সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬

চট্টগ্রামের ‘কেজরিওয়াল’ হতে চান রেজাউল!

প্রকাশিতঃ সোমবার, মার্চ ২, ২০২০, ১:৫৭ অপরাহ্ণ

আজাদ তালুকদার : আম আদমি পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কেজরিওয়াল ২০১৩ সালে পরাশক্তির রাজনৈতিক দলের বাঘা বাঘা প্রার্থীদের পরাজিত করে দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন। এর মূল কারণ হলো- তিনি জনগণের মনের ভাষা বুঝতে পেরেছিলেন। অতিরঞ্জন, বাহুল্যপনা, ভিআইপি কালচার, মিলিটারি মিলিটারি ভাবের নেতা-মন্ত্রীদের কাছ থেকে জনগণ যখন মুখ ফিরিয়ে নিলো-তখনই আম আদমি পার্টির ব্যানারে কেজরিওয়ালের সরল, সাদামাটা অভিষেক।

দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থলোপাট, রাজকীয় বিলাসব্যসনের বিপরীতে দিল্লীর মানুষকে তিনি স্বপ্ন দেখালেন পরিবর্তনের। আর সেই পরিবর্তনটা আত্মিক, মনোজাগতিক, দৃষ্টিভঙ্গি ও রুচির। তিনি বলেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে নিরাপত্তা আর সরকারি প্রটোকলের ঘেরাটোপে বন্দী থাকবেন না। ভিআইপি কালচার বাতিল করবেন। দিল্লির নিম্ন আয়ের মানুষকে সস্তায় বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ দেবেন। কেজরিওয়ালের ‘মেদবিহীন পরিবর্তন’ এর প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখেছিলেন দিল্লীর মানুষ। দিল্লির সাধারণ থেকে বিত্তবানেরাও এ ধরনের নেতৃত্বই চেয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে আম আদমি পার্টি গঠনের ৬-৭ মাসের মাথায় মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ভারতের রাজধানী জয় করলেন কেজরিওয়াল।

রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ কেজরিওয়াল অবশ্য প্রথম যাত্রায় ৪০ দিনের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। বহু নাটকের মধ্য দিয়ে স্বল্প সময়ের রাজনীতিবিদ অরবিন্দ কেজরিওয়াল যখন পদত্যাগ করলেন, তখন অনেক বিশেষজ্ঞ এবং ঝানু রাজনীতিবিদ তাঁকে মাইনাস করে দিয়েছিলেন। এমনকি বিজেপির রথি-মহারথিরা কেজরিওয়াল এবং আম আদমি পার্টিকে একপ্রকার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যই করেছিলেন। ২০১৪ সালের লোকসভা প্রচারণার একপর্যায়ে কাশ্মীরে প্রচারণাকালে প্রধানমন্ত্রী মোদি কেজরিওয়ালের কাশি নিয়ে বিদ্রূপ করেছিলেন। এরপর দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে মোদি আম আদমি পার্টি এবং কেজরিওয়ালকে বিশ্বাসঘাতক বলেছিলেন। ভারতজুড়ে মোদির এ ধরনের বক্তব্যের নিন্দাও হয়েছিল। কিন্তু জনগণ তার জবাবে এই অনভিজ্ঞ লোকটিকে দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী পদে বসালেন, লোকসভা, বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন দিলেন দ্বিগুণ ভোট দিয়ে, দেখালেন যে তাঁরা কেজরিওয়ালের মতো সাধারণ মানুষকে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদদের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন।

দীর্ঘ ৮ বছরের পথচলায় কেজরিওয়াল একটুও বদলাননি। যেমন ছিলেন এখনোও তাই। বরং আরও বেশি নত-বিনীত হয়েছেন। দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়েছেন। ভিআইপি কালচার ভেঙেছেন। দিল্লির নিম্ন আয়ের মানুষকে সস্তায় বিদ্যুৎ ও পানি দিয়েছেন। ক্ষমতায় থেকেও নিরাপত্তা আর সরকারি প্রটোকলের ঘেরাটোপে থাকেননি।

চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনেকটা কেজরিওয়ালের গল্পের মতোই অভিষেক নির্লোভ, নির্মোহ, সরল সাদামাটা হিসেবে পরিচিত রেজাউল করিম চৌধুরীর। মনোনয়ন পাওয়ার পর কেউ কেউ তাকে কেজরিওয়ালের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। বলছেন চট্টগ্রামের কেজরিওয়াল।

জাতীয় নির্বাচন, উপ নির্বাচন, মেয়র নির্বাচনে বার বার মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হচ্ছিলেন রেজাউল করিম। মনোনয়ন পাওয়া দূরের কথা, তেমন কোনো আলোচনাতেই ছিলেন না তিনি। বরং রাজনীতির মহারথিরা রেজাউল করিমের মনোনয়ন চাওয়ার ব্যাপারটিকে নিছক অ্যাডভেঞ্চার মনে করে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছিলেন বিভিন্ন সময়।

