
একুশে প্রতিবেদক : ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে-জড়িয়ে আছেন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কীর্তিমান কাব্য। আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, রক্তস্নাত পথ বেয়ে আওয়ামী লীগের অর্জন, বঙ্গবন্ধু কন্যার ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব ও তার সরকারের নানা সাফল্যচিহ্ন। কিন্তু এসব সাফল্য বা জাতির সঠিক ইতিহাস এক ঘরে, এক ফ্রেমে নিয়ে আসার উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না কিংবা অনেকের ভাবনারও অতীত।
বাস্তবে সেই উদ্যোগ নিয়েছেন চকরিয়ার এমপি মো. জাফর আলম। আওয়ামী লীগের অর্জন ও ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধকালীন ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সাফল্যগাথা সর্বোপরি দেশের অগ্রযাত্রা মাত্র ৬ হাজার বর্গফুটে তথ্যভিত্তিক চমৎকার, সুনিপুণ উপস্থাপনায় তুলে এনেছেন তিনি, যার নাম দিয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’।
এছাড়াও থরে থরে সাজিয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া শাখাওয়াৎ, কবি সুফিয়া কামাল, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, জীবনানন্দ দাশ, পল্লী কবি জসিম উদ্দিন, কবি শামসুর রাহমান, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কবি সুকান্তসহ বরেণ্য বাঙালিদের সৃষ্টিকর্মের সম্ভার।

কী পেয়েছে বাংলাদেশ-এই শিরোনামে চিত্রে-তথ্যে বঙ্গবন্ধু কর্নারে তুলে ধরা হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম মেয়াদের পাঁচ বছর ও সর্বশেষ ১২ বছরের সমস্ত কর্ম-অর্জন। ‘অবহেলিত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন’, ‘নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুর বিকাশ’, ‘স্বাবলম্বী-উদ্যমী যুব সমাজ গঠন’, ‘সুস্থ জাতি সুন্দর ভবিষ্যৎ’, ‘ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন’, ‘অন্ধকারকে পেছনে ফেলে আলোর পথে বাংলাদেশ’, ‘কর্ম ও বাসস্থান’, ‘অবহেলিত পাহাড়ে শান্তির ছোঁয়া’, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন’, ‘টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে পরিবেশের সুরক্ষা’, ‘আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উন্নয়নের মাইলফলক’, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে সরকার’, ‘নারীর ক্ষমতায়ন-শিশুর বিকাশ’, ‘খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ’, ‘সবার জন্য যুগোপযোগী শিক্ষা’, ‘উন্নয়ন যোগাযোগ : বাঁচছে সময় বাড়ছে বাণিজ্য’ শিরোনামে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও ছবি দিয়ে এসব কর্মযজ্ঞ নান্দনিক উপায়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্জন’ শিরোনামে চিত্র ও বর্ণনাসহ প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ‘ভ্যাকসিন হিরো পুরস্কার’, ‘এজেন্ট অফ বেঞ্জ পুরস্কার’, ‘রোটারি শান্তি পুরস্কার’, ‘পার্ল এস বাক পুরস্কার’, ‘চ্যাম্পিয়ন অব স্কিল : ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়ুথ’, ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ’, ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন পুরস্কার’, ‘সিইআরইএস পদক’, ‘লাইফটাইম কন্ট্রিউবিশন ফর উইম্যান এমপাওয়ারমেন্ট’, ‘স্পেশাল ডিসটিংশন, অ্যাওয়ার্ড ফর লিডারশীপ’, ‘আইসিটি সাসটেইনবল ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’, ‘সাউথ-সাউথ পুরস্কার’, ‘মাদার তেরেসা শান্তি পুরস্কার’, ‘এম কে গান্ধী পুরস্কার’, ‘আইপিএস ইন্টারন্যাশনাল এচিভমেন্ট এওয়ার্ড’, ‘ড. কালাম স্মৃতি ইন্টারন্যাশনাল এক্সেলেন্স এওয়ার্ড’, ‘গ্লোবাল উইম্যান্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’, ‘জাতিসংঘ পুরস্কার’, ‘ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার’, ‘শান্তিবৃক্ষ’, ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এর মতো আন্তর্জাতিক পদক ও স্বীকৃতিগুলো চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে বঙ্গবন্ধু কর্নারে।

চকরিয়া বাস স্টেশন সংলগ্ন বাণিজ্যিক ভবন সিস্টেম কমপ্লেক্সের ৪ তলায় স্থাপিত বঙ্গবন্ধু কর্নারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথে ৪০ বাই ২০ বর্গফুটের খোলা স্পেস। ব্যতিক্রম এক কারুকাজ সম্বলিত এই স্পেসটিতে পা রাখলেই পরিবেশটা এতটা নানন্দিক পরিপাটি যে, বঙ্গবন্ধু কর্নারে প্রবেশ করতে ব্যাকুল হবেন যে কেউ। প্রবেশপথের বামে দুর্লভ এক ফ্রেমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ছবি, ডানে একই আদলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুই পাশের দেওয়াল ধরে প্রধানমন্ত্রীর দেশ-বিদেশের অর্জনগুলো যেন কেড়ে নিচ্ছে চোখ-মন দুটোই। মূল দরজার কাছে শোভা পাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন নৌকা।
ঢুকেই ডানে বিস্তৃত পরিসরে অফিসকক্ষ, ওয়েটিং রুম। বামে ঢুকতেই নজর কাড়বে কাঁচ দিয়ে মোড়ানো মার্বেল পাথরের তৈরি বঙ্গবন্ধু পরিবারের জীবিত সদস্যদের ছোট ছোট ভাস্কর্য। এখানে স্থান পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। তাদের চার সন্তান- সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ও টিউলিপ সিদ্দিক।

