শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২০, ১৯ আষাঢ় ১৪২৭

টেলিভিশন ও কিছু সাদাকালো স্মৃতি

প্রকাশিতঃ সোমবার, মে ২৫, ২০২০, ১১:২২ অপরাহ্ণ

ফয়সুল আলম : সময়টা এখন করোনার। করোনা যে আমাদের পরিবার, সমাজ আর রাষ্ট্রাচারে অনেক অভ্যাস বদলে দিয়েছে এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। করোনার সংক্রমণরোধে সীমিত আকারে ব্যাংকিং, রোস্টারিং ডিউটি -এসব কারণে একজন ব্যাংকার হয়েও দিনের অনেকটা সময় ঘরেই থাকছি। বই পড়া, পরিবারের সাথে আড্ডা আর টিভি দেখেই বেশিরভাগ সময় পার করছি। টেলিভিশন নামক এই বোকা বাক্সটার সাথে জড়িয়ে আছে আমার শৈশব-কৈশোরের অনেক স্মৃতি।

টিভি দেখার প্রতি এই অদম্য ঝোঁকটা আমার সেই ছেলেবেলা থেকেই। আমাদের গ্রামে তখন কোন টিভি ছিল না। এমনও হতো শুধু টিভি দেখার জন্যই নানু বাড়িতে দিনের পর দিন পড়ে থাকতাম। পরে অবশ্য নানু বাড়িটাই আমার এক রকম স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হয়, যখন নানুবাড়ির পাশের একটা স্কুল “যোগেন্দ্র চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়” এ ভর্তি হই। আমার নানু বাড়ি মফস্বল শহর ভৈরবের ছাগাইয়া গ্রামে। আমার শৈশব-কৈশোরের অনেকটা সময় কাটে ওখানেই। নানুদের ঘরে কোনো টিভি ছিল না তখন। আসলে ঐ সময়ে গ্রামে হাতেগোনা দুএকটা টিভি পাওয়া দুষ্কর ছিল। উঁচু বাঁশের মাথায় অ্যান্টেনা দেখেই অনুমান করা যেত কার বাড়িতে টেলিভিশন আছে। সে সময়ে ছাগাইয়া গ্রামের মোল্লা বাড়ির দুটো ঘরে টিভি ছিল। একটা সুবর্ণাদের ঘরে, আর অন্যটা ছিল কবির মামার। দুটোই সাদাকালো। এনালগ। চ্যানেল পাল্টানোর জন্য কোনো রিমোট সিস্টেম ছিল না। সে সময়ে টিভির একটা কমন রোগ ছিল ‘ঝিরঝির’ করা; যা শুনতে অনেকটা মুষলধারে বৃষ্টির শব্দের মত।

বেশ লম্বাসম্বা একটা বাঁশের মাথায় লাগানো অ্যান্টেনাটা নেড়ে চেড়ে ঝিরঝির ঠিক করতে করতে হাত আর কাঁধ ব্যথা হয়ে যেত। অ্যান্টেনাটা সহজে ঘোরানোর সুবিধার্থে বাঁশের নিচের মাটির অংশ ফাঁকা রাখা হত। আর কেনো জানি প্রিয় কোনো অনুষ্ঠানের প্রিয় মুহূর্তে সেই ঝিরঝিরটা হঠাৎ করেই বেড়ে যেত। যদিও এতটা বিরক্তি লাগত না তখন।এত্ত ঝিরঝিরানি সত্ত্বেও কারো চোখ যেন এক মুহূর্তের জন্যও টিভি স্ক্রিন থেকে সরত না। দুএকজন পাক্কা লোক থাকতই যারা কিনা অ্যান্টেনা নাড়াতে ওস্তাদ।

আমার এক মামাত ভাই আলামিন এ ব্যাপারে খুব দক্ষ আর আগ্রহী ছিল। কবির মামার নিক্কন ব্র্যান্ডের টিভিটার চ্যানেল পাল্টানোর টিউনারটা ভাঙা ছিল বিধায় হাত দিয়ে ঘুরিয়ে চ্যানেল পালটানো এতটা সহজ ছিল না। আলামিন ভাই বুদ্ধি করে একটা পদ্ধতি বের করে ফেলল, আর তা হল টিউনারটা হাত প্লাস দিয়ে ধরে সহজেই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চ্যানেল পাল্টানো। যাই হোক, সেই সময় টিভির চ্যানেল বলতে বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) আর দুটো ভারতীয় চ্যানেল ন্যাশনাল আর মেট্রো।

