শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

এত ডলফিনের মৃত্যু কি ঠেকানো যেত না?

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২১, ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ

  • ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে প্রায় তিনশ’ ডলফিনের মৃত্যু
  • নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও ফাঁসজালে আটকা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে ডলফিন
  • বেশিরভাগ মৃত ডলফিনের শরীরে মিলেছে জখমের চিহ্ন

জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : মানুষের পর বুদ্ধিমান প্রাণীগুলোর অন্যতম ডলফিন। নদী বা সাগরে বিচরণ করলেও এই প্রাণীগুলো মাছ নয়। এরা সন্তান প্রসব করে, বুকের দুধ দেয়। ডলফিন নিশ্বাস নেয় পানির ওপর। এ কারণে নদী বা সাগরে সবখানেই ডলফিনকে একটু পরপর ভেসে উঠতে দেখা যায়। নদীতে বিচরণ করতে করতে অনেক সময় পেতে রাখা কারেন্ট জাল, ফাঁস বা চান্দিজালে ঠোঁট, পাখনা জড়িয়ে আটকা পড়ে ডলফিন। জালে আটকা পড়লে নিশ্বাস নেওয়ার জন্য পানির ওপর মাথা তুলতে না পেরে দম বন্ধ হয়ে মারা যায়।

বাংলাদেশের জলসীমায় এ পর্যন্ত কত সংখ্যক ডলফিন মারা গেছে এবং এর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি সরকারি কোনও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে ডলফিন সুরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয় বনবিভাগকে। ‘গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য রক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণ’ (ইপিএএসআইএই) নামে ডলফিন রক্ষায় একটি প্রজেক্ট থাকলেও সেটির কার্যক্রম খুবই সীমিত। প্রকল্পের কার্যকারিতা কতটুকু কিংবা অগ্রগতির বিষয়ে কোন পাওয়া যায়নি।

এছাড়া আদালতের নির্দেশে ‘হালদা নদীর ডলফিন হত্যা রোধ, প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং সকল প্রকার জাতীয় মা মাছ রক্ষা কমিটি’ গঠন করার হলেও এর তেমন কোনো কার্যক্রম কিংবা কমিটি থেকে তৎপরতাও দেখা যায়নি বিগত সময়ে। সেই কমিটি থেকে ডলফিনের মৃত্যুর কারণ চিহ্নিতকরণ, জীবিত এবং মৃত ডলফিনের কোনো তথ্য সংগ্রহ কিংবা সংরক্ষণের প্রচেষ্টাও করা হয়নি। এতেই বোঝা যায় ডলফিন রক্ষায় সরকারী সংস্থাগুলোর কতটা উদাসীন। নানামুখী সংকটের অজুহাতে কমিটির কার্যক্রম শুধু সচেতনতা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ।

তবে ডলফিনের মৃত্যু সংক্রান্ত ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটি বাংলাদেশ (ডব্লিউসিএস) থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৪৯টি ডলফিন মারা যায়। এর মধ্যে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ছয়মাসে চট্টগ্রামের হালদা নদীতে ১৮টি ডলফিনের মৃত্যু হয়। হালদা নদী রিসার্চ ল্যাবরেটরির তথ্যানুযায়ী, গেল দুই বছরে (২০২০-২০২১) শুধু চট্টগ্রামের হালদা নদীতেই ৬টি এবং সমুদ্র উপকূলে ৭টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে; যার অধিকাংশই ছিল আঘাতজনিত।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সেভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশ বলছে, ২০২০ সাল থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ টেকনাফ, উখিয়া, কুতুবদিয়া এবং সেন্টমার্টিনে উদ্ধার করা হয়েছে মোট ২১টি ডলফিনের মরদেহ। এছাড়া কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর একটিসহ চলতি বছর মোট ১৯টি মৃত ডলফিন ভেসে আসে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর একদিনেই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের মান্দারীটোলা সাগর উপকূলে তিনটি মৃত ডলফিন ভেসে আসে।

এভাবে দেশের উপকূলে একের পর এক ডলফিনের মরদেহ ভেসে আসছে। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকেরই মৃত্যু হয়েছে মাছ ধরার জালে বিশেষ করে কারেন্ট জাল ও ফাঁসজালে আটকা পড়ে আঘাতের কারণে। মৃত ডলফিনের বেশিরভাগের শরীরে মিলেছে জখমের চিহ্ন। এসব ঘটনা জানার পর যে কোনো মানুষের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে এই মৃত্যু কী ঠেকানো যেত?

সরকারের ইপিএএসআইএই প্রকল্পের গবেষক দলের বিশেষজ্ঞ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল আজিজ বলেন, ‘বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার নদীগুলোতে রয়েছে নোনা ও মিঠাপানির অনুকূল ভারসাম্য। এ কারণে বিশ্বজুড়ে বিপন্ন হয়ে পড়া ইরাবতী ডলফিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। কিন্তু পরিবেশদূষণ, নদীর নাব্যতা হ্রাস, অবাধে জাল ফেলে মাছ শিকার, নিষিদ্ধ ছোট ফাঁসের জালের বিস্তার, যান্ত্রিক নৌযানের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দিন দিন ডলফিনের আবাস ছোট হয়ে আসছে। এভাবে ডলফিনের বসতি এলাকায় মানুষের উৎপাত বাড়তে থাকলে সামনের দিনগুলোতে এদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।’

বাংলাদেশে সাধারণত গাঙ্গেয় ডলফিন, ইরাবতী ডলফিন, হাম্পব্যাক ডলফিন, বটল নোজ ডলফিনসহ আরো কয়েকটি প্রজাতির ডলফিনের দেখা মিলে। এরমধ্যে একমাত্র গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুক মিঠাপানির নদীর ডলফিন। দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা ও কর্ণফুলী নদীতে বিচরণ আছে গাঙ্গেয় (গাঙ্গেটিকা প্লাটানিস্টা) ডলফিনের। তবে মিঠা পানির এই ডলফিন প্রায় বিলুপ্তির পথে। ২০১২ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুসারে এই প্রজাতিটি সংরক্ষিত। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০১২ সালে এই ডলফিনকে অতি বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে লাল ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত করেছে।

তবে বিপন্ন প্রজাতিভুক্ত গাঙ্গেয় ডলফিনের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির তথ্যানুযায়ী গেল দুই বছরে (২০২০-২০২১) শুধু চট্টগ্রামের হালদা নদীতেই ৬টি এবং সমুদ্র উপকূলে ৭টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে। যার অধিকাংশই ছিল আঘাতজনিত। গবেষকরা বলছেন, হালদায় অবৈধ বালু উত্তোলন, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের বেপরোয়া বিচরণ, মানবসৃষ্ট বিপর্যয় ও পানির লবণাক্ততার কারণে ডলফিনের আবাসস্থল এখন চরম হুমকির মুখে। গবেষকরা বলছেন, দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে খুব তাড়াতাড়ি হালদা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে নদীর স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এই প্রাণীটি। শুধু মিঠা পানির গাঙ্গেয় ডলফিনই নয়, নোনাপানির ডলফিনের মৃত্যুর হিড়িক ভাবিয়ে তুলেছে পরিবেশবিদ ও ডলফিন গবেষকদের। কক্সবাজার, আনোয়ারা পারকি সমুদ্র সৈকত, সীতাকুণ্ডের সাগর উপকূলে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে ডলফিনের মৃত্যু। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল নোনা পানির বিপন্ন প্রজাতির ইরাবতী ডলফিন।

সর্বশেষ গত ২৩ সেপ্টেম্বর কুয়াকাটা সমুদ্রে সৈকতের তেত্রিশকানি পয়েন্টে ৫ ফুট দৈর্ঘ্যর একটি শুশক প্রজাতির মৃত ডলফিন ভেসে আসে। কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির সদস্যরা জানান, ডলফিনটির শরীরের উপরিভাগের চামড়া অনেকটা উঠে গেছে। ডলফিনটির মাথায় আঘাতের চিহ্ন আছে। তাদের ধারণা, জেলেদের জালের আঘাতে এটির মৃত্যু হয়েছে। এর আগে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর একটিসহ চলতি বছর মোট ১৯টি মৃত ডলফিন ভেসে আসে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের মান্দারীটোলা সাগর উপকূলে যে তিনটি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছিল, সেগুলোর মৃত্যু সঠিক কারণ জানা যায়নি। তবে জালে আটকা পড়ে ডলফিনগুলোর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে তদন্তে উঠে আসার কথা জানান সীতাকুণ্ড উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শামীম আহমেদ। শরীরের বেশিরভাগ পঁচে যাওয়ায় একই সাথে মৃত্যু রহস্য উদঘাটন না করেই মাটি চাপা দিতে হয় তিনটি ডলফিনকে।

এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর আনোয়ারা পারকি সমুদ্র সৈকতের ক্রিস্টাল গোল্ড জাহাজের সামনে ভেসে আসে ৬ ফুট দৈর্ঘ্যের বিশালাকৃতির বিপন্ন ‘ইরাবতী’ প্রজাতির একটি মৃত ডলফিন। শরীরে বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্নের পাশাপাশি ডলফিনটির শরীর দিয়ে রক্ত ঝরতে দেখেন স্থানীয় লোকজন ও পর্যটকেরা। ডলফিনটি থেকে সংগৃহীত রক্ত, মাংসপেশি ও ‘ইনটেশটাইনাল কনটেন্ট’ ময়নাতদন্ত করে জানা যায় জেলেদের জালের আঘাতে মৃত্যু হয়েছে ডলফিনটির। শেষ পর্যন্ত ৪ সেপ্টেম্বর বেড়িবাঁধের পাশে এটি পুঁতে ফেলা হয়। তার আগে ২০ আগস্ট সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুর ইউনিয়নের বগাচতর সমুদ্র উপকূলের সংরক্ষিত কেওড়াবনের ভেতর পাওয়া যায় আরও সাড়ে ছয় ফুট লম্বা ও দুই মণের বেশি ওজনের একটি মৃত ডলফিন। ডলফিনটির শরীরেও ছিল বেশ কিছু আঘাতের চিহ্ন। তবে শরীরের বিভিন্ন অংশ পঁচে যাওয়া নমুনা সংগ্রহ কিংবা ময়নাতদন্ত না করেই মৃত ডলফিনকে সেখানেই মাটিচাপা দেওয়া হয়।

শুধু পূর্ণবয়স্ক নয়, বাচ্চা ডলফিনের মৃত্যুও হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। গত ১ আগস্ট কর্ণফুলী নদীর তীরে (চান্দগাঁও থানার হামিদচর এলাকায় ডাঙ্গায়) এক বছরেরও কম বয়সী গাঙ্গেয় প্রজাতির ডলফিনের বাচ্চা মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ১৫ কেজি ওজনের ডলফিনটির দৈর্ঘ্য ছিল ৩ফুট ৫ ইঞ্চি। সেসময় সংরক্ষণের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে নিয়ে যাওয়া হয় মৃত ডলফিনটিকে।

পরবর্তীতে গত ২৬ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) একদল গবেষক ডলফিনটির ময়নাতদন্ত করেন। ময়নাতদন্ত শেষে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, প্রথমে জেলেদের জালে আটকা পড়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে যায় ডলফিনটির এবং পরবর্তীতে পিঠে আঘাতের কারণে সেটির মৃত্যু হয়। তারা জানান, জেলেরাই সেটি ডাঙ্গায় ফেলে যান।

ডলফিনের মৃত্যুর এই মিছিল এখানেই শেষ নয়। গত ১৫ জুলাই বোয়ালখালী উপজেলায় কর্ণফুলী নদীর পাশের ছন্দারিয়া খালের ১৩ নম্বর রেলওয়ে ব্রিজ এলাকায় ৭ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি ডলফিনের মৃত দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ডলফিনটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছিল আঘাতের চিহ্ন। সেসময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুন নাহার ময়নাতদন্তের মাধ্যমে ডলফিনটির মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করার কথা জানালেও অজানা রয়ে গেছে ডলফিনটি মৃত্যু রহস্য। তার ঠিক ৯ দিন আগে গত ৬ জুলাই চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মেখল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে চানখালী খালে একটি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়। প্রায় সাড়ে ৭ ফুট দীর্ঘ ডলফিনটির ওজন ছিল প্রায় ১২০ কেজি।

এছাড়া চলতি বছরের ১৭ মে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকায় ভেসে আসে একটি মৃত ডলফিন। অন্যান্য ডলফিনের মত এটির শরীরেও ছিল অসংখ্য জখমের চিহ্ন। পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ দ্য নেচার অফ বাংলাদেশ জানায়, ভারী কোন বস্তুর আঘাতে এমন জখম হয়েছিল ডলফিনটির। তাদের ধারণা, জেলেদের জালে জড়িয়ে গেলে তাদের আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে সেই ডলফিনের।

২০২০ সালের ১৪ অক্টোবর হালদা নদীতে (রাউজানের পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডে কাগতিয়া আজিমের ঘাট এলাকা) সাড়ে চার ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪০ কেজি ওজনের বিপন্ন প্রজাতির একটি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়। লেজে ভাসা জাল জড়ানো ডলফিনটির দেহে আঘাতের চিহ্ন ছিল। মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখা না হলেও গবেষকেরা এর আঘাত দেখে ধারণা করেছিলেন, নদীতে জালে আটকে যাওয়ার পর বালুবাহী নৌযান বা ইঞ্জিনচালিত নৌকার প্রপেলারের আঘাতে ডলফিনটির মৃত্যু হয়েছে। অর্ধগলিত অবস্থায় উদ্ধার করার পর ওইদিনই গর্ত করে পুঁতে ফেলা হয় ডলফিনটি। একই বছরের ২৪ মে চট্টগ্রামের হালদা নদীর রাউজান অংশের উরকিরচর এলাকায় ৭ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়। মৃত ডলফিনটির মুখে ছিল মাছ ধরার জালের টুকরো। ধারণা করা হয় জালে আটকা পড়ে মৃত্যু হয়েছিল ডলফিনটির।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সেভ দ্য নেচার অফ বাংলাদেশে’র হিসেব অনুযায়ী, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২০ সালের আগস্ট কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ টেকনাফ, উখিয়া, মাতারবাড়ী, কুতুবদিয়া উপজেলা ও সেন্টমার্টিনের সমুদ্র সৈকতের বিভিন্ন অংশ থেকে যে ২৫টি ডলফিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগের গায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল।

২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সেন্টমার্টিন উত্তর সৈকতে একটি, ২৩ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার জেটির দক্ষিণ পাশে একটি, ২৪ ফেব্রুয়ারি সেন্টমার্টিন পুলিশ ফাঁড়ির সামনে একটি, ২৫ ফেব্রুয়ারি সেন্টমার্টিন সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম পাড়ায় একটি এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সোনারপাড়া পয়েন্টে একটি এবং টেকনাফের খুড়েরমুখে একটি মৃত ডলফিন ভেসে আসে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মীরা ডলফিনগুলোকে মাটিচাপা দেয়; প্রতিটি ডলফিনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন তারা।

এছাড়া একই বছরের ৪ এপ্রিল টেকনাফ উপজেলার শাপলাপুর সমুদ্র সৈকতে বিশাল আকৃতির একটি মৃত ডলফিন ভেসে আসে, যার মাথায় ও লেজে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরদিন ৫ এপ্রিল ইনানী সমুদ্র সৈকতে রয়েল টিউলিপের সামনে সমুদ্রের পানিতে ভাসমান একটি মৃত ডলফিন ভেসে আসে যার মাথায় ও পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন এবং লেজে বাধা ছিল রশি।

পরবর্তীতে ১২ মে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের উখিয়া উপজেলার শফির বিল এলাকায় ১১ ফুট লম্বা বিশাল আকৃতির মৃত ডলফিন ভেসে আসে। ডলফিনটির মাথা, লেজের উপরের অংশে এবং চোখে ধারালো অস্ত্রের আঘাত স্পষ্ট ছিল। ১৯ মে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবনী পয়েন্টের ছাতা মার্কেটের সামনে একটি ক্ষতবিক্ষত মৃত ডলফিন ভেসে আসে। একই মাসের ২০ তারিখ কলাতলী পয়েন্টের সাগরের অগভীর অংশে ভাসমান অবস্থায় একটি মৃত ডলফিন ভেসে আসে।

