শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭

দীর্ঘমেয়াদি দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে স্বল্পমেয়াদি আত্মত্যাগ করুন

প্রকাশিতঃ বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২০, ২:২৫ অপরাহ্ণ

জিয়া উদ্দিন মাহমুদ : করোনা পরিস্থিতিতে এই মুহূর্তে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ জনগণের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা।করোনা ভাইরাসে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ আক্রান্ত। মাত্র তিন মাসে এই ভাইরাস মারণাস্ত্রের মত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে পুরো বিশ্বকে আজ মুত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। বিশ্বের সকল ক্ষমতাধর দেশও আজ এই ভাইরাসে টালমাটাল।

ভেঙে পড়েছে পুরো বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে আক্রান্ত আর মূত্যুর সংখ্যা। বেকার হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। বন্ধ হচ্ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। গৃহহীন হচ্ছে অনেক মানুষ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। যদিও সরকারি হিসাব অনুযায়ী আমাদের দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দুটোই আমাদের মোট জনসংখ্যার তুলনায় এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের জনসংখ্যা এবং ঘনবসতিই আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ।

তাই সরকার বিগত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন এবং সকল ধরনের গণপরিবহন চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ওষুধের দোকান ব্যতিত সকল ধরনের দোকান,
মার্কেট বন্ধ ঘোষণা করেছে। যা মূলত লকডাউনের নামান্তর। আর সরকারের এই সকল কর্মকাণ্ডের একটাই উদ্দেশ্য – মানুষের চলাচলকে সীমিত করা। আর এই বিষয়টি যাতে প্রতিপালন হয় সেজন্য সেনাবাহিনীসহ অন্যন্য নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিযুক্ত আছে।

কিন্তু কতটা পালন হচ্ছে এই সামাজিক দূরত্ব? সামাজিক দূরত্বইবা কী? এর সাথে করোনা ভাইরাসে কী সম্পর্ক? এই সামাজিক দূরত্ব না মানলে কিইবা হবে?

সামাজিক দূরত্ব, কেউবা বলেন শারীরিক দূরত্ব, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি বা এই ধরনের কোনো উপসর্গ নেই, অর্থাৎ যে কোনো সুস্থ মানুষ তার পরিবারের অন্যান্য সুস্থ মানুষ ব্যতিত আপাতত অন্য কোনো মানুষের সংস্পর্শে না আসা এবং প্রয়োজনে আসতে হলেও তা কমপক্ষে দুই মিটার বা তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলতে হবে এবং সেই ক্ষেত্রে উভয়কেই মুখবন্ধনী বা মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মানে কিন্তু সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। করোনা ভাইরাস এমন একটি ভাইরাস যা কোনো আক্রান্ত ব্যাক্তির হাঁচি, কাশি, থুথু বা কফের মাধ্যমে পাশে থাকা অন্য কোনো সুস্থ ব্যক্তিতে সহজেই সংক্রমিত হয়। এছাড়াও আক্রান্ত ব্যক্তির স্পর্শে আসা যে কোনো বস্তুর মাধ্যমেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, করোনায় ভাইরাস কোনো ব্যক্তির দেহে সংক্রমিত হলে রোগের উপসর্গ আসতে অনেক ক্ষেত্রে ৫-৬ দিন লেগে যেতে পারে এবং রোগের উপসর্গ আসার আগেই তা অন্যের শরীরে সংক্রমিত হয়। তাই এর প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজন একে অন্যের থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলা। সেইসাথে একজনের ছোঁয়া যে কোনো জিনিষ অন্য কেউ না ছোঁয়া এবং ছুঁলেও তা অবশ্যই জীবানুনাশক দিয়ে জীবানুমুক্ত করে নেয়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মোতাবেক বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হাঁচি কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা। এই অদৃশ্য ভাইরাস এতই সংক্রমক যে কখন, কীভাবে একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে প্রবেশ করবে তার কোনো ঠিক নেই। এইজন্যই বিভিন্ন দেশে মানুষের চলাচলের উপর এত নিষেধাজ্ঞা।

