রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৫ আশ্বিন ১৪২৭

চট্টগ্রামে তৃণমূল থেকে রাজনীতির শীর্ষে যাঁরা

প্রকাশিতঃ সোমবার, আগস্ট ১৭, ২০২০, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ


চট্টগ্রাম : গত ৬ আগস্ট ‘উত্তরাধিকার-রাজনীতি, চট্টগ্রাম স্টাইল’ শিরোনামে একুশে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ পড়ে ফোন করেছেন, ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েছেন অনেকে। সংবাদের বিষয় ও উপস্থাপনার প্রশংসা করে কেউ কেউ বলেছেন বর্তমান ‘উত্তরাধিকার রাজনীতির’ নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি এই সংবাদ।

অন্যদিকে তৃণমূল থেকে আজীবন ‘তিলোত্তমা রাজনীতি’র পথে হেঁটে, ঘামঝরিয়ে রাজনৈতিক অবমূল্যায়নের শিকার হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত যারা, এই সংবাদ পাঠের পর তারাও উত্তরাধিকার রাজনীতির ‘নির্মম বাস্তবতা’ মেনে নিয়ে ফের শংকাবোধ করছেন এই বলে, পারিবারিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার নিষ্পেশন থেকে কি মুক্তি মিলবে না? অগণন-অজস্র ঘাম-শ্রম, রক্তদান কি বৃথা যাবে?

এমন প্রশ্ন আর শঙ্কার দোলাচলে তৃণমূলের যেসব রাজনৈতিক নেকাকর্মী; মূলত তাদের জন্যেই একুশে পত্রিকার এই প্রতিবেদন। তৃণমূল থেকে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়ে পারিবারিক ‘তকমা’ ছাড়া কেবল নিজ প্রচেষ্টা ও যোগ্যতায় জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়, তৈরি করা যায় ঈর্ষন্বীয়, স্বতন্ত্র অবস্থান মূলত সেই গল্পই আজকের প্রতিবেদনের প্রতিপাদ্য।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন রাজনীতিবিদ। স্বাধীনতার পর থেকে পাঁচবার এমপি হয়েছেন। হয়েছেন দুদুবার মন্ত্রী। প্রাচীন সংগঠন আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ২০১২ সাল থেকে। বর্তমানেও তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন পিতা সাবেদুর হমান ১৯৪৪ সালে কলকাতায় ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি চট্টগ্রাম চলে আসেন। চট্টগ্রামে তিনি “ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন” নামে একটি অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান, যার মাধ্যমে তিনি অনেক রাস্তা, ভবন ও বাংলাদেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গড়ে তুলেন। এছাড়াও তিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ২০টি বিলাসবহুল মার্সিডিজ বাসের বহর চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার ও অন্যান্য এলাকার সঙ্গে প্রবর্তন করেন।

সাবেদুর রহমান কক্সবাজার যে বিশাল সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পট হবে তা আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন। যার প্রেক্ষিতে তিনিই সর্বপ্রথম কক্সবাজারে হোটেল প্রতিষ্ঠা করেন। আর সেটি হলো ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘হোটেল সায়মন’। বর্তমানেও এটি কক্সবাজারের হোটেলগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি হোটেল হিসেবে বিবেচিত। কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প প্রসারে তার এ পদক্ষেপ এখনও চট্টগ্রাম কক্সবাজারের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

মনেপ্রাণে একটি রাজনৈতিক আদর্শকে লালন করে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে অর্থনৈতিক দুর্বলতা যেন জনসেবা থেকে তাকে দূরে রাখতে না পারে সে জন্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি পৈতৃক ব্যবসাসমূহ দেখাশুনা করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ১৯৮৩ সালে গ্যাসমিন লিমিটেড নামে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পাইপ লাইনের কাজ করে আসছে। ১৯৬৪ সালে কক্সবাজারে তার পিতার প্রতিষ্ঠিত হোটেল সায়মনকে পরবর্তীতে আরো সম্প্রসারণ করে ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি করেন। এছাড়া তিনি ‘পেনিনসুলা চিটাগাং’ নামক একটি আন্তর্জাতিক মানের চার তারকা হোটেল প্রতিষ্ঠা করেন।

দাম্পত্য জীবনে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন স্ত্রী আয়েশা সুলতানার সাথে সংসার করছেন। তার তিন ছেলে এবং এক মেয়ে রয়েছে। শিক্ষাজীবন তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৬২ সালে স্যার আশুতোশ কলেজ থেকে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৬৬ সালে লাহোরের ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। লাহোরে অধ্যয়নকালে তিনি ছয় দফা আন্দোলনের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন সময় মিছিল সমাবেশে সরাসরি নেতৃত্ব দেন। এসময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৬ সালে ছয় দফার যৌক্তিকতা তুলে ধরে লাহোরে পূর্ব পাকিস্তানে অধ্যয়নরত ছাত্রদের সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের এক সমাবেশে তিনি সভাপতিত্ব করেন। লাহোর থেকে দেশে ফিরে মানুষের কল্যাণ করার মহান ব্রত নিয়ে চট্টল শার্দুল এম.এ. আজিজের হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হন। ১৯৭০ সালে তিনি সর্বপ্রথম তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদে তিনি বিরোধী দলীয় হুইপের এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও সততার সাথে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জাতীয় সংসদে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতে আসার পর তিনি দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বাকশাল এবং ’৭৭ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়া ১৯৮০ ও ৮৪ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৯২, ১৯৯৬, ২০০৪ এবং ২০১২ সালে সভাপতি এবং একই সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন সৎ, ভদ্র, নম্র, স্পষ্টবাদী ও উদার মনোভাবের মানুষ হিসেবে নিজ দলের নেতাকর্মীসহ চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের নিকট তার সুনাম রয়েছে। রাজনীতি করতে গিয়ে এ সুদীর্ঘ সময়ে তিনি কখনও কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেননি এবং কোনও সন্ত্রাসী লালন করেননি। কখনও নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আপোস করেননি।

’৭৫ পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রী পরিষদে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার আহ্বান তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজ দলের আদর্শে অবিচল থেকেছেন সব সময়। রাজনীতি করতে এসে মুক্তিযুদ্ধসহ বহুবার তিনি জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট চত্বরে তৎকালীন বিএনপি’র সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলায় তিনি এবং আওয়ামী লীগের অনেক নেতৃবৃন্দ আক্রান্ত হন।

এসময় সন্ত্রাসীরা তাঁর পায়ের রগ কেটে দেয়। ’৮৮ সালে ২৪ জানুয়ারী শেখ হাসিনার মিছিলে পুলিশ নিবিচারে গুলি চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যা করার ঘটনায় তিনিও মারাত্মকভাবে আহত হন। ’৯২ সালের ৮ মে ফটিকছড়িতে জামায়াত ক্যাডারদের সশস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত হয়ে অলৈাকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। ২০১৪ সালে তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সেক্টর-১ এর সাব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন।

চট্টগ্রামে কালোরাত্রির নৃশংসতা ঠেকাতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে সাহসী বীর বাঙালি যোদ্ধারা শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে কুমিল্লা থেকে আগমনকারী সেনাদলের পথ বন্ধ করে দেন এবং চট্টগ্রাম শহর ও ক্যান্টনমেন্টের প্রধান প্রধান এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। পরবর্তীতে তিনি সিইনসি স্পেশাল ট্রেনিং নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করেন।

ড. হাছান মাহমুদ

স্কুল জীবনেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়া তৃণমূলের নেতা হাছান মাহমুদ সফল নেতৃত্বের মাধ্যমে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ঈর্ষণীয় অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়ে্ছেন

১৯৮৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে মাস্টার্স করা এই রাজনীতিক দেশে-বিদেশে মোট তিন বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী ও পরিবেশ রসায়নে পিএইচডি ইন সায়েন্স ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করা হাছান মাহমুদ ১৯৯৬ সালে বেলজিয়ামের ভ্রীজে ইউনিভার্সিটি অব ব্র্যাসেলস থেকে হিউম্যান ইকোলজি (পরিবেশ বিজ্ঞান) বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। একই সালে বেলজিয়ামের আরেক নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব লিবহা দু ব্রাসেলস থেকে ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন তিনি।

২০০১ সালে বেলজিয়ামের লিম্বুর্গ ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাম থেকে পরিবেশ রসায়ন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন দেশের বর্তমান সময়ের মেধাবী রাজনীতিক ড. হাছান মাহমুদ। ১৯৯৩ সালে ব্রিজে ইউনিভার্সিটির সমস্ত বিদেশী ছাত্রদের স্টুডেন্ট ফোরাম ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন অব ভিইউবি’র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পাশাপশি নির্বাচিত হন বেলজিয়াম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এসময় ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠে।

ছাত্রজীবনে তিনি প্রথমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম শহরের জামালখান ওয়ার্ড ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৮ সালের শেষার্ধে চট্টগ্রাম সরকারী ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৮১ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৭ সালে সামরিক শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ে তিনি গ্রেফতার হন। পরে ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তুখোর বক্তা হাছান মাহমুদ। তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে নব্বই দশকের শুরুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য বিপুল বিজয় লাভ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়ে যাওয়ার কারণে সেই নিবার্চনে প্রার্থী হতে না পারলেও তিনিই ছিলেন সমস্ত প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ও ছাত্রদলের সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান। আশির দশকের শুরুতে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন হাছান মাহমুদ। ১৯৯২ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য মনোনীত হন হাছান মাহমুদ।

২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী জরুরি অবস্থায় যখন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে সামরিক সমর্থিত সরকার গ্রেফতার করে তখন ড. হাছান মাহমুদ দলীয় সভাপতির মূখপাত্র হিসেবে অকুতোভয়ে কাজ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কারারুদ্ধ শেখ হাসিনার পক্ষে গণমাধ্যমে সরব ভূমিকা পালন করে দেশজুড়ে পরিচিতি পান। তখন থেকেই তাঁর সাহসী ভুমিকা দলের সকল কর্মী ও সমর্থকদের কাছে প্রশংসিত হয়ে আসছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত ড. হাছান মাহমুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছেন পরিবেশ বিজ্ঞান বিষয়ে। এর আগে পরিবেশ বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ স্টাডিস বিষয়ে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এবং নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন তিনি। ইউরোপীয়ান ইনস্টিটিউট ফর স্ট্রেটেজিক স্টাডিস, ব্রাসেলস, বেলজিয়ামে ভিজিটিং ফেলো এবং একাডেমিক বোর্ড মেম্বার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন হাছান মাহমুদ।

চট্টগ্রামের খ্যাতিমান আইনজীবী প্রয়াত নুরুচ্ছফা তালুকদারের জ্যেষ্ঠ সন্তান ড. হাছান মাহমুদের জন্ম ১৯৬২ সালের ৫ জুন চট্টগ্রামে। তার বাবা চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং দুই মেয়াদে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাবলিক প্রচিকিউটর ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ড. হাছান মাহমুদ দুই কন্যা ও এক ছেলের জনক। রাজনীতি ও সামাজিক জীবনে অনেক বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে আজকের অবস্থানে উঠে এসেছেন তিনি।

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনৈতিক জীবনে তিনি বারবার মৌলবাদী অপশক্তি ও স্বাধীনতা বিরোধীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমনকি কয়েকবার তার প্রাণনাশেরও চেষ্টা চালিয়েছিল মৌলবাদি গোষ্ঠি ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা। ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। এখনো তার শরীরে ৪০টির মতো স্প্রিন্টার সে হামলার দুঃসহ স্মৃতি বহন করে চলছে। কিন্তু কোনও রক্তচক্ষু হাছান মাহমুদকে তার সংগ্রামের পথ থেকে পিছু হটাতে পারেনি। ড. হাছান মাহমুদের মতো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মেধার বহুমাত্রিক সমন্বয় বর্তমান সময়ে খুব কম সংখ্যক রাজনীতিবিদের মাঝে দেখা যায়।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭ আসনে বিএনপির তৎকালীন হেভিওয়েট নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হন হাছান মাহমুদ। এরপর প্রথমে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং ৬ মাস পর পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী এবং তিন বছরের মাথায় এই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ড. হাছান মাহমুদ।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি এমপি নির্বাচিত হন এই আসন থেকে। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭ সংসদীয় আসনে পুনরায় হ্যাট্রিক বিজয় অর্জন করেন হাছান মাহমুদ।

এরপর দ্বিতীয়বারের মতো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্যমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন ড. হাছান মাহমুদ। ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বন পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপরিত দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

এর আগে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে দেশে ফিরে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। এরপর ২০০১ সালের অক্টোবরে যোগ দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে। অল্পদিনের মধ্যেই ২০০২ সালে আওয়ামীলীগের সম্মেলনে তিনি দলের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সে দায়িত্ব পালন করেন ড. হাছান মাহমুদ। ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামীলীগ সভানেত্রীর বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করেন বিশ্বস্ততার সাথে। এরপর ড. হাছান মাহমুদ পরপর দুই কমিটিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষতার সাথে। বর্তমানে যুগ্ম সম্পাদকের পাশাপাশি দলের অন্যতম মূখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ডা. আফছারুল আমীন

নগরীর দক্ষিণ কাট্টলীর সম্ভ্রান্ত পরিবার মরহুম ডা. ফজলুল আমীন ও মরহুমা হাজেরা খাতুনের বড় ছেলে ডা. আফছারুল আমীন। ৬ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে আফছারুল আমীন দ্বিতীয় এবং ভাইদের মধ্যে সবার বড়। তবে তাঁর এক ভাই শিশুকালে পানিতে পড়ে মারা যান। বর্তমানে তাঁরা ৫ ভাই ও চার বোন। আফছারুল আমীনের অন্যান্য ছোট ভাইয়েরা হলেন- মো. মোরশেদুল আমীন, ইঞ্জিনিয়ার মো. খোরশেদুল আমীন, মো. এরশাদুল আমীন ও ডা. মো. আরিফুল আমীন। তাদের মধ্যে মোরশেদুল আমীন ও মো. এরশাদুল আমীন পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করেন। তৃতীয়জন ইঞ্জিনিয়ার মো. খোরশেদুল আমীন কানাডা প্রবাসী। সবার ছোট ডা. মো. আরিফুল আমীন বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার নেতা। ডা. আফছারুল আমীন দুই সন্তানের জনক। এরা হলেন-মো. ফয়সল আমীন ও মো. মাহিদুল আমীন। বড় ছেলে মো. ফয়সল আমীন এমবিএ পড়ছেন। পাশাপাশি ঢাকায় একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি বিবাহিত। ছোট ছেলে মো. মাহিদুল আমীন এমবিবিএস সম্পন্ন করেছেন। ডা. আফছারুল আমীনের সহধর্মিনী ডা. কামরুন্নেছা ঢাকা সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক।

নগরীর দক্ষিণ কাট্টলীস্থ বাড়িতে কৈশোর কেটেছে ডা. আফছারুল আমীনের। লেখাপড়ার পাশাপাশি নানা খেলাধূলায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। ফুটবল খেলায় খুব পারদর্শী ছিলেন। সে সময়ে এলাকায় একজন ভাল খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন তিনি কলেজ ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন ছিলেন।

ডা. আফছারুল আমীনের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি স্থানীয় প্রাণহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পঞ্চম শ্রেণি পাশের পর ভর্তি হন নগরীর কলেজিয়েট স্কুলে। সেখান থেকে ১৯৬৭ সালে এসএসসি পাশ করেন। এরপর ভর্তি হন সরকারি সিটি কলেজে। এ কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে এইচএসসি পাশ করেন। ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। ১৯৭৭ সালে এবিবিএস পাশের পর যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত টানা চাকরি করে বছরের শেষের দিকে ইস্তফা দেন। জড়িত হন পারিবারিক ব্যবসায়।

চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালীন ডা. আফছারুল আমীন রাজনীতিতে যুক্ত হন। ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হলেও কলেজ শাখায় কোন পদ-পদবি পাননি। অবশ্য তিনি কোন পদ দাবিও করেননি, কারণ ওই সময়ে তাঁর আপন ছোট চাচা সিরাজুল আমীন ছিলেন সিটি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি। চট্টগ্রাম মেডিকেলে পড়াকালীন তিনি কলেজ শাখার মুজিববাদী ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু’র ৬ দফা, ১১ দফাসহ বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ’তে (বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন) জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮৩ সালে সরকারি চাকরি ছাড়ার পর আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তিনি সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে জড়িয়ে পড়েন নগর আওয়ামী লীগে। ১৯৯২ সালে নগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তিনি সমাজকল্যাণ সম্পাদক এবং ১৯৯৬ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তী কমিটিতে তিনি যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।

ডা. আফছারুল আমীন জাতীয় নির্বাচন করেন ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে। প্রথম দুইটি নির্বাচনে পাঁচ লাখেরও বেশি ভোট পেয়ে সামান্য ভোটের ব্যবধানে হেরে গেলেও ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ (পাহাড়তলী, হালিশহর, খুলশী, ডবলমুরিং ও পাঁচলাইশ আংশিক) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনে জয়লাভের পর তিনি মন্ত্রীত্ব পান। প্রথমে পান নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব। পরবর্তীতে দপ্তর বদল হলে তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

ডা. আফছারুল আমীন মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন শহরে ঝাউতলা, টাইগারপাসসহ বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের হামলায় আহতদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করান। ওই সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ছাড়াও নিরাপদে অস্ত্র রাখা হতো।

ডা. আফছারুল আমীনের পিতা ডা. ফজলুল আমীন রাজনীতি, সামাজিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও এলাকায় শিক্ষা প্রসারে ব্যাপক অবদান রাখেন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁরাও শিক্ষা প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন। দক্ষিণ কাট্টলীস্থ পিএইচ আমীন একাডেমি প্রতিষ্ঠায় ডা. ফজলুল আমীন শুধু অর্থ দিয়ে নয়, কঠোর পরিশ্রমও করে গেছেন। তাঁর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে যাচ্ছেন ডা. আফছারুল আমীনসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।

ডা. আফছারুল আমীন নবম, দশম, একাদশ সংসদের নির্বাচিত সদস্য। তিনি ২০১৪ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি অত্যন্ত সৎ, নির্লোভ, নির্মোহ মানুষ হিসেবে পরিচিত। স্পষ্টভাষী মানুষ হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপনের অধিকারী আফছারুল আমীন এমপি, সংসদীয় কমিটির সভাপতি হয়েও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেন। তিনি গানম্যান রাখেন না। গাড়িতে ব্যবহার করেন না সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রাপ্য পতাকা। এমনকি গাড়িতে সংসদ সদস্যের স্টিকার পর্যন্ত লাগান না তিনি।

পাঁচ বছর মন্ত্রী, প্রায় ১২ বছর ধরে এমপি। কিন্তু একটুও পরিবর্তন হয়নি তাঁর বাড়ি, অফিসঘর। দেওয়ানহাটের মোড়ের চেম্বারটা এখনো আগের মতো। জীর্ণশীর্ণ কক্ষ, পুরোনো পর্দা, নেই কোনো সাজসজ্জা। ছোট্ট এই অফিস ঘরেও বড় বেশি সাদামাটা, সপ্রতিভ আফছারুল আমীন। কেবল একটি অনাড়ম্বর টেবিল ঘিরেই তাঁর জগৎ।

চিকিৎসক পিতার পথ ধরে এই চেম্বারের জীর্ণশীর্ণ চেয়ারে বসে সবসময় তিনি মানুষের সেবা করেছেন। বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন নিজ এলাকাসহ চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষকে।

নুরুল ইসলাম বি.এসসি

তৃণমূল থেকে উঠে আসা চট্টগ্রামের আরেক রাজনীতিবিদের নাম নুরুল ইসলাম, যিনি নুরুল ইসলাম বিএসসি নামে পরিচিত। নুরুল ইসলাম বি.এসসি ৩ জানুয়ারী ১৯৪৩ সালে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও এলাকার এক সম্ভ্রান্ত ও মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা তজুমিয়া ছিলেন একজন ধার্মিক ও দানশীল ব্যক্তি। মায়ের নাম হাজেরা খাতুন।

রাজনীতির পথে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল ছাত্রজীবনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রলীগে যোগদান করেন। ‘৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলনে তখনকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র নুরুল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের মিছিলে সামিল হয়ে লালদিঘির ময়দানে মিছিল করেছিলেন।

১৯৬৭-৬৯ পর্যন্ত ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রলীগে। একাত্তরের রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা নুরুল ইসলাম বিএসসি ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যুক্ত হন। বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

নুরুল ইসলাম বি.এসসি চট্টগ্রাম এনএমসি মডেল হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি এবং বিএসসি পাস করেন। শিক্ষকতা পেশা দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়। এরপর তিনি যোগ দেন চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে। কাস্টমসের চাকরি ইস্তফা দিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। সততা. অধ্যবসায়, শ্রম, একনিষ্ঠতা তাকে দেশের অন্যতম শীর্ষ উদ্যোক্তায় পরিণত করে।

১৯৯১, ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নিবাচনে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী আসন থেকে নৌকা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যথাক্রমে বিএনপির প্রয়াত সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও মোরশেদ খানের কাছে পরাজিত হন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ শিল্পপতি নুরুল ইসলাম বি.এসসি। ২০০১ সালেও মনোনয়ন চান। কিন্তু মনোনয়ন দেওয়া হয় দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সহ সভাপতি কুয়েতের বর্তমান রাষ্ট্রদূত এসএম আবুল কালামকে।

২০০৮ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নুরুল ইসলাম বিএসসি। ২০১৪ সালে দলীয় মনোনয়ন না পেলেও ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই টেকনোক্রেট মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। দায়িত্ব পান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক র্কমসংস্থান মন্ত্রণালয়ের।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে অন্যদের মতো তিনিও পদত্যাগ করেন মন্ত্রীসভা থেকে। এরপর আশা করেছিলেন অন্তত এমপি পদটা সাথে নিয়ে চিরবিদায় নিবেন। কিন্তু তার সেই আশা পূরণ হয়নি। তার আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় মহিউদ্দিনপুত্র ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে। দলীয় প্রধান ফের মুল্যায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন বটে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। ৭৮ বছর বয়সী নুরুল ইসলাম বি.এসসি স্ত্রী-সন্তান, নাতি-নাতনিদের নিয়ে এখন জীবনের শেষ সময়টুকু পার করছেন।

চট্টগ্রামে তিনি ২৭ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ৩২টি গ্রন্থ রচনা করেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখেন। তার গ্রন্থ সমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সংকটে আবর্তে বাংলাদেশ, রাজনীতির এপিট ওপিট, চট্টগ্রামের মানুষ ও সংস্কৃতি, আমার দেখা রাজনীতি, আত্মঘাতী রাজনীতির ধারা, সংস্কার মাইনাস টু, মুক্তচিন্তা।

মোছলেম উদ্দিন আহমেদ

বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম কধুরখীল গ্রামের কাজী মো. নকী বাড়ির মরহুম মোশারফ উদ্দিন আহমদের সন্তান মোছলেম উদ্দিন আহমেদ। ১৯৪৮ সালের ১ জুন জন্মগ্রহণ করা মোছলেম উদ্দিন রাজনৈতিক মাঠের কর্মী হিসেবেই পরিচিত। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। বর্তমানে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী মোছলেম উদ্দিন আহমেদ সরকারি মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্রবস্থায় প্রথমবার কারাবরণ করেন।

১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম শহর শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন তিনি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম জেলা (দক্ষিণ) যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত জেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন মোছলেম উদ্দিন। ১৯৮৭ সালে বোয়ালখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে চারদফা চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সাল থেকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়ে এখনো সে পদে বহাল আছেন।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দুইদফা ওয়ার্ড কমিশনার হওয়া ছাড়া রাজনৈতিক জীবনে পরবর্তীতে বড় প্লাটফর্মে জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন ছিল মোছলেম উদ্দিনের। এর আগে দুদফা (১৯৯৬, ২০০১) জাতীয় নির্বাচনে পটিয়া আসন থেকে মনোনয়ন পেলেও নির্বাচিত হতে না পারার দুঃখ দীর্ঘদিন পুড়িয়েছে বর্ষীয়ান এই নেতাকে। শেষ দুটি নির্বাচনে বোয়ালখালী আসন থেকে মনোনয়ন চাইলেও ব্যর্থ হন। সাংসদ মঈনউদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুর পর দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা মোছলেম উদ্দিনের উপর আস্থা রাখেন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো সংসদে যাওয়ার সুযোগ হয় ৭৩ বছর বয়সী এই রাজনীতিকের।

আ জ ম নাছির উদ্দীন

আ জ ম নাছির উদ্দীন চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুলে পড়ার সময়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। বিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে যোগ দেন উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মিছিলে। আ জ ম নাছির উদ্দিন ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি এবং একই সাথে নগর ছাত্রলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে খন্দকার মোস্তাক সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মিছিল-মিটিং করেন আ জ ম নাছির উদ্দীন। এসময় তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে সবে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন।

১৯৮০ এবং ১৯৮২ সালে চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পালন করেন নাছির। ১৯৮৩ এবং ১৯৮৫ সালে পর পর দুবার বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। আ জ ম নাছির ১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হন। এরপর দীর্ঘদিন দলীয় কোনো পদে থাকতে না পারলেও নভেম্বর ২০১৩ সালে নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। সেই কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে মেয়র নির্বাচিত হন আ জ ম নাছির উদ্দীন।

দীর্ঘকালীন ক্রীড়া সম্পৃক্ততার কারণে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে আ জ ম নাছির উদ্দীন বেশ পরিচিতি লাভ করেন। তিনি চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

আ জ ম নাছিরকে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের দুর্দিন, দুঃসময়ের নেতা বলা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যা-পবরর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নাম উচ্চারণ যখন কঠিন ছিল তখন তিনি চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের পতাকা উড়িয়েছেন। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জামায়াত শিবিরকে উৎখাত করে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতি ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এজন্য বারবার জামায়াত-শিবিরের ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হন তিনি। চার চারবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন আ জ ম নাছির। চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য বারে বারে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন।

এজন্য বিভিন্নভাবে বিএনপি ও জামায়াত সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছিল তাকে। ক্লিনহার্ট অপাাশেন ও যৌথবাহিনীর অপারেশনের নামে আ জ ম নাছির উদ্দীনকে বিএনপি জামায়াত জোট সরকার চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই অল্পের জন্য রক্ষা পান তিনি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ইস্যুতে ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়া আ জ ম নাছিরকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখান থেকেই ধরতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে নির্দেশে দিয়েছিলেন।

এসময় পাহাড়-অরণ্যে, পানিতে ভেসে ছদ্মবেশ ধারণ করে আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছিল আ জ ম নাছির উদ্দীনকে। আ জ ম নাছিরের বদৌলতে এখনো চট্টগ্রামের উল্লিখিত তিনটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের পতাকা উড়ছে পত পত করে। কেবল বিএনপি-জামায়াত জোট নয়, রাজনীতিতে তাকে টিকতে হয়েছে প্রতিনিয়ত স্বীয় দলের রাজনৈতিক গ্রুপ ও প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে।

খোরশেদ আলম সুজন

১৯৭০ সালে ৮ম শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ে বাঙালি সংস্কৃতি পদদলিত করে পাকিস্তানি ভাবধারা ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘পাকিস্তান : দেশ ও কৃষ্টি’ শীর্ষক পাকিস্তানি সংস্কৃতি। আজকের মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও সদ্য নিযুক্ত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন তখন ৮ম শ্রেণীর ছাত্র। মৌলবাদী সংস্কৃতি, শক্তির বিরুদ্ধে সেই যে মাঠে নামা, রাজনীতির নানা পদ, কন্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে তিনি এখনো সেই মাঠে, অবিরত ছুটছেন মানুষের অধিকার আদায়ে।

খোরশেদ আলম সুজন ১৯৭০ সালে কাট্টলী স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় ছাত্রলীগে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত বাঙালি সৈন্যদের সেবাশুশ্রুষার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রামে ছোট্ট অংশগ্রহণ ছিল খোরশেদ আলম সুজনের। সেই অংশগ্রহণে ঈর্ষান্বিত হয়ে বিহারীরা তাকে দুইবার ধরে নিয়ে গিয়েছিল হত্যা করার জন্য। পরবর্তীতে এলাকাবাসী গিয়ে তাকে মুক্ত করে নিয়ে আসে।

১৯৭৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর কাট্টলী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ অবিভক্ত ডবলমুরিং থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম সরকারী মুসলিম ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে মহসিন কলেজ) ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সদস্য নির্বাচিত হন সুজন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সময় চট্টগ্রাম সরকারী উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের ছাত্র ছিলেন সুজন। ১৫ আগস্টের সেই দিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তার নেতৃত্বে চট্টগ্রামে প্রথম একটি প্রতিবাদী মিছিল বের হয় আন্দরকিল্লা থেকে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর চট্টগ্রামের মিউনিসিপ্যাল বিদ্যালয় মাঠে প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করেন একুশে উদযাপন পরিষদ নাম দিয়ে।

১৯৭৬ সালে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন সুজন। ভর্তি হয়েই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগকে সংগঠিত করেন। মাত্র ১৩ জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু। ১৯৭৬-৭৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সুজন। পরবর্তীতে ১৯৭৯-৮২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর উচ্চ রাজনৈতিক স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি সায়েন্সে। ১৯৮০-৮২ সালে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। ১৯৮২-৮৪ সালে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৮৬-৮৮ সালে জাতীয় ছাত্রলীগের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন খোরশেদ আলম সুজন।

এরপর মজুরী কমিশন আন্দোলনসহ বিভিন্ন শ্রমিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন সুজন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে দুইবার জেল খাটেন তিনি। ১৯৮৮-৯০ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সিবিএ ননসিবিএ সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত হন। ১৯৯০-৯৮ সালে চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী সংগঠনের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শিল্প ও বানিজ্য উপকমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের অসহযোগ আন্দোলনে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার নির্দেশে চট্টগ্রাম বন্দর অবরোধসহ অসহযোগ আন্দোলন সফল করেন সুজন।

‘তোমার রক্তে রঞ্জিত শস্যশ্যামল এই বাংলায়, ভূলিতে পারিনি, ভুলিনি তো আমরা’ – ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর এই এপিটাফটি লিখেছিলেন চট্টগ্রামের তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা খোরশেদ আলম সুজন। ১৪শ’ টাকা খরচ করে চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জের ‘পাথর বিতান’ থেকে এটি খুদাই করে রাখেন তিনি। তার সেটিই বঙ্গবন্ধুর কবরের প্রথম এপিটাফ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

কেবল ওই এপিটাফই নয়, বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে অসংখ্য স্লোগান বানিয়েছেন তিনি, যা পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক দামামা, মিছিল-মিটিংয়ে ব্যবহৃত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা পরবর্তী সময়ে সামরিক জান্তার নিপীড়ন ও হত্যা নিয়ে সাহিত্যে প্রথম প্রতিবাদ আবুল ফজলের ছোটগল্প ‘মৃতের আত্মহত্যা’। তুমুল জনপ্রিয় সাহিত্য পত্রিকা সমকাল ছিল তখন লেখক-সাংবাদিক সৃষ্টির পাঠশালা, আতুরঘর। ‘মৃতের আত্মহত্যা’ গল্পটি ছাপার অপরাধে তৎকালীন সরকার সমকাল নিষিদ্ধ করে দেয়।

শিক্ষাবিদ আবুল ফজল বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে গল্প লিখেন মৃতের আত্মহত্যা। সেদিন সুজনই সেই গল্পটি ‘শব্দ হবে গোলাপ’ নামক কবিতা পত্রিকায় ছাপিয়ে ১০ হাজার কপি বিলি করেন ঘরে ঘরে। দেশে তখন মিলিটারি জান্তার ভয়াবহ নিপীড়নমূলক অপশাসন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত কারফিউ দেয়া হচ্ছে। প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ। জনমনে আতংক। বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেল হত্যার ঘটনা মানুষকে বিমূঢ় ও স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এক কথায় সামরিক কর্তাদের বুট এবং ব্যাটনের নিচে তখন সংবিধান, সকল মানবিক বোধ, মুক্তিযুদ্ধ সব।

