মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০, ১৭ চৈত্র ১৪২৬

বিএনপি-প্রার্থী ভ্রাতার জয় নিশ্চিত করতে আ. লীগের মনোনয়নে ডামি প্রার্থী!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০, ৮:৩৪ অপরাহ্ণ

দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডে বিএনপি-আ.লীগ প্রার্থী ভ্রাতৃদ্বয়

চট্টগ্রাম : গেলো সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী ইয়াছিন চৌধুরী আছুর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন আওয়ামী লীগের চার প্রার্থী। এই চার প্রার্থীর মধ্যে ৩৮৮৪ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থাৎ দ্বিতীয় হন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। বাকি তিন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মধ্যে আজিজুর রহমান ৩২৫৮ ভোট পেয়ে তৃতীয়, এস এম শহীদুল্লাহ ১৫৩৫ পেয়ে  ৪র্থ এবং সবচেয়ে কম ভোট ৮৪২ পেয়ে ৫ম হন ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মো. নুরুল আলম।

২০১০ এর নির্বাচনে একই পদে একই প্রার্থীদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৫শ’র কাছাকাছি ভোট পেয়ে সর্বনিম্ম অবস্থান হয় নুরুল আলমের। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী এম এ মান্নান, এস এম শহীদুল্লাহ, আজিজুর রহমান তার চেয়ে অনেক বেশি ভোট পেলেও নির্বাচিত হন বিএনপি প্রার্থী ইয়াছিন চৌধুরী আছি।

মজার বিষয় হচ্ছে, পরপর দুুটি নির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পাওয়া মো. নুরুল আলমই পেয়েছেন আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিট। বলা হচ্ছে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ঘোষিত তালিকায় দীর্ঘদিনের ত্যাগী, পুরোনো আওয়ামী লীগ নেতাদের পেছনে ফেলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর তালিকায় নিজের নাম নিয়ে এসে মনোনয়নের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বড় অঘটন বা চমকটিই দেখালেন নুরুল আলম।

নুরুল আলমের এ চমকের রহস্য কী- একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নুরুল আলম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক প্রবাসী। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার গ্রিনকার্ড নিয়ে সপরিবারে সেখানেই বসবাস করেন তিনি। বছর পাঁচেক আগে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল আনোয়ার চৌধুরী বাহারের আমেরিকা প্রবাসী ছেলে আরেফিন চৌধুরী সাফির সাথে নুরুল আলমের আমেরিকায় বসবাসরত মেয়ের বিয়ে হয়।

প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত মিরসরাইয়ের সন্তান নুরুল আনোয়ার চৌধুরী বাহার। ব্যবসা-বাণিজ্যে রাতদিন ব্যস্ত সময় কাটানো এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের এক সময়ের নেতা নুরুল আনোয়ার চৌধুরী বাহার রাজনীতিতে সক্রিয় না থেকেও কেবল ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের আশীর্বাদে আওয়ামী লীগের সদ্যগত কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং প্রস্তাবিত কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। রাজনীতিতে যাদের নিরঙ্কুশ ত্যাগ-তিতিক্ষা, কমিটিতে  বারে বারে তারা অবনমন কিংবা বাদ পড়লেও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের আশীর্বাদপুষ্ট বাহারের বরং পদোন্নতি হয় সবসময়- চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এই বিতর্ক, বিস্ময় আরেক গল্প, অন্য উপাখ্যান।

বিভিন্ন সংস্থার জরিপে, স্থানীয়দের আলোচনায় না থাকা মো. নুরুল আলম আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীন রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন বাগিয়ে আনা মূলত বেয়াই-কানেকশনের চমক বলে তথ্যানুসন্ধানে উঠে এসেছে। আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পাওয়ার পাশাপাশি কাউন্সিলর পদে দলের মনোনয়ন বিলি-বণ্টনের দায়িত্বও ছিলো প্রবীণ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের হাতে। মূলত বেয়াই বাহারের কল্যাণে, মোশাররফ হোসেনের সহযোগিতায় সবাইকে টপকিয়ে ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে আসেন নুরুল আলম।

