রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬

বেয়াইকে সমর্থন পাইয়ে দেবার পর এবার জেতানোর দায়িত্ব নিলেন বাহার!

প্রকাশিতঃ সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২০, ৫:১৫ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বেয়াই নুরুল আলমকে ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে শাসকদল আওয়ামী লীগের সমর্থন পাইয়ে দিয়েছিলেন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক নুরুল আনোয়ার চৌধুরী বাহার।

বাহারের বাড়ি মিরসরাই, শহরের আবাস জামালখানে। এরপরও তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে নির্বাচনকালীন দলীয় মনিটরিংয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত আপন বেয়াই নুরুল আলমের নির্বাচনী এলাকা ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডে।

অভিযোগ ওঠেছে, ম্যাকানিজম করে বেয়াইয়ের বিজয় নিশ্চিত করতেই তিনি এই ওয়ার্ড থেকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ফারুক ১৯ নম্বর ওয়ার্ড দেখভালের দায়িত্ব নুরুল আনোয়ার বাহারকে দেওয়ার কথা স্বীকার করে একুশে পত্রিকাকে বলেছেন, বেয়াইকে জেতানোর মানসিকতা থেকে দায়িত্ব নিলেও হয়তো তিনি নিতে পারেন। তবে শফিকুল ইসলামের দাবি, এই ওয়ার্ডের মূল দায়িত্বে থাকবেন তিনি নিজেই। নুরুল আনোয়ার চৌধুরী বাহার তার সাথে সমন্বিতভাবে মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকবেন।

কীভাবে, কারা এই দায়িত্ব বণ্টন করেছেন জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম ফারুক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যে যেখানে দায়িত্ব পালন করতে ইচ্ছা পোষণ করেছেন তাকে সেখানেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবস্থানরত মহানগর, থানা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতারাও নির্বাচন মনিটরিং কমিটিতে থাকবেন। আর দায়িত্ব বণ্টনের কাজটি নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের জ্ঞাতসারে হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের মোবাইল ফোনে একাধিবার কল করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বার বার রিং হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে নুরুল আনোয়ার চৌধুরী বাহার ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডে নির্বাচনকালীন মনিটরিংয়ের দায়িত্ব চাননি দাবি করে একুশে পত্রিকাকে বলেন, জামালখান ওয়ার্ডে আমার পরিবারের ১শ’ বছরের বসবাস। এখানকার সবার সাথে আমার সম্পর্ক, চেনা-জানা। অন্তত ১০ জন মানুষ এখানে আমার কথা শুনবে। দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডে আমাকে কেউ চিনে না। সেখানে আমার কথা কে শুনবে। তাই আমি আতা ভাইকে (উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক)  বলেছি ১৯ নম্বরে নয়, আমাকে ২১ নম্বর জামালখান ওয়ার্ডেই দায়িত্ব দিন।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং গেল দুই কাউন্সিলর নির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল মান্নান বলেন, বেয়াই নুরুল আলমকে জেতানো নয়, নুরুল আলমকে সাথে নিয়ে তার ভাই বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ইয়াছিন চৌধুরী আছুকে জেতানোর জন্য নির্বাচনকালীন মনিটরিং কমিটির দায়িত্ব নিয়েছেন নুরুল আলম চৌধুরী বাহার।

তিনি বলেন, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে, জঘন্য পন্থায় বিএনপি প্রার্থী ভাইকে জেতাতে কাজ করছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী নুরুল আলম। তার সাথে যোগ দিয়েছেন নুরুল আনোয়ার বাহারসহ সমস্ত আত্মীযস্বজন। আমার সাথে আওয়ামী লীগের স্থানীয় যেসব নেতা কাজ করছেন তাদেরকে বিএনপি প্রার্থী আছু হুমকি দিচ্ছেন, বলছেন বিদ্রোহী প্রার্থীর সাথে আপনাদের কী সম্পর্ক। আওয়ামী লীগ নেতারা আমার সাথে থাকলে আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়া নুরুল আলমেরই অসুবিধা হওয়ার কথা, ইয়াছিন চৌধুরী আছুর নয়। এ থেকেই বোঝা যায়, আওয়ামী লীগের সমর্থন বাগিয়ে আনা নুরুল আলম তার সহযোগী, আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে মুলত তার ভাই বিএনপির আছুকে জেতাতে কাজ করছেন।

তবে বিষয়টি অস্বীকার করে নুরুল আনোয়ার চৌধুরী বাহার বলেন, আওয়ামী লীগের হয়ে বিএনপি প্রার্থী ভাইকে জেতানোর অভিযোগ সত্য নয়। এধরনের আঁতাত বা যোগসূত্রের কোনো প্রমাণ পেলে যতই আমার আত্মীয় হোক, কোটি টাকার বিষয় হলেও আমি আর নেই। দীর্ঘদিনের সুনাম, ভাবমূর্তি আত্মীয়তার কারণে আমি হারাতে চাই না। মূলত বিএনপির হাত থেকে এই ওয়ার্ডটি রক্ষার জন্যই নুরুল আলমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যে সবাই কাজ করছে বলে জানান নুরুল আনোয়ার বাহার।

এর আগে অভিযোগ ওঠেছিল, গত দুই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী ইয়াছিন চৌধুরী আছুর ডামি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে দুইবারই যথাক্রমে ২শ’ ও ৮শ’ ভোট পেয়ে ৫ প্রার্থীর মধ্যে ৫ম হন নুরুল আলম। আর সেই দুইবারসহ পর পর তিনবার কমিশনার হন তার আপন ভ্রাতা বিএনপি নেতা ইয়াছিন চৌধুরী আছু। এই পরিস্থিতিতে ৬ মাস দেশে, ৬ মাস আমেরিকায় অবস্থান করা নুরুল আলমকে এবার আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে দেন তার আপন বেয়াই চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল আনোয়ার চৌধুরী বাহার।  অপরপক্ষে একই ওয়ার্ড থেকে বিএনপির মনোনয়ন পান তার আপন ভাই বর্তমান কাউন্সিলর ইয়াছিন চৌধুরী আছু।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারররফ হোসেন শুরু থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পান এবং পরবর্তীতে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান মনোনীত হন। প্রধান সমন্বয়কারী হওয়ায় কাউন্সিলর নির্বাচনে দলীয় সমর্থন দেওয়া-নেওয়ার দায়িত্বটি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ পুরোদমে ছেড়ে দেয় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের উপর। সে হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় কাউন্সিলর মনোনয়নে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ইচ্ছাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়েছে।

নুরুল আনোয়ার চৌধুরী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে রাজনীতির মাঠে পরিচিত। রাজনীতিতে সক্রিয় না থেকেও কেবল মোশাররফ হোসেনের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় উত্তর জেলা আওয়ামী লীগে গত তিন কমিটিতে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন বাহার। সর্বশেষ উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে বাহারের নাম দিয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের সূত্র ধরেই নুরুল আনোয়ার চৌধুরী বাহার ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মাধ্যমে বেয়াই নুরুল আলমকে দলের সমর্থন পাইয়ে দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

প্রসঙ্গত, আমেরিকায় বসবাসরত নুরুল আলমের মেয়ের সাথে বাহারের আমেরিকা প্রবাসী ছেলের বিয়ে হয় দুইবছর আগে। সেই আত্মীয়তার সূত্রে তারা পরস্পরের বেয়াই।