শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩০ ভাদ্র ১৪২৬

আলোঝলমলে হালদা ভ্যালির আড়ালে অন্ধকারের গল্প

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯, ৯:০৮ অপরাহ্ণ


শরীফুল রুকন : চা-বাগান করার জন্য চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নারায়ণহাটে ‘হালদা ভ্যালি’কে ১২৯ একর জমি দিয়েছিল সরকার। তবে সেই ১২৯ একরের নাম দিয়ে হালদা ভ্যালি কর্তৃপক্ষ আশপাশের অন্তত দুই হাজার একর বনভূমি দখল করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দখল করে নেয়া বনভূমি থেকে জোরপূর্বক ভূমিহীনদের উচ্ছেদ, বনজসম্পদ ধ্বংস ও বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগও আছে চা-বাগানটির বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, হালদা ভ্যালি চা-বাগানটি ১৯০৫ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ছয়টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাত ঘুরে সব শেষে আসে পেডরোলো গ্রুপের হাতে। চা-বাগানের জন্য হালদা ভ্যালিকে যে পরিমাণ জমি দেয়া হয় তার চেয়ে বহু গুণ জমি তারা দখলে নেয়ার পাশাপাশি ২০০৫ সাল থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংসের অভিযোগ উঠতে শুরু করে তাদের বিরুদ্ধে।

নারায়ণহাটের বাদুরখিল এলাকায় বন বিভাগের জমিতে বসবাস করতেন রুহুল আমিন, আবুল হাশেম, মো. রব্বানী ও নুরুল আলমসহ অন্তত ৫০ জনের পরিবার; ভূমিহীন এসব মানুষজন বন বিভাগের কাজে সহায়তা করার পাশাপাশি বনভূমিতে বসবাস করে আসছিলেন। প্রথমবারের মত ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর তাদেরকে মারধর করে বন বিভাগের জমি থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে হালদা ভ্যালি কর্তৃপক্ষ।

এরপর ২০১৭ সালের ২৩ মে হালদা ভ্যালিকে বনভূমি দখলে বাধা দিতে যায় বন বিভাগের লোকজন। এ সময় বনকর্মীদের উপর হামলা চালানো হয়। এ সময় বন বিভাগের দুটি মোটরসাইকেলও দুর্বৃত্তরা ছিনিয়ে নেয়। এসব ঘটনায় হালদা ভ্যালির সিনিয়র ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠে।

গতবছরের মে মাসের শুরুতে এক্সকাভেটর ব্যবহার করে বন বিভাগের জমি থেকে কিছু দরিদ্র মানুষকে জোরপূর্বক তুলে দেয় হালদা ভ্যালি কর্তৃপক্ষ। অসহায় মানুষগুলো পুলিশ-প্রশাসনের কাছে গিয়ে বিচার পাননি। পরে উপজেলায় গিয়ে মানববন্ধন, সাংবাদিক সম্মেলন করেন। এমনকি নানা দপ্তরে লিখিত অভিযোগও জানান। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। মেলেনি কোন প্রতিকার।

এদিকে হালদা ভ্যালির বিরুদ্ধে সরকারি সংরক্ষিত বনভূমি জবরদখল, বনাঞ্চল ও বনজসম্পদ ধ্বংসসহ বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগ করে আসছে বন সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি। বন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রতিকার চেয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি ও ৫ মে বিভাগীয় কমিশনার বরাবর চিঠি দেয়া হয়।


চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান বন সংরক্ষক ড. মো. জগলুল হোসেন স্বাক্ষরিত এসব চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘হালদা ভ্যালি চা-বাগান সংলগ্ন বন বিভাগের সংরক্ষিত বনভূমি আছে। হালদা ভ্যালির মালিক প্রভাবশালী ও বিত্তশালী হওয়ায় তার ছত্রছায়ায় চা-বাগানের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলমের দাপটে চা-বাগান সংলগ্ন বন বিভাগের সামাজিক বনায়নের উপকারভোগী ও স্থানীয় দরিদ্র ব্যক্তিরা ভিটে ছাড়ার সম্মুখীন।’

এতে আরো উল্লেখ করা হয়, ‘সংরক্ষিত বনভূমিতে পাহাড় ও গাছ কেটে ক্রমাগত বন ধ্বংস ও বনভূমি জবরদখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হালদা ভ্যালি কর্তৃপক্ষ। ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম ও তার কিছু লোকজন সরকারি বন বিট জ্বালিয়ে দেবে এবং সুযোগ পেলে বনকর্মীদের মারধর করাসহ হত্যা করবে বলে প্রায়ই হুমকি দিচ্ছেন। বনকর্মীদেরকে হালদা ভ্যালি চা-বাগানের অভ্যন্তরের সড়ক ব্যবহারে বাধাও দেওয়া হচ্ছে।’

একই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে সর্বশেষ গত ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়েছেন চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বখতিয়ার নূর সিদ্দিকী।

তবে এভাবে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী নানা সংস্থার কাছে ধর্না দিয়েও প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না বলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। তারা বলছেন, চা-বাগানের জন্য লিজ নিয়ে প্রথমত অতিরিক্ত ভূমি দখল, আবার দখল করা জমিতে বন ধ্বংস করে ড্রাগন ফলসহ নানা ধরনের চাষাবাদ, মাছচাষ ও স্থাপনা তৈরী করেছে হালদা ভ্যালি কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, ২০০৩ সালে হালদা ভ্যালি ইজারা নেন পানির পাম্প বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান পেডরোলো এনকে লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাদের খান। ২০০৭ সালে পুরো বাগানে স্থায়ী সেচ ব্যবস্থা চালু করে সাফল্য পান তিনি। ২০১৭ সালের উৎপাদনের ভিত্তিতে গত বছর চা উৎপাদনে ‘সেরা পুরস্কার’ পায় বাগানটি। চা বোর্ড এই পুরস্কার দেয়। ব্ল্যাক টি বা সাধারণ চায়ের পাশাপাশি এখন সাদা চায়ের মতো দামি চা উৎপাদন করতে শুরু করেছে এই বাগান। তৈরি করা হচ্ছে বিশেষায়িত গ্রিন টিও। চায়ের দেশ চীনে প্রথমবারের মতো গ্রিন টি রপ্তানিও করে হালদা ভ্যালি। এখন কুয়েতে নতুন রপ্তানি আদেশ পেয়েছে তারা। আলোঝলমলে হালদা ভ্যালির এই সফলতা, চাকচিক্যের আড়ালে যে অন্ধকার লুকিয়ে আছে, তা এবার সামনে এসেছে।

অভিযোগ আছে, বনভূমি জবরদখল, বনাঞ্চল ও বনজসম্পদ ধ্বংসের ক্ষেত্রে হালদা ভ্যালি কর্তৃপক্ষের ‘লাঠি’ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছেন জাহাঙ্গীর। তিনি ফটিকছড়ির একটি চা-বাগানের টিলাবাবুর (কর্মী) ছেলে ছিলেন। জন্ম সেখানেই। দরিদ্র পরিবারের সন্তান জাহাঙ্গীর এখন দানবীর, কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক। বন বিভাগের জমি দখলসহ নানা অভিযোগে অন্তত ২১টি মামলার আসামি হয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম।

অভিযোগ রয়েছে, হালদা ভ্যালির হয়ে হয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রশাসনের লোকজনকে ‘ম্যানেজ’ করেন জাহাঙ্গীর; এরই অংশ হিসেবে হালদা ভ্যালিতে পিকনিক আয়োজন, খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া সেখানে রেস্ট হাউজে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন পেশাজীবী, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ লোকজনদের যাবতীয় সার্ভিস, গিফট দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ। এসব করার কারণে বন বিভাগের জমি নিয়ে কোন অভিযোগ হলে সেটা তারা নমনীয়ভাবে দেখেন এবং এ পর্যন্ত তারা নমনীয়ভাব দেখিয়ে এসেছেন বলেও অভিযোগ আছে।

সর্বশেষ গত ২৬ আগস্ট হালদা ভ্যালির পাশে সংরক্ষিত বনে সামাজিক বনায়নের অংশ হিসেবে গাছের চারা লাগাতে যায় বন বিভাগের লোকজন। সে সময় ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে ৭০-৮০ জন লোক বন বিভাগের কর্মীদের বাধা দেয় ও রোপন করা চারা তুলে ফেলে বলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।

