শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

আস্থার সংকটে ডুবছে হাজার কোটি টাকার রপ্তানি

টেস্টের রেজাল্ট ‘পাস’, তবুও বন্দরে পণ্য ‘ফেল’
শরীফুল রুকন | প্রকাশিতঃ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৫২ অপরাহ্ন


[সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাত থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু রপ্তানির গ্রাফ ১ বিলিয়ন ডলারের ঘরেই আটকে আছে। কেন কৃষকের উৎপাদিত ফসল কারখানার কাঁচামাল হতে পারছে না? কেন আন্তর্জাতিক সনদের অভাবে বিশ্ববাজার থেকে ফিরে আসছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত পণ্য? অলস চিংড়ি কারখানা আর নীল অর্থনীতির অপার সম্ভাবনাই বা কতটুকু কাজে লাগছে? কাঁচামাল সংকট, প্যাকেজিং প্রযুক্তি, ল্যাব সমস্যা, অপ্রচলিত পণ্যের বাজার এবং নীতিমালার জট নিয়ে একুশে পত্রিকার পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের তৃতীয় পর্ব।]

দৃশ্যটি কল্পনা করুন। চট্টগ্রামের একটি কারখানা থেকে এক কন্টেইনার সুগন্ধি চাল বা ফলের জুস পাঠানো হলো ইউরোপের কোনো দেশে। দেশের ল্যাবে পরীক্ষা করে বলা হলো—সব ঠিক আছে, মান শতভাগ খাঁটি। কিন্তু পণ্যটি যখন বিদেশের বন্দরে পৌঁছাল, তখন সেখানকার কাস্টমস অফিসার বললেন, “তোমাদের এই কাগজের কোনো দাম নেই। আমাদের ল্যাবে আবার টেস্ট হবে।”

ফলাফল? দিনের পর দিন পণ্য আটকে থাকল পোর্টে, ডেমারেজ গুনতে হলো আমদানিকারককে, আর শেষমেশ হয়তো সামান্য অজুহাতে পুরো চালানটিই ফেরত পাঠানো হলো। এই গল্পটি কাল্পনিক নয়, এটিই এখন বাংলাদেশি কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিকারকদের নিত্যদিনের হাহাকার। বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইউরোপের বায়াররা আমাদের সার্টিফিকেটে ভরসা পায় না। তারা বলে, তোমাদের দেশের ল্যাবের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। ফলে আমাদের পণ্য নিয়ে তারা দ্বিতীয়বার টেস্ট করায়, যা আমাদের জন্য লজ্জার এবং খরচের।’

পণ্য যতই ভালো হোক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ‘বিশ্বাস’ মুখের কথায় হয় না, হয় সনদে। আর সেই সনদ হতে হয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আমাদের রপ্তানি খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন পণ্যের মান নয়, বরং সেই মান প্রমাণ করার অক্ষমতা। এই ‘আস্থার সংকট’ বা ‘ক্রাইসিস অব ট্রাস্ট’ আমাদের ঠেলে দিচ্ছে এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে।

ল্যাব আছে, কিন্তু ‘স্বীকৃতি’ নেই

বাংলাদেশে বিএসটিআই, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, কিংবা পরমাণু শক্তি কমিশনের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান আছে। তাদের ল্যাবও আছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ল্যাবগুলোর অনেকগুলোরই আন্তর্জাতিক ‘অ্যাক্রেডিটেশন’ বা স্বীকৃতি নেই।

প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা এই সমস্যার মূলে হাত দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের বিএসটিআই বা ফুড সেফটি অথরিটির ল্যাবগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। এই ল্যাবগুলো যদি আন্তর্জাতিক ল্যাবের সাথে অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতি পায়, তবেই আমাদের সনদ বিদেশে গ্রহণযোগ্য হবে”।

সহজ কথায়, আমাদের ল্যাবের মেশিনে পণ্যটি ‘নিরাপদ’ প্রমাণিত হলেও, ইউরোপ বা আমেরিকার ক্রেতা সেই ল্যাবকে বিশ্বাস করেন না। তারা চান এমন কোনো ল্যাবের সিল, যার নাম তাদের খাতায় ‘বিশ্বস্ত’ হিসেবে লেখা আছে। এই স্বীকৃতির অভাবেই আমাদের কোটি কোটি টাকার পণ্য বিদেশের বাজারে গিয়ে ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

