সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

আনোয়ারায় ট্রাফিক পুলিশের টোকেন বাণিজ্য, মাসিক আয় ২৮ লাখ টাকা!

প্রকাশিতঃ শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯, ৪:৫৪ অপরাহ্ণ

জিন্নাত আইয়ুব, আনোয়ারা : আনোয়ারায় তিন হাজারেরও বেশি সিএনজি হতে টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে মাসে লাখ টাকা আদায় করছে জেলা ট্রাফিক পুলিশ।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা, চন্দনাইশ, বাঁশখালী উপজেলায় যেসব সিএনজি অটোরিক্সা চলাচল করে তাদের টোকেন নিতে হয় আনোয়ারার চাতরী চৌহমুহনী বাজারের কথিত লাইনম্যান থেকে। এর জন্য চালকদের সিএনজি-প্রতি গুনতে হয় ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা। এভাবে তিনহাজারেরও বেশি সিএনজি থেকে ট্রাফিক পুলিশের চাঁদা আদায় হয় প্রতিমাসে ১০ লাখের ও অধিক।

উপজেলার কালাবিবির দীঘির চায়না রোডের মাথায়, চাতরী চৌমুহনী শশী ক্লাবের সামনে, বৈরাগ চায়না রোডের মাথাসহ আরো বেশ কয়েকটি স্থানে প্রায়শই মোটর সাইকেল ও সিএনজির ডকুমেন্ট চেক করে জেলা ট্রাফিক পুলিশের চাতরী চৌমুহনী পুলিশ বক্স। এসব ক্ষেত্রে যাদের টোকেন আছে তারা ছাড় পায় আর যাদের টোকেন নেই তাদের আটকে দিয়ে রুট পারমিট বাতিলের হুমকি দেয়া হয়। যা নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী কয়েকজন সিএনজি চালক জানান, যাদের টোকেন আছে তাদের গাড়ী ধরে না। টোকেন না থাকলে ধরে, আর ধরলে পুলিশকে টাকা দিতে হয়।

সিএনজি চালকদের এই অভিযোগের ভিত্তিতে গত কয়েকদিন ধরে যাত্রীবেশে সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, জেলা ট্রাফিক পুলিশের চাতরী চৌমুহনী বক্সের সদস্যরা স্থান বদল করে প্রায়শই চেকপোস্ট বসায়। সিএনজি চালিত ট্যাক্সি, মোটর সাইকেল ও মিনি ট্রাকের লাইসেন্স ও অন্যান্য ডকুমেন্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। অনেক সময় দেখা যায়, পুলিশ সিগন্যাল দিলেও কিছু ট্যাক্সি তা অমান্য করে চলে যায়। আর কিছু ট্যাক্সি আটকে রাখে পুলিশ।

এক্ষেত্রে দেখা যায়, টোকেনধারী ট্যাক্সিগুলো সিগনাল অমান্য করে চলে যায়। এই ব্যাপারে একাধিক সিএনজি চালকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানালেন,আনোয়ারা চন্দনাইশ, বাঁশখালীসহ রোডের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ যাত্রী নিয়ে ট্যাক্সিগুলো আনোয়ারা চাতরী চৌমুহনীতে পর্যন্ত আসার টোকেন রয়েছে। টোকেন থাকলে পুলিশ ধরবে না। টোকেন না থাকলে ধরবে।

টোকেন আছে কীভাবে জানবে পুলিশ? এমন প্রশ্নের জবাবে চালকরা জানান, ট্যাক্সির সামনে গ্লাসে টোকেন লাগানো আছে। টোকেন না থাকলে পুলিশের সিগনাল অমান্য করার সাহস কি কারো আছে? মোটর সাইকেল দিয়ে দৌঁড়ে আটকে রাখবে। তখন মারধর ছাড়াও অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে।

খোঁজ নিয়ে ও বেশ কয়েকজন চালকের সাথে কথা বলে জানা যায়, ‌‌’চট্টগ্রাম’ নম্বরধারী বা নম্বরবিহীন টোকেন নিয়ে উপজেলাজুড়ে এসব সিএনজি চলাচল করে। এভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে আসা সিএনজিগুলোকে মাসিক টোকেন নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। আনোয়ারা উপজেলার চাতরী চৌহমুহনী হয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার সিএনজি যাতায়াত করে।

চালকরা আরো জানান, গত ২-৩ বছর আগেও টোকেনের দাম ছিল ৩০০ টাকা। তা বাড়তে বাড়তে এখন ৪৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও লাইনম্যান খরচ হিসেবে প্রতি সিএনজি হতে দৈনিক ২০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। দিনে অন্তত তিন হাজারেরও বেশি সিএনজি এ সড়ক দিয়ে বিভিন্ন উপজেলায় চলাচল করে। সেই হিসাবে দিনে ৬০ হাজার টাকার চাঁদা উত্তোলন করা হয়। যা মাসে দাঁড়ায় ১৮ লাখ টাকা। টোকেন আর চাঁদা মিলিয়ে মাসে ২৮ লাখ টাকারও বেশি চাঁদাবাজি হয় এই সড়কে।

টোকেনের বিনিময়ে চাঁদা আদায় করার বিষয়টি অস্বীকার করে চাতরী চৌমুহনী বাজারের পুলিশ বক্সের ট্রাফিক ইনচার্জ (টিআই) ছামিউর রহমান খান জানান, আমি প্রতিদিন ৩/৪ টাকা গাড়ি জব্দ করে থানায় হস্তান্তর করি। তিনি সুকৌশলে টোকেনের কথাটা এড়িয়ে যান।

টোকেন বাণিজ্যের বিষয়ে বেশ কয়েকজন লাইনম্যান জানায়, আমরা এই টোকেনগুলো চট্টগ্রাম হালিশহর টি আই (প্রশাসক) থেকে নিয়ে আসি, সেই সাথে টোকেনের জন্য স্থানীয় কিছু নেতাকে মাসোহারাও দিতে হয়। এছাড়াও পুলিশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের মাসোহারা তো দিতে হয়ই।

এদিকে এসব টোকেন বাণিজ্য আর চাঁদাবাজির খেসারত দিতে হয় যাত্রী সাধারণকে। রুটপ্রতি যাত্রীদের গুনতে হয় অতিরিক্ত ভাড়া। এছাড়া এসব চাঁদার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে প্রায়শই বিভিন্নপক্ষের সংঘাত লেগেই থাকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুঠোফোনে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জুবায়ের বলেন, উপজেলায় টোকেন বাণিজ্যের বিষয়ে আমি জানি না। তবে টোকেন বাণিজ্যে কেউ জড়িত আছে প্রমাণ মিললে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।