একই বছরের ২২ জুন কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় সমুদ্র সৈকতে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি মৃত হাম্পব্যাক ডলফিন পাওয়া যায়। ১০ ফুট উচ্চতার ডলফিনটির ওজন ছিল ১৬০ কেজি। বিরল প্রজাতির ডলফিনগুলো শুধুমাত্র ভারত এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ক্রান্তীয় জলেই দেখা যায়। শরীরে জখমের চিহ্ন থাকায় ধারণা করা হয়েছিল আঘাত পেয়ে মৃত্যু হয় ডলফিনটির।

হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির গবেষণা বলছে, বিগত সময়ে বেশিরভাগ ডলফিনের মৃত্যুর হয়েছে যান্ত্রিক নৌযান ও বালুবাহী ড্রেজারের ডুবে থাকা যান্ত্রিক পাখার আঘাতে। এছাড়া মৃত ডলফিনগুলোর বড় অংশের মৃত্যু হয়েছে জালে আটকা পড়ে এবং অসচেতন জেলেদের আঘাতের কারণে। এছাড়া পরিকল্পিতভাবে ডলফিন হত্যার ঘটনা ঘটেছে বিগত সময়ে। শুধু তাই নয়, চর্বি সংগ্রহের জন্যও এর মধ্যে কয়েকটি ডলফিন শিকার করা হয়েছে।

জানা যায়, ডলফিনের চর্বি দিয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী সুস্থ হয় এমন কুপ্রথা প্রচলিত আছে হালদাপাড়ের গ্রামগুলোতে, যার কারণে অনেকে ফাঁদ পেতে ডলফিন শিকার করেন। এছাড়া হালদাপাড়ের অনেক জেলেদের মধ্যে এমন কুসংস্কারও আছে যে মাছ ধরার জালে ডলফিন আটকালে আর কখনই মাছ ধরা পড়বে না। শুধু তাই নয়, ডলফিনের পাখনা ও লেজ ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার হয় এই বিশ্বাসে সাগরপাড়ে ডলফিন মারছেন অনেক জেলে। বিগত সময়ে সাগরের তীরে এমন অনেক ডলফিন ভেসে এসেছে যেগুলোর লেজ ও পাখনা কাটা ছিল।

চর্বি সংগ্রহ করতে ২০২০ সালের ৮ মে হালদা নদীতে (রাউজান উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের জিয়া বাজার এলাকার ছায়ারচর নামক স্থানে) একটি গাঙ্গেয় ডলফিনকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৫ ফুট ২ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যর এবং ৫২ কেজি ওজনের ডলফিনটির মাথা বরাবর আড়াআড়িভাবে এবং ঘাড় থেকে লেজ পর্যন্ত দৈর্ঘ্য বরাবর কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ঘটনাটি চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। শুধু দেশে নয়, বৈশ্বিকভাবে মহাবিপন্ন গাঙ্গেয় ডলফিন হত্যার সংবাদটি গুরুত্বের সাথে ওঠে আসে এএফপি, আল জাজিরাসহ বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।

এ ঘটনার পর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চট্টগ্রামের হালদা নদীতে ডলফিন হত্যা রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের নির্দেশনা চেয়ে ২০২০ সালের ১২ মে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আইনজীবী আব্দুল কাইয়ুম লিটন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক ও চট্টগ্রামের রাউজানের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে রিটে বিবাদী করা হয়। রিটের প্রেক্ষিতে হালদা নদীতে ডলফিন রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে ডলফিন রক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালককে ইমেইলের মাধ্যমে আদালতকে জানাতে বলা হয়।

এরপর ১৯ মে বিষয়টি আবার শুনানি হয় উচ্চ আদালতে। হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য, কার্প জাতীয় মা মাছ ও ডলফিন রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বিশেষ একটি কমিটি গঠন করে দেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ। আদালত বলেছেন, কমিটিতে হালদা নদী এলাকার সংসদ সদস্যরা উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবেন। কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। হাইকোর্ট আদেশে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কমিটির কার্যক্রম পরিচালনা করতে বলেন। আদালতে নির্দেশে কমিটি গঠন করা হলেও সেই কমিটি থেকে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় নি।