কোনো কোনো দেশ কারফিউ জারি করেছে, একের অধিক লোক একসাথে চলাচল আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করেছে, সৌদিআরবের মত দেশ পবিত্র ওমরাহ পালন বন্ধ রেখেছে, জামায়াতে নামায পড়া এমনকি জুমার নামায পড়া বন্ধ রেখেছে, মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা তাদের প্রার্থনার মত ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ রেখেছে, ফিলিপাইনে ঘর থেকে মানুষ বেরুলেই গুলি করার নির্দেশ দিয়েছে। আমাদের দেশেও মসজিদে জামাতে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রেও একসাথে ৫ জনের বেশি (জুমার নামাজে একসাথে ১০ জন) না যাওয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। কিছু কিছু এলাকা ইতিমধ্যে লকডাউন ঘোষণা করেছে। এর একটাই কারণ, করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকানো। প্রতিদিনই বিভিন্ন গনমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সকলেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের করোনার ভয়াবহতার রূপ দেখে আসছেন।

বার করোনা নিয়ে আমাদের গুজবেরও কমতি নেই। এতকিছুর পরও মানুষ সচেতন হচ্ছে না। এখনো বিনা কারণে উৎসুক মানুষ ঘোরাঘুরি করছে, অলিগলিতে অযথা আড্ডা দিচ্ছে, জটলা বাধছে, বাজারে,
চায়ের দোকানে শুধু শুধু ঘোরাঘুরি করছে। এই অবস্থাই মানুষই হয়ে যাচ্ছে মানুষের শত্রু।

কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যে কোনো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে মানুষের স্বত:স্ফূর্তভাবে মানবীয় গুণাবলী নিয়ে আর্বিভূত হয়। অসহায়ের সহায়তা করতে যার যা সামর্থ্য আছে তা নিয়ে হাজির হয়। করোনার কারণে বাংলাদেশের লকডাউনের শুরু থেকেই মানুষের এই মানবিকতা প্রকাশ পাচ্ছে। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন, এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে হাজির হচ্ছে দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে।

সরকারও এসব সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য প্রতিদিন ত্রাণের ব্যবস্থা করছে যা আসলেই এই দুঃসময়ে প্রশংসার কাজ। দুর্দিনে মানুষই দাঁড়াবে মানুষের পাশে বন্ধু হয়ে। তবে যেহেতু এটি কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, অর্থাৎ বন্যা, ঝড় ইত্যাদি নয়, তাই এই ত্রাণ বিতরনেও যেন আমরা বন্ধু হতে গিয়ে শত্রু হয়ে না যাই। যারা ত্রাণ বিতরণ করবেন এবং যারা ত্রাণ নিবেন সকলেই যেন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ভুলে না যাই।

প্রয়োজনে ত্রাণ বিতরণে আমরা দক্ষ জনবল নিয়োগ করি অথবা এই কাজেযাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের সহায়তায় ত্রাণ বিতরণ করি।জরুরি প্রয়োজনে যেখানেই যাই না কেন, সামাজিক দূরত্ব অবশ্যই মেনে চলব। কারণ, এই মুহূর্তে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে নিজে নিরাপদ থাকা এবং অন্যকে নিরাপদ রাখা মানবিক গুণাবলীর চেয়ে কম নয়।

ত্রাণ দিয়ে যেমন মানুষের ক্ষুধা নিবারণের জন্য মানবিকতা দেখানো যায়, তেমনি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেও মানুষের জীবন রক্ষার করার মত আরো বড় মানবিকতার দেখানো সম্ভব। করোনা ভাইরাস আনবিক বোমার চেয়ে ভয়ানক এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুেদ্ধর পর বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ হল এই করোনা ভাইরাস। আমরা কখনোই চাই না এই ভয়াবহতা আমাদের মাঝে আসুক। আমরা দেশের যে কোনো দুর্যোগে এক হয়ে কাজ করেছি, দলমত নির্বিশেষে একাকার হয়ে সকল সমস্যার সমাধান করেছি। তেমনি এই করোনা ভাইরাস ঠেকাতে আমরা সবাই এক হয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলব।

আমরা চাইনা বাংলাদেশে আরেকটা চীন, ইতালির কিংবা আমেরিকার মত মৃত্যুপুরী হোক। সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখার মত যে ভুলের খেসারত তারা দিচ্ছে সেই খেসারত আমরা দিতে চাই না। প্রয়োজনে সরকার যদি এই সংক্রান্ত কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাতেও আশা করি জনগণের সমর্থন থাকবে। কারণ, কোনো দীর্ঘমেয়াদী দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে আমরা স্বল্পমেয়াদী যে কোনো আত্মত্যাগে প্রস্তুত আছি। তাই আসুন ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিজের পরিবার ও দেশকে সুস্থ রাখুন।

জিয়া উদ্দিন মাহমুদ : ব্যাংকার ও লেখক