ঝুঁকিপূর্ণ ঐ সময়ে ছাপানো হয়েছিল শিক্ষাবিদ আবুল ফজলের দুঃসাহসিক ছোট গল্প ‘মৃতের আত্মহত্যা’। আর সেটি ছাপার অপরাধে সমকাল নিষিদ্ধ হওয়ার পর নতুন করে ছাপিয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটি পালন করেছিলেন সুজন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধের নেশায় বুঁদ হয়ে এধরনের অনেককিছুই করেছেন তরুণ বয়সে। প্রতিবাদি আন্দোলনের সেই পরম্পরা বজায় রেখেছেন সকল রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলনে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, মৃত্যু উপত্যকা থেকে ফিরে আসেন বারবার। বন্দর অবরোধ করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। কনভেনশনাল আর্মির মতো যুদ্ধ করতে হয়েছে সেখানে।

১৯৯০ সালের ১০ নভেম্বর নুর হোসেন যখন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়, তখন সুজন তার থেকে মাত্র ১ হাত দূরে। সেদিন তিনিও মারা যেতে পারতেন। নূর হোসেনের নির্মম মৃত্যুর পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকর্মীদের সুজনের আহ্বান ছিল, কাল সূর্য উঠার পর থেকে স্বৈরাচারের প্রেতাত্মাদের যেখানেই দেখা যাবে সেখানেই যেন আক্রমণ শুরু করা হয়।

২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জনদুর্ভোগ লাঘবে জনতার ঐক্য চাই শীর্ষক নাগরিক উদ্যোগ নামক সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। যার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নাগরিক সমস্যা এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করেন সুজন। খোরশেদ আলম সুজন প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিশ্বস্তজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে আসীন ছিলেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি।

এম রেজাউল করিম চৌধুরী

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র যু্গ্ম সাধারণ সম্পাদক ও স্থগিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরীর রাজনীতিতে হাতেখড়ি স্কুলজীবন থেকেই। তৃণমূল থেকে রাজনীতির নানা ধাপ অতিক্রম করে আজকের পর্যায়ে উঠে এসেছেন তিনি।

১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘি ময়দানে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুসলিম হাই স্কুলের তৎসময়কার ৭ম শ্রেণীর ছাত্র রেজাউল করিম চৌধুরী শশ্রুমণ্ডিত বঙ্গবন্ধুকে দেখে এবং তার ভাষণ শুনে মুগ্ধ হন। সেই থেকে বঙ্গবন্ধুর ভক্ত হয়ে যান এবং ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে যোগ দেন।

চট্টগ্রামের প্রাচীন জমিদার বাড়ি বহদ্দার বাড়ির সন্তান রেজাউল করিমের বাবা প্রয়াত হারুন-অর-রশীদ চৌধুরী ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা ও দাদা ছালেহ আহমদ ছিলেন ইংরেজ শাসিত ভারত এবং পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামের একজন খ্যাতিমান আইনজীবী ও চট্টগ্রামে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত বিলুপ্ত কমরেড ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি পাকিস্তান আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরিবারের বড় ভাই অধ্যাপক সুলতানুল আলম চৌধুরী ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯৫৪ সালের যুক্ত ফ্রন্ট নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার পূর্ব পুরুষেরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ২৩টি মসজিদ প্রতিষ্ঠাসহ অসংখ্য জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। যার কারণে এলাকার জনসাধারণ এখনও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন খ্যাতিমান ঐতিহ্যবাহী বহদ্দার পরিবারকে।

তাঁর পরিবারের পূর্ব পুরুষেরা এলাকায় শিক্ষার প্রসারের জন্যে ১৮২০ সালে বহদ্দারহাটে নিজস্ব জমির উপর প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব ষোলশহর প্রাথমিক বিদ্যালয়। উক্ত বিদ্যালয় থেকে ১৯৬২ সালে ৫ম শ্রেণী এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাই স্কুল থেকে এস.এস.সি পাশ করেন রেজাউল করিম চৌধুরী। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর অব আর্টস ডিগ্রী অর্জন করে আইন বিষয়ে পড়াশোনার জন্যে ভর্তি হন রেজাউল করিম। কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সামরিক দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ লড়াইয়ে নেমে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারেননি রেজাউল করিম চৌধুরী।

রেজাউল করিম চৌধুরী ১৯৬৯-১৯৭০ চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, ১৯৭০-১৯৭১ সালে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৭২-১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি হন। এরপর ১৯৭০ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগ কার্যকরী কমিটির সদস্য, ১৯৭২-১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক, ১৯৭৩-১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, ১৯৭৬-১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৭৮-১৯৭৯ সালে আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।

এরপর ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করে ১৯৯২ আওয়ামী লীগে সম্পৃক্ত হন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগে কার্যকরী কমিটির সদস্য হওয়ার মধ্যদিয়ে। ১৯৯৭-২০০৬ সালে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং ২০০৬-২০১৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ২০১৪ সালে থেকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পদে নিয়োজিত হয়ে এখনো সেই পদে বহাল আছেন।

চট্টগ্রামের উন্নয়নের দাবীতে সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ ও চট্টগ্রামের দুঃখ নামে খ্যাত চাক্তাই খাল খনন সংগ্রাম কমিটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৮৩-১৯৯৪ সাল পর্যন্ত। এছাড়া চট্টগ্রাম বিজয় মেলা পরিষদের ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ১৯৯১-১৯৯২ সাল পর্যন্ত। চট্টগ্রাম বিজয় মেলা পরিষদের মহাসচিব ছিলেন ২০১১ সালে এবং ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন ২০১৪ সালে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৬ সালে সামরিক শাসনকে উপেক্ষা করে “সূর্যপথ” নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন রেজাউল করিম চৌধুরী। ‘বারুদ’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন তিনি। এছাড়া জামায়াত শিবিরের হিংস্রতা ও ধর্মীয় রাজনীতি (১৯৯৩), কালো টাকানির্ভর রুগ্ন রাজনীতি থেকে মুক্ত হতে হবে (২০১৪), ছাত্রলীগ ষাটের দশকে চট্টগ্রাম (২০১৬) এবং স্বদেশের রাজনীতি ও ঘরের শত্রু বিভীষন (২০১৯) নামে চারটি গ্রন্থ রচনা করেন রেজাউল করিম চৌধুরী।

এম এ সালাম

চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সালামকে বলা হয় পরিচ্ছন্ন রাজনীতির বরপুত্র। সৎ, ত্যাগী ও কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে সুনাম আছে তাঁর। তিনিও ওঠে এসেছেন তৃণমূল থেকে নিজ প্রচেষ্টায়।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এম এ সালাম ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ ছাত্রলীগের সদস্য, ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদস্য ও ১৯৮০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীলগের সহ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হওয়ায় টানা ২৮ বছর চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন সুনামের সাথে। ১৯৯২ সালে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে উপমহাদেশের প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী ইউনিটের (চট্টগ্রাম উত্তর জেলা) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এম এ সালাম। এরপর ১৯৯৬, ২০০৪, ২০১২ সালের ২৫ ডিসেম্বর পরপর আরও তিনবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন সালাম। ১৯৯৬ সালে ৩৯ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অল্প ভোটে হারেন এম এ সালাম।

গত বছরের ৬ ডিসেম্বর কাউন্সিলরদের বিপুল ভোটে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এম এ সালাম। তার প্রাপ্ত ২২৩ ভোটের বিপরীতে রাউজানের সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী পেয়েছেন ১২৯ ভোট।

এম এ সালামকে সরকার ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। ৫ বছরের মেয়াদ শেষে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মাঠপর্যায়ের এই নেতা।

ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার বড়হাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও সাতকানিয়া আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সুনীল কান্তি বড়ুয়ার ছেলে ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেয়া বিপ্লব বড়ুয়া যুক্তরাজ্যের উল্ভারহ্যাম্পটন ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। যুক্তরাজ্যের সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে বার ভোকেশনাল কোর্স (পিজিডিএল), যুক্তরাজ্যের কল টু দ্যা বার ‘দ্যা অনারেবল সোসাইটি অব গ্রেস ইন’ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ কমিটির সহ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ঘোষণাপত্র উপ পরিষদ (জাতীয় কাউন্সিল ২০১৬), অভ্যর্থনা উপ পরিষদ (জাতীয় কাউন্সিল ২০১৬) এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এর আগে ছাত্রজীবনে সক্রিয় ছিলেন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। সাতকানিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক, সাতকানিয়া থানা ছাত্রলীগের এডহক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। এমনকি দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রলীগ সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বিপ্লব বড়ুয়া। ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জাতীয় কমিটির সদস্য।

১৯৯২-১৯৯৪ সালে রাজনৈতিক কারণে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন উদীয়মান আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। ১৯৮৮ সালের ১২ এপ্রিল সাতকানিয়ায় জামাত-শিবিরের সশস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। এরপর ১৯৯৪ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত অবস্থায় পুলিশের হামলায় আহত হন। পরে ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমির বইমেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তৎকালীন অবৈধ প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আগমন প্রতিহত করতে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন।

২০০২ সালে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করার কারণে খালেদা জিয়ার জোট সরকার বাংলাদেশ টেলিভিশনের বার্তা বিভাগের প্রযোজক পদ থেকে বে-আইনীভাবে চাকরিচ্যুত করে বিপ্লব বড়ুয়াকে।

ভয়াবহ ২১ আগস্ট বোমা হামলার পর লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বিধানের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের কাছে পত্র প্রেরণ করে দলের দুঃসময়ের ভূমিকা রাখেন বিপ্লব।

বিতর্কিত ১/১১ এর সময়ও রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ২০০৭ সালের ১/১১ এর পরবর্তী সময়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে ব্রিটিশ সরকার ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন লাভের জন্যে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন তিনি। বিশেষ করে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের কাছে ই-পিটিশন প্রদানে অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন চট্টগ্রামের এই কৃতি সন্তান।

২০০৮ ও ২০১৪ সালে নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় মিডিয়া সেন্টারে অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় বাংলাদেশ সফরকারী বিদেশী সাংবাদিকদের আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে যোগাযোগ ও সহযোগিতা প্রদান করেছিলেন নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে।

চীনের সাথে দল ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে প্রশংসিত হন। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে চীন সফর করেন। এর পরের বছর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অনূর্ধ্ব ৪০ নেতাদের নিয়ে প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে চীন সফর করেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সাথে চীন সফরে যান বিপ্লব বড়ুয়া।

২০১৬ সালের জুন মাসে সিআরআই-এর প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবেও চীন সফর করেন। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৪ দলের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে চীন সফর করেন ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া।

২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের আমন্ত্রণে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দের সফরকালে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের সাথে চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তোলেন এই নেতা।

আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) এর সাথে বিভিন্ন কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বিপ্লব বড়ুয়া।

যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর রায়ের পর সারাদেশে জামাত-বিএনপি পরিচালিত সাম্প্রদায়িক হামলার বিবরণী বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের দূতাবাসে উপস্থাপন এবং এই নিয়ে জেনেভায় জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলসহ ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা এবং তাইওয়ানে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করে প্রশংসা কুড়ান চট্টগ্রামের এই মেধাবী সন্তান।

শুধু তাই নয়, ব্যারিস্টার বিপ্লব ২০১২ সালে রামুর বৌদ্ধ পল্লিতে হামলার পর রামুতে একটানা ১০ দিন অবস্থান করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ শান্তি সম্মেলন অয়োজনে সদস্য সচিব হিসেবে কাজ করেন তিনি।

১৯৯৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের অবৈতনিক গাইড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যারিসটার বিপ্লব বড়ুয়া স্বাধীন বাংলাদেশে বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে সর্বপ্রথম এবং একমাত্র ব্রিটিশ কোয়ালিফাইড ব্যারিস্টার। ২০০৯ সাল থেকে তার একক উদ্যোগে নিয়মিতভাবে জাতীয় শোক দিবস এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন হয়।

এসবের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া আওয়ামী লীগের উপ দপ্তর সম্পাদক এবং ২০১৯ সালে দপ্তর সম্পাদক মনোনীত হন। উপ সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন বিপ্লব বড়ুয়া।

আমিনুল ইসলাম আমিন

১৯৬৫ সালে জন্ম নেওয়া কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের আজকের উপ প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিনের রাজনৈতিক সচেতনতা মূলত ১৯৭৯ সাল থেকে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোতোয়ালী আসন থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এম এ মান্নান দেওয়ানবাজার ওয়ার্ডের খলিফাপাট্টি এলাকায় নির্বাচনী গণসংযোগ করতে আসেন।

গণসংযোগ শেষে আমিনের বাবা দেওয়ানবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলামের বাসায় চা খেতে যান। নির্বাচনে কৌতূলোদ্দীপক হয়ে ওঠা আমিন পরদিন বাসার পাশে খালি জায়গায় ফুটবল খেলছিলেন। এসময় এই ছেলে এদিকে এসো বলে আমিনকে ডাক দেন তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা (পরবর্তীতে জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি) বশির উদ্দিন মাহমুদ।

আমিনকে তিনি বললেন, এই নৌকার ক্যাম্পে (নির্বাচনী কার্যালয়) তুমি সহপাঠীদের নিয়ে প্রতিদিন বসবে। ছোলামুড়ি, পেঁয়াজু খাবে। স্থানীয় কিশোরদের নিয়ে এই কাজটি করতে গিয়ে নৌকার অফিস বেশ সরগরম রাখতে পেরেছিলেন আমিন। নির্বাচনে পরাজিত দেখানো হলো এম এ মান্নানকে। জিয়া সরকার পাশ করিয়ে আনলেন তার প্রার্থী আরিফ মঈনুদ্দীনকে। মন খারাপের এমন সময়ে বশির উদ্দিন মাহমুদ আমিনসহ কয়েকজনকে তার বাসায় নিমন্ত্রণ করেন।

নীহার রঞ্জন সরকারের ‘ছোটদের রাজনীতি’ বইটি পড়তে দেন আমিনকে। এর কয়েকদিন পর ছোটদের অর্থনীতি, আবুল ফজলের ‘মৃতের আত্নহত্যা’ পড়তে দেন। বই দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে তার সাথে একটা ভালো সম্পর্ক হয়ে যায় আমিনের।

সেই কিশোর বয়সে ১৯৮০ সালে আমিনুল ইসলাম বশির উদ্দিন মাহমুদের হাত ধরে বঙ্গবন্ধুবিদ্বেষী একটি মিটিং পণ্ড করে দিয়েছিলেন ইট-পাটকেল মেরে। এক বিকেলে বশির উদ্দিন ডেকে নিয়ে যান আমিনকে। যেতে যেতে রেয়াজউদ্দিন বাজারের কাছে দিয়ে দেখতে পান ডেমোক্রেটিক লীগ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে ১৫ আগস্টের দিনকে ‘নাজাত দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। মঞ্চে চার-পাঁচ জন লোক বসা, আর অডিয়েন্সে টোকাই শ্রেণীর ১৫-১৬ জন।

মাইকে বঙ্গবন্ধুকে গালাগাল করা হচ্ছে। মাথা খারাপ হয়ে গেলো আমিনের। বশির উদ্দিন হাতে কয়েকটি ইটভাঙা দিয়ে আমিনকে বললেন, মঞ্চ লক্ষ্য করে মারতে পারবে? বলতেই মেরে দিলেন আমিন। একের পর এক ইট ছুড়ে মারতে মারতে বশির উদ্দিন চিৎকার দিয়ে বললেন, কই তোরা, কাদেরিয়া বাহিনী আসছে। কাদেরিয়া বাহিনীর নাম শুনে পড়ি-মরি করে পালিয়ে গেলো সবাই।

