বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৮ আশ্বিন ১৪২৭

ওসি প্রদীপে যেন না নিভে মানবিক পুলিশের আলো

প্রকাশিতঃ বুধবার, আগস্ট ১২, ২০২০, ১১:৪২ অপরাহ্ণ

আমিনুল হক বাবু : ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা! পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ!’ এই হলো পুলিশ সম্পর্কে বাঙালির প্রচলিত ধারণা এবং কিছুটা বাস্তবতাও বটে! অথচ করোনার এই ক্রান্তিকালে দেশব্যাপী মানবিক অবদান রেখে মানুষের মনে শক্ত জায়গা করে নিয়েছে এই বাহিনী।

এই দুঃসময়ে বাংলাদেশ পুলিশ তার সবটুকু সক্ষমতা বিলিয়ে দিয়েছে, দিচ্ছে করোনা মোকাবিলা করতে। দেশের দুই লক্ষাধিক পুলিশ সদস্য সরাসরি মাঠে থেকে করোনার বিস্তাররোধে কাজ করছেন। অনেক পুলিশ সদস্য ১২-১৬ ঘন্টা এক টানা কাজ করছেন।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশজুড়ে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত ও লকডাউন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য পুলিশ সদস্যরা নিয়মিত টহল দিয়েছেন। এ ছাড়া রাস্তায় জীবাণুনাশক ছিটানো, শ্রমজীবী মানুষকে সহায়তা করা, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া, এমনকি কোয়ারেন্টিন থেকে পালানো ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার কাজও করেছেন পুলিশ সদস্যরা। নিম্ন আয়ের পরিবার ও নিম্ন মধ্যবিত্তদেরও গোপনে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ।

সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে বলপ্রয়োগ নয়, মানুষকে সচেতন করতে গান লিখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেয়েছেনও পুলিশ সদস্যরা। করোনাকালে কোন অসাধু ব্যবসায়ী যাতে পণ্য মজুত করতে না পারে, তা-ও খতিয়ে দেখেছে, দেখছে পুলিশ। এসব কাজ করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বা হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।

করোনার সময় মানুষের দুর্দিনে পাশে থেকে যে পুলিশিং আমরা দেখেছি, এই পুলিশিং বাংলাদেশের পুলিশ আগে করেনি। পুলিশের কাজে এখন মানবিকতাও যুক্ত হয়ে গেছে।

সারাবছর পুলিশকে গালি দেওয়া লোকটিও এই দুঃসময়ে পুলিশের ভূমিকার কথা উঁচু গলায় বলে বেড়িয়েছে। কিন্তু টেকনাফ থানা পুলিশ এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিয়ে পুলিশের এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছে।

গত ৩১ জুলাই রাতে মেরিন ড্রাইভ এলাকার শামলাপুর অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় ডকুমেন্টারি ফিল্ম-এর শুটিং শেষে পুলিশ চেকপোস্ট অতিক্রম করার সময় পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হন।

কক্সবাজার পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা অস্ত্র তাক করায় আত্মরক্ষার্থে গুলি করতে বাধ্য হয়েছেন পরিদর্শক লিয়াকত আলী। এই যুক্তি মেনে নিয়ে বলি, আত্মরক্ষা করার জন্য গুলি করে কোমরের নিচে। কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার গায়ে যে গুলিগুলো লেগেছে সবগুলো কোমরের উপরে, বুকে।

সুতরাং আত্মরক্ষার গ্রাউন্ড এখানে গ্রহণযোগ্য নয়। গুলি কেন করা হলো, সে পরিস্থিতি আদৌ সৃষ্টি হয়েছিল কিনা সেসব তদন্তে উঠে আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

তবে প্রায় সব গণমাধ্যমে এসেছে, টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের নির্দেশে সেদিন গুলি চালিয়েছিল পরিদর্শক লিয়াকত। টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। টেকনাফ, উখিয়া ও মহেশখালীতে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে বেশকিছু নিরীহ মানুষকে হত্যার অভিযোগও আছে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশেও (সিএমপি) চাকরি করেছিলেন ওসি প্রদীপ। এখানেও নানা অভিযোগে কয়েক দফা বরখাস্ত হয়েছিলেন। তারপরও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কমেনি। তিনি সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। আর বাস্তবতা হলো সীমা লঙ্ঘনকারীকে মানুষ তো বটেই আল্লাহতায়ালাও পছন্দ করেন না।

আমি মনে করি, পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা সদস্য যদি কোনো অপকর্ম করে থাকে তার দায়ভার তার ওপরই বর্তাবে। একজন প্রদীপের কর্মকাণ্ডের দায়ভার কিন্ত গোটা পুলিশ বাহিনীর নয়। প্রতিটি পেশার সাথেই সৎ এবং অসৎ শব্দটি জড়িত। পুলিশ বাহিনীও এর বাইরে নয়।

দুই লক্ষ সদস্যের পুলিশ বাহিনীতে করোনা ক্রান্তিকালে মানুষের জন্য কাজ করে জীবন দেওয়া পুলিশ যেমন আছেন আবার কিছু অসৎ সদস্যও আছেন। বাংলাদেশে অনেক সৎ এবং ভালো পুলিশ অফিসার আছেন, এটাই সত্যি। প্রদীপের এই ঘটনা বিপদগামী পুলিশ অফিসারদের জন্য একটা বার্তা হতে পারে।

অবশ্য পুলিশের আইজিপি সম্প্রতি পুলিশকে একটা কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছিলেন, ‘অতিরিক্ত টাকা কামাতে চাইলে পুলিশের পদ ছেড়ে ব্যবসা ধরো, অন্যথায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ কিছু কিছু পুলিশ সদস্য সম্ভবত এই ম্যাসেজটা এখনো ধারণ করতে পারেন নি।

আশা করি, ভুল থেকে শিক্ষা নেবেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা। নেতিবাচক এই সময়টাকে পেছনে ফেলে তারা ইতিবাচক ভূমিকার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পুলিশকে নিয়ে যাবেন। আমি বিশ্বাস করি, আগামীর পুলিশ হবে আরও মানবিক।

লেখক : সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী।