রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

যুদ্ধকালীন গ্রুপ-কমান্ডার পদবি ছিনতাই!

প্রকাশিতঃ শনিবার, জুন ১২, ২০২১, ১০:৩৩ অপরাহ্ণ

শরীফুল রুকন : মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন সিরু বাঙালি; সেই বইয়ের সূচনাতে তিনি লিখেছেন, “মুক্তিযুদ্ধের সূচনা নিয়ে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত বহু ধ্যান-ধারণাকেই পাল্টে দেবে এই গ্রন্থ।” সত্যি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসকে বিকৃত করে এই বইয়ের মাধ্যমে পাল্টে দিয়েছেন সিরু বাঙালি; যার বিরুদ্ধে ভারতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার অভিযোগ আছে।

সিরু বাঙালির প্রকৃত নাম সিরাজুল ইসলাম। তিনি নিজেকে যুদ্ধকালীন ১৫১ নং গ্রুপের ‘কমান্ডার’ দাবি করে ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ শীর্ষক বইটি প্রকাশ করেছেন। এছাড়া ফেসবুকসহ বিভিন্ন স্থানে নিজেকে ‘যুদ্ধকালীন গ্রুপ-কমান্ডার’ বলে পরিচয় দিয়ে আসছেন। সিরু বাঙালি গত বছরের ১৬ আগস্ট ফেসবুকে লিখেছেন, “আমি যুদ্ধকালীন গেরিলা কমান্ডার। এটাই আমার জীবনের সেরা অহংকার।”

অথচ ‘মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত জাদুঘর’ খ্যাত বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ডা. মাহফুজুর রহমান একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন, ১৫১ নং গ্রুপের ‘কমান্ডার’ ছিলেন গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্র; তিনি নটরডেম কলেজের প্রফেসর ছিলেন। সিরু বাঙালি ১৫১ নং গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন না।

এদিকে পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় থেকে সমাজসেবা অফিসারের কাছে ১৫১ নং গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা পাঠানো হয়েছে। ১৫১ নং গ্রুপের কমান্ডার গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্রের তৈরি করা ওই তালিকায় একই গ্রুপের মোট ছয়জন বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বাক্ষর করেছেন। সেখানে লেখা হয়েছে, “ওই গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্র; দায়িত্বকালীন অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে আহমদ নবী চৌধুরীকে কমান্ডার বানানো হয়।” একই তালিকায় মন্তব্যের কলামে লেখা হয়েছে, “সিরাজুল ইসলাম (সিরু বাঙালি) দায়িত্বরত অবস্থায় নিজ কাজে চলে যান।”

অন্যদিকে ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইয়ের ২৬৬ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, তার নেতৃত্বাধীন ১৫১ নং গ্রুপে তিনিসহ প্রশিক্ষণ নেওয়া ১২ জনসহ মোট ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অথচ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে সরকারের কাছে জমা দেওয়া আবেদনে সিরু বাঙালি ছাড়া ওই ১২ জনের কেউই তাদের কমান্ডার হিসেবে সিরু বাঙালির নাম উল্লেখ করেননি। ওই ১২ জনের কেউ কেউ তাদের কমান্ডার হিসেবে গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্রের নাম, আবার কেউ কমান্ডার হিসেবে আহমদ নবীর নাম লিখেছেন। এদিকে আহমদ নবী চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার জন্য যে আবেদন করেছিলেন, সেটির একটি কপি একুশে পত্রিকার হাতে আছে; সেখানে আহাম্মদ নবী চৌধুরী নিজেকে ১৫১ নং গ্রুপের কমান্ডার হিসেবে পরিচয় তুলে ধরেছেন।

এছাড়া ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বর দৈনিক আজাদীতে “একজন আহমদ নবী ও তাঁর গ্রুপের মুক্তিযুদ্ধ” শিরোনামে চট্টগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরীর একটি লেখা প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি লিখেছেন, “১৫১ নং গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন আহমদ নবী।” নবী গ্রুপের ২২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার নামও লিখেছেন নাসিরুদ্দিন চৌধুরী; যেখানে সিরাজুল ইসলাম প্রকাশ সিরু বাঙালির নাম নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিরু বাঙালি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল- আমার এই বইটির লেখাগুলো ১৯৯৩ সালে ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৫ সালের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত ১৪৫ সপ্তাহ নাসিরুদ্দিন চৌধুরীই পূর্বকোণে ছাপিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে বইটি প্রথম ‘শৈলী প্রকাশন’ থেকে বের হয়। আমার বইটিও প্রথম ছাপিয়েছেন নাসিরুদ্দিন চৌধুরী। আমি এ বিষয়ে তার কাছে জিজ্ঞেস করবো না। আমার দিন শেষ হয়ে গেছে। আমি কমান্ডার আছি না আছি সেগুলো দেখার আর সময় নেই।’

এদিকে ১৫১ নং গ্রুপের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া পটিয়ার বাসিন্দা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা একুশে পত্রিকাকে বলেন, “প্রকৃতপক্ষে ১৫১ নং গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্র। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে আহমদ নবীকে কমান্ডার বানানো হয়। তিনি মারা যাওয়ার আগে পটিয়া উপজেলা প্রশাসনকে ১৫১ নং গ্রুপের ২৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা জমা দিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে লেখা আছে, সিরু বাঙালি যুদ্ধ না করে নিজ কাজে ফিরে গিয়েছিলেন। আসলে সিরু বাঙালি তার বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। তার বাড়িটা ছিল মুসলিম লীগ, জামায়াত অধ্যুষিত এলাকায়। তিনি সেখানে আত্মগোপনে ছিলেন বলতে পারেন।”

তিনি আরও বলেন, “গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্রের মৃত্যুর পর থেকে সিরু বাঙালি নিজেকে ১৫১ নং গ্রুপের কমান্ডার বলে দাবি করে আসছেন। আসলে তিনি যুদ্ধই করেননি। যেসব মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছেন, তাদের সঙ্গে ছিলেন দাবি করে গল্প বানিয়ে বলেন, লিখেন তিনি। তবে এটা সত্য যে, ভারতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কারণে ভারতীয় তালিকায় সিরু বাঙালির নাম আছে। সে কারণে যুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তার নাম অটো যুক্ত হয়েছে।”

একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে, ১৫১ নং গ্রুপের কমান্ডার গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্র অসুস্থ হয়ে পড়লে সে স্থানে আহমদ নবী চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সিরু বাঙালিকে ওই গ্রুপের কমান্ডার বানানোর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া সিরু বাঙালির লেখা ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালে উক্ত বইটির সর্বশেষ সংস্করণ বের করে আদিগন্ত প্রকাশন। সিরু বাঙালির দাবি, এ পর্যন্ত বইটির ১১টি সংস্করণ বের হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ১৯টি দেশে বইটির প্রকাশনা উৎসব হয়েছে।

বইটির ২৬৫ পৃষ্ঠায় ‘কমান্ডার হয়ে স্বদেশ যাত্রা’ শিরোনামে সিরু বাঙালি লিখেছেন, “১৯৭১ সালের ২০ অক্টোবর হরিণা ইউথ ক্যাম্পে তাকে ১৫১ নং গ্রুপ কমান্ডার করা হলে মানু বড়ুয়া নামের এক ছেলে আপত্তি জানায়। কিন্তু নির্বাচকমণ্ডলী মানুর ভেটো দেওয়াকে গুরুত্ব দেয়নি। পরে মানু নিজে থেকে তার গ্রুপে যেতে চাইলে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। পরে মানু বড়ুয়া ‘পটিয়ার হুলাইনের গ্রুপ কমান্ডার আহমদ নবীর’ দলভুক্ত হয়।” সিরু বাঙালি আরও লিখেছেন, “এ ঘটনার প্রায় এক যুগ পর মানু বড়ুয়া চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানার মোড়ে ফেন্সি টেইলারিং শপে চাকরি করার সময়ে তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলে, হরিণা ক্যাম্পে করা তার ভুলের জন্য সে অনুশোচনা করে এবং আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।”

বইয়ে সিরু বাঙালির লেখা উপরোক্ত কথাগুলো থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। প্রথমত ওই ‘মানু বড়ুয়ার’ প্রকৃত নাম মনোজ বড়ুয়া, তার ডাক নাম মানু; যা একাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি সিরু বাঙালিও একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া মনোজ বড়ুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে যে আবেদন করেছেন, সেখানে নিজের পুরো নাম লিখেছেন, মনোজ বড়ুয়া মানু।

এদিকে ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইয়ের ২৬৬ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “তার নেতৃত্বাধীন ১৫১ নং গ্রুপে প্রশিক্ষণ নেওয়া ১২ জনসহ মোট ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।” এই ১৩ জনের নামের তালিকার মধ্যে আবার উনাইনপুরার বাসিন্দা সেই মনোজ বড়ুয়ার নাম আছে। অর্থ্যাৎ সিরু বাঙালি একবার লিখেছেন, মানু তার গ্রুপ ছেড়ে আহমদ নবীর গ্রুপে চলে গিয়েছিল। পরে তিনিই আবার লিখেছেন, মানু তার গ্রুপে যুক্ত হয়ে যুদ্ধ করেছেন!

অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে মনোজ বড়ুয়া প্রকাশ মানু যে আবেদন করেছেন, সেখানে তিনি লিখেছেন, “১৫১ নং গ্রুপের অধীনে যুদ্ধ করেছিলেন, আর তার কমান্ডার ছিলেন আহমদ নবী চৌধুরী।” সেই ‘আহমদ নবী’ই ছিলেন গৌরাঙ্গ প্রসাদের অবর্তমানে ১৫১ নং গ্রুপের কমান্ডার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিরু বাঙালি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মানু বড়ুয়া আর মনোজ বড়ুয়া একই ব্যক্তি। উনাইনপুরে তার বাড়ি। এখন ইংল্যান্ডে থাকে। পরে সে আমার গ্রুপে যোগ দেয়।’ তাহলে বইয়ে মানু বড়ুয়া ও মনোজ বড়ুয়াকে আলাদা ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন কেন- জানতে চাইলে সিরু বাঙালি বলেন, ‘এখন কথা সেটা না। আমার ছেলে যারা আছে তাদের কাছে জানতে চাইলে সব জানতে পারবেন।’

এদিকে যে গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্রকে ১৫১ নং গ্রুপ কমান্ডার বা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সিরু বাঙালি স্বীকার করেন না, তার কথা ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় তুলে ধরা হয়েছে। ২০ অক্টোবর ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেরার সময় প্রফেসর গৌরাঙ্গ মিত্র সঙ্গে ছিলেন জানিয়ে ২৭৬ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “আমার যদি মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের জন্য খেতাব প্রদান করার কোনো ক্ষমতা থাকত, তাহলে আমি প্রফেসর গৌরাঙ্গ মিত্রের মতো মানুষদের কোনো যুদ্ধ ছাড়াই শুধু যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে ভারত থেকে দীর্ঘ বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে দেশে প্রবেশ করতে পারার সাহসিকতার জন্য ‘বীর উত্তম’ খেতাব দিতাম।”