রূপনগর, সংশপ্তক, কোথাও কেউ নেই,বহুব্রীহি,আজ রবিবার, চোর এরকম বহু ধারাবাহিক ও সাপ্তাহিক নাটকের কথা এখনও খুব মনে পড়ে। তৌকির-বিপাশার ‘শেষ পর্যন্ত তোমাকে চাই’ নাটকে তৌকির আহমেদের মৃত্যু খুব কষ্ট দিয়েছিল আমায়। বিশেষভাবে ‘অস্থির পাখিরা’ ধারাবাহিক নাটকে ঘুমের মধ্যে বখাটেরা কী  লোহমর্ষকভাবে মাহফুজ আহমদের দুচোখে আঘাত করে তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল, সেটা মনে হলে এখনও খুব ভয় লাগে। মাদকাসক্ত একদল বখাটে ছেলেরা মহল্লার পরিবেশটাকে বিষাক্ত করে তুলে। মাহফুজ মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েও এদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়।কী অসাধারণ অভিনয়ই না করেছিলেন তখনকার তরুণ অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ। বিটিভির নাটক আমাদের জীবনকে তখন এতটাই দখল করেছিল যে,পরদিন স্কুলে গিয়ে কোনো ধারাবাহিক নাটকের আগামী পর্বে কী ঘটবে তা নিয়ে সাগ্রহে বন্ধুদের মাঝেও খুব আলোচনা হত।

তখন বিনোদনধর্মী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান বলতে এক ও একচ্ছত্র হানিফ সংকেত ও তাঁর ‘ইত্যাদি’। পরবর্তীকালে ‘শুভেচ্ছা’র মতো আরও অনেক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান এলেও ‘ইত্যাদি’র মতো এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। ‘ইত্যাদি’র বিদেশভ্রমণ অংশটা আমার কাছে বেশি ভাল লাগত। দীর্ঘ রমজান শেষে কাজী নজরুলের “রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ” গান দিয়েই শুরু হত আমাদের ঈদ আনন্দ। তখনকার ঈদ আরও আনন্দময় হতো। কারণ ঈদ মানেই নতুন নতুন অনুষ্ঠান, ঈদ নাটক, নতুন ‘ইত্যাদি’। আমাদের শিশুকিশোরদের অনুষ্ঠান বলতে ছিল ‘নতুন কুড়ি’ আর ‘জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক’ অনুষ্ঠান। তবে  শিশুকিশোরদের অনুষ্ঠান হলেও আসলে তখনকার টিভি অনুষ্ঠানগুলো এমন ছিল যে পরিবারের সব বয়সের সকলে একসাথে বসে খুব মজা করে দেখত।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রচারিত নাটক ও সিনেমার মধ্যে জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটা আমার কাছে ভাষা আন্দোলনের এক কিংবদন্তি মনে হয়েছে। আর ষোল ডিসেম্বর বা ছাব্বিশে মার্চে হয়তো ‘কলমীলতা’,’অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’,’ওরা ১১ জন’সিনেমা গুলা আমার নিজ চোখে না দেখা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে ঠিক যেন আমার চোখের সামনে বাস্তবরূপে ফিরে দেখার মত।

সেই সময়ের দর্শকনন্দিত সিনেমা ‘বেদের মেয়ে জোসনা’,‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ এখনও বাংলার আলোড়ন সৃষ্টিকারী সিনেমার তালিকায় জায়গা দখল করে আছে। বাংলা ও হিন্দি সিনেমার সূত্রে আমাদের প্রিয় ও পরিচিত মুখ ছিল রাজ্জাক, শাবানা, ববিতা, আলমগীর, প্রবীর মিত্র, ফারুক, সালমান শাহ, মৌসুমী, শাবনূর, শাহরুখ, আমির-সালমান খান, অজয় দেবগন আরও অনেকে।