সবাইকে তাক লাগিয়ে সেই রেজাউল করিমের হাতেই চট্টগ্রামের মেয়র মনোনয়ন তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর কারণ রেজাউল করিমের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, ত্যাগ, ধৈর্য, সততা, নির্লোভ, নির্মোহ জীবন। তাকে নিয়ে শুদ্ধতার আশাবাদ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে সংশয়। রেজাউল পারবেন তো নিজ চিন্তায়, সিদ্ধান্তে অনড়, অটুট থাকতে? পারবেন তো শেষপর্যন্ত সততার তকমা ধরে রাখতে?

অনেকে সুযোগের অভাবে সততার ‘তকমা’ নিয়ে বেড়ায়। সুযোগ না পেলে তার অসৎ হওয়ার সুযোগও থাকে না। রেজাউল করিম সুযোগ পেলে কতটা সৎ থাকবেন সেই প্রশ্নটির পাশাপাশি নগরসেবায় তার পক্ষে কতটা প্রভাব ও রাহুমুক্ত থাকা সম্ভব হবে সেই প্রশ্নও তৈরি হচ্ছে জনমনে।

ইতোমধ্যে তাকে ঘিরে ধরেছে নানা বলয়ের লোকজন। যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তির সাথে ‘খয়ের খা’ সম্পর্ক থাকা লোকজনও শুরু থেকে ঘিরে ধরেছেন রেজাউলকে। রেজাউলকে হাতে রাখার, তার ‘একান্ত’ হওয়ার প্রতিযোগিতাও চলছে বিভিন্ন জনে। রেজাউলকে ‘বৈষয়িক বৈতরণী’ পার হবার নির্ভরশীল, একনিষ্ঠ জায়গাও ভাবতে শুরু করেছেন কেউ কেউ।

এমন সংশয়-ভাবনার মাঝেই সম্প্রতি নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহারের জন্য আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন থেকে পাজেরো জিপ নিয়েছেন রেজাউল করিম চৌধুরী। শুদ্ধতা আর ত্যাগের প্রশ্নে রেজাউল করিমকে নিয়ে যাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তারাই বলছেন চলমান ভোগ-বিলাসের সংস্কৃতিতে এটি অশোভন কিছু নয়। কিন্তু আশা জাগানিয়া রেজাউল করিম চৌধুরী যখন প্রচারণার জন্য বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করবেন তখন অবশ্যই সেটা অশোভন।

যদিও একুশে পত্রিকার কাছে রেজাউল করিম চৌধুরীর দাবি, তার ২০০১ মডেলের এক্স করোলা গাড়িটি নিয়ে গণযোগাযোগ তৈরি করা, মানুষের দ্বারে দ্বারে যাওয়া কষ্টকর। শহরের মাঝে এমন কিছু এলাকা আছে যেখানে এই গাড়ি নিয়ে গেলে নিচের অংশ মাটির সাথে লেগে যায়। এ কারণে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের গাড়িটি তিনি নিয়েছেন। তাছাড়া মুরুব্বীর অফার ফিরিয়ে দেওয়াটাকে সুন্দর মনে করেননি তিনি।

আপনার যে চিন্তা-চেতনা, সাদামাটা জীবন; তার সাথে আপনার ৯ লাখ টাকা দামের গাড়িই সুন্দর, দৃষ্টিনন্দন। এ গাড়িতে চড়ে প্রচারণা চালাতে গিয়ে গাড়ির তলা ক্ষয়ে যাক, খসে পড়ুক- তাতেই বরং আপনি প্রশংসিত হতেন, সাধুবাদ পেতেন-এমন কথার জবাবে রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচনে অনেক কিছু ব্যালেন্স করে চলতে হয়। তার অর্থ এই নয় যে, আমি কারো মুঠোবন্দী হচ্ছি, বিলাসী জীবনে পা বাড়াচ্ছি।’

নির্বাচিত হতে পারলে লোভ-হিংসা-বিদ্বেষ-এর ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত হয়ে সিটি করপোরেশন পরিচালনা করবো। দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো জীবন-যাপন করবো। যোগ করেন রেজাউল করিম চৌধুরী।

নির্বাচিত হলে কোন ধরনের জীবনযাপন করবেন, কীভাবে করপোরেশন চালাবেন তা সময়ই নির্ধারণ করবে। তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা যে কোনো মূল্যে, যে কোনো পরিস্থিতিতে রেজাউল করিম শুদ্ধাচারের পথেই হাঁটবেন।