একই পৃষ্ঠায় আবার সিরু বাঙালি লিখেছেন, “প্রফেসর গৌরাঙ্গ মিত্রের মতো একজন নেহায়েত শান্তশিষ্ট, আগাগোড়া ভদ্রলোক কেন যে মুক্তিযুদ্ধের মতো এমন একটি বিপদাপন্ন গেরিলাযুদ্ধে যোগ দিতে গেলেন, আমি অনেক গবেষণা করেও তার হদিস বের করতে পারিনি শেষ পর্যন্ত।”

এদিকে একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা গেছে, কমান্ডার গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্রের বাড়ি হচ্ছে পটিয়ার ধলঘাট। কিন্তু সিরু বাঙালি তার বইয়ে বার বার বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে লিখেছেন, গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্রের বাড়ি হাইদগাঁও। ধলঘাট থেকে হাইদগাঁওয়ের দূরত্ব ২০ কিলোমিটারের বেশি। এছাড়া ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইয়ের ২৮১ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্র যুদ্ধ না করে পটিয়ার হাইদগাঁওয়ে নিজের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন।” আবার ২৮০ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্র যুদ্ধ না করে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বোয়ালখালীর জৈষ্ঠপুরা সেন বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন।” তাহলে কোনটি সঠিক?

এদিকে গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্রের মতো উচ্চশিক্ষিত, সজ্জন ব্যক্তির শরীর নিয়ে নানা আপত্তিকর কথাবার্তা ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’- বইয়ে ২৬৭ ও ২৬৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন সিরু বাঙালি। বইটিতে অধ্যাপক নুর মোহাম্মদের পরিচয়ও উল্লেখ করেননি সিরু বাঙালি। মুক্তিযোদ্ধারা জানান, অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ হরিণা ক্যাম্পের পলিটিক্যাল মোটিভেটর ছিলেন।

১৫১ নং গ্রুপে কমান্ডার হিসেবে স্বীকৃত আহম্মদ নবী চৌধুরীকে নিয়ে ২৭৮ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “২৮ অক্টোবর (১৯৭১) মঙ্গলবার আমরা বোয়ালখালী থানার জৈষ্ঠপুরা গ্রাম ত্যাগ করলাম। আমরা এবার পশ্চিম পটিয়ার দিকেই যাত্রা শুরু করলাম। রাত প্রায় দেড়টা দুটার সময় আমরা পশ্চিম পটিয়ার ৮নং কাশিয়াইশ ইউনিয়নের পিঙ্গলা বড়–য়া পাড়ায় এসে আস্তানা গাড়লাম। পরদিন সন্ধ্যায় কমান্ডার নবী তার গ্রুপের ছেলেদের নিয়ে আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে তার নিবাস পটিয়ার হুলাইন গ্রামের দিকে চলে গেল। নবী গ্রুপ সেই যে গেল পরে জিরি ওহাবি মাদ্রাসা অপারেশনে কমান্ডার নবীকে অনেক চেষ্টা করেও আমাদের সাথে সংযুক্ত করতে পারিনি।”

সিরু বাঙালি লিখেছেন, জিরি ওহাবি মাদ্রাসা অপারেশনে কমান্ডার আহমদ নবী ছিলেন না। অথচ কমান্ডার আহমদ নবী মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অংশ নিতে যে আবেদন করেছেন, সেখানে যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস অংশে তিনি লিখেছেন, ‘জিরি মাদ্রাসা অভিযানে অংশ নিয়ে তিনি ২২টি রাইফেল উদ্ধার করেছেন।’ আহমদ নবীর সহকর্মী পটিয়ার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ক্যাপ্টেন করিম ও শাহজাহান ইসলামাবাদীর গ্রুপ যৌথভাবে জিরি মাদ্রাসায় অপারেশন করেছে। সেখানে ক্যাপ্টেন করিম গ্রুপের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন আহমদ নবী। সেই অভিযানে সিরু বাঙালি ছিলেন না। তিনি প্রশিক্ষণ নিলেও মুক্তিযুদ্ধ করেননি।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে সিরু বাঙালি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জিরি মাদ্রাসায় অভিযানে আহমদ নবী ছিলেন না, বেকার কথাবার্তা বলে লাভ নেই। জুনে একবার ক্যাপ্টেন করিমের নেতৃত্বে জিরি মাদ্রাসায় অভিযান হয়েছে, সেখানে আমি ছিলাম।’ জুন মাসে প্রশিক্ষণ ছাড়া কীভাবে যুদ্ধে অংশ নিলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সিরু বাঙালি বলেন, ‘আমি গেরিলা যুদ্ধ করেছি। আপনি আমার বইটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ভালোভাবে পড়ুন। তখন জানতে পারবেন, আমি কী করেছি। ৫১ বছর পর এসে যদি এসব প্রশ্ন করেন, তাহলে আমি তো কিছু করতে পারবো না।’

প্রফেসর গৌরাঙ্গ ও নবীকে (১৫১ নং গ্রুপ কমান্ডার) নিয়ে ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইয়ের ২৮০ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “ইতিমধ্যে প্রফেসর গৌরাঙ্গ মিত্র পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি তাঁর গ্রাম হাইদগাঁও-এ ফেরৎ যাবার জন্য সবার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। তিনিও কমান্ডার নবীর মতো সেই যে গেলেন, দেশ স্বাধীন হবার আগ পর্যন্ত তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। পরে শুনেছি, ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি বোয়ালখালী জৈষ্ঠপুরা সেন বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন।”

সিরু বাঙালির উপরোক্ত লেখাগুলোর বিষয়ে ১৫১ নং গ্রুপের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘প্রথমত গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্রের বাড়ি হাইদগাঁওয়ে নয়, ধলঘাটে। আর জৈষ্ঠপুরা সেন বাড়ি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। কিন্তু সিরু বাঙালির লেখায় নতুন প্রজন্মের মনে হবে, সেন বাড়ি ছিল আরাম-আয়েশের জায়গা। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সেপ্টেম্বরে দেশে ফিরে প্রফেসর গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্রসহ আমরা জৈষ্ঠপুরা সেন বাড়িতে অবস্থান নিয়েছিলাম মাত্র ৪ ঘণ্টা। সেখানে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্রের অবস্থার করার প্রশ্নই উঠে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিরু বাঙালি একুশে পত্রিকাকে বলেন, “গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্র আমার গ্রুপের কমান্ডার না। তিনি গ্রুপ-কমান্ডার ছিলেন না। তিনি ছিলেন ‘স্যাক্সন কমান্ডার’।’ কী কমান্ডার আবার জানতে চাইলে সিরু বাঙালি বলেন, ‘ওনাকে (কমান্ডার পদে) দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি কিছুতে ছিলেন না। তিনি দুটি গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন। ১৫১ ও ১৫২ দুই গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন। তিনি কোথাও ছিলেন না। তিনি ‘হিঙ্গলা’ থেকে এই যে চলে গেলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সেপ্টেম্বর মাসে তার সঙ্গে আমার ঢাকায় দেখা হয়। আমার গ্রুপের তো ৪ জন মারা গেছেন, এখন আমি ছাড়া বাদ বাকি ১২ জনের মধ্যে আরও ৮ জন আছে। আপনি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করুন এ বিষয়ে।”

আপনার গ্রুপের ওই ১২ জনের কেউ তো যুদ্ধকালীন কমান্ডার হিসেবে আপনার নাম কোথাও লিখেননি, তাদের কেউ কমান্ডার হিসেবে গৌরাঙ্গ প্রসাদ মিত্র আর কেউ আহমদ নবীর নাম লিখেছেন।- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সিরু বাঙালি বলেন, ‘না লিখলে না লিখুক। তারা কমান্ডার হিসেবে আমার নাম না লিখলে আমার কিছু করার নেই। আমার এটা তো ইন্ডিয়া থেকে স্বীকৃত। এটা তো বাংলাদেশে কিছু না। আমার নাম কেন তারা লিখেনি, সেটা তাদের কাছে জিজ্ঞেস করুন, যে তুমি ওনার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলে, তুমি ওনার নাম দাওনি কেন?’

‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-বিকৃতি

১৯৭১ সালের এপ্রিলে কালুরঘাটে হওয়া যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়ে সিরু বাঙালি তার ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইয়ের ১৬৮ ও ১৬৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “আমার কাছে রক্ষিত চারটি ৩৬-ই হ্যান্ড গ্রেনেড ও ৭.৬২ মি.মি ২০০ রাউন্ড গুলি নিয়ে হামিদচরের ভেতর দিয়ে কর্ণফুলীর তীর বেয়ে গ্রামে পালিয়ে এলাম।” কিন্তু ওই চারটি গ্রেনেড ও গুলি কার কাছ থেকে কীভাবে পেলেন তা বইয়ে উল্লেখ করেননি সিরু বাঙালি। চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘সদ্য বিদ্রোহ করে বসা ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর বাহিনীর সঙ্গেই পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর যুদ্ধটি হয়েছিল। তখনকার প্রেক্ষাপটে কালুরঘাট যুদ্ধে সিরু বাঙালির গ্রেনেড পাওয়া দূরে থাক, সেখানে তার যুক্ত হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। কারণ যুদ্ধটি ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনীর মধ্যকার।’

এদিকে কালুরঘাট যুদ্ধ থেকে পাওয়া কথিত সেই চারটি গ্রেনেড দিয়ে তিনটি অপারেশন করার কথাও নিজের বই ও ফেসবুকে লিখেছেন সিরু বাঙালি। যদিও তার এসব কথার মধ্যে অনেক অসঙ্গতি আছে। কারণ মে মাসের ১ ও ৩ তারিখ তিনটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটনানোর কথা সিরু বাঙালি লিখলেও ওই সময়ে তিনি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রশিক্ষণ নেননি, যা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন।

২০২০ সালের ১৯ জুলাই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সিরু বাঙালি লিখেছেন, ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই গেরিলা প্রশিক্ষণের জন্য তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের হরিণা ইউথ ক্যাম্পে পৌঁছেছিলেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে লিখেছেন, “পালাটানার এক গভীর গিরিখাতে গ্রেনেড চার্জ প্রশিক্ষণ নিলাম আজ (২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১)। এটি ছিল আমার জীবনের ভয়ঙ্করতম অভিজ্ঞতা। গ্রেনেড শত্রু-মিত্র পার্থক্য বোঝে না।”

অর্থ্যাৎ একদিকে সিরু বাঙালি বলছেন, ১৯৭১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আবার অন্যদিকে নিজের লেখা বই ও ফেসবুকে সিরু বাঙালি দাবি করেছেন, প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগেই মে ও জুন মাসে পাকিস্তানিদের হত্যা করতে বেশকিছু গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন তিনি। আর এতে হতাহতও হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশিক্ষণগ্রহণ ছাড়া গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব নয়।