সনদের রাজনীতি ও অদৃশ্য দেয়াল

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এখন আর শুধু শুল্ক বা ট্যাক্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখনকার বড় বাধা হলো ‘নন-শুল্ক বাধা’। উন্নত দেশগুলো নিজেদের বাজার বাঁচাতে এখন ‘মান’-এর দোহাই দিয়ে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘রোড ম্যাপ অন ফুড’-এ একটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার বাজারে আমাদের আলু রপ্তানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ‘ব্রাউন রট’ রোগের অজুহাতে। অথচ আমাদের ল্যাবগুলো তখন নিশ্চিত করতে পারেনি যে আমাদের আলু রোগমুক্ত। একইভাবে, চিংড়ি রপ্তানির সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতির অভিযোগ তোলে, তখনো আমরা দ্রুত ও সঠিক পাল্টা প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হই। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এখন আর ট্যারিফ বা শুল্ক দিয়ে বাণিজ্য আটকানো হয় না, এখন আটকানো হয় স্যানিটারি ও ফাইটো-স্যানিটারি মেজারস দিয়ে। আমাদের ল্যাবগুলো যদি সেই মানদণ্ড পূরণ করতে না পারে, তবে এটি আমাদের রপ্তানির জন্য বড় হুমকি।’

এমনকি মাংস বা দুগ্ধজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ‘বিএসই’ বা ‘ম্যাড কাউ ডিজিজ’ মুক্ত সনদ চাওয়া হয়। আমাদের দেশে এই রোগ নেই, কিন্তু তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে সনদ দেওয়ার মতো একক কোনো কর্তৃপক্ষ বা স্বীকৃত ল্যাব আমাদের নেই। ফলে বিলিয়ন ডলারের হালাল মাংসের বাজার আমাদের চোখের সামনে দিয়ে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

একক কর্তৃপক্ষের অভাব: অনেক মাঝি, নৌকা ডোবে

থাইল্যান্ড বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশে খাদ্য ও ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শক্তিশালী ‘ফুড এন্ড ড্রাগ অথরিটি’ থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে এই দায়িত্ব ছড়িয়ে আছে অনেকগুলো সংস্থার হাতে—বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর ইত্যাদি।

‘রোড ম্যাপ অন ফুড’-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই সমন্বহীনতা আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। একজন রপ্তানিকারককে তার পণ্যের মানের সনদ নিতে ছুটতে হয় তিন-চারটি ভিন্ন দপ্তরে। এতে সময় নষ্ট হয়, খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এফবিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্বের অন্য দেশে একটি উইন্ডো থেকেই সব ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়। আর আমাদের এখানে বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, আর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রে দৌড়াতে দৌড়াতেই উদ্যোক্তার জান শেষ। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না কমলে রপ্তানি বাড়বে না।’

বাপা-এর সাধারণ সম্পাদক ইকতাদুল হক আক্ষেপ করে বলেন, “বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সনদ নিতে হয়রানি আর অতিরিক্ত ফি আমাদের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারের উচিত সব সনদ এক জায়গা থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা”।

দ্বিগুণ খরচের বোঝা

যেহেতু আমাদের দেশের ল্যাব রিপোর্টের ওপর বিদেশের ক্রেতারা ভরসা পান না, তাই রপ্তানিকারকদের অনেক সময় বাধ্য হয়ে পণ্যটি সিঙ্গাপুর বা ব্যাংককে পাঠিয়ে টেস্ট করাতে হয়। এতে একেকটি টেস্টের জন্য হাজার হাজার ডলার খরচ হয়।

