
মোহাম্মদ রফিক : চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কর্তৃপক্ষ কনস্টেবল থেকে সাব-ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত শুধু চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের একটি তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল গত বছরের ১০ অক্টোবর।
সিএমপির তৎকালীন উপকমিশনার শ্যামল কুমার নাথ এ নির্দেশনা জারি করেছিলেন। যার স্মারক নং সিএমপি/আরও (সিআরও)/৬০৯২)। পুলিশ সদর দপ্তরের মৌখিক নির্দেশনার প্রেক্ষিতে জারি করা সার্কুলারের আলোকে নগরের ১৬ থানা ও ফাঁড়িতে কর্মরত চট্টগ্রামের বাসিন্দা পুলিশ সদস্যদের একটি তালিকা প্রস্তুতও করেছিল সিএমপি। পরে তা সদর দপ্তরে পাঠালে তালিকা অনুযায়ী ইন্সপেক্টরসহ ১৩জনকে চট্টগ্রাম বিভাগের বাইরে বদলির আদেশ জারি হয়।
এ নিয়ে সিএমপিতে কর্মরত সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বদলিআতঙ্ক এবং অসন্তোষ দেখা দেয়। একাধিক গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হলে তালিকা ধরে চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের অন্যত্র বদলির সিদ্ধান্ত বাতিল করে সদর দপ্তর। কিন্তু গত দুই মাস ধরে পুলিশ সদর দপ্তর পুরোনো পথেই হাঁটছে। এ দুই মাসে সেই তালিকা ধরে প্রায় ৩শ’ জন পুলিশ সদস্যকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের বাইরে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে কনস্টেবল, সাব-ইন্সপেক্টর এবং পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে একাধারে চট্টগ্রামের বাসিন্দা নয়, কৌশল হিসেবে তালিকায় অন্য জেলার বাসিন্দাদেরও রাখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশ সদস্য কিংবা কর্মকর্তাদের বদলি একটি রুটিন ওয়ার্ক। শুধু চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এমনটি হচ্ছে বিষয়টি তা নয়, সারাদেশে এক রেঞ্জ থেকে অন্য রেঞ্জে পুলিশ সদস্যদের বদলি করা হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রেও বিপাকে পড়েছেন বদলির আদেশ পাওয়া পুলিশ সদস্যরা। ভুক্তভোগী এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘চাকরি করছি চট্টগ্রাম রেঞ্জে। আমাকে হঠাৎ করে সিলেট রেঞ্জে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ভেতর বদলি হলে পরিবারের দেখাশোনা তেমন সমস্যার মধ্যে পড়তাম না। এখন সন্তানদের পড়ালেখা চরম বেকায়দায় পড়ে গেছি।
জানা গেছে, সম্প্রতি সদর দপ্তর থেকে একের পর এক বদলির আদেশ আসায় সিএমপিতে কর্মরত জন্মসূত্রে চট্টগ্রামের বাসিন্দা, এমন পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বদলি আতংক বিরাজ করছে। এর আগে বিষয়টি পৌঁছেছে চট্টগ্রামের মন্ত্রী-এমপিদের কাছেও। ভুক্তভোগীরা বলছেন, চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা চট্টগ্রাম নগরে চাকরি করতে পারবেন না, এমন কোনো পুলিশ প্রবিধান ও অধ্যাদেশে নেই।
জানা গেছে, গতবছর অক্টোবরে ওই তালিকা ধরে নগরের বন্দর থানার তৎকালীন ওসি সুকান্ত চক্রবর্তীকে সিলেট রেঞ্জে, পাহাড়তলী থানার টিআই সুভাষ চন্দ্র দে-কে খুলনা রেঞ্জে, পাঁচলাইশ থানার তৎকালীন টিআই কানু দাশকে সিলেট রেঞ্জে, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আতিক আহমেদ চৌধুরীকে ঢাকায় সিআইডিতে, খুলশি থানার তৎকালীন ওসি প্রণব চৌধুরীকে ঢাকার সিআইডিতে, নগর বিশেষ শাখার ফজলুল করিম সেলিমকে সিলেট রেঞ্জে বদলি করা হয়।
এর আগে গতবছর মে মাসে নগরের ডবলমুরিং থানার ওসি একেএম মহিউদ্দিন সেলিম (নোয়াখালীর বাসিন্দা) এবং আকবর শাহ থানার ওসি জসীম উদ্দিনকে (চট্টগ্রামের বাসিন্দা) বদলি করা হয়। এদিকে প্রায় দশ মাস আগে নগর বিশেষ শাখায় কর্মরত উচ্চ পদস্থ এক কর্মকর্তার বদলির আদেশ এলেও এখনো তিনি কর্মরত থাকায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই মাসে সদর দপ্তর থেকে বদলি আদেশ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বড় কোনো অনিয়ম বা অদক্ষতার অভিযোগ মিলেনি। চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ায় তাদের বদলির আদেশ অনেকটাই ‘শাস্তিমূলক’ বলে মনে করছেন।
শুধু চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের তালিকা তৈরির নির্দেশনা সংক্রান্ত ওই চিঠির বিষয়ে সেসময় উপ-পুলিশ কমিশনার (বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার) শ্যামল কুমার নাথ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রশাসনিক কারণে ওই চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এখন আর সেটা কার্যকর নেই।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তাণভীর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বেছে বেছে শুধূ চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের তালিকা তৈরি করে তাদের অন্য রেঞ্জে বদলি করা হচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। জন্মসূত্রে চট্টগ্রামের বাসিন্দা এমন সিনিয়র অফিসার এ মুহূর্তে আমার সামনে (দামপাড়া পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে) বসা আছেন। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে যারা দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে কর্মরত আছেন তাদের বদলির বিষয়ে আমরা সদর দপ্তরকে অবহিত করছি।’
যদি এমন হয় যে, অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে কাজ করছেন, তাহলে তো বদলির বিষয়টা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।- যোগ করেন পুলিশ কমিশনার।