২০২০ সালের ২৭ এপ্রিল সিরু বাঙালি নিজের ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, “১৯৭১ সালে ২৭ এপ্রিল অধিকৃত চট্টগ্রাম শহরে ফেরত এসেছিলাম আজ। সাথে ছিল কালুরঘাট যুদ্ধের সেই ৪টি হ্যান্ড গ্রেনেড। বাকিটা পহেলা মে।” এরপর পহেলা মে ফেসবুকে লিখেছেন, “১৯৭১ সালের ১লা মে শনিবার। দুপুর ঠিক ১২টা। দুরুদুরু বক্ষে এগিয়ে গেলাম খাতুনগঞ্জে। হাতে ঠোঙ্গার মধ্যে রয়েছে একটি তাজা ৩৬-এইচই হ্যান্ড গ্রেনেড। ওঠা ছুঁড়তে হবে এখানে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি গরুর গাড়ির ফাঁকে অবাঙালি ব্যবসায়ী ‘হারুন মটন’ এর লোহার রেলিংঘেরা দোতলায় গিয়ে দাঁড়ালাম। রাস্তায় পাকিস্তানি কোনো সৈন্য নেই। তবুও ছুঁড়তে হবে। দুনিয়াকে জানান দিতে হবে নতুন করে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শুরু হয়েছে। জীবনে প্রথম বারের মতো গ্রেনেড ফাটাব। ভয়ে হাত-পা কাঁপছে। তবুও পিনমুক্ত বোমাটা ছুঁড়লাম। বিকট শব্দে ফাটল সেটা। একটা গরু পড়ে যেতে দেখলাম। আর কিছু দেখিনি। পলায়নপর মানুষের সাথে পালালাম। বাকি ইতিহাস ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ গ্রন্থে। জয় বাংলা।”

একইদিনের ঘটনা উল্লেখ করে ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইয়ের ১৮১ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “পিনমুক্ত গ্রেনেডটি রাস্তার উপর ছুঁড়ে মারলাম। কিন্তু সেটা যেখানে পড়ার কথা সেখানে না পড়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে অন্যখানে গিয়ে পড়ল। শরীরের কাঁপুনিটি আমার এত বেশি ছিল, ছুঁড়ে দেবার প্রেসারটি একটু বেশিই হয়েছিল। যার দরুণ ওটি রাস্তা থেকে গড়িয়ে সোজা নালায় পড়ে যায়। অবশ্য গ্রেনেডটি রাস্তায় না ফেটে নালায় ফাটাতে একটি সুবিধা হল এই, পথচারী লোকজনের খুব একটা ক্ষতি হল না। তবে বিকট আওয়াজে সমস্ত এলাকা প্রকম্পিত হল। মানুষের মাঝে চরম আতঙ্কের ভাব দেখা দিল। দু-একজন যারা আহত হয়ে পড়েছিলেন তারা ছাড়া আর সব লোকজন, যে যেদিকে পারল দৌড়ে পালাল।…” অর্থ্যাৎ ফেসবুকে সিরু বাঙালি লিখেছেন, ‘বিস্ফোরণে একটা গরু পড়ে গিয়েছিল। আর কিছু দেখেননি।’ আবার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘গরু নয়, কয়েকজন মানুষ আহত হয়েছিলেন।’

২০২০ সালের ৩ মে ফেসবুকে সিরু বাঙালি লিখেছেন, “৩ মে সোমবার ১৯৭১। চট্টগ্রাম বিপণী বিতানের দোতলার পশ্চিম ফটক দিয়ে আমার ২য় গ্রেনেডটি চার্জ করলাম বেলা ঠিক ১:৩০ মিনিটে। সকাল ১১টা থেকে গ্রেনেড নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম চার্জ করার জন্য। রাস্তায় পাকিস্তানি সৈন্য না পাওয়ায় এই দেরি। বোমা ছুঁড়েই পগারপার হয়েছিলাম। ফলে কী হয়েছিল দেখিনি। পরদিন বিকেলে দোতলার অবাঙালি ফার্মেসি ‘খালিদ জামাল’ এর বাঙালি কর্মচারী মোহাম্মদ মোসলেম মিয়া জানিয়েছিল, ‘৪ জন পাকি সৈন্য মাটিতে পড়ে ‘ধরফর’ করতে দেখে দোকান বন্ধ করে আমরা পালিয়েছিলাম। আর কী হয়েছে জানি না। আরো বিস্তারিত জানতে ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ দেখুন।” অথচ বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল- বইয়ে ‘৪ জন পাকি সৈন্যের ধরফর’ করার বিষয়ে কিছুই লিখেননি সিরু বাঙালি।

২০২০ সালের ৪ মে ফেসবুকে সিরু বাঙালি লিখেছেন, “৪ মে ৭১ সন্ধ্যায় আমার ৩য় গ্রেনেডটি চার্জ করলাম লাভলেনের মোড়ে, বিচারপতি ইমাম হোসেন চৌধুরীর বাড়ির সামনে। এবারের মতো শেষ, আবার আসব।” অথচ বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল- বইয়ের ১৮৩ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “ওই দিনই অর্থাৎ ৩ মে সন্ধ্যার কিছু পরেই আমার ৩ নং গ্রেনেডটি চার্জ করি বিচারপতি ইমাম হোসেন চৌধুরীর বাড়ির সামনে লাভলেনের মোড়ে। ওই মোড়টির মধ্যখানে যে আইল্যান্ডটি আছে তার উপর একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ছিল তখন। সেটার উপরই গ্রেনেডটি চার্জ করি।” অর্থ্যাৎ একবার সিরু বাঙালি বলছেন, বিস্ফোরণের ঘটনা ৪ মে, বিচারপতি ইমাম হোসেন চৌধুরীর বাড়ির সামনে। আবার তিনিই বলছেন, ঘটনা ৩ মে বিচারপতি ইমাম হোসেন চৌধুরীর বাড়ির সামনে লাভলেনের মোড়ে রাস্তার আইল্যান্ডের বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারে।

