শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

রাঙ্গুনিয়ায় পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএমের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

| প্রকাশিতঃ ২ নভেম্বর ২০২০ | ৬:৫০ অপরাহ্ন


আবছার রাফি : চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় পল্লী বিদ্যুতের জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন, ভৌতিক বিল করা ও খুঁটি স্থাপনকে কেন্দ্র করে ইচ্ছে মতো টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ নানা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ উঠেছে, রাঙ্গুনিয়ায় নতুন সংযোগ থেকে শুরু করে মিটার স্থাপন, বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপন ও স্থানান্তর এবং ট্রান্সফরমার পরিবর্তনসহ প্রতিটি সেবার জন্য গ্রাহক থেকে উৎকোচ গ্রহণ করা হচ্ছে। ঘুষ না দিলে গ্রাহকরা বৈধ সেবা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে ঘুষ দিলে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দুর্নীতি, অনিয়মে আকণ্ঠ নিমজ্জিত রাঙ্গুনিয়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই হয় না। কর্মকর্তা-কর্মচারী, লাইনম্যান ও ঠিকাদার থেকে শুরু করে ‘টপ টু বটম’ প্রায় সবাই উৎকোচ বাণিজ্যে জড়িত; তাদের সঙ্গে রয়েছে স্থানীয় দালালচক্র। তাদের অবৈধ আয় থেকে মাসোহারা পেয়ে থাকেন ডিজিএম মোখলেছুর রহমান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নতুন বৈদ্যুতিক মিটারের আবেদন ফি ৫৬৫ টাকা হলেও রাঙ্গুনিয়ায় পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকের কাছ থেকে ৩ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মিটার স্থাপনের অনুমোদন পাওয়ার পরও সংযোগ স্থাপনের কাজ বন্ধ রাখার মাধ্যমে আগ্রহী গ্রাহকদের অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।

এদিকে, বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থানান্তরের আবেদন করার তিনমাস পর ডিজিএম মোখলেছুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি পত্র পাঠানো হয় জান্নাতুল ফেরদৌস রেখা নামে রাঙ্গুনিয়ার একজন গ্রাহকের কাছে। সেখানে খুঁটি স্থানান্তরের কাজের জন্য ৪৪ হাজার ১০০ টাকা দিতে বলা হয়।

খুঁটি স্থানান্তরের জন্য ১ হাজার ৭৫০ টাকা নির্ধারিত ফি পরিশোধের বিধান থাকলেও এক্ষেত্রে কোন খাতের জন্য এ বাড়তি টাকা দিতে হবে, তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই পত্রটিতে।

সেখানে আরও তিনটি ‘নিয়ম’ উল্লেখ করে বলা হয়, ‘লাইন স্থানান্তরে কোনও গাছপালা কাটার সমস্যা অথবা কোনও বাধা থাকলে তা আবেদনকারীকে সমাধান করতে হবে, স্থানান্তরের সময় বাধার কারণে লাইনরুট পরিবর্তন করতে হলে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হবে, বাধার কারণে লাইন স্থানান্তর সম্ভব না হলে জমাকৃত টাকা ফেরত দেওয়া হবে না।’

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, খুঁটি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সব সমস্যা গ্রাহককে সমাধান করতে হলে ৪৪ হাজার ১০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে কেন? পল্লী বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে সেটা উল্লেখ না করার কারণ হচ্ছে, সেখানে আপত্তিকর কিছু খাত আছে, আবার কিছু খাতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়। এখন এভাবে ভেঙে হিসাব দিলে গ্রাহক তা নিয়ে আপত্তি তুলবে স্বাভাবিকভাবে, তাই পৃথকভাবে হিসাব দেওয়া হয় না।

এদিকে, রাঙ্গুনিয়ায় মিটার রিডিং না দেখে ভৌতিক বিদ্যুৎ বিল করার অভিযোগ আছে পল্লী বিদ্যুতের বিরুদ্ধে। পদুয়া এলাকার বাসিন্দা মো. সোহেল বলেন, স্বাভাবিকের চেয়ে ২ থেকে ৩ গুণ বেশি বিল পেয়ে প্রতিনিয়ত বিপাকে পড়ছেন গ্রাহকরা। ঘর-বাড়ি, দোকান বন্ধ থাকলে সেখানেও বড় অংকের বিল আসছে। এ ধরনের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করেন গ্রাহকেরা। কয়েক মাস আগে লকডাউনের কবলে পড়ে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের উপরও এভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয় ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। বিষয়টি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে উপজেলা জুড়ে।

অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, অবৈধভাবে সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে বৌদ্ধ বিহার গড়ে তোলা বিতর্কিত বৌদ্ধ ভিক্ষু শরণংকর থের’র ‘জ্ঞাণশরণ মহাঅরণ্য’ বৌদ্ধ বিহারে একে একে ২৪টি বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। অথচ বনভূমিতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কোনও সুযোগই নেই।

অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগের এ বিষয়টি সম্প্রতি চারিদিকে চাউর হলে তড়িঘড়ি করে ১৯টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। বন বিভাগের অনুরোধের পরও বাকি ৫টি অবৈধ সংযোগ এখনও অবিচ্ছিন্ন রেখে দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙ্গুনিয়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোখলেছুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ঘর থাকলেই আমরা বিদ্যুৎ দিতে পারি। ঘর থাকাটা যদি বৈধ হয়, তাহলে বিদ্যুৎ দেওয়াটা কী অবৈধ? বনবিভাগ বাধা দিলে ঘরও হতো না, মিটারও দেওয়া হতো না। তারা তো বাধা দেয়নি।’

বিতর্কিত বৌদ্ধ ভিক্ষু শরণংকর থের’র ‘জ্ঞাণশরণ মহাঅরণ্য’ বৌদ্ধ বিহারে ২৪টি নয়, ১৯টি বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে দাবি করে মোখলেসুর রহমান বলেন, এর মধ্যে ১৬টি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এসময় সংযোগ প্রদানের সময় দায়িত্বে ছিলেন না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

২০ শতাংশ জমিতে ১৯টি সংযোগ লাগে কিনা, আর নিয়ম মেনে বিদ্যুৎ সংযোগ দিলে ১৬টি লাইন কেন কর্তন করেছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে ডিজিএম মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘জায়গা আবেদনকারীর কিনা তা তো আমরা ঠিক করবো না, ঠিক করবে ভূমি অফিস। তবে প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে মনে হয়েছে সরকারি সংরক্ষিত বনভূমিতে এই সংযোগ দেওয়া হয়েছে, তাই বিচ্ছিন্ন করেছি। ’

বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থানান্তরের জন্য ৪১ হাজার ১০০ টাকা পরিশোধ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ম অনুযায়ী করেছি। কোন খাতে কত খরচ হবে তা তো পত্রে লেখা থাকবে না, থাকবে অফিসে। অফিসে আসলে জানতে পারবেন।’ পরক্ষণে তিনি আবার বলেন, ‘কলাম করে সব লেখা থাকে পত্রে।’

এদিকে একুশে পত্রিকার হাতে আসা ডিজিএম স্বাক্ষরিত উক্ত পত্রে কোনও খাতের কথা উল্লেখ নেই।

এ সময় রাঙ্গুনিয়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোখলেছুর রহমান একুশে পত্রিকা প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান, কে নিউজ করতে বলেছে? কে তথ্য দিয়েছে?