বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৭

ধর্ষণ কেন কমছে না?

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০, ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ


আমিনুল হক বাবু : একজন ধর্ষক চরম মাত্রার ঘৃণ্য অপরাধী। ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ। আর এই অপরাধ আমাদের সমাজে দিনের পর দিন ঘটে চলছে। ধর্ষকরা ধর্ষণ করে পুলক অনুভব করে, বিভৎস উল্লাসে মেতে উঠে। গ্রেপ্তার যদি হয়ও আইনের ফাঁকে কিংবা ম্যানেজ করে এক সময় জামিন নিয়ে নেয়। এরপর ফুলের মালা গলায় দিয়ে এলাকায় শোডাউন করে প্রবেশ করে। দ্বিগুণ বেগে হুমকি ধমকি দিতে থাকে ধর্ষিতাকে, সাথে তার পরিবারকেও।

ধর্ষণের ধরণে ও যেন এসেছে বিকৃত পরিবর্তন। স্বামীর সামনে স্ত্রীকে, মায়ের সামনে মেয়েকে, ভাইয়ের সামনে বোনকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে আবার আপনজনদের হাতেই ধর্ষিত হচ্ছে নারী কিংবা শিশু। ধর্ষণ করেই থামছে না কেউ কেউ, জানটাও নিয়ে নিচ্ছে।

আর ধর্ষিতা, আহা! কপাল পুড়ে তার। প্রথমে যায় থানায়, মৌখিকভাবে প্রমাণ করতে হয় সে ধর্ষণের শিকার, নয়তো অভিযোগ রেকর্ড করা দুঃসাধ্য। এরপর যেতে হয় ওয়ান স্টপ সেন্টারে, দিতে হয় পরীক্ষা, এ যেন আরেকবার ধর্ষণ! এরপর অপেক্ষা মেডিকেল প্রতিবেদনের। এরপর আদালতের বারান্দায়, ততদিন কী আর ধৈর্য থাকে? থাকলে এরপর তাকে প্রমাণ করতে হবে সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে কি না, আর এটা প্রমাণ করতে গিয়ে তাকে মুখোমুখি হতে হয় ধর্ষকের উকিলের একের পর এক প্রশ্নবাণে। এ যেন তাকে বারবার ধর্ষণ। সর্বশেষ বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা। সময় সময় পুলিশ রিপোর্টে ঘাপলা, প্রয়োজনীয় স্বাক্ষীর অভাব, সব মিলিয়ে অসহায় ধর্ষিতার পরিবারের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে যায়।

দেশে ধর্ষণ কেন কমছে না? কয়েকটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করলে বোঝা যাবে, কেন ধর্ষণ বেড়ে চলেছে।

ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ বিচারহীনতা বা বিচার বিলম্বিত হওয়া। দেখা যায়, একটা ধর্ষণের বিচার হতে দীর্ঘ সময় লাগে। এতে করে অর্থনৈতিক কারণে নির্যাতিতার পক্ষে মামলা চালানো সম্ভব হয় না। হয়রানি করতে থাকে উকিল, ধর্ষক পক্ষের লোকেরা। বাধ্য হয়ে অনেক সময় নির্যাতিতা আপস করে ফেলে, না হলে পদে পদে তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়।

ধর্ষণের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে হতাশা তিন স্তরের। প্রথমত, ধর্ষণের শিকার নারী স্বজন ও সমাজের ভয়ে মুখ খুলে বলতেই চান না যে তিনি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধের শিকার হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, যাঁরা দ্বিধা-সংকোচ কাটিয়ে বিচার চাইতে যান, তাঁরা বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দিক থেকে অত্যন্ত লাঞ্ছনাময় আচরণের শিকার হন, এমনকি প্রকাশ্য আদালতেও। তৃতীয়ত, মামলা দায়েরের পর থেকে আসামিদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, শারীরিক আক্রমণ ইত্যাদি চলে। তা ছাড়া ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ থেকে শুরু করে মামলার তদন্তপ্রক্রিয়ায় পুলিশের অদক্ষতা, আন্তরিকতাহীনতা, দুর্নীতিপ্রবণতা, নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি কারণে অধিকাংশ ধর্ষণ মামলায় আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হয় না বলে ধর্ষক ছাড়া পেয়ে যায়।

বাংলাদেশে ধর্ষিত নারীর সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়, যেন অপরাধের শিকার তিনি হননি, বরং ধর্ষিত হয়ে তিনি নিজেই অপরাধ করেছেন। ধর্ষণ সম্পর্কে আমাদের সমাজের এই সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি ধর্ষকদের বিচার ও শাস্তি দেওয়ার পথে এক মৌলিক প্রতিবন্ধকতা। পরিবারের আপনজন থেকে শুরু করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা পর্যন্ত সবাই ধর্ষণের শিকার নারীর সহমর্মী হয়ে তাঁর পাশে না দাঁড়ালে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া খুব কঠিন। তবে ধর্ষণের বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনি সহযোগিতা দেওয়া থেকে শুরু করে আইন প্রয়োগের প্রতি ধাপে দক্ষতা বাড়ানো এবং দুর্নীতি দূর করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া দরকার।

ধর্ষণের খবর আমরা রাখি কিন্ত শেষ পর্যন্ত কয়টা ঘটনার বিচার সম্পন্ন হয় সে খবর কি আমরা রাখি? কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের বিরুদ্ধে যেমন অসহযোগিতার অভিযোগ উঠে, আবার এটাও সত্যি অনেক সময় মিথ্যা ধর্ষণের অভিযোগের কারণে কোনটা প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পুলিশও বেকায়দায় পড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে ধর্ষণের মামলা তদন্তে পুলিশ যদি দলমত না দেখে আন্তরিকতার সাথে কাজ করে এবং আদালতে সত্য তথ্য উপস্থাপন করে তবে ধর্ষকের নিস্তার নেই।আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলা এর জলজ্যান্ত উদাহরণ।

এছাড়া আমরা ধর্ষককে বিভাজন করে ফেলি, ধর্ষণের শিকার মেয়েকে বিভাজন করে ফেলি তার সামাজিক অবস্থান দিয়ে, যার ফলে আন্দোলন গড়ে উঠছে না। আবার অনেকে মনে করে, আমার পরিবারের মানুষ যেহেতু নিরাপদে আছে, অন্যের যা হয় হোক। এই যে বিভাজনের চিন্তাধারা, তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অপরাধী যে দলের বা যে শ্রেণির হোক না কেন, তার পরিচয় হবে সে অপরাধী। সে বড়লোক না গরিব, শিক্ষিত না মূর্খ—তা দেখা উচিত নয়। কারণ সমাজের যে স্তরেই বাস করুক, তাতে তার অপরাধ কম হয়ে যায় না।

এদিকে সমাজে মাদকের এত প্রসার ছিল না আগে। বর্তমানে মাদক সহজলভ্য হয়ে গেছে। অপ্রিয় হলেও সত্য, সমাজের উঁচু তলার অনেকে এর সঙ্গে জড়িত। যুব সমাজকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে নিয়ে গেছে মাদক। শুধু যুব সমাজ নয়, কিশোর থেকে বয়স্ক—অনেকে আজ মাদকাসক্ত। ইয়াবা তো মুড়ির মতো বিক্রি হচ্ছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে করছে তা নয়, বরং ঘুষ দিয়ে বুক ফুলিয়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করছে। ফলে একজন মাদকাসক্ত ধর্ষণ করতে দ্বিধা করছে না। কারণ মাদকাসক্ত ব্যক্তির হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। এবং ধর্ষণ শেষে খুনও করছে। মাদকের নিয়ন্ত্রণ দরকার। না হয় ধর্ষণ কমবে না।

সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, ধর্ষকের সাথে সাথে তার পিতা-মাতা কিংবা ভাই-বোনের ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, এটা উচিত নয়। তবে যে তরুণ-যুবককে যে বা যারা ধর্ষক হয়ে উঠতে সহযোগিতা করেছে, আশ্রয়-প্রশ্নয় দিয়েছে তাদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। অনেক সময় দেখা যায় প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদ পায় ধর্ষক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা প্রশাসনের জন্য বিষয়টা আসলে খুবই বিব্রতকর। মনে রাখতে হবে ধর্ষকের মতো অপরাধীর কোন দল থাকতে পারে না।

এখন সময় এসেছে প্রতিটি ধর্ষণের দ্রুত বিচার করার। বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে বিচার ও ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এত বেশিসংখ্যক ধর্ষণের ঘটনা ঘটতে পারত না। বিলম্বিত বিচার ও বিচারহীনতার পরিবেশ ধর্ষণপ্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। তাই ধর্ষণের প্রতিটি মামলার দ্রুত বিচার ও জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। তবেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।

লেখক : সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী।