রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

সাতকানিয়ায় রোহিঙ্গাদের হাতে যেভাবে উঠছে জন্মসনদ

টাকার বিনিময়ে ‘বাংলাদেশি’
মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন | প্রকাশিতঃ ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | ৫:৩১ অপরাহ্ন

কাগজপত্র বলছে তারা বাংলাদেশি, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নে জাতীয় নিরাপত্তার এক ভয়াবহ ফাঁকফোকর উন্মোচিত হয়েছে, যেখানে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকরা টাকার বিনিময়ে অনায়াসে পেয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশি জন্মসনদ।

প্রায় ২৫ বছর আগে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হোসেন আহমদ এখন সপরিবারে ‘বাংলাদেশি’। তিনি শুধু একা নন, তার স্ত্রী লায়লা বেগম, এবং দুই ছেলে মোহাম্মদ সোলতান আহমদ ও রফিক আহমদ—পরিবারের চার সদস্যই এখন বাংলাদেশি পরিচয়ের ‘বৈধ’ সনদধারী।

প্রতিবেদকের হাতে আসা তথ্য ও কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই জালিয়াতির প্রক্রিয়াটি চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। লায়লা বেগম প্রথম সনদ পেয়েছেন ২০১৬ সালে। এরপর হোসেন আহমদ নিজে ২০২২ সালের ২১ আগস্ট এবং তার দুই ছেলেও ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি একই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্মসনদ সংগ্রহ করেন। এসব সনদে স্বাক্ষর রয়েছে তৎকালীন চেয়ারম্যান মনির আহমদ এবং সচিব অসিমের।

হোসেন আহমদ নিজেই বাংলাদেশি সনদ সংগ্রহের কথা স্বীকার করেছেন, যিনি বর্তমানে কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নয়াপাড়ায় বসবাস করছেন।

এই জালিয়াতি শুধু কয়েকটি কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের এই অবাধ বিচরণ এবং ‘বাংলাদেশি’ বনে যাওয়ার সুযোগে এলাকাটি অপরাধের এক নতুন অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মুহাম্মদ মামুন বলেন, “রোহিঙ্গারা টাকা দিয়ে এখানে বসবাসের সুযোগ পাচ্ছে। তাদের কারণে এলাকায় চুরি, ডাকাতি ও ইয়াবা কারবার ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। রাতে অন্ধকারে ইয়াবা বিক্রি করে তারা তরুণ সমাজকে ধ্বংস করছে।” অন্যান্য বাসিন্দাদেরও অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের কিছু প্রভাবশালী সদস্যই অর্থের লোভে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন।

এই ভয়াবহ অনিয়মের দায় কে নেবে? অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য আব্দুর রহিম তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন।

তবে, খোদ ইউনিয়ন পরিষদই এই অনিয়মের সত্যতা স্বীকার করছে। কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মহসিন বলেন, “২০২২ সাল ও এর আগে এক রোহিঙ্গা পরিবারের চার সদস্যের জন্মসনদ তৈরি করা হয়—যার দায় সেই সময়ের চেয়ারম্যান, সদস্য ও সচিব কেউই এড়াতে পারেন না। বিষয়টি তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেছে। আমরা বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।”

প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত এই ঘটনা গড়িয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, “রোহিঙ্গাদের হাতে জন্মসনদ তৈরি করার ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রশাসনের এই ‘দ্রুত ব্যবস্থা’ নেওয়ার আশ্বাসের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে কেঁওচিয়ার সাধারণ মানুষ, যারা নিজেদের এলাকাতেই এখন বহিরাগতদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।