শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

এমপি কমলের বিরোধিতা-স্থানীয়দের হুমকি, করোনা রোগীর শ্বাসরুদ্ধকর গল্প

| প্রকাশিতঃ ১৯ এপ্রিল ২০২০ | ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

চট্টগ্রাম : বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুনধুম দক্ষিণ পাড়ার ৬৯ বছর বয়সী ব্যক্তিটির করোনা-পজিটিভি ধরা পড়ে বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল)। কক্সবাজার ল্যাবের পরীক্ষায় করোনা-শনাক্ত একমাত্র ব্যক্তিটিকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে আইসোলেশনে রাখতে হলে পাড়ি দিতে হবে অন্তত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ কর্দমাক্ত পথ।

এদিকে, কক্সবাজার-বান্দরবান বেল্টে প্রথম করোনা-রোগী শনাক্ত হওয়ার নড়েচড়ে বসে বান্দরন প্রশাসন। সেদিন বিকেলেই বান্দরবান সিভিল সার্জন, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রশাসন মিলে করোনা-আক্রান্ত ব্যক্তির বাড়িসহ আশপাশের কয়েকটি বাড়ি লকডাউন করে আক্রান্তকে তার বাড়িতেই আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এরপর স্থানীয় প্রশাসনের কাছে খবর আসে, নারায়ণগঞ্জের তাবলিগ-ফেরৎ করোনা-আসক্ত লোকটি বেশ নড়াচড়া করেন। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও পাহারা ছাড়া তাকে একজায়গায় আটকে রাখা কঠিন। তাই যদি হয়, তাহলে আক্রান্ত লোকটি করোনা ছড়িয়ে দিতে পারে পুরো অঞলে।

সেই শঙ্কায় শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সকালে নাইক্ষ্যংছড়ি স্বাস্থ কমপ্লেক্স থেকে প্রশাসন ও স্বাস্থ্যবিভাগের লোকজনসহ অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয় আক্রান্ত ব্যক্তির বাড়িতে। নাইক্ষ্যংছড়ি সদর উপজেলা থেকে বান্দরবান সদরের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। মিয়ানমার সীমান্তের ঘুনধুম থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি সদর উপজেলা বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার। ঘুনধুম থেকে কক্সবাজারের রামু, উখিয়া হয়ে নিভৃত জনপদ পাড়ি দিয়ে পৌঁছতে হয় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদরে। সে হিসেবে উখিয়া ও রামুর দূরত্ব ঘুনধুম থেকে যথাক্রমে ৫০ এবং ৬০ কিলোমিটার। করোনা-আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য সরকার ইতোমধ্যেই কক্সবাজারের উখিয়া এবং রামুতে ৫০ শয্যা করে দুটি ডেডিকেটেড হাসপাতাল তৈরি করেছে।

ভৌগোলিক অবস্থান, দূরত্ব বিবেচনার পাশাপাশি প্রাণঘাতি ভাইরাসের রোগী নিয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার ঝক্কি-ঝুঁকি এড়ানো, সেইসাথে উন্নত চিকিৎসার জন্য রামু হাসপাতালে করোনা-আক্রান্ত ব্যক্তিকে রাখতে কক্সবাজারের সিভিল সার্জনের কাছে অনুরোধ করা হয় বান্দরবান সিভিল সার্জন থেকে। কক্সবাজারের সিভিল সার্জন এই অনুরোধ সাথে সাথেই নাকচ করে দেন। জানান, বান্দরবানের রোগী বান্দরবানেই থাকুক, বান্দরবানের দায় কক্সবাজার নেবে না।

ফলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অগত্যা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই (যেখানে ৫টি আইসোলেশন বেড ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে) নিয়ে আসতে সিদ্ধান্ত নেয় বান্দরবানের সংশ্লিষ্টরা। করোনা রোগী নিয়ে পথচলতে থাকা অ্যাম্বুলেন্সকে জানিয়ে দেওয়া হয় সেই সিদ্ধান্ত।