এদিকে ২২ মে ক্যাপ্টেন করিমের দলে যোগ দিয়েছিলেন বলে নিজের বইয়ে দাবি করেছেন সিরু বাঙালি। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, “৭১’ এর ৩ জুন পানওয়ালাপাড়া কবরস্থান থেকে তুলে বস্তায় মোড়ানো একটি এলএমজি নিয়ে দারোগাহাটে পাঞ্জাবি সৈন্যর সামনে পড়ে যাই। বাকিটা পুরাই ইতিহাস।” এই লেখা দেখে অনেকেই মনে করতে পারেন, এলএমজি নিয়ে সেদিন পাঞ্জাবি সৈন্যদের খতম করে দিয়েছিলেন হয়তো। কিন্তু তা নয়। বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল- বইয়ের ১৯২-৯৬ পৃষ্ঠায় সিরু লিখেছেন, ‘রিক্সায় করে এলএমজি বহনের সময় দারোগাহাট রোডের সাহেব পাড়ার গলির মুখে পাকিস্তানের দুজন পোশাকধারী মিলিশিয়ার সামনে তারা পড়েছিল। কিন্তু মাতাল অবস্থায় থাকায় ওই পাকিস্তানিরা এলএমজি বহনের বিষয়টি খেয়াল করতে পারেননি। পরে যে রিক্সা করে এলএমজি বহন করা হয় সেই রিকশাওয়ালা আড়াই টাকার ভাড়া ১০ টাকা চাওয়ায় তাকে হত্যার জন্য হাজিপাড়ায় জালাল ভাই নামের একজনের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং সেখানে তাকে হত্যা করা হয়।”

বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল- বইয়ের ২০০ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “৮ জুন দুপুর দেড়টায় চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ের মালখানার সামনে একটি গ্রেনেড চার্জ করি আমি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সম্ভবত ডেটোনেটরের গোলমালের দরুণ ওটি অক্ষত থেকে যায়। পরে অবশ্য ওদিন সন্ধ্যায় পাকিস্তানি সৈন্যরা ওটাকে ফায়ার করে ফাটায়।” ২০৯ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “ক্যাপ্টেন করিমের নির্দেশে ১৩ জুন রোববার দুপুর প্রায় দেড়টার সময় নগরের পাথরঘাটায় সেন্ট প্লাসিড স্কুলের কোণায় অবস্থিত এ্যাডভোকেট ফজলুল কবির চৌধুরীর বাসায় একটি গ্রেনেড চার্জ করি।..আমার ছুঁড়ে দেওয়া গ্রেনেডটি অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। ওই বাড়ির দেওয়ালের উপর দিকে জালিতারের বেড়া রয়েছে। সেই বেড়াতে লতাবাহার ফুলের গাছ জড়ানো রয়েছে। যে কারণে গ্রেনেডটি বেড়ার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় এবং ফিরে ওই গ্রেনেডটি রাস্তায় এসে বিস্ফোরিত হয়। এতে এক লোক গুরুতর আহত হয়।”

২১৮ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “কুমিল্লায় দুইজন মুক্তিযোদ্ধাকে পাঞ্জাবীদের হাতে তুলে দিয়ে চট্টগ্রাম নগরের শেরশাহ কলোনীতে আত্মগোপনে থাকা জামায়াতের এক পাণ্ডাকে ১৮ জুন গুলি করে হত্যা করেছেন তিনি।” তবে নিহতের নাম-পরিচয় উল্লেখ করেননি তিনি।

সিরু বাঙালির দাবি করা চট্টগ্রাম শহরের উপরোক্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কারও কাছ থেকে কখনো শোনেননি, জানেন না বলে জানিয়েছেন অন্তত ১৪ বইয়ে চার হাজার মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র্র ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ডা. মাহফুজুর রহমান। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি নিয়ে সিরু বাঙালির সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম আমি। তিনি যুদ্ধ চলাকালীন ঘটনার বিষয়ে আমাকে সাক্ষাৎকার দেননি। কারও সাক্ষাৎকার আমি নিলে তিনি যে তথ্যগুলো দিচ্ছেন, সেগুলো আমি বিভিন্নভাবে যাচাই-বাছাই করি। এ কারণে অনেকেই আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সাক্ষাৎকার দেন না।’

ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘১ মে ও ৩ মে তিনটি জায়গায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের যে ঘটনা সিরু বাঙালি বলেছেন, তা আমি কারো কাছ থেকে শুনিনি। এই গ্রেনেডগুলো তিনি পেলেন কীভাবে, সেটা তো বড় প্রশ্ন। এছাড়া গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য প্রশিক্ষণের দরকার হয়। যার তার হাতে গ্রেনেড যাওয়া তখনকার প্রেক্ষাপটে সম্ভব নয়।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে সিরু বাঙালি একুশে পত্রিকাকে বলেন, “বিস্ফোরণের ঘটনার সময় ডা. মাহফুজ কী তখন সেখানে ছিলেন? তিনি তো ছিলেন না। তিনি আমার গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানোর কথা না শুনলে তো আমার কিছু করার নেই। আপনি ৫১ বছর আগের ঘটনা জিজ্ঞেস করছেন, চট্টগ্রামে কত জায়গায় কত রকমের অপারেশন হয়েছে। আমি সবকিছু বলতে পারবো? কালুরঘাট যুদ্ধে মাহফুজুর রহমান ছিলেন? সেখানে কী হয়েছে তিনি জানেন? মাহফুজ ভাই আমার বন্ধু মানুষ। কিছু বলতে আমার ভালো লাগছে না। আপনি এসব বিষয় ওনার কাছে জিজ্ঞেস করেছেন কেন? তিনি কী চট্টগ্রামের যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন?’

