মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০, ১৭ চৈত্র ১৪২৬

নির্বাচনের আগেই শাহাদাতের কাছে হারলেন রেজাউল‍!

প্রকাশিতঃ শনিবার, মার্চ ২১, ২০২০, ২:৪৭ অপরাহ্ণ

 

চট্টগ্রাম : নিরো ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের পঞ্চম সম্রাট। জুলিও-ক্লডিয়ান রাজতন্ত্রের সর্বশেষ এই সম্রাট রোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে অজনপ্রিয় সম্রাট ছিলেন। হত্যা, রক্তপাত তার প্রিয় বিষয়বস্তু। অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা সম্রাট নিরো।

এমনকি ক্ষমতার জন্য নিজের মাকেও হত্যা করেন তিনি। বিষ খাইয়ে মেরেছেন সৎভাই ব্রিটানিকাসকে। প্রচলিত আছে – নিরো তার প্রথম স্ত্রী অকটাভিয়াকেও হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় স্ত্রী পপ্পেয়াকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় লাথি মেরে হত্যা করেন।

রোমের যে অগ্নিকাণ্ডের কথা বলা হয়, সেটি ঘটেছিল ১৯ জুলাই, ৬৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে। এটি ছিল রোমের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ অগ্নিকাণ্ড। ছয় দিন ধরে আগুনের শিখা জ্বলতে থাকে। রোমের ১৪ জেলার ১০টিই আগুনে পুড়ে যায়।

রোমবাসীর ধারণা, এই অগ্নিকাণ্ড সম্রাট নিরো নিজেই ঘটিয়েছিলেন। কারণ ধ্বংসস্তূপের জায়গায় তিনি তার অবিস্মরণীয় স্থাপত্যকর্ম ‘ডোমাস অরিয়া’ বা স্বর্ণগৃহ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন।

উপরন্তু ইতিহাস আছে, রোম যখন আগুনে পুড়ছিল, নিরো তখন তার প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিথারা বাজাচ্ছিলেন। আর এটি নিয়ে তৈরি হয় প্রবাদবাক্য – রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল।

নিরোকে নিয়ে তৈরি সেই প্রবাদ বাক্য আজ প্রয়োগ করা হচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর উপর।

যদিও অত্যাচারী, অজনপ্রিয় রোমান সম্রাট নিরোর সঙ্গে তুলনা করার মতো কোনো ঘটনাই ঘটাননি রেজাউল। কাজ করলেই জনপ্রিয়-অজনপ্রিয়তার প্রশ্ন আসে। সেই সুযোগও তিনি এখনো পাননি।

এরপরও রেজাউলকে গত দুদিন ধরে নিরোর প্রবাদবাক্যের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, করোনা আতঙ্কের আগুনে নগরবাসী যখন পুড়ছিল, রেজাউল তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। আর বাঁশি হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে, রেজাউলের সেই স্লোগান – ‘সাবান দিয়ে হাত ধুবেন, নৌকা মার্কায় ভোট দিবেন।’

বিশ্বব্যাপী সংক্রমিত করোনা আতঙ্কে চট্টগ্রামের মানুষ যখন তটস্থ, দিগবিদিক ছুটছেন, চাইছেন এতটুকুন আশা- তখনই গণসংযোগ, গণজমায়েতের নিষেধাজ্ঞা ছাপিয়ে শুক্রবার বিকেলে গণসংযোগ, পথসভা করে রেজাউল করিম বললেন – করোনা নিয়ে যখন এত আতঙ্ক তখন একটা স্লোগান দিই- ‌’সাবান দিয়ে হাত ধুবেন, নৌকা মার্কায় ভোটটা দিবেন।’

গত কদিন ধরে করোনা আতঙ্কে নগরবাসী কতটা নির্বাচনবিমুখ হয়ে ওঠেছেন, তা তাদের নির্বাচন বন্ধের নানান আকুতিভরা দাবি থেকেই প্রতীয়মান। আর সেই আকুতি অনেকটা পদদলিত করে করোনা ঝুঁকি বাড়িয়েই নির্বাচনী প্রচারণা, গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন রেজাউল।

