যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন দেশটির মানুষ। ইতিহাসে সবচেয়ে তিক্ততাপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারণা শেষে স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় পূর্ব উপকূলীয় এলাকা থেকে আনুষ্ঠানিক ভোটগ্রহণ শুরু হয়। দেশটির মোট ভোটারের সংখ্যা ২৩ কোটি হলেও নির্বাচনে প্রায় ১৪ কোটি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যে ফল জানার জন্য তাকিয়ে আছে বিশ্ব। কে হবেন পরাক্রমশালী এই রাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট, হিলারি ক্লিনটন না ডোনাল্ড ট্রাম্প?
এবার নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে তিক্ত নির্বাচনের সাক্ষী হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নজিরবিহীন তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন। বিভিন্ন ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে রিপাবলিকান পার্টির কর্মী-সমর্থকরা ভোটারদের ভয় দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভোটকেন্দ্রের সামনে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে গোলমালের খবরও পাওয়া গেছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ ছিল তুঙ্গে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের সামনে ভোটারদের লম্বা লাইন দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে হয়েছে তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের ভোটকর্মীরাও এবারের নির্বাচন সামাল দিতে বেশ নাজেহাল হয়েছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। ট্রাম্প সমর্থকরা আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে ভোট সামলাতে ময়দানে নামেন। ট্রাম্প নিজেই দলের কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন। রিপাবলিকান প্রার্থীর অভিযোগ, ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে কারচুপি করার চেষ্টা করবে। ভোটগ্রহণে অনিয়ম রুখতে গোটা ভোট প্রক্রিয়ার ওপর কড়া নজর রাখতে হবে, দলীয় কর্মীদের এমনই নির্দেশ দেন ট্রাম্প।
এদিকে হ্যাম্পশায়ারের ছোট্ট তিন শহরে ভোটে হিলারির চেয়ে এগিয়ে গেছেন ট্রাম্প। শহর তিনটি হলো ডিক্সভিলি নচ, হার্টস লোকেশন ও মিলসফিল্ড। তিন শহরে মোট ভোটার ১০০ জনের কম। এর মধ্যে ট্রাম্প পেয়েছেন ৩২ আর হিলারি পেয়েছেন ২৫ ভোট। নির্বাচনের নিয়ম বা ভোটার সংখ্যা যা যাই হোক না কেন, ডিক্সভিল নচের এ বিজয় হিলারি সমর্থকদের আশার পালে হাওয়া দিতে পারে বলে মনে করছে সিএনএন। আগের বেশ কয়েকটি নির্বাচনে এ কেন্দ্রে বিজয়ী প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসে পৌঁছে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে সর্বদাই ডিক্সভিল নচের ভোটের ফল সর্বাগ্রে ঘোষিত হয়। ২০১০ সালের জনগণনা অনুযায়ী ডিক্সভিল নচের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১২। অর্থাৎ ভোটদাতার সংখ্যা আরো কম। ভোটদাতার সংখ্যা এত কম হওয়ার কারণেই ডিক্সভিল নচের ভোটগণনা সর্বাগ্রে শেষ হয়ে যায়। এবারের নির্বাচনে ডিক্সভিল নচে ৭টি ভোট পড়েছে। ৪টি ভোট পেয়েছেন হিলারি, ২টি পেয়েছেন ট্রাম্প। লিবার্টেরিয়ান পার্টির প্রার্থী গ্রে জনসন পেয়েছেন ১টি ভোট। এ ছাড়া একজন ব্যালট পেপারে লিখেছেন গত নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী মিট রমনির নাম। ভোটগণনার এই প্রথম দফার ফল প্রকাশিত হতেই হিলারি ট্রাম্পের চেয়ে ২ ভোটে এগিয়ে যান। এর পরপর ওই অঙ্গরাজ্যের হার্টস লোকেশন এলাকায় গিয়ে ব্যবধান আরো বাড়িয়ে নেন হিলারি ক্লিনটন। হার্টস লোকেশনে হিলারি ১৭টি ভোট পেয়েছেন। ট্রাম্প পেয়েছেন ১৪টি। ফলে হিলারির এগিয়ে থাকার ব্যবধান ২ থেকে বেড়ে ৫-এ পৌঁছে যায়। কিন্তু মিলসফিল্ড এলাকার গণনার ফল প্রকাশিত হতেই পিছিয়ে পড়েন হিলারি। মিলসফিল্ডে ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন ১৬টি ভোট। হিলারি ক্লিনটন পেয়েছেন মাত্র ৪টি। ফলে তিনটির মধ্যে দুটি এলাকায় এগিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও হিলারি ক্লিনটনের মোট ভোট ছিল ২৫ আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মোট ভোট ৩২। নিউ হ্যাম্পশায়ারে কে জিততে চলেছেন, তা অবশ্য এই তিনটি ছোট ছোট এলাকার ভোটগণনার ফল দেখে আঁচ করা একেবারেই সম্ভব নয়। ডিক্সভিল নচ, হার্টস লোকেশন, মিলফিল্ডের ফলাফল দেখে গোটা যুক্তরাষ্ট্রের ফলাফলের আঁচ পাওয়া আরো অসম্ভব। তবু ভোটগণনার একেবারে প্রারম্ভিক গতিবিধি বলছে, রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের ইলেক্টোরাল কলেজে মোট নির্বাচক সংখ্যা ৪। এই অঙ্গরাজ্যের ভোট গণনায় এখনো ট্রাম্প