন হাজতে দেবে, মা-ই তখন কাঁদবে। হাজতে গেলে বড় ভাই তোমার নাম ভুলে যাবে। যে মা জন্ম দিয়েছে তার জন্য সব করো, বড় ভাই তো তোমাকে কিছু দিতে পারবে না। বড়জোর হয়তো একটা পদ দিতে পারবে। এই পদটা তোমার মৃত্যুকে এগিয়ে আনতে পারে, তোমার মৃত্যুকে দ্রুত করার জন্য ভূমিকা রাখতে পারে।’

একুশে/এসআর/এটি