শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

ডেটলাইন সীতাকুণ্ড : নিলামে উঠলো ছাত্রলীগের পদ!

প্রকাশিতঃ বুধবার, নভেম্বর ১৮, ২০২০, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী নিজের ফেইসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এই অভিযোগ তুলেছেন।

মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর) রাত সাড়ে ১১ টায় দেওয়া ফেসবুক পোস্টে গোলাম রাব্বানী আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে কমিটি ঘোষণা, অর্থ আত্মসাতসহ বেশ কিছু অভিযোগ তুলে ধরেন।

ফেইসবুক স্ট্যাটাসে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ এনে সাবেক এই ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক লিখেছেন, “আহ্বায়ক শায়েস্তার কাছে কমিটি টিকিয়ে রাখতে ২০ লক্ষ টাকা দাবি করে, বাধ্য হয়ে পৈতৃক জায়গা বিক্রি করে ৮ লক্ষ টাকা দেয় বহু কষ্টে। কিন্তু বর্তমান দুইজন ২০ লাখ টাকা দেওয়াতে ৭ লাখ ফেরত দেয়, ১ লাখ টাকা এখনো রয়ে গেছে জেলা সেক্রেটারির কাছে।”

গোলাম রাব্বানী আরো লিখেছেন, ‘নবনির্বাচিত সভাপতি বয়সোত্তীর্ণ এবং অছাত্র। সাধারণ সম্পাদক অছাত্র, হত্যা ও অপহরণ মামলার আসামী (চট্টগ্রাম মেজিস্ট্রেট আদালত, মামলা নং-৩৩৯/১৮)। ছাত্রলীগের কোথাও প্রাথমিক সদস্য পদও নাই, ইতিপূর্বে স্থানীয়ভাবে শিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলো। বাবা ওয়ার্ড জামায়াত নেতা, বড় ভাই ওয়ালিদ রনি উপজেলা বিএনপির সক্রিয় নেতা!’

এদিকে রাব্বানীর এই স্ট্যাটাসের পর এক এক করে মুখ খুলতে শুরু করেছেন সীতাকুণ্ডের ছাত্রলীগ নেতারা।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, সীতাকুণ্ড উপজেলা ছাত্রলীগের সদ্যঘোষিত কমিটিতে সাবেক আহ্বায়ক শায়েস্তা খাঁকে সভাপতি ও যুগ্ম আহ্বায়ক জামশেদ খানকে সাধারণ সম্পাদক করার জন্য ১৫ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রেজাউল করিম।

অভিযোগ আছে, রেজাউলকে ম্যানেজ করে টাকার অঙ্কের পরিমাণ ১৫ লাখ থেকে ৮ লাখে দফারফা করেন শায়েস্তা খাঁ এবং জামশেদ খান। আর এই টাকা শায়েস্তা-জামশেদ গত ১৩ আগস্ট রেজাউল করিমের বাসায় গিয়ে দিয়ে আসেন। দুজনের সাথে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ছিলেন সীতাকুণ্ড উপজেলা ছাত্রলীগের পূর্বের আহ্বায়ক কমিটির সহ-সম্পাদক জাবের আল মাহমুদ।

শুধু তাই নয়, টাকা নেওয়ার পর প্রত্যাশিত পদ প্রদানের আশ্বাস দিলেও অন্য পক্ষ (বর্তমান সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) থেকে আরো বেশি (২০ লাখ) টাকার প্রস্তাব পেয়ে তাদেরকেই কমিটিতে পদ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে।

এদিকে এসব অভিযোগের অনুসন্ধানে নেমে বেশ কিছু তথ্যপ্রমাণ ও আর্থিক লেনদেনের কথোপকথনের রেকর্ড একুশে পত্রিকার হাতে আসে।

জানা যায়, পদ না পেয়ে শায়েস্তা খাঁ এবং জামশেদ খান রেজাউল করিমের কাছে টাকা ফেরত চাইলে রেজাউল ৭ লাখ টাকা জাবের আল মাহমুদকে ফেরত দেন। ১ লাখ টাকা কম পেয়ে টাকা কম থাকার কারণ জানতে চাওয়া সেই পুরো আলাপটি হয়েছিল মুঠোফোনে।

জাবের আল মাহমুদের সাথে উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রেজাউল করিমের ৩২ সেকেন্ডের সেই ফোনালাপ ছিল এরকম-

জাবের আল মাহমুদ : ৭ কেন, ৮ ছিল না?
রেজাউল করিম : এহ?
জাবের আল মাহমুদ : এখানে ৭ কেন? ৮ ছিল না, ৮?
রেজাউল করিম : তাহলে ঐ যে ১ টা আমি তোমাকে পরে দিচ্ছি!
জাবের আল মাহমুদ : জ্বি?
রেজাউল করিম : ১ (লাখ টাকা) টা হয়তো ওখানে কম ছিল আর কী! আমি তোমাকে পরে দিবো আর কী, দু-একদিন পরে, এহ?
জাবের আল মাহমুদ : আচ্ছা, ঠিক আছে।
রেজাউল করিম : অসুবিধা হবে?
জাবের আল মাহমুদ : না না না না না, আমি এইমাত্র দেখছি এই কারণে।
রেজাউল করিম : আমি নিজেও জানি না, অন্য একজনকে রাখতে দিছিলাম তো!

এদিকে, আর্থিক লেনদেনের কথা স্বীকার করে সীতাকুণ্ড উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক শায়েস্তা খাঁ একুশে পত্রিকাকে বলেন, পদ-পদবির জন্য সবাই তো একটা আশা করে, আমরাও করেছিলাম। রেজাউল করিম আমাদের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা দাবি করলেও অনেক অনুরোধের পর তিনি ৮ লাখ টাকা নিয়ে আমাকে সভাপতি আর জামশেদ খানকে সাধারণ সম্পাদক করার কথা দেন।

সদ্যঘোষিত কমিটিও টাকার বিনিময়ে ঘোষণা করা হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘যে কমিটি বর্তমানে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সেই কমিটির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়েছেন রেজাউল। ছাত্রলীগের রাজনীতির নামে এই চাঁদাবাজি বন্ধে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হস্তক্ষেপ চাই আমরা।’

আর্থিক লেনদেনের বিবরণ দিতে গিয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক জামশেদ খান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘১৩ অক্টোবর আমি, শায়েস্তা খাঁ এবং জাবের আল মাহমুদ রেজাউল করিমের বাসায় যাই। শায়েস্তা খাঁ গাড়িতে ছিলো, আমি আর জাবের নিজ হাতে নগদ ৮ লাখ টাকা তার হাতে তুলে দেই। পুরো ঘটনা তো আপনারা সবাই ইতোমধ্যে জানেন। আমাদের ৭ লাখ টাকা রেজাউল ফেরৎ দিয়েছে, যেগুলো এখনও জাবেরের কাছে আছে।’

জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড উপজেলা ছাত্রলীগের নব নির্বাচিত সভাপতি শিহাব উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে ছাত্রলীগের কমিটির অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। যারা প্রত্যাশিত পদ পায়নি, তারাই এই মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। আমরা টাকা লেনদেনের মাধ্যমে পদ পেয়েছি এরকম কোনো প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না।’

তবে সব ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রেজাউল করিম। তিনি বলেন, কেউ যদি প্রমাণ দিতে পারে আমি কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কাউকে পদ প্রদান করেছি তাহলে আমি পদত্যাগ করবো।’

তিনি বলেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে আমরা নতুন কমিটির অনুমোদন দিয়েছি। ছাত্রলীগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৯ বছর। নিয়ম অনুযায়ী ৩৩ বছরের কাউকে তো পদ প্রদান করা সম্ভব না। আর একটা আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ ৩ মাস, করোনা পরিস্থিতির কারণে আমরা এতোদিন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ঠিক মতো নিতে পারিনি। আমাদের কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যারা বাদ পড়েছে তারা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের সুরেই কথা বলেছেন সভাপতি তানভীর হোসেন চৌধুরী তপু। তিনি বলেন, য‘খন কেউ পদ পদবির আশা করে আর সেটা পায় না, তখন তারা নানা ধরনের অভিযোগ করে, গুজব ছড়িয়ে সংগঠনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। যে অভিযোগটি উঠেছে তা সম্পূর্ণ অসত্য।’

তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীতাকুণ্ড উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে অর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। লেনদেনের একটি ফোন রেকর্ডের কথাও বলা হয়েছে। আমি নিজে রেকর্ডিংটা শুনেছি, সেখানে লেনদেনের কোনো বিষয় স্পষ্ট হয়নি। আমরা তদন্ত করছি, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’