একই কক্ষে চারপাশ ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্ম, ইতিহাস-ঐতিহ্য সংগ্রামমুখর পথ বেয়ে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০ এর নির্বাচন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধসহ আওয়ামী লীগের সংগ্রামের রক্তস্নাত ঘটনাবলী জানা যাবে চিত্রে এবং সংক্ষিপ্ত বর্ণনায়।
৭ বীরশ্রেষ্ঠ ও জাতীয় চার নেতার বীরত্বগাথা, সপরিবারে জাতির জনকের হত্যাকাণ্ড, জেল হত্যাকাণ্ডের তথ্যচিত্রের উপস্থাপনায় নতুনত্ব নতুন প্রজন্মকে জানতে আগ্রহী করে তুলবে অনায়াসে। এছাড়াও লাইব্রেরিতে শোভা পাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী, ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘হাসিনা : এ ডটারস টেল’সহ দেশ-বিদেশের রাজনীতি ও বিশ্বনেতাদের জীবনী নিয়ে দুর্লভ সংগ্রহশালা। শুধু তাই নয়, বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ সব সংগ্রহশালায় ঠাসা বঙ্গবন্ধু কর্নার। আছে বিজ্ঞান, সায়েন্স ফিকশন, রম্য, ভ্রমণকাহিনী এমনকি স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের প্রয়োজনীয় পাঠও সেরে নেওয়া যাবে এখানে।
৬ হাজার বর্গফুটে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের নানা কাব্যগাথা নিয়ে তৈরি বঙ্গবন্ধু কর্নারটির প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলতি মাসের শেষের দিকে এটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বপ্নদ্রষ্টা কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. জাফর আলম।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে জানাতে ব্যতিক্রমী এই বঙ্গবন্ধু কর্নারের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে জানতে চাইলে এমপি জাফর আলম বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে গত ১২ বছরে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। গ্রামীণ জনপদের ঘরে ঘরে আজ শহুরে ছোঁয়া, নাগরিক সুবিধার হাতছানি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, আর যোগ্যকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে সেই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। পরিবারের সবাইকে হারিয়েও বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে রাতদিন তিনি কাজ করে চলেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম, বাংলাদেশের অগ্রগতি, বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুর গড়া আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা একসূত্রে গাথা। সেই কারণে এক ঝলকে, এক ছাদের নিচে এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞের ধারাবাহিক ইতিহাস-সংগ্রামের প্রতিটি ধাপ নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি।
নতুন প্রজন্মকে এই ইতিহাস জানাতে স্রেফ চিত্তের দায়বদ্ধতা থেকে ব্যক্তিগত অর্থায়নে এই উদ্যোগ নিয়েছেন জানিয়ে এমপি জাফর আলম বলেন, এই জ্ঞানভাণ্ডারের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত। স্থানীয় লোকজন ছাড়াও পর্যটন নগরী কক্সবাজার আসা-যাওয়ার পথে যে কেউ এখানে ঢুঁ মারতে পারবেন, এক পলকে জেনে নিতে পারবেন বাংলাদেশের বাড়বাড়ন্তের গল্প।
স্থানীয় সংবাদকর্মী ছোটন কান্তি নাথ জানান, এমপি মহোদয়ের শাণিত রুচিবোধ ও চেতনা দেখে আমরা অভিভূত। সত্যিকার অর্থেই দেশচেতনা-প্রগতিশীলতার অসীম সীমানার মানুষ তিনি। সে কারণেই তিনি এটি করতে পেরেছেন, যা অনেকের জন্য অনুসরণীয়, অনুকরণীয়। যেই ফ্লোর ভাড়া দিলে এক কোটি টাকা অগ্রিম পেতেন, মাসে কয়েক লক্ষ টাকা ভাড়া পেতেন; সেই ফ্লোরে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে বঙ্গবন্ধু কর্নার করেছেন তিনি। এটি নির্মাণে নিজস্ব ফ্লোর ব্যবহারের বাইরে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে তথ্য দেন এই সংবাদকর্মী।

সংসদ সদস্য মো. জাফর আলমের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. সেকান্দর চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা একসাথে, একই বিভাগে পড়েছি। প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতি করেছি। তখন থেকেই তার মাঝে নতুন, ব্যতিক্রমী সৃষ্টিকর্মের তাগাদা দেখেছি। বন্ধু জাফর সবসময় নিত্যনতুন ইনোবেটিভ বুদ্ধি বের করতেন। তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ও দিতে পারতেন। ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’র মতো ডায়নামিক নতুন কিছু করা তার পক্ষে খুবই সম্ভব। কারণ তাঁর চিন্তার জগৎ অনেক প্রসারিত, কল্পনাশক্তি প্রবল।’