রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

একটি র‌্যালির জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা

| প্রকাশিতঃ ২৮ মার্চ ২০২২ | ৫:৫৩ অপরাহ্ন

জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) স্বাধীনতা স্মৃতি চত্বর থেকে বঙ্গবন্ধু চত্বর পর্যন্ত হেঁটে যেতে দুই থেকে সর্বোচ্চ তিন মিনিট সময় লাগে। এই পথ হেঁটে ছোট একটি র‌্যালি করতে চবি কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ দিয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা!

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২৬ মার্চ র‌্যালি করতে এই ভুতুড়ে বরাদ্দ দিয়েছে চবি কর্তৃপক্ষ। শুধু তাই নয়, সেদিন স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজনে শৃঙ্খলা বাবদ ৬০ হাজার টাকা ও মঞ্চ তৈরি বাবদ ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে।

এসব খরচ আদৌ সম্ভব কি না সেটি নিয়ে সন্দিহান খোদ বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন শিক্ষক। এমন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা তথ্য দিয়েছেন, বরাদ্দের চেয়ে খরচ আরও বেশি দেখানো হতে পারে।

এছাড়া স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে এলইডি ও ভিডিও বাবদ বরাদ্দ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, সাজ-সজ্জা বাবদ বরাদ্দ ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা, সাউন্ড সিস্টেমের জন্য বরাদ্দ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এসব বরাদ্দ কতটুকু যৌক্তিক তা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

যে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, তাদের পেছনে বরাদ্দ হয় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা; আর ওই দিন কনসার্টের শিল্পীদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। তাছাড়া নিম্নমানের স্মারক বা ক্রেস্ট এবং উত্তরীয় দিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রতি ৫ হাজার টাকা আদৌ খরচ হবে কি না সে প্রশ্নও উঠছে।

আপ্যায়ন বাবদ বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা; অথচ বিশ্ববিদ্যালয় লাউঞ্জ থেকে ১৮০ টাকা করে সেদিন ১ হাজার জনের জন্য খাবার এনেছিল কর্তৃপক্ষ। সেক্ষেত্রে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়।

আরও মজার বিষয় সব বরাদ্দ ‘রাউন্ড ফিগার’; সব মিলিয়ে এসেছে ২২ লাখ টাকা।

ফেসবুকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলী-আর-রাজির এ সংক্রান্ত একটি স্ট্যাটাস দেখে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

সহকারী অধ্যাপক আলী-আর-রাজি লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতা দিবসের ‘অনুষ্ঠান আয়োজনে’ যে ব্যয় বরাদ্দ হয়েছে, তা অবশ্যই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা। অনুমান করি, এই টাকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় অনুষ্ঠানসমূহ আয়োজনে সারা বছরের জন্য যে বরাদ্দ থাকে তার দ্বিগুণ। তাহলে বাকি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো কোন খাত থেকে, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। বছরের পর বছর ধরে এমন বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয় চলছে- এরও সুরাহা প্রয়োজন। কিন্তু যা প্রচার হচ্ছে, তা অনির্দিষ্ট, গোলমেলে।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ব্যয় প্রকাশ্য হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সবার জানার অধিকার আছে যে, প্রতিটি টাকা কোন খাত থেকে আসছে, কোথায়, কীভাবে তা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু তেমন কোনো আয়োজন আমাদের নাই, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে থাকলেও, সব তথ্য সকলকে অবগত করার ব্যবস্থা নাই।’

চবি শিক্ষক আলী-আর-রাজির ওই স্ট্যাটাসে তারেক আজীজ নামের একজন লিখেছেন, ‘এরকম রাউন্ড ফিগার খরচ জীবনেও দেখি নাই।’

মো. তারেকুর রহমান নামে একব্যক্তি লিখেছেন, ‘প্রতিবাদ করার মানুষ নেই। তারা সংখ্যায় খুব কম, ন্যায়ের পক্ষে কথা বলা মানুষ কমে যাচ্ছে দিন দিন। আর শয়তানরা সংঘবদ্ধ। এটা হচ্ছে তার ফসল। সমাজের কোন অংশেই ভাল মানুষগুলো আর নেতৃত্বে আসছে না। অনেকাংশেই আসতে পারছে না।’

হাস্যরসের ছলে আনারুল ইসলাম লিখেছেন, ‘মাত্র বাইশ লাখ। কয়েক কোটি হলে ভালো হতো।’

খাবারের প্রসঙ্গ টেনে নাইম রহমান লিখেছেন, ‘সকাল-দুপুরের নাস্তা দুবাই থেকে আনছে।’ রিজওয়ানুর রহমান নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘বাপরে বাপ, খাবারের খরচ ২ লাখ ৭০! ফাইভ স্টার হোটেল থেকে খাবার আনালেও মনে হয় এতো খরচ হবে না।’

মো. সোহেল আহমেদ লিখেছেন, ‘হিসাব দেখেই তো বুঝা যাচ্ছে যে এটা মনগড়া।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এ নিয়ে আমি এখনই মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। এসব বিষয়ে ইউজিসি কিংবা শিক্ষামন্ত্রী, উপমন্ত্রীর মাধ্যমে তদন্ত কমিটি করে তদন্ত সাপেক্ষে মন্তব্য করা সমীচীন হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বরাদ্দের বেশকিছু বিষয় আমর কাছে অযৌক্তিক মনে হচ্ছে। যেহেতু টাকার বরাদ্দটা বিশাল অংকের, তাই বিষয়গুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। এছাড়া সম্মাননার জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং তাদের সঠিক মূল্যায়ন ও সম্মান যথাযথভাবে হওয়া উচিত।’

অস্বাভাবিক খরচের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এটা নিয়ে আমার সাথে কথা বলে লাভ নেই। আপনি রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলুন। আর শুধু সমালোচনা করলেই তো হবে না। এসব আমরা কেন করেছি, কীভাবে করেছি, কেন করতে হয়েছে এসব নিয়ে আপনি প্লিজ রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলুন।’ -বলেই ফোন কেটে দেন তিনি।

চবি রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর এস. এম. মনিরুল হাসান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আসলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী প্রচার হচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে আমি মন্তব্য করতে পারবো না। যেহেতু বিষয়টি আমি এখনও অফিসিয়ালি জানি না। বরাদ্দ অনুযায়ীই খরচ হবে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘যেকোনো অনুষ্ঠানের খরচ সাথে সাথেই দেখানো যায় না। কারণ সকল খাতের খরচের হিসেব একসাথেই আসে। যা আমার কাছে এখনও আসেনি। যদি আসে আমি দেখে অবশ্যই অফিসিয়ালি আপনাদের জানাতে পারবো। তবে অন্যান্য বার এসব খাতে যে খরচ হয়েছে আমার ধারণা এবার তার চেয়ে বেশি হবে না।’