শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

জাপানি ‘সততার’ আড়ালে সামিটের চুক্তিফাঁদ, পেট্রোবাংলার নীরবতা

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অলিগার্কদের দৌরাত্ম্য, ভুল নীতি এবং হাজার কোটি টাকার অপচয় নিয়ে একুশে পত্রিকার তিন পর্বের বিশেষ অনুসন্ধানের প্রথম পর্ব।
শরীফুল রুকন | প্রকাশিতঃ ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:২৯ পূর্বাহ্ন

  • ঘূর্ণিঝড়ে চার মাস অচল টার্মিনাল, শূন্য গ্যাস সরবরাহ; তবু সরকারের কাছে ২৬৮ কোটি টাকা ভাড়ার আবদার সামিটের।

  • জাপানি অংশীদারদের ‘সততা’র আড়ালে অনৈতিক দাবি; লোকসানের দোহাই দিয়ে সরকারের কাছে হাত পাতলেও শেয়ারহোল্ডারদের দিচ্ছে নগদ লভ্যাংশ।

  • পেট্রোবাংলায় নীরবতা, প্রভাবশালী জুজুর ভয়ে ‘অজ্ঞতা’র ভান কর্মকর্তাদের; একপাক্ষিক চুক্তির ‘ফোর্স মেজার’ ধারা এখন লুটপাটের ঢাল।

  • আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের সুপারিশ বিশেষজ্ঞদের; চীন-কোরিয়া যে প্রযুক্তি বর্জন করেছে, তা বাংলাদেশে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আইইইএফএর সতর্কবার্তা।

  • সামিটের বিতর্কিত বিল ও দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে প্রশ্ন করতেই ফোন কেটে দিলেন জ্বালানি উপদেষ্টা।

ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রলয়ঙ্করী অধ্যায় শেষ হয়েছে দেড় বছর আগে। অথচ সেই পুরনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অজুহাত তুলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এক অভিনব ‘আর্থিক ঘূর্ণিঝড়’ তৈরির পাঁয়তারা করছে সামিট গ্রুপ। তাদের মালিকানাধীন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালটি ঝড়ের কবলে পড়ে প্রায় চার মাস অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২৪ মে থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর অচল ছিল। জাতীয় গ্রিডে তাদের গ্যাস সরবরাহও ছিল শূন্য।

অথচ এই অচল সময়ের জন্যই সরকারের কাছে ভাড়া হিসেবে প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার অর্থাৎ ২৬৮ কোটি টাকা দাবি করেছে সামিট গ্রুপ। দাবির স্বপক্ষে তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে তাদের জাপানি দুই ব্যবসায়িক অংশীদার—মিতসুবিশি এবং জেরার নাম।

পেট্রোবাংলা এবং রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলছেন না। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে ‘সেবা না দিয়েও টাকা দাবি করা’ তাদের পুরনো কৌশল। এ বিষয়ে তদারক সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অজ্ঞতা এবং গড়িমসির চিত্রও বেরিয়ে এসেছে।

সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত সামিটের এই বিপুল অঙ্কের ভাড়া দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে আরপিজিসিএলের উপব্যবস্থাপক (জনসংযোগ ও আইন) হাসান আব্দুল্লাহ জানান, এ বিষয়ক কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই, ভালো বলতে পারবে পেট্রোবাংলা।

আরপিজিসিএলের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘এলএনজি সরবরাহ করতে না পারলে তো সামিটকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সরকার ভাড়া দেবে কেন?’ তিনিও পেট্রোবাংলার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

২৬৮ কোটি টাকার প্রসঙ্গ তুলতেই যেন আকাশ থেকে পড়লেন পেট্রোবাংলার মুখপাত্র উপ-মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তারিকুল ইসলাম খান। গত ৯ ডিসেম্বর যোগাযোগ করা হলে এ ব্যাপারে ‘সম্পূর্ণ অজ্ঞতা’র ভান করেন এবং বিষয়টিকে ‘চুক্তি অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘এমন তথ্য কেউ আগে আমার কাছে জানতে চায়নি।’

তবে যখনই তাঁকে গ্লোবাল থিংক-ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনোমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ব্রিফিং নোটের সূত্র ধরে চ্যালেঞ্জ করা হয়, তখন তাঁর সেই ‘অজ্ঞতা’র খোলস আলগা হতে শুরু করে।

ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে চার মাস গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেও সামিটের প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা দাবির বিষয়টি পেট্রোবাংলায় দেড় বছর ধরেই আলোচিত। এসব তথ্য তুলে ধরার পর তিনি রক্ষণাবেক্ষণের দাবি থেকে সরে আসেন। সুর পাল্টে জানান, এ নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে আলাপ করে জানাবেন।

এরপর শুরু হয় লুকোচুরির দীর্ঘ নাটক। দুদিন পর ১১ ডিসেম্বর পুনরায় যোগাযোগ করা হলে তারিকুল ইসলাম খান জানান, তিনি তথ্য পাননি। ১৫ ডিসেম্বর আবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে এড়িয়ে যান এবং আরও সময় চান। ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষার পরও তিনি কোনো তথ্য দেননি।

শুধুমাত্র মুখপাত্রই নন, পেট্রোবাংলার শীর্ষকর্তারাও এই বিতর্কিত বিলের প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান। সংস্থার চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে গত ৯ ডিসেম্বর থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দফায় দফায় যোগাযোগ করা হলেও সাড়া দেননি তিনি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠিয়ে বার্তা দেওয়া হলেও জবাব দেননি তিনি।

সংস্থার মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. আব্দুল জলিলও কোনো জবাব দেননি। গত ২২ ডিসেম্বর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সামিটের দাবির আইনি খুঁটির বিষয়টি ফাঁস করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সামিট যেহেতু অনেক বড় ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান, তাই তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো সত্য প্রকাশ করলে উল্টো রোষানলে পড়ার আশঙ্কা থাকে। মূলত এই ভীতি বা শঙ্কা থেকেই পেট্রোবাংলার কেউ গণমাধ্যমের সামনে মুখ খুলতে চাইছেন না।’

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে করা একপক্ষীয় চুক্তির ২৪.৫ ধারাটিকে ‘লুটপাটের’ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে সামিট। চুক্তির ওই ‘ফোর্স মেজার’ ধারায় বলা আছে—রাজনৈতিক কারণ বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় টার্মিনাল অচল থাকলেও সরকারকে মাসিক বিল পরিশোধ করতে হবে।

কাজ না করেও টাকা দাবির এই প্রক্রিয়াকে ওই কর্মকর্তা ‘এলএনজি প্রকল্পের নামে সংঘবদ্ধ চক্রের দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অংশ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘চুক্তির এই অনৈতিক ধারা ব্যবহার করেই এখনও বিল চাওয়া হচ্ছে। তবে বিষয়টি বিতর্কিত হওয়ায় এখন পর্যন্ত (২২ ডিসেম্বর) পেমেন্ট স্থগিত রাখা হয়েছে। সামিট বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে, আমরাও প্রাতিষ্ঠানিক জবাব দিচ্ছি। ২০২১ সালের নভেম্বরেও বঙ্গোপসাগরে মুরিং লাইন ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে তিন মাস টার্মিনাল বন্ধ ছিল এবং তখনও সামিট টাকা চেয়েছিল। যদিও পেট্রোবাংলা তা দেয়নি।

জাপানি সুশাসনের দোহাই ও নৈতিকতার প্রশ্ন

অচল সময়ের বিলের দাবিতে যুক্তি দিতে গিয়ে সামিট তাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে। সামিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল খান গত বছর জানিয়েছিলেন, সামিট এলএনজির শেয়ারহোল্ডার হলো বিশ্বস্বীকৃত জেরা (১৬.৫%) এবং মিতসুবিশি (২৫%)। জাপানের সুমিতমো মিৎসুই ব্যাংকিং করপোরেশন (এসএমবিসি) থেকে অর্থায়ন পাওয়ায় তারা করপোরেট সুশাসনের সর্বোচ্চ মান বজায় রাখেন।

প্রশ্ন উঠেছে এখানেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানের মিতসুবিশি এবং জেরা বিশ্বজুড়ে তাদের ব্যবসায়িক সততা ও নৈতিকতার জন্য পরিচিত। বাংলাদেশের মানুষ যখন অন্ধকারে এবং শিল্প যখন গ্যাসের অভাবে ধুঁকছে, তখন আবহাওয়াগত কারণে সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েও জনগণের করের টাকা দাবি করা কি জাপানি ‘করপোরেট গভর্ন্যান্স’-এর সংজ্ঞায় পড়ে?

জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন ও জেরার সদর দপ্তরে গত ৯ ডিসেম্বর ইমেইল বার্তা পাঠায় একুশে পত্রিকা। ওই বার্তায় আইইইএফএর প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সামিটের টাকা দাবির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। জানানো হয়, পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএলের স্থানীয় কর্মকর্তারা সেবা না দিয়ে টাকা দাবিকে অযৌক্তিক বলে মত দিয়েছেন।

জানতে চাওয়া হয়, বড় শেয়ারহোল্ডার হিসেবে আপনারা কি নিশ্চিত করতে পারেন যে সামিট এমন কোনো বিল জমা দিয়েছে? ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সেবা দিতে ব্যর্থ হওয়ার পরও সরকারি তহবিল থেকে অর্থ দাবি করা কি আপনাদের করপোরেট সুশাসন ও নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক নয়?

২৯ ডিসেম্বর এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জেরা ও মিতসুবিশির পক্ষ থেকে কোনো জবাব মেলেনি। অন্যদিকে মিতসুবিশি করপোরেশনের অবস্থান জানতে ১৭ ডিসেম্বর তাদের ঢাকা অফিসে দুই দফা যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু সেখান থেকেও কেউ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তাদের এই নীরবতা এবং স্থানীয় অংশীদার সামিটের অনৈতিক আবদার জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হতে পারে

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম ভোক্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সামিটের দাবির যৌক্তিকতা খণ্ডন করে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সেবা না পেয়ে আমি পয়সা দেব কেন? সামিট গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরেই এমন ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। তারা চুক্তিতে এমন সব শর্ত লিখে নিয়েছে, যার মাধ্যমে সেবা না দিয়েও বছরের পর বছর টাকা দাবি করে যাচ্ছে। সরকারের উচিত এসব চুক্তি অবিলম্বে পর্যালোচনা করা। সেবা দিতে না পারলে উল্টো তাদেরই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা, অথচ তারা জনগণের টাকা দাবি করছে।’

শামসুল আলম উল্লেখ করেন, বিগত সরকার এবং বিনিয়োগকারীরা যোগসাজশ করে এমন সব আইন ও চুক্তি তৈরি করেছে, যা দুর্নীতিকে বৈধতা দিয়েছে। নাইকো চুক্তি যদি দুর্নীতির কারণে বাতিল হতে পারে, তবে সামিটের এই অনৈতিক চুক্তি কেন বাতিল হবে না? তিনি বলেন, শুধু চুক্তি বাতিল নয়, যারা দুর্নীতির মাধ্যমে এই বাড়তি সুবিধা নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

শামসুল আলমের মতে, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারেরা দায় এড়াতে পারে না। জাপানি কোম্পানিগুলো যদি বাংলাদেশে এসে ব্যবসায়িক নৈতিকতা লঙ্ঘন করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে তাদের নিজ দেশেই মামলা করা সম্ভব। ক্যাব বা সরকার আন্তর্জাতিক পরিসরে এ বিচার চাইতে পারে।

জাপানি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে দিয়ে শামসুল আলম বলেন, সামিট যদি অপরাধ বা অনৈতিক কাজ করে থাকে এবং মিতসুবিশি বা জেরা যদি সেই অপরাধ বা অনৈতিক কাজের অংশীদার হয়, তবে তাদেরও দায় নিতে হবে। জাপানি সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে এই কোম্পানিগুলোর উচিত সামিটের সঙ্গে তাদের অংশীদারিত্ব পুনর্বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনে পুঁজি প্রত্যাহার করা। বাংলাদেশের জনগণ সামিটকে অপরাধী হিসেবে চেনে, জাপানি অংশীদাররা কেন সেটা বুঝতে পারছে না, তা এক বড় প্রশ্ন।

‘ফোর্স মেজারের’ সুযোগ নাকি অন্যকিছু?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, প্রাকৃতিক কারণে বা ঘূর্ণিঝড়ের জন্য যদি টার্মিনাল বন্ধ থাকে, তবে তা ‘ফোর্স মেজার’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির আওতায় পড়ে। এ ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী কোনো পক্ষই একে অপরের কাছে টাকা দাবি করতে পারে না।