সিনেমার নায়করা আমাদের কাছে ছিল প্রায় দোষশূন্য। সিনেমাতে মারপিটের সময় আমরা সকলে মিলে নায়কের পক্ষ নিতাম। তাইতো ফাঁসির আসামী সালমান শাহের  কারাগারে ‘চিঠি এলো জেলখানাতে…’ গান দেখে ঘরভর্তি সবার চোখ যেন কান্নার ফোয়ারা। ছোটবেলায় আমাদের জন্য সিনেমা মানে ছিল ‘বই’। আর সিনেমায় গান শুরু হলে আমাদের প্রতি নির্দেশ আসতো আবার কাহিনী শুরু হলে দেখতে আসার। হয়তো তখন গানের রোমান্টিক দৃশ্য বাচ্চাদের চরিত্র নষ্টের ব্যাপারে প্রেরণা জোগাতে পারে বলে অভিভাবকদের বিশ্বাস ছিল। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় তৎকালীন সমাজে মানুষের মূল্যবোধ কত উচ্চ ছিল।

সে সময়ে প্রচারিত বিদেশি সিরিয়াল ‘রোবোকপ’ খুব প্রিয় ছিল আমার। ‘আলীবাবা চল্লিশ চোর’, ‘আলিফ লায়লা’, ‘সিন্দবাদ’ সিরিয়ালের জিন, পুরী, ভুত, পেত্নী আর রাক্ষসের কাহিনী মনে হলে এখনও ভয়ে গা শিউড়ে উঠে। আলীবাবার-কাশেম, মর্জিনা আর আলিফ লায়লার-মালিকা হামিরা, ডাকু কেহেরমান এইসব চরিত্র আমাদের মনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে বাস্তব জীবনে ও আমরা তখন অনেককে এসব নাম ধরে ডেকে ভেংচি কাটতে দেখতাম। ‘সিন্দবাদ’ এর জাহাজ আমাকে ডাঙার বাস্তবতা থেকে তাড়িয়ে নিয়ে যেত দূরের সমুদ্রে,তখন ভাবতাম বড় হয়ে বাবার মত নাবিক হব। আমার বাবা চাকরির সুবাদে জীবনের বেশিভাগ সময় নদী আর সমুদ্রেই কাটিয়েছেন।

‘আকবর দ্য গ্রেট’ এর সেই বিখ্যাত আবহবাণী ‘সূর্য ওঠে আবার অস্তমিত হয় ওই দিগন্তের পানে তবু ধরণীর বুকে তার চিহ্ন রেখে চলে’ এখনও মনে আছে আমার। তখন ভাবতাম আমাদের বয়সে আকবর কত ফুর্তি করছে, শাহী সালাম পাচ্ছে আর আমাদের কিনা সারাক্ষণ স্কুলের পড়া নিয়েই থাকতে হচ্ছে।

অন্যের বাড়িতে গিয়ে কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো মোড়ায় বসে, কখনো বা মেঝেতে বসে টিভি দেখার অবসান ঘটল যখন আমার বড় মামা জসিম বিদেশ থেকে ১৪ ইঞ্চির সনি ব্র্যান্ডের একটা টিভি নিয়ে বাড়ি আসলো। এরপর থেকে শুরু হয় নানুর বাসায় খাটে শুয়ে শুয়ে আয়েশ করে টিভি দেখা। এমনকি স্কুলের টিফিন আওয়ারে এসেও টিভি দেখতে দেখতেই টিফিনটা সারতাম। সে সময়ে টিভি দেখার খুব কাছের সঙ্গী ছিল আমার এক চাচাত মামা। বয়সে কিছুটা ছোট হলেও বন্ধুর মতই ছিলাম দুজন। নাম তার বাক্কি। সে এতটাই সালমান শাহ ভক্ত আর সালমান শাহের অনুকরণপ্রিয় ছিল যে শেষমেশ মহল্লায় তাকে ছোট সালমান শাহ বলেই অনেকে ডাকত। সেদিনের বাক্কি মামা আজ অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। এখন সে সরকারের বড় কর্মকর্তা। টিভি দেখার আরেক সঙ্গী আমার মেজো মামা হাবিজ। কিশোর বয়সে ফুটবল খেলতে গিয়ে পায়ে ছোট লেগে দু্ই পা অচল তার। অত্যন্ত বিনয়ী আর বিচক্ষণ এই মানুষটার জীবনে সমাজের আর দশটা মানুষের মত স্বাভাবিকভাবে চলতে ফিরতে না পারার দরুণ হয়তবা অনেক কষ্ট।

এতসব প্রতিকূলতার মাঝেও সদা হাস্যোজ্জ্বল তার মুখখানা দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে সকল বাঁধাকে পেছনে ফেলে জীবনযুদ্ধে সে স্বীয় মর্যাদার সাথে টিকে আছে। তাকে দেখে দেখে শিখেছি জীবনে টিকে থাকার জন্য চেষ্টা আর অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তিটা খুব দরকার।

“নানু প্রায়ই বলতেন এভাবে খালি টিভি দেখলেই হবে? টিভিতে শিক্ষার কত কিছু আছে সেগুলো নিজে কিছু শিখ”। সেই থেকে বিতর্ক আর কুইজের প্রতি মনোযোগ দেয়া শুরু। কোনো একটা বিতর্কে মডারেটর নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বলেছিলেন কিশোর বয়সে তার লেখালেখির অভ্যাসটা তার বর্তমান জীবনের জন্য খুব কাজে দিয়েছিল। আমার কিশোর মনে উনার কথাটা খুব দাগ কেটেছিল সেদিন। আর আমার লেখালেখির হাতে খড়ি সেখান থেকেই।

সে সময়ে ভৈরব থেকে প্রকাশিত “নিরপেক্ষ অরুনিমা” নামের একটা সাপ্তাহিক পত্রিকার পাক্ষিক আয়োজন “চাঁদের হাসি”তে আমার প্রথম লেখা ছেপেছিল। দৈনিক জনকন্ঠ, দৈনিক সমকাল পত্রিকার শিশুকিশোর পাতায় নিয়মিত লিখতাম তখন। একসময় “নিরপেক্ষ অরুনিমা” পত্রিকাটির পক্ষ থেকে ‘মাদকাসক্তি ও এর প্রতিকার’ শিরোনামে একটা রচনা প্রতিযোগিতার জন্য লেখা আহ্বান করা হলে পারুল নামের আমার এক খালা তাতে অংশগ্রহণ করে। লেখালেখির ব্যাপারে খালাকে খুব উদ্বুদ্ধ করতাম। পারুল খালার রচনাটা সেবারের প্রতিযোগিতায় প্রথম পুস্কারের জন্য মনোনিত হয়েছিল। আজ খালামনি উন্নত বিশ্বের বাসিন্দা; স্বামী সন্তানসহসহ কানাডার মন্ট্রিলে থাকে।

আমাদের ক্ষুদে লেখকদের আড্ডার আরেক সঙ্গী ছিল আতিক। সে সময়ে আমরা বেশ কয়েকজন কিশোর মিলে ‘অলংকার থিয়েটার (অথি)’ নামে একটা থিয়েটার চালু করি যা এখনো বর্তমান। অথি’র নির্দেশনায় মঞ্চস্থ বেশ কয়েকটা নাটিকায় শিশুকিশোরদের অভিনয় তখন স্থানীয় দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিল।

টেলিভিশন শুধু বিনোদন কিংবা হাসি আর আনন্দের সঙ্গীই নয়, বরং টেলিভিশনের ভেতরকার মানুষগুলোর ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ-কষ্টও গ্রাস করে দর্শকদের। তাইতো প্রিয় নায়ক সালমান শাহের অকাল মৃত্যতে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কিছুদিন টিভির সামনে যাওয়াটাও বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ক্যাবল টিভি, ইন্টারনেট টিভির এই যুগে বাঁশের মাথায় এমন অ্যান্টেনার যেমন দেখা মেলে না তেমনি সাদাকালো এনালগ আর সনাতন পদ্ধতির টেলিভিশনও কারো ঘরে আর দেখা যায় না। তবে যাই হোক, সেইদিনের সাদাকালো বোকা বাক্সটাই আমার মত অনেকের শৈশব-কৈশোরে ঘোটা সাম্রাজ্য বিস্তার করে রেখেছিল!

অচিরেই করোনার প্রভাব কাটিয়ে সারা পৃথিবীর সুখ-ছন্দ হারানো মানুষগুলোর জীবনে ভর করুক শৈশব-কৈশোরের সেই নির্মল আনন্দ আর সীমাহীন খুশি।

ফয়সুল আলম : লেখক ও ব্যাংকার