এরপর দেখা দেয় নতুন সঙ্কট। নাইক্ষ্যংছড়ি সদরের স্থানীয় লোকজন ঘোষণা দেয়, এখানে করোনা রোগী ঢুকতে দেওয়া হবে না। ঢোকার চেষ্টা করলে যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করা হবে। এ পরিস্থিতিতে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, বিভাগীয় কমিশনার, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ উর্ধ্বতন মহলে জানানো হয় বিষয়টি।

তাদের হস্তক্ষেপে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান ওই রোগীকে রাখতে রাজি হন। তিনি বান্দরবান সিভিল সার্জনকে ফোন করে বললেন, রামু ডেডিকেটেড হাসপাতালে রোগীটি পাঠিয়ে দিতে। পরিবর্তিত তথ্য, আপডেট যথারীতি জানিয়ে দেওয়া হয় করোনা রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সকে।

অ্যাম্বুলেন্সটি যখনই রামু হাসপাতালের কাছাকাছি পৌঁছে, তখন কক্সবাজার সিভিল সার্জন বান্দরবান সিভিল সার্জনকে ফোন করে ফের অপারগতা জানান। বলেন, আপনাদের রোগী আপনারাই রাখেন। আমাদের পক্ষে এই রোগি গ্রহণ করা সম্ভব নয়। বিষয়টি স্থানীয় এমপি সাইমুম সরওয়ার কমলও চান না বলে জানিয়ে দেন সিভিল সার্জন।

উপায় না দেখে চিকিৎসক-নার্স সঙ্কটে জর্জরিত, আধুনিক সুবিধাবিহীন নাইক্ষ্যংছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই রাখার সিদ্ধান্ত হলো। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, উর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপে শেষপর্যন্ত কোনো বাধা বা অঘটন ছাড়াই শুক্রবার রাত ৯টায় করোনা-রোগীটি প্রবেশ করে নাইক্ষ্যংছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। অবসান হয় করোনা রোগী নিয়ে টানা ১৪ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির।

বান্দরবান সিভিল সার্জন ডা. অংসুইপ্রু মারমা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ভৌগোলিক ও দূরত্বগত অবস্থান থেকে সর্বোপরি ভালো চিকিৎসার জন্য রামুর ডেটিকেটেড হাসপাতালে এই অঞ্চলের একমাত্র করোনা-পজিটিভ রোগীকে ভর্তি করাতে চেয়েছিলাম। প্রথমে রাজি না হলেও পরে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন রাজি হয়েছিলেন। সে অনুযায়ী আমরা প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি জানালেন, তাদের পক্ষে এই রোগী গ্রহণ করা সম্ভব নয়। উর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপে শেষপর্যন্ত শুক্রবার রাতে নাইক্ষ্যংছড়ি হাসপাতালে করোনা-পজিটিভ রোগীকে ভর্তি করি। তাকে আলাদা কক্ষে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। একটু আগেও রোগীর সাথে টেলিফোনে আমার কথা হয়েছে। তিনি ভালে আছেন। তার, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্টের উপসর্গ নেই। সীমিত জনবল দিয়ে আমরা তাকে সর্বোচ্চ সেবা, খাবার-দাবারের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করছি তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠবেন।’