একুশে পত্রিকাকে ড. তামিম বলেন, প্রাকৃতিক কারণে যদি সরকার গ্যাস নিতে না পারে, সেটার জন্য সরকার দায়ী নয়। সরকার তো নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। আবার ঘূর্ণিঝড় তো সামিটও নিয়ন্ত্রণ করে না। তাই ‘ফোর্স মেজার’ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের অজুহাতে সামিটের বাড়তি টাকা, ভাড়া দাবি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

তবে চার মাস কেন টার্মিনাল বন্ধ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় তো এক-দুই দিনের জন্য হয়। ঝড়ের হাত থেকে বাঁচাতে তারা টার্মিনাল গভীর সমুদ্রে সরিয়ে নিয়েছিল, এটা জানি। কিন্তু এর জন্য চার মাস তো লাগার কথা না। এত দীর্ঘ সময় কেন লাগল, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সামিট যদি গ্যাস দিতে প্রস্তুত থাকে আর পেট্রোবাংলার কারণে দেরি হয়, তবেই তারা টাকা চাইতে পারে। অন্যথায় বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সালিশি আদালতে গড়াতে পারে।

ঘরের ভেতর আর্থিক রক্তক্ষরণ

এদিকে সামিটের ২০২৪–২৫ সময়ের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন এক চিত্র। সামিটের গত দুই দশকের (২০০৫-২০২৪) বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে জাপানি সুশাসনের দাবির সঙ্গে তাদের লভ্যাংশ নীতির চরম বৈপরীত্য ফুটে ওঠে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি যখন লোকসান ও তারল্য সংকটের দোহাই দিয়ে সরকারের কাছে ধরনা দিচ্ছিল, ঠিক তখনই তারা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। অর্থাৎ, দুর্যোগ বা সংকটের সময় সেবা না দিয়ে জনগণের করের টাকা ‘ভাড়া’ হিসেবে দাবি করা হলেও, সেই অর্থ কোম্পানির রিজার্ভ বা মেরামতে ব্যয় না করে তা পকেটস্থ করে লভ্যাংশ হিসেবে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৫ সালে যেখানে তাদের নিট মুনাফা ছিল সীমিত, সেখানে ২০১০ সালের পরবর্তী সময়ে ‘কুইক রেন্টাল’ জমানায় তাদের মুনাফা এবং সম্পদের পাহাড় জ্যামিতিক হারে বেড়েছে, যার বড় অংশই এসেছে উৎপাদন না করে পাওয়া এই ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ থেকে।

সামিটের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ১৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭টি এখন পুরোপুরি বন্ধ। এ কারণে কোম্পানিটিকে ১৩৮ কোটি টাকা ‘ইম্পেয়ারমেন্ট লস’ বা সম্পদের মূল্যহ্রাসজনিত ক্ষতি গুনতে হয়েছে। এতে তাদের নিট মুনাফা কমেছে এক বছরে ৩৯ শতাংশ। বার্ষিক প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, তারা তাদের পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, সামিট গ্রুপ দেশ ছেড়ে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু তারা যৌক্তিক ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় দেখিয়ে বছরের পর বছর যে অর্থ আত্মসাৎ করেছে, তা নিয়ে তাদের যেতে দেওয়া উচিত নয়। তাঁর পরামর্শ, অবিলম্বে তাদের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করা দরকার এবং দুদক বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত।

‘চমৎকার প্রশ্ন’, তবু জবাব নেই সামিটের

রিমালের অজুহাতে সেবা না দিয়ে অর্থ দাবি এবং জাপানি অংশীদারদের ঢাল হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে সামিট গ্রুপের বক্তব্য জানতে একুশে পত্রিকা গত ৯ ডিসেম্বর সামিট গ্রুপের জনসংযোগ বিভাগ ও কোম্পানি সচিব বরাবর ইমেইল পাঠায়। ২৬৮ কোটি টাকা দাবি ও সেবা না দিয়েও অর্থ চাওয়া সরকারের ‘নো সার্ভিস, নো পেমেন্ট’ নীতির লঙ্ঘন কি না এবং জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কি না—তা জানতে চাওয়া হয়।

পরদিন ১০ ডিসেম্বর সামিট কর্পোরেশনের পিআর অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ফয়সাল আল-আমীন এ প্রতিবেদকের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, স্পর্শকাতর এই বিষয়গুলোতে বক্তব্য তৈরি করতে তাদের কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। এরপর ১১ ডিসেম্বর এ প্রতিবেদক হোয়াটসঅ্যাপে পুনরায় যোগাযোগ করে বক্তব্যের তাগাদা দিলে ফয়সাল আল-আমীন জানান, ‘আমরা প্রশ্নগুলো পর্যালোচনা করছি। প্রশ্নগুলো চমৎকার ও যৌক্তিক।’ তবে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি জানান, সেদিনই জবাব দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, পরবর্তী সময়ে জানানো হবে।

এরই মধ্যে সামিটের ‘বার্ষিক রিপোর্ট ২০২৪-২৫’ এবং আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রতিবেদকের হাতে আসে আরও কিছু তথ্য। দেখা যায়, একদিকে সামিট সরকারের কাছে বকেয়া বিল ও তারল্য সংকটের কথা বলে হাহাকার করছে, অন্যদিকে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পরও ৬৯৫ কোটি টাকা ‘পাওনা’ হিসেবে দেখানো এবং পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদেশে সরিয়ে নেওয়া বা বিক্রি করার প্রক্রিয়ার বিষয়গুলো নজরে আসে।

এই অসংগতিগুলোর ব্যাখ্যা চেয়ে গত ১৩ ডিসেম্বর ফয়সাল আল-আমীনকে হোয়াটসঅ্যাপে আরও চারটি প্রশ্ন পাঠানো হয় একুশে পত্রিকার পক্ষ থেকে। জানতে চাওয়া হয়, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ‘লোকসান’ পোষাতেই কি জনগণের করের টাকায় ঘূর্ণিঝড়কালীন অচল সময়ের বিল দাবি করা হচ্ছে? আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘সাবসন এনার্জি’র কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্র বিক্রির চুক্তি কি সামিটের দেশ থেকে বিনিয়োগ গুটিয়ে নেওয়ার বা পালানোর ইঙ্গিত? দ্বিতীয় দফায় পাঠানো এই প্রশ্নগুলো দেখে ফয়সাল আল-আমীন জবাব দেন ‘Noted bhai’ (নোটেড ভাই)। ২৩ ডিসেম্বর আবারও যোগাযোগ করে জবাবের জন্য শেষবারের মতো তাগাদা দেওয়া হয়। কিন্তু সামিট গ্রুপ কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব বা ব্যাখ্যা দেয়নি।

আইইইএফএর সতর্কবার্তা

বন্ধ সময়ের বিল দাবির পাশাপাশি বাতিল তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) প্রকল্প ফিরে পেতে সরকারের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে সামিট। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি এক বিজ্ঞপ্তিতে সামিট গ্রুপ দাবি করে, তাদের দ্বিতীয় এফএসআরইউ (যা দেশের তৃতীয় এফএসআরইউ প্রকল্প হিসেবে পরিচিত) বাতিলের সিদ্ধান্তটি অবৈধ। প্রকল্পটিতে তারা ইতিমধ্যে দুই কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং প্রকল্প বাতিলের ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।

কামাল হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসসহ বিদেশি আইনজীবীদের মতামত দেখিয়ে তারা দাবি করছে, পারফরম্যান্স বন্ড জমার সময়সীমা ও প্রক্রিয়া নিয়ে পেট্রোবাংলার অভিযোগ সঠিক নয়।

৫৫ কোটি ডলারের এ নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে সামিট যখন মরিয়া, তখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা সংস্থা আইইইএফএ শোনালো ভিন্ন কথা। সংস্থাটি বাংলাদেশে এফএসআরইউ বা ভাসমান টার্মিনাল প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।

২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বরে প্রকাশিত আইইইএফএর একটি ব্রিফিং নোটে বলা হয়েছে, সামিট যে ভাসমান টার্মিনাল প্রযুক্তি গেলাতে চাইছে, তা চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার বৃহত্তম এলএনজি আমদানিকারকেরাও বর্জন করেছে। উচ্চ পরিচালনা ব্যয়ের কারণে চীন ২০১৬ সালেই এ ধরনের প্রকল্প বন্ধ করেছে।

