রবিবার, ৭ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

কালের আবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প

প্রকাশিতঃ শনিবার, নভেম্বর ২৩, ২০১৯, ৯:০৮ অপরাহ্ণ


জিন্নাত আয়ুব, আনোয়ারা : বর্তমান প্রযুক্তির যুগে প্লাস্টিক ও লোহার পণ্যের কদর বেড়ে যাওয়ায় গ্রাম-গঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশের তৈরি বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। অভাবের তাড়নায় এই শিল্পের কারিগররা পূর্ব-পুরুষের এ পেশা ছেড়ে আজ অনেকে অন্য পেশার দিকে ছুঁটছে। শত অভাব অনটনের মাঝেও আনোয়ারা উপজেলায় হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার আজও পৈত্রিক এই পেশাটি ধরে রেখেছেন।

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এসব বাঁশশিল্পের কারিগররা তাদের পূর্ব-পুরুষের এ পেশা আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেও হিমশিম খাচ্ছেন, ঝুঁকে পড়ছেন অন্য পেশায়। দিন দিন বিভিন্ন জিনিসপত্রের মূল্য যেভাবে বেড়ে চলেছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না এই শিল্পের তৈরি বিভিন্ন পণ্যের মূল্য। যার কারণে কারিগররা জীবন সংসারে টিকে থাকতে এই পেশায় হিমশিম খাচ্ছেন।

কয়েক দশক আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান হত এই কারিগরদের তৈরি এই সব বাঁশ ও বেতের পণ্যসামগ্রী। এক সময় দেশের ঘরে ঘরে বাঁশের তৈরি এই সব সামগ্রীর কদর ছিল অনেক। কালের আর্বতনের সাথে সাথে বিশেষ আর চোখে পড়ে না এই পণ্যগুলো। অপ্রতুল ব্যবহার আর বাঁশের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাঁশশিল্প আজ হুমকির মুখে।

বাঁশ ও বেত থেকে তৈরি সামগ্রী বাচ্চাদের দোলনা, তালায়, র‌্যাক, পাখা, ঝাড়ু, টোপা, ডালী, মাছ ধরার পলি, খলিশানসহ বিভিন্ন প্রকার আসবাবপত্র গ্রামঞ্চলের সর্বত্রই বিস্তার ছিল। এক সময় যে বাঁশ ২০ থেকে ৩০ টাকায় পাওয়া যেত সেই বাঁশ বর্তমান বাজারে কিনতে হচ্ছে দুইশত থেকে আড়াইশ টাকা, সেই সাথে বাড়েনি এসব পণ্যের দাম। জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ ঘর-বাড়ি নির্মাণে যে পরিমাণ বাঁশের প্রয়োজন সে পরিমাণ বাঁশঝাড় বৃদ্ধি পাচ্ছে না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় যে, বর্তমানে আনোয়ারার ২০ হতে ২৫টি পরিবারই শিল্পটি ধরে রেখেছেন। পুরুষদের পাশাপাশি সংসারের কাজ শেষ করে নারীও বাঁশ দিয়ে এইসব পণ্য বেশি তৈরি করে থাকেন। এ আধুনিতার যুগে বাজারে সহজলভ্য ও আর্কষণীয় বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য ও অন্যান্য দ্রব্যমূল্যের সাথে পাল্লা দিতে না পারায় এই শিল্পের অনেক কারিগররা তাদের বাপ-দাদার পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলার গুয়াপঞ্চক গ্রামের নারী কারিগর নুর নাহার জানান, ‘আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে বাঁশ-বেতের জিনিসপত্র তৈরি করে সংসার চালাতাম। এখন এ কাজে একটি বাঁশ থেকে ১০/১২টি ডালি তৈরি করা যায়। সকল খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি পণ্য থেকে ১০/২০টাকা করে লাভ করা যায়। তবে আগের মত আর বেশি লাভ হয় না এখন। তাই এই সীমিত লাভ দিয়ে পরিবার চালানো কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আমি এই পেশা বাদ দিয়েছি।

তবে বর্তমানে এই পেশায় নিয়োজিত উপজেলার কাজলী দাস, দহর চাঁদ, রত্না দাসসহ কয়েকজন কারিগর জানান, খেয়ে না খেয়ে অতি কষ্টে তাদের পূর্ব-পুরুষের ঐতিহ্যবাহী এই বাঁশশিল্প টিকে রাখতে ধার-দেনা ও বিভিন্ন সমিতি থেকে বেশি লাভে টাকা নিয়ে কোনো রকম বাপ-দাদার এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। আমাদের এই শিল্পটির উন্নতিকল্পে যদি সরকারিভাবে অল্প লাভে ঋণ দেয়া হয় তাহলে বাঁশশিল্পের কারিগররা স্বাবলম্বী হবে আর হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

একুশে/জিএ/ এএ