অনুসন্ধান মতে, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বাগিয়ে নিতে দুই মাস আগে থেকেই আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে কোমর বেধে নামেন নুরুল আলম। তাকে মনোনয়ন পাইয়ে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন মেয়ের জামাই আরেফিন চৌধুরী সাফি। এ জন্য কয়েক মাস আগে আমেরিকা থেকে দেশে চলে আসেন সাফি। শ্বশুরের মনোনয়নের জন্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছাড়াও ধর্ণা দিতে থাকেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কাছে।

গত ১২ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার ফ্লাইটে চট্টগ্রাম থেক  ঢাকা যাচ্ছিলেন আওয়ামী লীগের উপ প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। সে খবর পেয়ে আমিনুল ইসলামের সাথে দেখা করতে নুরুল আলমের আমেরিকা প্রবাসী একমাত্র ছেলে এরিককে নিয়ে বিমান বন্দরে হাজির হন আরেফিন চৌধুরী সাফি। ভিআইপি লাউঞ্জে বসে শ্বশুরের মনোয়নের জন্য আমিন ইসলামের সহযোগিতা কামনা করেন তারা।

শুধু তা নয়, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ঢাকার ইস্কাটনের বাসা ও চট্টগ্রামের নন্দনকাননের বাসায় গত দেড় মাসে অসংখ্যবার আসা যাওয়া করেন সাফি। মোশাররফ হোসেনের সাথে এক টেবিলে বসে খাওয়া-দাওয়াও করেন তিনি। গত ৭ ফেব্রুয়ারি দুপুর সোয়া ২টায় মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে খাবারের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সাফি লিখেন ‘উইথ আওয়ার গারডিয়ান এঞ্জেলস’ । ছবিটি পাঁচতারকা হোটেল ‘রূপসী বাংলা’র বলে শামীম চৌধুরী নামে একজন সেই পোস্টের নিচে মন্তব্য করেন।

এদিকে, বাহার-আলম ক্যারিশমায় কুপোকাত ৩৫ বছরের মাঠের কর্মী, ২৫ বছর ধরে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে থাকা মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আজিজুর রহমানের মতো পুরোনো নেতারা। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নুরুল আলমের বিপরীতে বিএনপির মনোনয়ন পান বর্তমান কাউন্সিলর ইয়াছিন চৌধুরী আছু। বলাবাহুল্য, আওয়ামী লীগ-বিএনপির টিকিট পাওয়া দুই প্রার্থী যথাক্রমে ইয়াছিন চৌধুরী আছু ও মো.  নুরুল আলম আপন সহোদর।

২০০০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। কিন্তু দলের সিদ্ধান্ত না মেনে সেই নির্বাচনে অংশ নেন বিএনপি নেতা ইয়াছিন চৌধুরী আছু। আর তাকে জেতাতে তৎকালীন বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আশীর্বাদপুষ্ট ওই সময়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ সভাপতি এম এ হাশেম রাজুর নেতৃত্বে গুলি চালিয়ে নির্বাচনী কেন্দ্র দখলে যুক্ত ছিলেন আজকের আওয়ামী লীগ প্রার্থী নুরুল আলম। ওই ঘটনায় তৎকালীন চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সফিউল আজম চোখ হারান। নির্বাচনের দিন পিস্তলসহ গ্রেফতার হন ছাত্রদল নেতা পারভেজ।

