রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

আমার বিচারের ভার চট্টগ্রামবাসীর উপর ছেড়ে দিলাম : আবদুচ ছালাম

প্রকাশিতঃ শনিবার, আগস্ট ১০, ২০১৯, ১০:২১ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : নাছির ভাই নেতা। আমি কর্মী। আমার মতো কর্মীকে নিয়ে নেতার মুখে ’এমন’ বক্তব্য অসুন্দর। উনার সাথে তো আমার কোনো বিরোধ থাকার  কথা নয়। উনি কেন আমাকে আক্রমণ করে কথা বলছেন আমার বোধগম্য নয়। আমার অপরাধটা কী! গত ১০ বছরে জাতির পিতার কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনায় অবহেলিত চট্টগ্রামকে ৫০ বছর এগিয়ে দিতে রাত-দিন একাকার করে কাজ করাই যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে আমি অপরাধী। আর সেই অপরাধের (!) বিচারের ভার নগরের ৭০ লক্ষ মানুষের উপর ছেড়ে দিলাম।

একুশে পত্রিকায় প্রকাশিত চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের ‘ছালাম সাহেব আত্মপ্রচারে ব্যস্ত ছিলেন’ এবং ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী কর্মগুণে চট্টলবীর, উনি নিজে নিজে কর্মবীর’ শিরোনামে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের প্রতিক্রিয়ায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’র (সিডিএ) সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম এসব কথা বলেন।

এছাড়াও চট্টগ্রামের উন্নয়নে নিজের ভূমিকা ও অবস্থান ব্যাখ্যা করেন আবদুচ ছালাম। তিনি বলেন, আমরা একই দল করি। নাছির ভাই আমার দলের সাধারণ সম্পাদক। আমরা কখনো একে অপরের প্রতিপক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারি না। কিন্তু নাছির ভাই কেন আমাকে আক্রমণ করে কথা বলছেন বুঝি না। তবে এটা ঠিক, নাছির ভাই কেন, দলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে যাওয়া, বক্তব্য দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ এই চর্চা, সংস্কৃতি দলের জন্য শুভ নয়। এতে করে নেতাকর্মীদের মাঝে ভুল ‘বার্তা’ যায়, তারা বিব্রত হন।

মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন জলাবদ্ধতা সংক্রান্ত সিডিএ’র দুটি মেগা প্রকল্পই কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই না করে গ্রহণ করা হয়েছে আবদুচ ছালামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান বলেন, ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়া একনেকে কোনো প্রকল্পেরই অনুমোদন হয় না তা নাছির ভাইয়ের মতো নেতার জানা থাকার কথা।

এ প্রসঙ্গে জবাব দিতে গিয়ে তিনি একটু পেছনে ফিরে যান। বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই সমস্যা দিন দিন বাড়তে বাড়তে এমন ভয়াবহ পর্যায়ে এসে দাঁড়ায় যে, হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে বাস্তবায়ন করা সমস্ত উন্নয়ন প্রকল্পের সফলতা ম্লান করে দিচ্ছিল। সমস্ত উন্নয়ন কার্যক্রমই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছিল। কারণ যুগ যুগ ধরে আমরা জলাবদ্ধতা নিরসনে বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও রক্ষা করতে পারিনি। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার এই নাজুক পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এগিয়ে আসলেন। তিনি ভয়াল এই সমস্যা সমাধানে কী কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার তা পরীক্ষা করে প্রকল্প গ্রহণের জন্য আমাকে সরাসরি নির্দেশনা দিলেন। এই সুবর্ণ সুযোগের পুরো সদ্ব্যবহার করলাম। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আমি দুটি প্রকল্প তৈরি করি। প্রথমটি হলো জোয়ারের পানি যাতে শহরে ঢুকতে না পারে সেজন্য কর্ণফুলী নদীর তীরে চাক্তাই থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত ১২টি স্লুইচগেটসহ ৮ দশমিক ৫০ কিমি দৈর্ঘ্য ও ২৫ ফিট উচ্চতাসম্পন্ন বাঁধ কাম রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প।

দ্বিতীয়টি হলো চট্টগ্রামে স্থিত ৫৭টি খালের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৩৬ খালের যাবতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত আগ্রহে সিডিএ’র গৃহীত দুটি প্রকল্পই পর্যায়ক্রমে একনেকে অনুমোদিত হলো। প্রথমটির কাজ ইতিমধ্যে সিডিএ শুরু করেছে। দ্বিতীয়টির কাজও সুষ্ঠুভাবে যথাসময়ে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে আমাদের গর্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আবদুচ ছালাম বলেন, উক্ত খালখনন ও খালসংস্কার প্রকল্পটি একনেকে শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত হওয়ার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গঠিত যাচাইবাছাই কমিটি দীর্ঘ ৬ মাস যাচাইবাছাই করে কোনো রকমের সংশোধন ছাড়াই ২০১৮ সালের ৬ মার্চ চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। এরপর গত ৯ এপ্রিল ২০১৮ আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্পের সমুদয় কাজের দায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপর ন্যস্ত করা হয়। এতবড় একটি প্রকল্পের কাজ একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের মাত্র ৩৩ দিনের মধ্যে শুরু করার ইতিহাস বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই। এটি এক নজিরবিহীন ঘটনা, যা সম্ভব হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতা এবং অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগাপ্রকল্পের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সেনাবাহিনী কাজ শুরু করে দেয় যা বর্তমানে চলমান। অন্যদিকে এই কাজ শুরু হওয়ার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জলাবদ্ধতা সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধানের জন্য সিটি করপোরেশন কর্তৃক বারইপাড়া নতুন খালখনন প্রকল্প, পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক পতেঙ্গা থেকে সদরঘাট পর্যন্ত এবং কালুরঘাট থেকে মদুনাঘাট পর্যন্ত ফ্লাডওয়াল নির্মাণ প্রকল্প, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃক গৃহীত কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটেল ড্রেজিং প্রকল্প অর্থাৎ আরও ৩টি প্রকল্পের অনুমোদন দেন। ইতিমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ নৌবাহিনীর মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরু করার প্রক্রিয়া চলমান। সবগুলো প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করে যথাসময়ে সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে। বলেন সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা সমস্যার পিছনে যে সমস্ত কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে তার মধ্যে মানুষের সচেতনতার অভাবটি বেশি এসেছে। জলাবদ্ধতা সমস্যার ৭০ ভাগই মানবসৃষ্ট। অবৈধভাবে খাল বা নালা দখল করা, খাল ও নালার উপর ভবন নির্মাণ করাসহ সমস্ত ময়লা আবর্জনা নালা ও খালে ফেলা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। মানুষ যদি সচেতন না হন কিংবা তাদের অভ্যাসের পরিবর্তন না হলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও প্রকল্পগুলোর সুদূরপ্রসারী সুফল পাওয়া যাবে না এবং এব্যাপারে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা অপরিহার্য বলে মনে করেন আবদুচ ছালাম।

চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম বলেন, চট্টগ্রামে গত ১০ বছরে উন্নয়নের যে মহাযজ্ঞ সাধিত হয়েছে তা এককথায় উন্নয়ন-বিপ্লব। চট্টগ্রামের ইতিহাসে এর আগে আর কখনো এভাবে উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেননি মানুষ। চট্টগ্রামকে আগামী ৫০ বছর এগিয়ে দেয়ার এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় যিনি আমাকে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন, মাথার উপর বটবৃক্ষের মতো ছিলেন তিনি আর কেউ নন, বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৯ সালের ২৮ এপ্রিল আমার জীবনে অকল্পনীয় একটি দিন। আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি যে সিডিএ’র মতো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হবো। আমার কল্পনার বাইরের সেই ঘটনা ঘটালেন আমার প্রাণপ্রিয় নেত্রী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

চট্টগ্রামের উন্নয়নের যে দায়িত্ব তিনি নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সেই দায়িত্ব পালনে তিনি আমাকে বেছে নিলেন। আর যেদিন আমাকে সিডিএ’র চেয়ারম্যান নিয়োগ দিলেন সেদিন থেকেই মনে মনে চিন্তা করলাম চট্টগ্রাম শহরের মানুষের আকাঙ্ক্ষা কী। তারা কী চান। আমি দেখলাম, চট্টগ্রামের মানুষ যানজটমুক্ত, জলাবদ্ধতামুক্ত এবং আধুনিক সুযোগসুবিধা সম্বলিত বাসযোগ্য একটি নগরী চান। যেখানে থাকবে গতিশীল যানচলাচল, উন্নত মানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমির সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বমানের বিনোদন-সুবিধা।

মানুষের এই আকাঙ্ক্ষাকে বুকে ধারণ করে আমি প্রথমে হাত দিলাম অবকাঠামোগত উন্নয়নে। এর ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম শহরের দীর্ঘদিনের সরু রাস্তাগুলো সম্প্রসারণে দুঃসাহসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলাম। প্রভাবশালীদের বসতবাড়ি, দোকানপাট, মসজিদ-মাদ্রাসা, মন্দির, কবরস্থান ভেঙে রাস্তা সম্প্রসারণের মতো যে কত কঠিন তা কল্পনা করা আরো কঠিন। তবুও নগরবাসীর অকৃত্রিম ভালোবাসায় আমি সেই কঠিন কাজটি করতে সক্ষম হলাম। একে একে ১৯টি রাস্তা সম্প্রসারণ, বর্ধিতকরণ ও সংস্কার, ৪টি ফ্লাইওভার নির্মাণ, চট্টগ্রামের জন্য ৪টি অপরিহার্য মেগা প্রকল্প যেমন- পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট ১৭ কিমি দৈর্ঘ্য সিটি আউটার রিং রোড, ফৌজদারহাট থেকে বায়েজিদ পর্যন্ত ৬ কিমি দৈর্ঘের প্রথম বাইপাস রোড, চন্দনপুরা থেকে শাহ আমানত ব্রিজ পর্যন্ত ২ কিমি দৈর্ঘের বাকলিয়া এক্সেস রোড, চাক্তাই খালের মুখ থেকে কালুরঘাট ব্রিজ পর্যন্ত ৮ দশমিক ৫০ কিমি দৈর্ঘ্য ১২টি স্লুইচ গেইটসহ বন্যা প্রতিরোধ বাঁধসহ রাস্তা নির্মাণে পদক্ষেপ গ্রহণ করি।

এছাড়া চট্টগ্রাম কলেজের ১৩ টি স্তরে উন্নয়ন ও সংস্কার, মহসীন কলেজে একাডেমিক ভবন ও দৃষ্টিনন্দন তোরণ নির্মাণ, চট্টগ্রাম সরকারি হাই স্কুলে একাডেমিক ভবন ও তোরণ নির্মাণের পাশাপাশি, মোহরা ও চান্দগাঁও আবাসিকে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে ভারতের বিখ্যাত দিল্লী পাবলিক স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য জায়গা বরাদ্দ প্রদান,  আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অনন্যা আবাসিক এলাকায় ভারতের বিখ্যাত অ্যাপোলো হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, পর্যটন খাতের উন্নয়নে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ, কল্পলোকে ১৫শ প্লট, অনান্য আবাসিকে ১৭শ’ প্লট, সিডিএ স্কয়ার ফ্ল্যাট প্রকল্পে ১৬৫টি ফ্ল্যাট, কাজীর দেউড়ি ফ্ল্যাট প্রকল্পে ৬৩টি ফ্ল্যাট, দেওয়ানহাট ফ্ল্যাট প্রকল্পে ৪০টি ফ্ল্যাট প্রকল্পের বেশিরভাগই সম্পন্ন হয়েছে। নারী শ্রমিকদের জন্য সল্টগোলায় বাংলাদেশের প্রথম নারী ডরমেটরি প্রতিষ্ঠা করেছি সিডিএ’র উদ্যোগে। যোগ করেন আবদুচ ছালাম।

প্রিয় চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে নিজের সবটুকু সামর্থ দিয়ে চেষ্টা করেছি। দীর্ঘদিনের বিরতিহীন চেষ্টা, শ্রমে, ঘামে কতটুকু করতে পেরেছি তার বিচারের ভার আমার প্রিয় চট্টগ্রামবাসীর উপরে ছেড়ে দিলাম। বলেন সিডিএ’র এ সাবেক চেয়ারম্যান।

একুশে/এইচআর/এটি