সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

চট্টগ্রামেও যুবলীগ নেতার মদদে জুয়ার আসর

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯, ১০:৪৮ অপরাহ্ণ

হালিশহরে রাস্তার পাশে চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবের বাইরের অংশ।

শরীফুল রুকন : চট্টগ্রামেও প্রভাবশালী এক যুবলীগ নেতার মদদে ‘চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবে’ প্রকাশ্যে জুয়ার আখড়া চলে আসছিল। হালিশহরের জে ব্লকের আবাহনী ক্লাব ভবনে জুয়ার আসরে লেনদেন কোনো দিন কোটি টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেত।

তবে ঢাকায় যুবলীগ নেতাদের ক্যাসিনোতে র‌্যাবের অভিযানের পর ভয় ও থমথমে অবস্থার মধ্যে চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবের জুয়ার আখড়াটিও গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে ক্লাবটির ভেতরে তিন-চারটি কক্ষে থাকা জুয়ার আখড়াগুলো বন্ধ করে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

আবাহনী ক্লাবে জুয়া পরিচালনায় যুক্ত থাকা এক ব্যক্তি একুশে পত্রিকাকে জানান, ঢাকায় ক্যাসিনোতে অভিযানের পর সবাই ভয়ের মধ্যে আছেন। এছাড়া বিকেলে পুলিশের পক্ষ থেকেও বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। তাই জুয়ার সরঞ্জাম সরিয়ে ফেলার পাশাপাশি ক্লাবের বাইরে শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ব্যানার লাগিয়ে দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে ব্যানারও তৈরী হয়েছে বাইরে ঝুলিয়ে দেওয়ার জন্য।

এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে আবাহনী ক্লাবের সামনের সড়কে গিয়ে দেখা গেছে, ক্লাবের গেইটের কাছে তিনটি প্রাইভেট কার ও পাঁচটি মোটর সাইকেল পার্কিং করা আছে। গেইটের আশপাশে অন্তত ১৫ যুবক অবস্থান নিয়েছেন। থমথমে ও গুমোট অবস্থা দেখা যায়। ক্লাবের ভেতরে অস্বাভাবিক কিছু একটা চলছে- বুঝা যাচ্ছে।

গেইটের কাছে ভিড়তেই ক্লাবের নিরাপত্তাকর্মী বলে উঠলেন, সরে যান.. সরে যান! ভেতরে ‘ক্যান্টিন’ আছে কিনা জানতে চেয়ে কৌশলে ভেতরে ঢুকার চেষ্টা করলে নিরাপত্তাকর্মী, পাশের একটি টং দোকান দেখিয়ে দেন।

সংশ্লিষ্টরা একুশে পত্রিকাকে তথ্য দিয়েছেন, নামে ক্লাব হলেও আবাহনী ক্লাব ভবনে কোনো ক্রীড়া সামগ্রী বা কোনো খেলোয়াড় নেই। সেখানে তাসসহ জুয়ার সামগ্রী এবং জুয়াড়ি। বিভিন্ন ধরনের মাদকও আছে। আগে একতলা ক্লাব ভবনের জানালা খোলা থাকায় বাইরে থেকে ভেতরের জুয়া খেলার দৃশ্য দেখা যেত। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জুয়া চলে। সন্ধ্যার দিকে প্রাইভেট কার নিয়ে বেশ কয়েকজন শিল্পপতিও যেতেন। কিন্তু বুধবার ঢাকায় ক্যাসিনোতে র‌্যাবের অভিযানের পর আবাহনী ক্লাবের জানালা বন্ধ রাখা হয়।

আবাহনী ক্লাবের জুয়ার আখড়াটি কে নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন- প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে অভিন্ন উত্তর পাওয়া যায়। ক্লাব ভবনের জুয়ার আখড়ার নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সালেহ আহমেদ দীঘলের নাম সবার মুখে মুখে। এই যুবলীগ নেতার বাসা হালিশহরের বি ব্লকে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে যুবলীগ নেতা সালেহ আহমেদ দীঘলের মুঠোফোনে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অসংখ্যবার যোগাযোগ করে প্রতিবারই সংযোগটি ‘ব্যস্ত’ পাওয়া যায়।

এসব বিষয়ে জানার জন্য চট্টগ্রাম আবাহনীর মহাসচিব ও সংসদ সদস্য শামসুল হক চৌধুরীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

এদিকে আবাহনী ক্লাব ভবনে জুয়া খেলা হতো- বিষয়টি জানা ছিল পুলিশের কর্মকর্তাদেরও।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, আবাহনী ক্লাবের জুয়ার আখড়া ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু দীঘল কেন, নেপথ্যে আরো অনেক সিনিয়র লোকজন সেখানে জড়িত। এখন সব বন্ধ থাকবে।

এদিকে নগরের একে খান মোড় এলাকায় একটি ভবনের তিনতলা ও চারতলা ভাড়া নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক ক্লাব নাম দিয়ে জুয়ার আসর বসানো হয়েছে। প্রতিদিন শতাধিক লোক সেখানে জুয়া খেলে ও মাদক গ্রহণ করে। এর বাইরে সিআরবি মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব ও সদরঘাটের মোহামেডান ক্লাবেও জুয়ার আসর বসে বলে অভিযোগ। ছোটপুল বহুতলার ভেতরে বইল্লার কলোনিতে আলমগীর নামে একজন জুয়ার আসর চালায়।

জানা গেছে, বায়েজিদের আমিন কলোনি এলাকার আশপাশে অন্তত ছয়টি স্থানে জুয়ার আসর বসে। আমিন কলোনি বেলতলা এলাকায় আবুল হোসেন ও স্বপন নামে দুইজন তিনটি জুয়ার স্পট চালান। বেলতলা এলাকায় আলমগীর নামের এক যুবকের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে আশপাশের অনেকে অনলাইনে বাজি ধরেন। এছাড়া আমিন কলোনির মাঠ এলাকায় জাহাঙ্গীরের দুইতলা বাড়িতে জুয়া চলে। টেক্সটাইল জিএম বাংলো পাহাড়ের উপর, শান্তিনগর কলোনীর সোহেলের বাসায় জুয়ার আসর বসে বলেও স্থানীয়রা তথ্য দিয়েছেন।

এদিকে বিআরটিসি সংলগ্ন জামতলা বস্তি, ষোলশহর রেলস্টেশন ও জিআরপি থানা সংলগ্ন এলাকায় অন্তত ১৫টি দোকানে জুয়া ও মাদকের আসর বসে বলে অভিযোগ। আসকার দিঘীর শতদল ক্লাবের দ্বিতীয় তলায় প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জুয়া চলে বলে অভিযোগ আছে। নগরজুড়ে এ ধরনের অর্ধশতাধিক স্পটে জুয়ার আসর বসছে; এসব স্পটের নেতৃত্বে থাকছেন ক্ষমতাসীন দল ও অঙ্গ সংগঠনের পদবীধারী কিছু ব্যক্তি।

এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, যদি দুইজন মানুষ নিজেদের একটা রুমে বসে জুয়া খেলে সেটা তো ধরা যায় না। চট্টগ্রাম ক্লাবের সদস্যরা যদি নিজেদের মধ্যে খেলে সেটাও ধরা যায় না। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে কেউ জুয়ার আখড়া চালালে, সেখানে যদি বাইরে থেকে কয়েকশ লোক আসে, তাহলে এটা অবৈধ। এটা কোনভাবেই চলতে দেওয়া হবে না।