১৯৮১ সালে ১৬ বছর বয়সে আমিনুল ইসলাম দেওয়ানবাজার ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন তিনি সোবহানিয়া আলীয়া মাদ্রাসার ছাত্র। চট্টগ্রাম আবাহনীর ক্লাবের সবচেয়ে কমবয়সী সদস্যও ছিলেন তখন। ১৯৮২ সালে ২১ ডিসেম্বর মহানগর ছাত্রলীগের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য করা হয় আমিনকে। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বর্তমান নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন। আ জ ম নাছিরের বাড়ির আঙিনায় এই কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। আ জ ম নাছিরই আমিনকে নগর ছাত্রলীগের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেন।

১৯৮৪ সালের ২৮ মে মুসলিম হলে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সম্মেলনে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তোফায়েল আহমেদকে প্রধান অতিথি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ছিলেন প্রধান বক্তা। সম্মেলনে রফিকুল ইসলাম বাচ্চুকে সভাপতি এবং গোলাম মোস্তফা বাচ্চুকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। আর আমিনুল ইসলামকে করা হয় সহ সাধারণ সম্পাদক।

বঙ্গবন্ধুর খুনী কর্নেল ফারুক ১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়ে চট্টগ্রাম আসেন মিটিং করতে। তখন আ জ ম নাছির উদ্দীনের প্রস্তাবনায় আমিনুল ইসলাম, প্রয়াত গোলাম মোস্তফা বাচ্চুসহ বেশ কয়েকজন সিদ্ধান্ত নেন এই মিটিং হতে দেবেন না। শেষ পর্যন্ত তারা পরিকল্পনা করেন মিটিং চলাকালে কাজীর দেউড়ি মোড়ে তাদের মিছিল ও বিক্ষোভ চলবে এবং তাদের মধ্যে মোটরসাইকেলে দু্ইজন গিয়ে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে ককটেল চার্জ করে মিটিং পণ্ড করে দেবেন।

ফিরিঙ্গি বাজারের শফিউল হাসান এবং শফিক আদনানসহ কয়েকজন মিলে ১৬টি ককটেল বানান তারা। যেগুলো সরবরাহ করার দায়িত্ব ছিল আমিনুল ইসলামের উপর। কর্নেল ফারুকের আগমনের কিছুক্ষণ আগে মিটিংয়ের কার্যক্রম শুরু করা হয়। ঠিক সেই সময়ই আলমাস সিনেমা হলের সামনে থেকে একটি মিছিল আসছিল কর্নেল ফারুকের মিটিংয়ে যোগ দেয়ার জন্য। সেই মিছিলের সামনে দুইটি ককটেল নিক্ষেপ করেন আমিনুল ইসলামরা। ভয়ে সবাই চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার ১৫ মিনিট পর তারা আবার জড়ো হন ঐ স্থানে। তখনই তারা জনতে পারেন কর্ণেল ফারুক মঞ্চে উঠতে যাচ্ছে। সাথে সাথে তিন বাইকে ৬ জন সার্কিট হাউসের সামনে গিয়ে ৭-৮ টি ককটেল ফাটিয়ে পণ্ড করে দেন সেই মিটিং।

দুবার প্রাণঘাতী হামলাও করা হয়েছিল আমিনুল ইসলামের উপর। প্রথমবার, ১৯৮৪ সালে ২৫ অক্টোবর লালদিঘির পাড়ে দলীয় মিটিংয়ের পর ১০-১২ জন শিবিরকর্মী ঘিরে ফেলে আমিনুল ইসলামকে। তার হাতে, পিঠে, মাথায় ছুরিকাঘাত করে তারা। নিজের প্রাণ বাঁচাতে সর্বশক্তি দিয়ে তাদের ধাক্কা দেন এবং পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। ভাগ্যক্রমে পুলিশের আশ্রয়ে বেঁচে যান আমিনুল ইসলাম।

দ্বিতীয় বারের হামলায় নিশ্চিত মৃত্যু থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেন তিনি। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যায়নরত অবস্থায় আ জ ম নাছিরের অনুরোধে মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিদর্শনে ১৯৮৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে আসেন আমিনুল ইসলাম। ঠিক সেই সময়ই রংপুরে এক শিবির কর্মীর মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে মিছিল বের করে চট্টগ্রাম শিবিরের কর্মীরা।

ঐদিন ঝামেলা এড়াতে মহসিন কলেজের অধ্যক্ষের অনুরোধে তেমন কোনো কার্যক্রম চালায়নি ছাত্রলীগ। পরদিন ২ অক্টোবরও পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অধ্যক্ষ মিছিল না করার অনুরোধ করলেও মিছিল করে ছাত্রলীগ। মিছিল কলেজের উপরের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের মুখোমুখি হয় শিবিরের মিছিল। ঠিক তখনই আমিনুল ইসলামের উপর ১৫-২০ জন শিবির কর্মী ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা করেন। পায়ে কোপ খেয়ে পড়ে যান তিনি। আত্মরক্ষার জন্য বহনকৃত পিস্তল বের করে সে সময় ফাঁকা গুলি করেন তিনি। এরপরই সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান আমিনুল ইসলাম।

১৯৮৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠান চলছিল প্রেসক্লাবের সামনে। আতাউর রহমান খান কায়সারের নির্দেশে সেই মিটিংয়ে উপস্থিত ফ্রিডম পার্টির চট্টগ্রামের সমন্বয়কারীকে মারধর করে সরিয়ে দেওয়ার কাজটিও করেছিলেন আমিনুল ইসলাম। এসময় তৎকালীন ছাত্রনেতা মফিজুর রহমান, সাইফুদ্দিন রবিও ছিলেন। ছাত্ররাজনীতির উত্তাল দিনগুরোতে আমিনুল ইসলাম এধরনের বহু ঝুঁকি নিয়েছিলেন আওয়ামী বিরোধী অপশক্তিকে রুখে দিতে।

এরই মধ্যে কৃতিত্বের সাথে দাখিল, ফাজিল, আলীম শেষ করেন আমিনুল ইসলাম। ফাজিলে মেধাতালিকায় ১৫ তম স্থান অধিকার করেন। এরপর ১৯৮৬ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসনে। একই সাথে হাদিসে (মাস্টার্স সমমান) ভর্তি হন ঢাকা আলীয় মাদ্রাসায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়নের সময় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ১৯৮৯ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য পদ লাভ করেন আমিনুল ইসলাম। ছাত্রলীগের এর পরের কমিটিতে গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক, পরবর্তী কমিটিতে সহ-সভাপতি এবং তার পরবর্তী কমিটিতে সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

২০০২ সালে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ কমিটির সহ সম্পাদক করা হয় আমিনুল ইসলামকে। তিনি যখন সহ সম্পাদক নির্বাচিত হন তখন ৬২ জন সহ সম্পাদকের মধ্যে ১৩ জনই সাবেক এবং তৎকালীন এমপি ছিলেন।

২০০৯ সালে উপ মহাদেশের প্রাচীন সংগঠন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন আমিনুল ইসলাম। এই কমিটিতে চট্টগ্রাম থেকে তখন স্থান পান ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও ড. হাছান মাহমুদ যথাক্রমে সদস্য এবং বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে। এরপর ২০১২ সালে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কমিটিতে পুনরায় সদস্য, ২০১৬ এবং ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সম্মেলনে পরপর দুইবার উপ-প্রচার সম্পাদক হন তিনি।

আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে ৫ বার চীন সফর করেছেন আমিনুল ইসলাম। এর মধ্যে একবার টিমের প্রধান ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, দুইবার টিম প্রধান ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। আর দুটির একটিতে টিম প্রধান ছিলেন ডাকসুর ভিপি আখতারুজ্জামান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু। এছাড়াও ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে ভারত সফর করেন আমিন। এসময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদরি সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন আমিনুল ইসলামসহ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।