চার হাজার মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নিয়ে ডা. মাহফুজুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ করে চলেছেন। কিন্তু ওনার বইয়ের কোনও জায়গায় চট্টগ্রাম শহরে আপনার যুদ্ধ করার তথ্যগুলো নেই- এ কারণে জানতে চাওয়া। কথাটি বলতেই সিরু বাঙালি বলেন, ‘তিনি তো আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।’ মুক্তিযুদ্ধের আগের সময়ের পরিস্থিতি নিয়ে আপনি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের পরিস্থিতি নিয়ে সাক্ষাৎকার দেননি- বলতেই সিরু বাঙালি বলেন, ‘না না, কথা সেটা না। আপনি গুলিয়ে ফেলছেন সবকিছু। এখন তো ক্যাপ্টেন করিম নাই, মারা গেছেন। আমি যা লিখেছি তা যাছাই করতে হলে আপনাকে যেতে হবে আমার এলাকায়, পশ্চিম পটিয়ায়, যেখানে আমি যুদ্ধ করেছি। তারা সব বলবে।’

১৯৭১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভারতে আপনি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কিন্তু তার আগেই ১ ও ৩ মে তিনটি জায়গায় তিনটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ কীভাবে ঘটিয়েছেন- জানতে চাইলে সিরু বাঙালি বলেন, ‘আপনি কথা বুঝেন না। ফালতু কথা বলেন। আমি ভারতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। গ্রেনেড চার্জ করার জন্য কোন ইয়ে লাগে না। আমাদেরকে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ১০ মিনিটের মধ্যে ক্যাপ্টেন করিম শিখিয়ে দিয়েছে। গ্রেনেড প্রশিক্ষণ নিয়ে আমি ক্যাপ্টেন করিমের অধীনে যুদ্ধ করেছি। তার নির্দেশে চট্টগ্রাম শহরে আমি গ্রেনেড চার্জ করেছি।’ সিরু বাঙালি ক্যাপ্টেন করিমের কাছ থেকে গ্রেনেড প্রশিক্ষণ নিয়ে ১ ও ৩ মে বিস্ফোরণে ঘটিয়েছেন বললেও ‘বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল’ বইয়ের ১৮৭ পৃষ্ঠায় সিরু বাঙালি লিখেছেন, “২২ মে সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো ক্যাপ্টেন করিমের সঙ্গে তার দেখা হয়।” এতে প্রমাণিত হয়, ক্যাপ্টেন করিমের কাছ থেকে সিরু বাঙালির গ্রেনেড বিস্ফোরণ শেখার বিষয়টি মিথ্যা।

এদিকে ফেসবুকে সিরু বাঙালি ‘মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট/ভারতীয় তালিকাভুক্ত এফ.এফ ১৫১ নং গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধা তালিকা’ প্রকাশ করেছেন। সেখানে নিজেকে গ্রুপ কমান্ডার দাবি করার পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ১২ জন মুক্তিযোদ্ধার কার কাছে কী অস্ত্র ছিল- তা উল্লেখ করেছেন সিরু বাঙালি। কারও নামের পাশে এসএলআর, কারও নামের পাশে রাইফেল, কারও নামের পাশে এলএমজি লেখা হয়েছে। অথচ ভারতীয় তালিকায় কোন মুক্তিযোদ্ধার নামের পাশে অস্ত্রের নাম নেই। এমনকি সিরু বাঙালির নামের পাশেও অস্ত্রের নাম নেই। তাহলে প্রশ্ন উঠেছে, সিরু বাঙালি অস্ত্রের তালিকা পেলেন কোথায়?

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার চৌধুরী মাহবুবুর রহমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সিরু বাঙালি চট্টগ্রামে কোনো আলোচিত ব্যক্তি ছিল না। আমরা পটিয়ায় তার কোনোদিন নামও শুনিনি। বইতে লিখেছে সে থাকতো ঢাকায়। চট্টগ্রাম শহরে তাকে কেউ চিনে না। এখন সবাই তার বন্ধু। ছাবেরও তার বন্ধু, রাজ্জাক, মাহফুজও তার বন্ধু। কালুরঘাট যুদ্ধে সে চারটি গ্রেনেড পেল কোথায়? এই গ্রেনেডগুলা বিস্ফোরণ ঘটানো শিখাইলো কে? সে গ্রেনেডগুলো বিচারপতির ওখানে মারলো, এখানে মারলো, বলে বেড়াচ্ছে। সব মিথ্যা।’

তিনি বলেন, ‘একাত্তরের ৩ জুন রাতে পানওয়ালা পাড়া কবরস্থান থেকে বস্তায় মোড়ানো একটা এলএমজি তুলে নিয়ে দারোগাহাটে পাঞ্জাবি সৈন্যের সামনে পড়ে যায় বলছে সিরু। এলএমজি মানে এটা তো পিস্তল না। এটা যুদ্ধের সময় বিশাল একটা কিছু। বিপক্ষ আসতেছে, ওদেরকে গায়েল করার অস্ত্র হলো এলএমজি। সে সময় মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণত ৩০৩ রাইফেল ব্যবহার করতো। আর ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য হলো এলএমজি। সে সময় একেবারে কবরস্থান থেকে তুলে বস্তায় মোড়ানো একটা এলএমজি নিয়ে দারোগাহাটে পাঞ্জাবী সৈন্যের সামনে যাওয়া, এককবারে অবিশ্বাস্য।