কোনো উপসর্গ না থাকা সত্ত্বেও কেন ওই রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে জানতে চাইলে বান্দরবান সিভিল সার্জন জানান, করোনা-সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া নারায়ণগঞ্জ থেকে তাবলিগ জামাতের ওই লোক ফিরেছেন বলে স্থানীয়দের কাছে তথ্য পেয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে আমরাই নমুনা সংগ্রহ করে কক্সবাজারে পাঠাই। বৃহস্পতিবার শতাধিক নুমনা পরীক্ষায় নারায়ণগঞ্জ-ফেরৎ ব্যক্তিটিরই কেবল করোনা-পজিটিভ ধরা পড়ে। আর এটিই কক্সবাজার-বান্দরবান অঞ্চলে প্রথম করোনা রোগী।- বলেন সিভিল সার্জন অংসুইপ্রু মারমা।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শাহরিয়ার কবীরও জানান একই কথা। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, নাইক্ষ্যংছড়ির স্থানীয় জনগণ ও কক্সবাজারের এমপি সাহেবের গ্রহণ-অগ্রহণের ঠেলাঠেলিতে রোগীটাকে নিয়ে গতকাল (শুক্রবার) দিনভর বেশ বেকায়দায় ছিলাম আমরা। সার্বিক বিবেচনায় রামু ডেডিকেটেড হাসপাতালই ওই করোনা রোগীর জন্য উপযুক্ত। সেই অনুযায়ী তাকে রামুতেই ভর্তি করানোর চেষ্টা। এক পর্যায়ে কক্সবাজার সিভিল সার্জন জানালেন, স্থানীয় জনগণ এবং এমপি মহোদয়ের বাধার মুখে করোনা রোগীকে রামু হাসপাতালে গ্রহণ সম্ভব নয়। শেষপর্যন্ত রাত ৯টায় কঠোর পাহারায় নাইক্ষ্যংছড়ি হাসপাতালে ওই রোগীকে ভর্তি করা হয়।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ডেডিকেটেড হাসপাতাল বলা হলেও এখানে ভেন্টিলেশন, আইসিইউ কিংবা বিশেষ কোনো সুবিধা নে্ই। নাইক্ষ্যংছড়ির হাসপাতালের মতোই এই হাসপাতারের অবস্থা। তাছাড়া হাসপাতালটি করোনা-রোগীর চিকিৎসা-উপযোগী করে গড়ে তুলতে এখনো কিছু কাজ বাকি। এখনই করোনা-রোগী ভর্তি করে হাসপতালটিকে বেকায়দায় ফেলতে চাইনি। তবুও আমরা চেষ্টা করেছিলা, কিন্তু পারিনি।

স্থানীয় এমপি সাইমুম সরওয়ার কমলের নিষেধের কথা স্বীকার করে সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, এখানে রোগীটিকে আনার কথা শুনে স্থানীয় লোকজন ক্ষেপে গিয়েছিলেন, তারা ঘোষণা দিয়েছেন করোনা রোগী ঠেকানোর। মূলত এসব পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইচ্ছা থাকলেও এমপি মহোদয় বিষয়টিতে না করেছিলেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার -৩ (কক্সবাজার সদর-রামু) আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল একুশে পত্রিকাকে বলেন, কক্সবাজার জেলা হচ্ছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের ১২ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে, বিদেশিরা আছে। সেই কারণে নাইক্ষ্যংছড়ির রোগী, নাইক্ষ্যংছড়ি হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি।

এমপি বলেন, রোগীটার বাড়ি নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুনধুম। সেখান থেকে কক্সবাজারের চেয়ে নাইক্ষ্যংছড়িই কাছে। সেখানেও করোনা বেড আছে। নাইক্ষ্যংছড়ির রোগী নাইক্ষ্যংছড়িতেই থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। যদি উন্নত চিকিৎসা লাগে তখন হয়তো এখানে আসতে পারে। কিন্তু এখন তো দরকার নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমপি কমল সাহেবের অসহযোগিতার ফলে করোনা পজিটিভ মানুষটি সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হলেন। এমপি সদয় হলে রোগীটি উন্নত সেবা পেতে পারতেন- এমন বক্তব্যের পর এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, এটা আমাদের কৌশলগত বিষয়। উনি যে ইউনিয়নের মানুষ সে্ ইউনিয়নেই থাকবেন। নাইক্ষ্যংছড়ির মানুষই তাকে গ্রহণ করছে না, সেখানে আমি কী! এধরনের কথা হয়তো নাইক্ষ্যংছড়ির মানুষই বলতে পারেন, কক্সবাজারের কেউ বলবেন না। কেউ বলে থাকলে তাকে ডিউটি করতে বলেন।

তিনি বলেন, এখানে আমি মূল বিষয় না। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে, উনাকে (করোনা রোগী) তো হসপিটালাইজড করা হয়েছে। উনি নাইক্ষ্যংছড়ির মানুষ, নাইক্ষ্যংছড়িতে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। আমার রামুতে উন্নত চিকিৎসার কিছু নেই। আপনি এসে দেখে যান, বেড ছাড়া কিছুই নেই এখানে। নেই আইসিইউ, নেই ভেন্টিলেশন।

এসময় বিষয়টি আর না প্যাঁচাতে প্রতিবেদককে অনুরোধ করেন সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল।