শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

বঙ্গবন্ধুর কবরের প্রথম এপিটাফ খোরশেদ আলম সুজনের

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, মার্চ ১৩, ২০২০, ৯:২৭ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : ‘তোমার রক্তে রঞ্জিত শস্যশ্যামল এই বাংলায়, ভূলিতে পারিনি, ভুলিনি তো আমরা’। – ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর এই এপিটাফটি লিখেছিলেন চট্টগ্রামের তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা খোরশেদ আলম সুজন। ১৪শ’ টাকা খরচ করে চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জের ‘পাথর বিতান’ থেকে এটি খুদাই করে রাখেন তিনি। তার সেটিই বঙ্গবন্ধুর কবরের প্রথম এপিটাফ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বুধবার (১১ মার্চ) একুশে পত্রিকার সাথে এক আলোচনায় এই তথ্য তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও জনদুর্ভোগ লাঘবের সংগঠন নাগরিক উদ্যোগের উপদেষ্টা খোরশেদ আলম সুজন।

তিনি বলেন, কেবল ওই এপিটাফই নয়, বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে অসংখ্য স্লোগান বানিয়েছিলাম, যা পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক দামামা, মিছিল-মিটিংয়ে ব্যবহৃত হয়েছে।

খোরশেদ আলম সুজন বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা পরবর্তী সময়ে সামরিক জান্তার নিপীড়ন ও হত্যা নিয়ে সাহিত্যে প্রথম প্রতিবাদ আবুল ফজলের ছোটগল্প ‘মৃতের আত্মহত্যা’। তুমুল জনপ্রিয় সাহিত্য পত্রিকা সমকাল ছিল তখন লেখক-সাংবাদিক সৃষ্টির পাঠশালা, আতুরঘর। ‘মৃতের আত্মহত্যা’ গল্পটি ছাপার অপরাধে তৎকালীন সরকার সমকাল পত্রিকা নিষিদ্ধ করে দেয়।

শিক্ষাবিদ আবুল ফজল বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে গল্প লিখেছেন এটা আজকের অনেকে জানেন না উল্লেখ করে সুজন বলেন, ‘সেদিন আমিই সেই গল্পটি  ‘শব্দ হবে গোলাপ’ নামক কবিতা পত্রিকায় ছাপিয়ে ১০ হাজার কপি বিলি করি ঘরে ঘরে। দেশে তখন মিলিটারি জান্তার ভয়াবহ নিপীড়নমূলক অপশাসন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত কারফিউ দেয়া হচ্ছে। প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ। জনমনে আতংক। বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেল হত্যার ঘটনা মানুষকে বিমূঢ় ও স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এক কথায় সামরিক কর্তাদের বুট এবং ব্যাটনের নিচে তখন সংবিধান, সকল মানবিক বোধ, মুক্তিযুদ্ধ সব।’

আজকের নবীন প্রজন্ম ভাবতে পারবে না কতটা অন্ধকার নেমে এসেছিল সেদিন। ঝুঁকিপূর্ণ ঐ সময়ে ছাপানো হয়েছিল শিক্ষাবিদ আবুল ফজলের দুঃসাহসিক ছোট গল্প ‘মৃতের আত্মহত্যা’। আর সেটি ছাপার অপরাধে সমকাল নিষিদ্ধ হওয়ার পর নতুন করে ছাপিয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটি পালন করেছিলাম আমি। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধের নেশায় বুঁদ হয়ে এধরনের অনেককিছুই করেছি তরুণ বয়সে। প্রতিবাদি আন্দোলনের সেই পরম্পরা বজায় রেখেছি সকল রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলনে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি, মৃত্যু উপত্যকা থেকে ফিরে আসি বারবার। বন্দর অবরোধ করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। কনভেনশনাল আর্মির মতো যুদ্ধ করতে হয়েছে সেখানে। – বলেন খোরশেদ আলম সুজন।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতা শুনিয়ে সুজন বলেন,  ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর নুর হোসেন যখন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়, তখন আমি তার থেকে মাত্র ১ হাত দূরে। সেদিন আমিও মরতে পারতাম। মারা গেলে হয়তো আমাকেও মাদকাসক্ত বানাতো। নূর হোসেনের নির্মম মৃত্যুর পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকর্মীদের আহ্বান জানিয়েছিলাম, কাল সূর্য উঠার পর থেকে স্বৈরাচারের প্রেতাত্মাদের যেখানেই দেখা যাবে সেখানেই যেন আক্রমণ শুরু করা হয়।

সুজন বলেন, মেয়র পদে মনোনয়ন-বঞ্চিত হবার পর সেদিন গণভবনের বাইরে টিভি সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে অজান্তে চোখের জল চলে এসেছিল। এই জল দেখে শহীদ নূর হোসেনের ভাই বললেন, আপনি এভাবে কেঁদে দিলেন টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে।  বললাম,  ‘যখন তোমার কে্উ ছিল না তখন ছিলাম আমি, এখন তোমার সব হয়েছে পর হলাম আমি’- এরপর তিনি ভাবলেশহীন।

পর হলেন কেন, অপরাধ কী?- একুশে পত্রিকার এই প্রশ্নে খোরশেদ আলম সুজনের সাফ জবাব – আমি বেশি খাই না, এটা আমার অপরাধ। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহর নিয়ে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। এটি চট্টগ্রাম মহানগরকে নেতৃত্বহীন করার ষড়যন্ত্র। আগামিতে একদিন চট্টগ্রাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম স্থানে পরিণত হবে।

একথা বলেই পুরোনো স্মৃতি হাতড়ান সুজন। বলেন, যখন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম তখন আমি আর বিবিসির তৎকালীন সাংবাদিক আব্দুস সামাদ পাশাপাশি বাসায় থাকতাম নয়াপল্টনে। রমনায় ভোরে একসাথে হাঁটাহাঁটি করতাম। তিনি বলতেন, তোমরা কখনো আমাদের সাথে থাকবে না। সবাই ঐতিহ্যে ফিরে যাবে। তোমাদের ঐতিহ্য হলো আরাকান।

খোরশেদ আলম সুজন বলেন, ঢাকার অনেকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতো নেতৃত্বের জন্ম হলে তারা যে কোনো সময় চট্টগ্রাম থেকে কর্তৃত্ব হারাবে। চট্টগ্রামেরও অনেক বড় বড় নেতার স্বপ্ন-খায়েস, আমৃত্যু তারা এই শহরে চড়ি ঘোরাবেন। অতীতে তারা কখনো জহুর আহমদ চৌধুরীর জন্য পারেননি, কখনো সিরাজ মিয়ার জন্য পারেননি, কখনো এম এ মান্নান বা মহিউদ্দিন চৌধুরীর জন্য পারেননি।

তারাই একটি সুযোগ খুঁজছেন বার বার। তারা মহিউদ্দিন চৌধুরীকে চিৎ করে ফেলে দেবার বহু চেষ্টা করেছেন। সেই চেষ্টায় তারা আ জ ম নাছিরকে আনলেন। যারা নাছিরকে আনলেন তারাই আবার তাকে চিৎ করে ফেলে আরেকজনকে আনলেন। তারা শুধু খুঁজছেন ‘আন্ডার দ্যা লিডারশিপ’। যার উপর নুন-মরিচ রেখে খাওয়া যাবে।