বরং আরো বেশি বেগবান হয়ে, জনদাবি-আতঙ্ককে একপ্রকার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার জনসংযোগ করলেন তিনি। একধাপ এগিয়ে গিয়ে রচনা করলেন সেই খেলু, হাস্যকর স্লোগান। আর সেই স্লোগানটি এখন সারাদেশে ভাইরাল। নানাজন নানাভাবে ট্রল করছেন রেজাউলের সেই ভিডিও স্লোগানটি নিয়ে। অনেকেই অনেকভাবে সেই ভিডিওটি আপ দিয়ে রেজাউল করিমকে অন্ধ, বধির এবং ক্ষমতালোভী, উম্মাদ, পাগল বলে আখ্যা দিতেও দ্বিধা করছেন না।

দেশি ফানি ডিডিও নামক একটি পেইজে ট্রল করা সেই ভিডিওটি শনিবার দুপুর পর্যন্ত দেখেছেন ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ। শেয়ার হয়েছে প্রায় ৬ হাজার এবং কমেন্ট পড়েছে ৫ শতাধিক। এটিকে নগরবাসীর জীবনের সাথে তামাশা উল্লেখ করে অনেকে ভিডিওটিতে কমেন্ট করেছেন, এতবড় দুর্যোগেও যিনি নগরবাসীর মনের অবস্থা, পালস্ বোঝেন না, তিনি কী করে মেয়র হবেন, মেয়র হয়েই বা কী করবেন?

অবুঝ, আনকোড়া ওই একটি মাত্র স্লোগান দিয়ে গ্রহণযোগ্য, ভদ্র, সজ্জন, নির্মোহ-নির্লোভ বিশেষণের জায়গা থেকে রাতারাতি ছিটকে পড়েন রেজাউল করিম চৌধুরী। হয়ে পড়েন মানুষের হাসির খোরাক, তামাশার পাত্র।

অন্যদিকে, বিএনপি মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন অত্যন্ত সুকৌশলে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নগরবাসীকে হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি গত দুদিন গণসংযোগ পরিহার করে রাস্তায় হেঁটে হেঁটে পথচারীদের মাস্ক বিতরণ করেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আচমকা একুশে পত্রিকা কার্যালয়ে হাজির হয়ে বললেন, করোনা-আতঙ্ক নিয়ে কিছু বলতে চান তিনি।

অতপর ভিভিও বার্তায় অংশ নিয়ে জানালেন, নগরবাসীর ভালো থাকা, সুস্থ থাকা তার ভালো থাকা। সর্বোপরি নিজের জীবনের চেয়ে নগরবাসীর জীবন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ দাবি করে বললেন, আপনাদের জীবনের চেয়ে আমার রাজনীতি, আমার মেয়র হওয়া কিংবা ক্ষমতায় যাওয়া কোনোভাবেই বড় হতে পারে না। বৈশ্বিক এই দুর্যোগে যে কোনো পরিস্থিতিতে নগরবাসীর পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন ডা. শাহাদাত।

শুধু তাই নয়, গতকাল (শুক্রবার) মাস্ক বিতরণ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে বললেন, নগরবাসীর স্বাস্থ্য বিবেচনায় প্রয়োজনে নির্বাচন বর্জন করতেও রাজি আছেন তিনি।

বলাবাহুল্য উদ্ভুত পরিস্থিতিতে শাহাদাতের এই অবস্থান, ভিডিও বার্তা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন নগরবাসী। শুধু একুশে পত্রিকার পেইজেই ভিডিও বার্তাটি শনিবার দুপুর পর্যন্ত দেখেছেন ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। শত শত কমেন্টে অজস্র, অগণন প্রশংসার সাগরে ভাসছেন ডা. শাহাদাত।

এই অবস্থায় রাজনৈতিক বোদ্ধা এবং কৌতূহলীরা বলছেন, নির্বাচনের আগেই ডা. শাহাদাতের কৌশল আর প্রত্যুৎপন্নমতিতার কাছে চরমভাবে হারলেন গোবেছারা রাজনীতিক রেজাউল। যদিও আপাতত নির্বাচনে হারা বা জেতার সুযোগ নেই। শনিবার দুপুরে করোনা পরিস্থতি এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের উপর্যুপরি দাবির মুখে সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণা দিলো নির্বাচন কমিশন।