যেভাবে এগিয়েছেন, সেই ধারা বজায় রেখে যদি তিনি হিলারিকে পেছনে ফেলে দিতে পারেন, তা হলে নিউ হ্যাম্পশায়ার ইলেক্টোরাল কলেজের চারটি ভোটই ট্রাম্পের ঝুলিতে চলে যাবে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া সারাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের সমর্থনও বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। জিততে হলে একজন প্রার্থীকে সংগ্রহ করতে হয় ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট, যার মোট সংখ্যা ৫৩৮টি। দুটি অঙ্গরাজ্য ছাড়া বাকি অঙ্গরাজ্যগুলোতে প্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রার্থীরা সেই ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটে বিজয়ী হন, আর এর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট অর্থাৎ ২৭০টি পেলেই একজন প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেন।
প্রধান দুই দলের মধ্যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পক্ষে গাধা প্রতীকে লড়ছেন ফার্স্ট লেডি, সিনেটর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসা হিলারি ক্লিনটন। আর রিপাবলিকান পার্টি তাদের হাতি প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে নিউইয়র্কের ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী আছেন আরো প্রায় দুই ডজন। কিন্তু হিলারি-ট্রাম্প ছাড়া অন্য কারোর নাম ৫০ অঙ্গরাজ্যের সবগুলোর ব্যালটে থাকবে না। এ দু’জনের বাইরে অন্য কারোর প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাও কেউ দেখছেন না।
মার্কিন সমাজে যেমন বহু বিভাজন, বহু গোষ্ঠী, ঠিক সেভাবেই ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনী প্রচার অভিযানের শুরু থেকেই নারীরা ভোটার হিসেবে ট্রাম্পের পক্ষে একটি বিশেষ সমস্যা হয়ে দাঁড়ান। জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প হিলারির চেয়ে অনেক কম নারী ভোট পাবেন। সেজন্য অবশ্য তিনি নিজেই প্রধানত দায়ী। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এবং টুইটারে তিনি বিশেষ বিশেষ নারীদের মেদবহুল বা কুশ্রী বলে অভিহিত করেছেন। এই পন্থায় ট্রাম্প স্বয়ং রিপাবলিকান নারী ভোটারদেরও সহানুভূতি হারিয়েছেন। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচার অভিযানে নারী অধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো স্থান পায়নি। সে তুলনায় হিলারি ক্লিনটন গোড়া থেকেই নারী-পুরুষের সমান পারিশ্রমিক, গর্ভপাত বা পরিবার ও পেশার মতো বিষয়গুলোকে তার প্রচারণায় গুরুত্ব দিয়েছেন। কম শিক্ষা বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্বেতাঙ্গ পুরুষরাই হলেন ট্রাম্পের ভোটব্যাংক। এই গোষ্ঠীর মানুষ ভারি শিল্পে চাকরি কমায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই ‘মেক অ্যামেরিকা গ্রেট এগেইন’, ট্রাম্পের এই স্লোগানের অর্থ তাদের কাছে সম্পূর্ণ আলাদা। ট্রাম্প যে চীন থেকে চাকরি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মুক্তবাণিজ্য ও অভিবাসনের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করেছেন, তা এই শ্রেণীর মানুষের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিনীরা চিরকালই প্রধানত ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়ে থাকেন। হিলারি ক্লিনটনও এবার এই ভোট পাওয়ার আশা করতে পারেন। অপরদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিভিন্ন জাতিবাদী মন্তব্যের দরুণ এই গোষ্ঠীর ভোটারদের কাছে অপ্রিয়। গত জুলাই মাসে এনবিসি টেলিভিশনের একটি জরিপ অনুযায়ী কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মাত্র ছয় শতাংশ ট্রাম্পকে ভোট দেবেন। অপরদিকে ওহাইওর মতো সুইং স্টেটের শতকরা একশ’ ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ হিলারিকে ভোট দেবেন বলে জরিপে প্রকাশ।
দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আগত মানুষরা যুক্তরাষ্ট্রে যেভাবে বাড়ছেন, সেভাবে আর কোনো জনগোষ্ঠী বাড়ছে না। চার বছর আগে তাদের একটা বড় অংশ বারাক ওবামাকে ভোট দিয়েছিলেন। ট্রাম্প মেক্সিকানদের সম্পর্কে যে ধরনের মন্তব্য করেছেন, অথবা তার মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা এই গোষ্ঠীর মানুষের আরো বেশি করে হিলারির দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। হিলারি ‘আশাবাদী, অংশগ্রহণমূলক ও উদার আমেরিকা’ নির্মাণে সমর্থন দেয়ার জন্য ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, ভাঙা আমেরিকাকে জোড়া লাগানোর জন? তিনিই ‘শেষ সুযোগ’; তিনিই আমেরিকাকে ফিরিয়ে দিতে পারেন শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা।