রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব, থাকছে না দলীয় প্রতীক

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ | ১২:৫৯ অপরাহ্ন


স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর সুপারিশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন। পাকিস্তান আমলের ১৯৬০-এর দশকে জেনারেল আইয়ুব খান প্রবর্তিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংসদীয় পদ্ধতির আদলে ঢেলে সাজানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পাঁচটি পৃথক আইনের অধীনে পরিচালিত হলেও, কমিশন দুটি আইনের মাধ্যমে এগুলোকে পরিচালনার কথা বলেছে। কমিশনের মতে, এই ব্যবস্থা চালু করতে পারলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে।

সুপারিশ অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামো দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত থাকবে: বিধানিক অংশ ও নির্বাহী অংশ। বিধানিক অংশের প্রধান হবেন ‘সভাধ্যক্ষ’, যা জাতীয় সংসদ স্পিকারের অনুরূপ। নির্বাহী অংশের প্রধান হবেন চেয়ারম্যান বা মেয়র, যিনি পরিষদ বা কাউন্সিল নেতা হিসেবেও পরিগণিত হবেন, যা সংসদ নেতার অনুরূপ। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে সুপারিশে।

বর্তমানে দেশে তিন স্তরের ‘গ্রামীণ স্থানীয় সরকার’-এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান। এই তিন স্তর গ্রামীণ স্থানীয় সরকার হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ। আর নগর স্থানীয় সরকারের দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন রয়েছে। এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আইন ও সাংগঠনিক কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবে তিনটি গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জেলা পরিষদের কার্য ও কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, জেলা পরিষদ হবে একটি বিকেন্দ্রীকৃত পরিকল্পনা ইউনিট। ডেপুটি কমিশনারের অফিস পৃথকভাবে জাতীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং ভূমি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকবে। আর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে জেলার সব উন্নয়ন সংক্রান্ত দপ্তরগুলো জেলা পরিষদের হাতে ন্যস্ত থাকবে। যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পদায়িত হবেন। অনুরূপভাবে উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদে বিভিন্ন দপ্তরগুলোতে কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের কাজকর্ম এবং অর্থ সম্পদ পরিষদের হাতে ন্যস্ত হবে।

সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্রুত নগরায়ণের ফলে নগর সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং গ্রামীণ এলাকা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের স্তর সংখ্যা হ্রাস করে গ্রামীণ ও নগরীয় ব্যবস্থার বিভাজন দূর করে সমজাতীয় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার দিকে এগোতে হবে। কমিশন মনে করে, বিদ্যামন গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের তিনটি প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামোসমূহ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ – এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের আইনি কাঠামো, সাংগঠনিক কাঠামো ও নির্বাচনব্যবস্থা অসম পদ্ধতিতে বিন্যস্ত। এটিকে একটি সমজাতীয় পদ্ধতিতে পুনঃস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।

সুপারিশে আরও বলা হয়, সংবিধানের তৃতীয় পরিচ্ছদের সকল ‘স্থানীয় শাসন’ শব্দাবলির স্থলে ‘স্থানীয় সরকার’ প্রতিস্থাপিত হবে। স্থানীয় সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শব্দ বা প্রত্যয়। অনুবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় সরকারের মূল ধারণা বিকৃত হয়ে পড়েছে। তাই স্থানীয় সরকার সংবিধানে সংস্থাপিত হওয়া প্রয়োজন। সংবিধানে সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযোগী একটি কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণ করে দিতে হবে, যা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ হবে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে স্থানীয় পরিষদের নির্বাচনসমূহ পরিচালনা করবে। ফলে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের অনুরোধের অপেক্ষা করতে হবে না।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত সুপারিশে বলা হয়, স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের প্রতীক ব্যবহার করা যাবে না। স্থানীয় সরকারের ‘স্থানীয় সরকার সার্ভিস’ নামে একটি নিজস্ব সার্ভিস কাঠামো থাকবে। সে সার্ভিসের অধীনে জনবলের ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী পদায়নের সুযোগ থাকবে।

স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, যেসব গণতান্ত্রিক দেশে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী, সেসব দেশকে অনুসরণ করেই সুপারিশগুলো করা হয়েছে। স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্রহণ করার বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন করবেন, আর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাঠামো নিজেদের মতো কাজ করবে।