অথবা, পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ক্রেতা নিজ খরচে টেস্ট করান এবং সেই খরচ পণ্যের দাম থেকে কেটে রাখেন। এই ‘ডাবল টেস্টিং’ বা দ্বিগুণ পরীক্ষার খড়গ আমাদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে ভারত বা ভিয়েতনামের সাথে আমরা আর পেরে উঠছি না। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ঠিকই বলেছেন, “আমরা এখনো মূলধারার বাজার, বিশেষত উন্নত বিশ্বের দরজা পুরোপুরি খুলতে পারিনি। আন্তর্জাতিক মান ও সার্টিফিকেশনের অভাবেই এটা হচ্ছে”।

ট্রেসিং: বিশ্বাসের আরেক নাম

আধুনিক ক্রেতা জানতে চায়, তার প্লেটের খাবারটি কোথা থেকে এসেছে। পিকেএসএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. ফজলুল কাদের ‘ট্রেসিং’ বা শেকড় সন্ধানের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের জমিতে অনেক সময় কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ট্রেসিং করা গেলে বোঝা যেত কোন কৃষকের ভুলে এটা হয়েছে এবং তা সংশোধন করা যেত”।

আমাদের দেশে কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮-তে রপ্তানিকারকদের লাইসেন্স ও মান নিয়ন্ত্রণের কথা বলা থাকলেও, মাঠ পর্যায়ে ‘ট্রেসিবিলিটি’ বা পণ্যের উৎস শনাক্তকরণের ব্যবস্থা এখনো আদিম পর্যায়ে। ফলে যখনই কোনো চালানে সমস্যা ধরা পড়ে, তখন পুরো দেশের পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলে আসে, কারণ নির্দিষ্ট অপরাধীকে বা ত্রুটিপূর্ণ উৎসকে আলাদা করা যায় না। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাশিদুল হাসান বলেন, ‘মাঠ থেকে পণ্য সংগ্রহের কোনো ডিজিটাল ডাটাবেজ আমাদের নেই। ফলে যখনই বিদেশের পোর্টে কোনো কনটেইনারে সমস্যা ধরা পড়ে, আমরা বলতে পারি না এটা কোন কৃষকের পণ্য। এই অস্বচ্ছতাই আমাদের বড় দুর্বলতা।’

উত্তরণের পথ: সনদের সার্বভৌমত্ব অর্জন

আমাদের রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারের বৃত্তে আটকে থাকার অন্যতম কারণ এই আস্থার সংকট। এখান থেকে বের হতে হলে আমাদের ল্যাবরেটরিগুলোকে শুধু দালান-কোঠা হিসেবে দেখলে হবে না, এগুলোকে বাণিজ্যের ‘পাসপোর্ট অফিস’ হিসেবে দেখতে হবে।

সরকারকে বুঝতে হবে, একটি অ্যাক্রেডিটেড ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা মানে শুধু বিজ্ঞান চর্চা নয়, এটি সরাসরি বিলিয়ন ডলারের বাজার খোলার চাবি। ভারতের ‘এনএবিএল’ অ্যাক্রেডিটেশন যেমন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত, আমাদের ‘বিএবি’-এর স্বীকৃতিকেও সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডটি এখন একটি অদৃশ্য কাঁচের দেয়ালে আটকে আছে। সেই দেয়ালটি অবিশ্বাসের। আমাদের কৃষক ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলাচ্ছে, উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করছে, কিন্তু দিন শেষে একটি কাগজ—একটি আন্তর্জাতিক মানের সনদের অভাবে সব পরিশ্রম ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আগামীর কৃষি বাণিজ্য হবে সনদের বাণিজ্য। যার ল্যাব যত শক্তিশালী, যার সনদের গ্রহণযোগ্যতা যত বেশি, সেই দেশই হবে বাজারের রাজা। ২০৪১ সালে ২৫ বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন দেখতে হলে আগে আমাদের এই আস্থার সংকট কাটাতে হবে। নতুবা আমাদের সম্ভাবনাময় কৃষি পণ্যগুলো বিশ্ববাজারের দোরগোড়া থেকে বারবার ফিরে আসবে, আর আমরা শুধু আফসোসই করে যাব।

চতুর্থ পর্ব: চিংড়ির কারখানায় ঝুলে আছে তালা, অথচ কাদা-পানির নিচেই লুকিয়ে আছে বিলিয়ন ডলারের সম্পদ