জানা যায়, আপাদমস্তক বিএনপি পরিবারের সন্তান নুরুল আলম ২০০৮ সালের দিকে আমেরিকা থেকে ফিরে রাতারাতি দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি পদে আসীন হন। শুরুতে এম এ মান্নান পরবর্তীতে কখনো এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, কখনো নুরুল ইসলাম বি.এসসি কখনো বা আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলতে দেখা যায় তাকে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাই ইয়াছিন চৌধুরী আছুর ‘বি টিম’ হিসেবে কাজ করতেই আওয়ামী লীগে এসেছেন নুরুল আলম। ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যুবলীগ নেতা হিসেবে নির্বাচন করলেও মূলত ভাইয়ের ডামি প্রার্থী ছিলেন তিনি। এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে এলেও বিএনপি প্রার্থী ভাইয়ের জয়লাভই তার লক্ষ্য। আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চেপে মূলত বিএনপি প্রার্থী ভাইয়ের জয়ের পথ নির্বিঘ্ন ও নিরঙ্কুশ রাখতে নুরুল আলম মনোনয়ন ভাগিয়ে আনে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মো. নুরুল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি হঠাৎ যুবলীগে আসিনি। ছাত্রজীবনে সিটি কলেজ ও এমইএস কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছি। বিএনপি প্রার্থী ভাইয়ের বি টিম কিংবা ডামি প্রার্থীর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। জায়গাজমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তার সঙ্গে আমার বিরোধ। এর জের ধরে আমার ভাই আছু আমার অফিস পর্যন্ত ভাঙচুর করে। কাজেই তার বি টিম কিংবা ডামি প্রার্থী হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

নুরুল আনোয়ার চৌধুরী বাহার তার বেয়াই বটে, কিন্তু মনোনয়ন প্রাপ্তিতে তার বা মোশাররফ হোসেনের কোনো হাত ছিল না দাবি করে নুরুল আলম বলেন, আমি ক্লিন ইমেজের মানুষ। আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তাছাড়া গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রিপোর্ট ছিল আমার পক্ষে। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। গত দুই নির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পেয়ে অর্থাৎ পাঁচ প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে ৫ম হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী মান্নান-আজিজ এবং বিএনপি প্রার্থী যে যেভাবে পেরেছে কেন্দ্র দখল করে নিয়েছিল। আমি তো কোনো ঝামেলায় নেই, জোর জবরদস্তিতে নেই। কেন্দ্র দখল করতে পারিনি তাই ভোট কম পেয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিক আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, নুরুল আলম প্রকাশ মিয়া কখনো ছাত্রলীগ করেনি। তার পুরো পরিবার বিএনপি। সে ছয়মাস দেশে থাকলে ছয়মাস থাকে আমেরিকায়। মহানগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি, সাবেক মন্ত্রী এম এ মান্নানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, আস্থাভাজন প্রয়াত হাজী মনির নুরুল আলম মিয়ার শ্বশুর। শ্বশুরের পীড়াপীড়িতেই মূলত এম এ মান্নানের অনুরোধে আমরা তাকে সরাসরি যুবলীগের সভাপতি পদে বসাই। ভাই ইয়াছিন চৌধুরী আছুর সাথে তার সুসম্পর্ক আছে এবং একঘরেই তারা বসবাস করেন বলে জানান এই প্রবীণ নেতা।

এমন একজন মানুষের হাতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন উঠায় ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ নেতা সিদ্দিক আলম বলেন, আওয়ামী লীগ এত নিচে নামবে আমাদের ধারণাতেও ছিল না। বঙ্গবন্ধুর গড়া আওয়ামী লীগের এমন দুরবস্থা দেখার জন্যই হয়তো এখনো বেঁচে আছি। মরে গেলেই বরং বেঁচে যেতাম। বলেন সিদ্দিক আলম।

১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডের বাসিন্দা প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা মো. সাজ্জাত হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া এখন সবচেয়ে সহজ বিষয়। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে যত্রযত্র, যাক-তাকে মনোনয়ন দিয়ে বিতর্ক যেমন তৈরি হচ্ছে তেমনি সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের যে একটা উৎসব, সেটিই রঙ হারাচ্ছে। উৎসব-উদ্দীপনা বজায় রাখতে সকল স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রথা তুলে দিয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।