শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

প্রিয়জনের সাথে কথা বলতে ‘বোবা’ হলেন ওরা!

| প্রকাশিতঃ ৩০ এপ্রিল ২০২০ | ৭:৪৭ অপরাহ্ন

আজাদ তালুকদার : শাহ আমানত (রহ.) এর মাজারের সামনে দিয়ে চলে যাওয়া জেলরোডের পাশ ধরে, ফুটপাথে প্রায় ২শ’ গজ এলাকাজুড়ে অসংখ্য ’বোবা’ মানুষের বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত অবস্থান। তাদের মুখে কোনো কথা নেই। সব কথা ইশারা-ইঙ্গিতে, হাত নাড়িয়ে।

আর এইসব ’বোবা কথামালা’ প্রিয়জনের সঙ্গে, স্বজনের সঙ্গে; যারা জেলখানায় বন্দি। সেই বন্দিদশা থেকে  জানালার ফাঁক গলে ইশারার জবাব দেওয়া হচ্ছে ইশারায়। এই ইশারায় কথোপকথন কিংবা স্বজনের সঙ্গে স্বজনের, প্রিয়জনের সঙ্গে প্রিয়জনের মিলনের দৃশ্যটি ওই পথ ধরে গেলে প্রায়ই দেখা যায়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে রোজাকে সামনে রেখে এভাবে বোবার মতো দেখাসাক্ষাতের প্রবণতা বেড়েছে।

রমযান মাসে বন্দি স্বজনের সঙ্গে দেখা করার জন্য এমনিতেই ব্যাকুল মন। সেই কারণে রমজান এলে জেল কর্তৃপক্ষ দেখাসাক্ষাতের বেলায় তুলনামূলক একটু উদারই হয়, স্বজনের রান্না করা খাবার-দাবার গ্রহণেও আপত্তি তোলে না তখন।

কিন্তু এবার রমযান এলেও পরিস্থিতি ভিন্ন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে জেল কর্তৃপক্ষ দেখাসাক্ষাতে করেছে কড়াকড়ি। তাই ইচ্ছা করলেও বন্দিদের সাথে স্বজনরা এখন আর দেখা করতে পারছেন না।

হোক কড়াকড়ি, তাতে কী! ব্যাকুল মন কি আর থেমে থাকে? থাকে না বলেই দেখাসাক্ষাতের বিকল্প ’বোবা’ পথেই হাঁটছেন বন্দিদের স্বজনেরা। যে কারণে গত কয়েকদিন ধরে ‘বোবা মানুষের’ পদভারে অন্যরকম এক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে চট্টগ্রাম জেল রোডে।

মঙ্গলবার  (২৮ এপ্রিল) দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা গেলো, কারাগারের সুউচ্চ দেয়ালঘেঁষা দক্ষিণমুখী পূর্ব-পশ্চিম দাঁড়িয়ে থাকা বহুতল ভবনটির ৩ তলা থেকে একেবারে উপরের তলার উত্তরমুখী প্রতিটি জানালায় তিন-চারজন করে বন্দি দাঁড়ানো। তাদের সাথে ‘আই কন্টাক্ট’ এবং ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলছেন জেলরোডে অবস্থান নেওয়া স্বজন-প্রিযজনেরা।

এপ্রান্ত থেকে চিৎকার করে কেউবা বলছেন, ‘ঘরের জন্য কোনো চিন্তা করো না, আমরা সবাই ভালো আছি। কোর্ট খুললেই তোমার জামিন হবে।’

এর মধ্যে অষ্টাদশী এক নারীকে দেখা গেলো ইশারায়ও বলছেন না কোনো কথা। বন্ধ একটি দোকানের সামনে ঠাঁই দাঁড়িয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আছেন জেলখানার ওই ভবনটির ৪ তলার জানালায়। কোথাও মনোযোগ নেই তার। মনে হচ্ছে হারিয়ে গেছেন ওই জানালায়। কাছে গিয়ে দুবার ডাকার পর সম্বিত ফিরে তার।

জিজ্ঞেস করতেই জানালেন স্বামীকে দেখতে আসার কথা। নাম তার পলি। চারদিন আগে পাহাড়তলী থানা পুলিশ  এক মামলায় তার স্বামী বিপ্লবকে ধরে আদালতে চালান দেয়। সেখানে থেকে তার ঠিকানা হয় এই কারাগার। সেই থেকে প্রতিদিন জেল রোডে চলে আসেন স্বামীকে দেখতে। এসময় সাথে থাকেন তার ভাই।

মাস তিনেক আগে বিয়ে হওয়া পলিকে জিজ্ঞেস করা হয়, কথা বলতে পারেন না, কাছে যেতে পারেন না- ঠাঁই দাঁড়িয়ে অপলক তাকিয়ে থেকে কী লাভ? পলি বলেন, জেলখানায় দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ। মন কাঁদলেও দেখা করতে পারি না। তাই গত দুদিন ধরে ১২ টার পর এখানে চলে আসি। আমি এখানে দাঁড়াই, ও (স্বামী) জানালায়। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে থাকি। তাতেই শান্তি পাই। ভালো লাগে।

নারী ও শিশু নির্য়াতন দমন (২০০৩ সংশোধনী) ৯ (১) এর মামলায় ১৪ দিন আগে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান চকবাজার এলাকার তরুণ ইমন। জেলরোডের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে তার সাথে ইশারায় কথা বলছিলেন মা হোসনে আরা ও খালা শামীম আরা।

শামীম আরা জানান, এক মেয়ের সাথে দেড় বছরের প্রেমের সম্পর্ক তার ভাগনে ইমনের। উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল কিছুদিন পর। মেয়েপক্ষের দাবি অনুযায়ী ২০ লাখ টাকা কাবিন দিতে রাজি না হওয়ায় দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। আর সেই বিরোধের জের ধরে মেয়ের করা নারী নির্য়াতন মামলায় গ্রেফতার হয়ে ভাগিনা এখন কারাগারে। আকস্মিক এই ঘটনায় সে খুব ভেঙে পড়েছে। তাই তাকে সান্ত্বনা দিতে এসেছি, ইশারায় বলছি আদালত খুললে ঈদের পর তার জামিন হবে।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেলসুপার মো. কামাল উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, করোনা-সতর্কতার অংশ হিসেবে আপদকালীন সময় পর্য়ন্ত সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বন্দিদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে। তবে সপ্তাহে প্রতিটি বন্দিকে অন্তত একবার ৫ মিনিট করে মোবাইল ফোনে স্বজনের সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করেছি।

বন্দিদের কাছে স্বজনরা যাতে টাকা পয়সা পৌঁছাতে পারে সেজন্য আমরা ’নগদ’ এবং ’বিকাশ’ ব্যবস্থা চালু করেছি। স্বজনরা নির্দিষ্ট নাম্বারে বিকাশ অথবা নগদ করে সংশ্লিষ্ট অপাটেরকে জানানোর পর ভেরিফাই করে সেই টাকা সংশ্লিষ্ট বন্দির কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।- বলেন জেলসুপার।