সেদিনের ঘটনাস্থলে থাকা বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চারা রোপনে বাধা পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে বলে আপনারা কেন এসেছেন? একটু পর ফোন করে ইউএনও বলেন আপনারা চলে যান। চারাগুলো তুলে নিয়ে আসেন। নয়তো আমি ১৪৪ ধারা জারি করবো।’

তিনি বলেন, ‘বনভূমিতে চারা রোপন করছে বন বিভাগ। তাতেও বাধা। আমরা ইউএনওকে বলেছি আপনি হালদা ভ্যালির সীমানা ঠিক করে দিন। এরপর রোপন করা চারা যদি তাদের জায়গায় পড়ে আমরা তা তুলে ফেলবো। কিন্তু তিনি ভূমি পরিমাপ করে দিচ্ছেন না। এই বিষয়ে কোন প্রতিকার নেই। বিচার নেই। সবার মুখ বন্ধ। নাদের খান যে সুরে কথা বলে প্রশাসন একই সুরে কথা বলে। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।’

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বখতিয়ার নূর সিদ্দিকী বলেন, ‘হালদা ভ্যালি কী পরিমাণ বনভূমি দখল করে আছে, সেটাও জানা যাচ্ছে না। তারা ১২৯ একর লিজ নিয়েছে। এখন কথা হচ্ছে ১২৯ একর পর্যন্ত যেন থাকে, এর বাইরে যেন না যায়। তারা এখন, আদালতের ‘স্ট্যাটাস কো’ দেখিয়ে সরকারি কাজে বাধা দিচ্ছে।’

রুহুল আমিন নামের স্থানীয় একজন বাসিন্দা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এখন এলাকায় রটে গেছে, নাদের খান সবাইকে ম্যানেজ করে ফেলেছেন। বন বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে মামলা কয়েকটা করেছে, মার খেয়েছে, তারা আর আসবে না। ১২৯ একর জমি লিজ নিয়ে প্রায় দুই হাজার একর জমি ভোগদখল করতে এখন হালদা ভ্যালির আর কোন বাধা নেই। সবার কাছে এমন একটা ধারণা এসেছে।’

অভিযোগের বিষয়ে হালদা ভ্যালির সিনিয়র ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসে আমাদের জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আমরা যে জায়গা দখলে আছি, সেখানে বন বিভাগের কোন জমি নেই। সরকার থেকে ইজারা নিয়ে আমরা চা-বাগান করছি। আমাদের জমির মালিকও সরকার। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আমরা চা-বাগান করছি।’

১২৯ একর জমি লিজ নিয়ে প্রায় ২ হাজার একর জমি দখল করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সব জমি তো সরকারের। কেউ যদি এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলে তাহলে সেই প্রশ্নের জবাব এসিল্যান্ড দেবেন। আমরা এক হাজার একর জায়গা পেয়েছি। আর জায়গার মালিক হচ্ছে ফটিকছড়ির ইউএনও, এসিল্যান্ড। এ বিষয়ে এসিল্যান্ডের সাথে কথা বলুন, তিনি ক্লিয়ার করবেন।’

ফটিকছড়ির সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জানে আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিরোধপূর্ণ পুরো জায়গার পরিমাপ এখনো শেষ করা যায়নি। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে এইটুকু বলা যায়, সেখানে বন বিভাগের জায়গা থাকার সম্ভাবনা কম। হালদা ভ্যালি যেটা দখল করেছে সেটা খাস জমি হতে পারে। এখন এসব নিয়ে আদালতে মামলাও চলছে। চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সেখান থেকেই হবে।’

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চিঠি একটা দিয়ে ঘুমালে হবে নাকি! বন বিভাগকে তো যোগাযোগ করতে হবে, সার্ভেয়ার চাইতে হবে। চা-বাগান, পাহাড় মাপা এটা তো সহজ কাজ নয়। কাজটি কঠিন। সেটার জন্য সময়ও প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমি ইউএনওকে চিঠি দেব। তিনি সার্ভেয়ার নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’