তিনি আরও বলেন, ‘সিরু বলেছে ক্যাপ্টেন করিম তাকে ১০টি গ্রেনেড দিয়েছে। ১০টি গ্রেনেড নিয়ে সে মুভ করেছে, কলেজিয়েট স্কুলে দুটি ফেলে দিল, গোলজার স্কুলে রাখলো দুটি। এগুলো কেউ দেখল না, কোনো হানাদারবাহিনীর টহল গাড়িও নেই। অথচ মে মাস মানে যুদ্ধের শুরু। এগুলো কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? তার সাথে বোয়ালখালীর নাছির ছিল বলে উল্লেখ করছে। নাছির তার জীবদ্দশায় যে জীবনী লিখছে সেখানে তো কিছু লিখে নাই।’

এদিকে সিরু বাঙালি চট্টগ্রাম শহরে যেসব গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন বলে দাবি করে আসছেন, সেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশনের সত্ত্বাধিকারী জামাল উদ্দিনের লেখা একটি বইটিতেও। কিন্তু সেসব মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করে বর্তমানে অনুশোচনায় ভুগছেন জামাল উদ্দিন।

এশিয়াটিক সোসাইটির মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অব বাংলাদেশ ওয়ার অব লিবারেশন’ প্রকল্পে গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া জামাল উদ্দিন বলেন, ‘সিরু বাঙালি চট্টগ্রাম শহরে যেসব গ্রেনেড চার্জ করেছে বলে দাবি করেছে, সব মিথ্য তথ্য। একেবারেই মিথ্যা।’ তাহলে আপনার বইয়ে সেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে কীভাবে- প্রশ্নে লেখক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি তো তখন বুঝতে পারিনি। আমি যখন বইটি লিখলাম, আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে, তখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সিরু বাঙালিকে বিশ্বাস করেছি। পরে জেনেছি, এ সমস্ত কোনকিছুতে যুক্ত ছিলেন না তিনি, বানিয়ে গল্প বলেছেন।’

তিনি বলেন, ‘সিরু বাঙালি মোটেই যুদ্ধ করেননি। তিনি ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন, এতটুকু সত্য। ট্রেনিং নিয়ে এসে তিনি ঘরে ঢুকেছেন, আর বের হননি। ওনার পুরো এলাকা মুসলিম লীগ, জামায়াত, রাজাকার অধ্যুষিত। তিনি আসলেই কিচ্ছু করেননি। গল্প বানিয়ে বানিয়ে বই লিখেছেন। এমনভাবে গল্পগুলো বানাচ্ছেন যে, কেউ টেরই পায় না। পরে খতিয়ে দেখতে গেলে বুঝতে পারে সবাই।’

‘আমার মতো মানুষকে তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা মানে তো মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে লেখা। এখন তিনি যে বানিয়ে বানিয়ে বলেছেন, এটা তো আমরা জানি না। পরে বই বের হওয়ার পরে চতুর্দিকে সমালোচনা শুরু হলে বুঝতে পারি। মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন যে, তিনি তো কোথাও ছিলেন না। তিনি পটিয়ার মানুষ, শহরে কেন আসবেন? এখানে কীভাবে গ্রেনেড চার্জ করলেন? ক্যাপ্টেন করিমের কথা বলছেন সিরু বাঙালি। অথচ করিমকে তিনি জীবনে চোখেও দেখেননি।’

বলাকা প্রকাশনের সত্ত্বাধিকারী জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাকে এমন একটা অবস্থায় ফেলে দিয়েছেন তিনি… আমার বইটা অনেক বড়। সিরু বাঙালির তথ্যগুলো সংশোধন করে এটার আরেকটি সংস্করণ বের করতে গেলে আমার অন্তত তিন থেকে চার লাখ টাকা লাগবে। নয়তো এতদিনে সংশোধন করে ফেলতাম। তিনি কমান্ডার পরিচয় দিয়েছেন, পরে দেখি তিনি কমান্ডারও না। কমান্ডার পরিচয় দিয়ে তিনি সিটি করপোরেশনসহ অনেক জায়গা থেকে সম্মাননা নিয়েছেন। এই যে তিনি ঘটনাগুলো করলেন, তার একটু লজ্জাও লাগে না। ফেসবুকে লিখেই চলেছে মিথ্যা কথাগুলো।’

জামাল উদ্দিন বলেন, ‘১৯৬৬ সালে সিরু বাঙালি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, এমন একটা তথ্যও দেন তিনি। তিনি কীভাবে গ্রেপ্তার হলেন? তিনি কলেজের ছাত্র নয়, ছাত্রনেতা নয়। কিছুই না। তারপরও বলে আমি গ্রেপ্তার হয়েছি, এই হয়েছি, সেই হয়েছি। গ্রেপ্তার হয়েছেন বলছেন, এই তথ্যটিও সম্পূর্ণ ভুয়া। তিনি তখন কলেজে পড়তেন না। ঢাকায় কী করতেন জানি না। পরে শুনছি, ঢাকায় পিয়ন নাকি ছোট একটা চাকরি করতেন। কিন্ত মানুষটা চালাক। মিথ্যা কথা এমনভাবে বলবে যে, যেন বিশ্বাস না করে পারে না। পড়ালেখা কোথায় করেছেন, তিনি সেটা বলেন না। কেন বলতে চান না জানি না।’

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে সিরু বাঙালি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আপনি আমার বইটি ভালোভাবে পড়লে জানতে পারবেন, আমি কী করেছি। আমি চট্টগ্রাম শহরে কখন এসেছি, কবে যুদ্ধ করেছি, ৯ এপ্রিল কোথায় ছিলাম, ২৩ মার্চ কোথায় ছিলাম, সব বইয়ে লেখা আছে। শুধু শুধু আমাকে বিরক্ত করবেন না। যদি আপনার মনঃপূত না হয়, আপনি যেখানে ইচ্ছা সেখানে চ্যালেঞ্জ করেন। আমার কিছু আসে যায় না।’