আবদুচ ছালাম

আব্দুচ ছালাম চট্টগ্রাম মহানগরের মোহরা ওয়ার্ডের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। ১৯৫১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলার চান্দগাঁও থানার মোহরা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুর রশিদ একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। সৎ ব্যবসায়ী ও বিশিষ্ট সমাজসেবক হিসেবে তাঁর সুনাম চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে সবারই জানা। তাঁর শিক্ষা জীবনও উজ্জ্বল হয়ে আছে বেশ কিছু কৃতিত্বের স্বাক্ষরে। সাফল্যের সাথে কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সালে বাণিজ্য বিভাগে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১১তম স্থান অধিকার করে স্নাতক এবং ১৯৭৩ সালে ২০তম স্থান অধিকার করে হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করেই ব্যবসাকে পেশা হিসাবে বেছে নেন এবং সততা ও কঠোর পরিশ্রমকে পূঁজি করে বর্তমানে ওয়েল গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইতোমধ্যেই তিনি শিল্পখাতে অবদানের জন্য নবাব স্যার সলিমুলাহ স্বর্ণপদক লাভ করেছেন। তার ১৪ টি শিল্প প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১২০০০ কর্মকতা কর্মচারী নিয়োজিত আছেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠি ওয়েল গ্রুপ-এর প্রতিষ্ঠাতা আবদুচ ছালাম ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন ষাটের দশকে, যখন তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোয় বাঙালি জাতির সার্বিক বিকাশ রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল এবং বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ ও প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তির সংগ্রাম দানা বেঁধে উঠছিল। ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

আবদুচ ছালাম শুধু একজন ব্যবসায়ী কিংবা রাজনীতিকই নন একজন সমাজসেবকও। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন একাত্তরে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত হলে আব্দুচ ছালাম তাতে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন। একাত্তরের ষোল ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। গত শতাব্দির নব্বই দশকের শুরু থেকে স্বীয় এলাকা মোহরা ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তিনি শ্রেষ্ঠ সমাজসেবক হিসেবে জাতীয় দরগাহ মাজার সংস্কার সংরক্ষণ কমিটি কর্তৃক স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হন।

ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের এক পর্যায়ে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বিশেষ করে মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি এম এ মান্নান এবং সাধারণ সম্পাদক এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাদের একান্ত আগ্রহ ও ইচ্ছায় মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অভিষিক্ত হন আবদুচ ছালাম। তাঁকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সর্বসম্মতিক্রমে কার্যকরি কমিটিতে কোষাধ্যক্ষ পদে অন্তর্ভুক্ত করেন ২০০৫।

গত ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর যখন দলীয় মনোনয়নের প্রশ্ন আসলো এবং আওয়ামী লীগ তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হলো,তখন চট্টগ্রাম-৭ আসন থেকে সর্বাধিক ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হলেন আবদুচ ছালাম। তৃণমূলের এই রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ড চট্টগ্রাম-৭ আসন থেকে ছালামকেই দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। পরবর্তীতে জোট রক্ষার স্বার্থে জাসদ সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদলকে দেওয়া হয় সেই মনোনয়ন।

আবদুচ ছালামকে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিগত ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০০৯ চট্টগ্রাম উন্নয়নের মহান দায়িত্ব হিসাবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসাবে নিযুক্ত করেন। উক্ত পদে আসীন হওয়ার পর থেকে ছালাম চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিষ্টার সাথে বঙ্গকন্যার অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর হাত ধরে দৃশ্যমান হয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কতৃর্পক্ষের কর্মকাণ্ড। প্রায় দশবছর এই দায়িত্ব পালন করেন আবদুচ ছালাম।

মফিজুর রহমান

স্কুলে পড়া অবস্থায় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত জন মফিজুর রহমান। সাতকানিয়ার খাগরিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীতে পড়ার সময় ছাত্রলীগের বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি হন তিনি।

এরপর খাগরিয়া ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন মফিজুর রহমান। সাতকানিয়া থানা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ও সহ-সভাপতি পদেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

১৯৭৭ সালে এসএসসি পাশের পর গাছবাড়িয়া কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন মফিজুর রহমান। তখন কলেজ ছাত্রলীগের প্রথম আহ্বায়ক কমিটি গঠন হলে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান মফিজুর রহমান। এছাড়া কলেজ কমিটির সেক্রেটারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এ ছাত্রনেতা।

পরে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ও সহ সভাপতি পদেও দায়িত্ব পালন করেন মফিজুর রহমান। চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

এরপর চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের কার্যনিবাহী কমিটির সদস্য ও সহ সভাপতি হন। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে এরশাদ সরকারের পুলিশ বাহিনী যে লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে তাতে আহত হন মফিজুর রহমান।

১৯৮৯ সালের ২৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সভাপতি হন মফিজুর রহমান। এর পাঁচদিন পর ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচারি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ চট্টগ্রামে আসতে চাইলে তা প্রতিরোধের ঘোষণা দেয়া হয়। সেদিন পতেঙ্গা থেকে দেওয়ানহাট মোড় পর্যন্ত রাস্তায় নেমে পড়ে বিক্ষুব্ধ জনতা।

দেওয়ানহাট মোড়ে অবস্থান নিয়ে সেদিন এরশাদের চট্টগ্রামে আসা ঠেকাতে আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যান সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতা মফিজুর রহমান। একপর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে এরশাদ ফিরে যাচ্ছেন, এরপর আনন্দ মিছিল নিয়ে ফেরার পথে সবাইকে ঘিরে রেখে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে, সেদিন গুরুতর আহত হন মফিজুর রহমান, তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়।

এরপর মফিজুর রহমানকে মাথাসহ সারা শরীরে অমানবিকভাবে পিটিয়েছে পুলিশ, চিকিৎসাও পাচ্ছিলেন না তিনি। ডিটেনশন (আটকাদেশ অবস্থা) দিয়ে কারাগারে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল, তখন কোতোয়ালীর ওসিকে মফিজ বছিলেন, আমি তো ধনুষ্টংকার হয়ে মারা যাবো। এই যে এখানে ফুলে গেছে, শরীরের সব জায়গায় রক্তাক্ত। আমাকে একটু চিকিৎসা করান।

ওসি রাজী হলে তখন বোয়ালখালীর ডা. এম.এ মান্নান কারফিউ চলার মধ্যে গাড়িতে করে পাঁচলাইশে নিয়ে গিয়ে এটিএস ইনজেকশন পুঁশ করেন, অ্যান্টিবায়েটিক ওষুধ দেন। তারপর মামলা ও ডিটেনশন দিয়ে তাকে কারাগারে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। তখন গাড়ি ভাঙচুর, অরাজকতা সৃষ্টি, বিস্ফোরক আইনে তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়।

এরশাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে সেদিন মফিজুর রহমান এতটাই আহত হয়েছিলেন যে, গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল তিনি মারা গেছেন। স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করতে থাকায় তাকে গুলি করে মারার আদেশও ছিল পুলিশের কাছে। সে সময় পাঁচলাইশের এসি সাইফুল তাকে বাঁচিয়েছেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। পুলিশ বিদ্রোহের সময় সিপাহীরা উনাকে খুব মেরেছিল। উনার রুমে মফিজকে তালা মেরে রেখেছিলেন তিনি। সেখান থেকে মফিজ মহিউদ্দিন চৌধুরীকে ফোন করে বলেছেন, পুলিশ অভিযানে যাচ্ছে, আপনারা সরে যান।’

১৯৮৯ সাল থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মফিজুর রহমান। সে সময় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে প্রতিটি ওয়ার্ড কমিটির পাশাপাশি সেখানে আঞ্চলিক কমিটি ও ইউনিট কমিটি গঠন করেন তিনি। ছাত্রলীগের স্কুল কমিটি, ছাত্রলীগের উদ্যোগে স্কুলে লাইব্রেরি, স্কুলে ভর্তি সহায়তার জন্য গাইড বের করা, তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়াসহ ছাত্রকল্যাণমুখী নানা উদ্যোগ নিয়ে প্রশংসিত হন মফিজুর রহমান। এছাড়া তার সময়ে আহমদিয়া সুন্নিয়া ও ছোবহানিয়া আলীয়াসহ বিভিন্ন মাদরাসায় ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হয়।

দুই মেয়াদে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি সহ সভাপতি ছিলেন মফিজুর রহমান। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মফিজুর রহমানকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বোর্ড সদস্য করা হয় দুই বছরের জন্য। এরপর আরও দুইবছরের জন্য একই পদে তাকে নিয়োগ দেয় সরকার।

২০১৩ সালে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন মফিজুর রহমান।

### উত্তরাধিকার-রাজনীতি, চট্টগ্রাম স্টাইল