আইইইএফএ সতর্ক করে বলেছে, বাংলাদেশে সম্প্রতি বাতিল হওয়া একটি এফএসআরইউ প্রকল্পের বার্ষিক ফি ধরা হয়েছিল ১১ কোটি ডলার, যা স্থলভাগের টার্মিনালের চেয়ে অনেক গুণ বেশি ব্যয়বহুল। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো দেশে উত্তাল সাগরে ভাসমান টার্মিনাল রাখা টেকসই সমাধান নয়।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার নামে সামিট এমন এক প্রযুক্তির প্রকল্প চাপিয়ে দিতে চাইছে, যা বিশ্বজুড়ে পরিত্যক্ত এবং যা আদতে দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ‘আর্থিক ফাঁদ’ হিসেবেই গণ্য হতে পারে।

এলএনজি বাণিজ্যে সামিটের আধিপত্য

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তৈরি করা ‘গ্যাস সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান-২০১৭’ ছিল মূলত আমদানিনির্ভর ব্যবসায়ের নীলনকশা। যেখানে ২০৪১ সাল পর্যন্ত এলএনজি আমদানিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং এই সুযোগটি লুফে নেয় সামিটসহ হাতেগোনা কয়েকটি বিশেষ কোম্পানি। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি এলএনজি আমদানি করা হয়েছে, যার পেছনে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল পেট্রোবাংলার সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি খাতে সামিটের যাত্রা শুরু হয় এবং কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা ছাড়াই বিশেষ আইনের মাধ্যমে তাদের একের পর এক কাজ দেওয়া হয়। এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ থেকে শুরু করে রিগ্যাসিফিকেশন ও সরবরাহের কাজ ঘুরেফিরে সামিট গ্রুপ, জাপানি জেরার মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত থেকে বিপুল অর্থ কামিয়ে সামিটের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান সিঙ্গাপুরে সাম্রাজ্য গড়েছেন এবং বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরের ৪৯তম ধনী ব্যক্তি। ফোর্বসের তথ্যমতে, তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) সাবেক এমডি মর্তুজা আহমেদের মতে, গত দুই দশকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব না দিয়ে আমদানিনির্ভরতা তৈরি করা হয়েছে শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের মুনাফা এবং বিশেষ গোষ্ঠীর কমিশনের স্বার্থে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামিটের এই ২৬৮ কোটি টাকার আবদার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি গত দেড় দশক ধরে চলা সেই দায়মুক্তি সংস্কৃতিরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’র দোহাই দিয়ে লুণ্ঠনকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি উপদেষ্টার ‘ইন্টারভিউ না দেওয়ার’ নীতি

বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে ২৮ ডিসেম্বর সকাল ১০টার পর থেকে একাধিকবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এই প্রতিবেদক। উপদেষ্টা ফোন রিসিভ না করায় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে তিনটি বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

জানতে চাওয়া হয়—ঘূর্ণিঝড় রিমালের সময় সেবা না দিয়েও সামিটের ২৬৮ কোটি টাকা দাবির মুখে সরকার ‘নো সার্ভিস, নো পেমেন্ট’ নীতিতে অটল থাকবে কি না। তারল্য সংকটের অজুহাত দিয়ে সরকারের কাছে টাকা চাওয়া সামিট গ্রুপ কীভাবে শেয়ারহোল্ডারদের ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে—সেই দ্বিমুখী আচরণ ও অনৈতিক দাবির কারণে তাদের বিরুদ্ধে চুক্তি বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ খরা কাটাতে ‘সার্বভৌম গ্যারান্টি’ ফিরিয়ে আনা হবে কি না।

দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে আবার যোগাযোগ করা হলে উপদেষ্টা ফোন রিসিভ করেন। এ সময় প্রতিবেদক নিজের পরিচয় দিয়ে সামিট ও জ্বালানি খাতের প্রসঙ্গটি তুলতেই তিনি থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমি কোনও ইন্টারভিউ টিউ দিই না।’ এ কথা বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন, ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বন্ধ টার্মিনালের জন্য জনগণের পকেট কাটার এই ‘চুক্তিফাঁদ’ কি বন্ধ করবে বা করতে পারবে পেট্রোবাংলা? নাকি ‘জাপানি সুশাসন’-এর আড়ালে এই অলিগার্ক তোষণ নীতিই বহাল থাকবে?

দ্বিতীয় পর্ব: নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পাশ কাটিয়ে ব্যয়বহুল এলএনজিতে ঝোঁকার কারণ কী?

তৃতীয় পর্ব: জ্বালানি অলিগার্কদের ‘১০ দিনের ভেলকি’, সমাধান কোন পথে?