এ প্রসঙ্গ কমিটির সদস্য সচিব ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সত্যি বলতে আমাদের জনবলের সংকট রয়েছে। যার কারণে আমরা চাইলেও তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছি না। তবে আমরা হালদা পাড়ের বাসিন্দা ও উপকূলীয় এলাকার জনগণ এবং জেলেদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। এছাড়া আমাদের কাছে যদি কেউ ডলফিন সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো আইনি সহযোগিতা চায়, আমরা সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডলফিনের মৃত্যু কিংবা বর্তমান সংখ্যা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এগুলো করতে একটা টিম, প্রজেক্ট এবং আর্থিক যোগান প্রয়োজন হয়, যার কোনোটাই আমাদের নেই। তবে জনবল সংকটের বিষয়ে আমি মৌখিক ও লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়েছি। আশা করছি জনবল সংকট নিরসন হলে আমরা পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারবো। তবে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি সচেতন না হয় তাহলে কখনোই ডলফিন রক্ষা সম্ভব নয়।’ যোগ করেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী।

পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আ ন ম মোয়াজ্জেম হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিগত সময়ে মৃত অবস্থায় ভেসে আসা বেশিরভাগ ডলফিনের শরীরে আমরা আঘাতের চিহ্ন দেখেছি। এছাড়া জেলেদের জালে আটকা পড়ে বেশিরভাগ সময় ডলফিন মারা যায়। কারণ জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে এখনও কারেন্ট জাল ব্যবহার করে, যা ডলফিনসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাছাড়া জালে আটকা পড়লে জাল বাঁচাতে জেলেরা ডলফিনদের আঘাত করে। এমনকি লেজে রশি বেঁধেও জাল থেকে বের করে। ডলফিন খুবই সংবেদনশীল প্রাণী। অনেক সময় জেলেদের আঘাতের আগেই এটি স্ট্রোক করে মারা যায়।’

তিনি বলেন, ‘চলতি বছর কক্সবাজারসহ উপকূলীয় এলাকায় বেশি ডলফিন মারা গেছে। আর এসব এলাকাজুড়ে জেলেরা মাছ ধরে। মাছ ধরার আধুনিক পদ্ধতি না থাকা এবং জেলেরা ডলফিনের গুরুত্ব না বুঝায় মৃত্যুর হার বাড়ছে। তাছাড়া ডলফিন রেসকিউ সম্বন্ধে জেলেদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় না। জেলেরা এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেলে ডলফিনের মৃত্যুর হার অনেকটা কমে আসতো। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রকল্প বন বিভাগের আছে ঠিকই, কিন্তু ডলফিন রক্ষায় তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না। ডলফিনের সঠিক কোনো পরিসংখ্যানও নেই তাদের কাছে।’

মোয়াজ্জেম হোসেন আরও বলেন, ‘ডলফিনের মৃত্যুর কারণ জানতে বন বিভাগকে এখনও অনুমানের উপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ডলফিনগুলোর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অজানা রয়ে যায়। এ বিষয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের নজরদারি প্রয়োজন। এছাড়া হালদার মত উপকূলীয় এলাকার নদীগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা প্রয়োজন। সমুদ্রের যেসকল অংশে ডলফিনের বিচরণ বেশি সেগুলোর নিরাপত্তার স্বার্থে সংরক্ষিত এলাকার আওতায় আনতে হবে। সেসব অংশে জেলেদের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পাশাপাশি নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের তদারকি বাড়াতে হবে। তাহলে ডলফিনের মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।’

এদিকে, চলতি বছরের মার্চে হালদা নদীতে মা মাছ ও ডলফিন রক্ষায় নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য ৮টি পয়েন্টে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। নৌ-পুলিশের একটি ইউনিটের মাধ্যমে ক্যামেরাগুলো দিয়ে নজরদারি চালানো হয়। পরবর্তীতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ) আরও ৪টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে। এগুলোর মাধ্যমে হালদা নদীর আরও ৬ কিলোমিটার এলাকায় নজর রাখা হচ্ছে।

তবে এসব সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেও থামানো যাচ্ছে না ডলফিনের মৃত্যু, উদঘাটন করা যাচ্ছে না মৃত্যু রহস্য। ফলে প্রশ্ন উঠেছে এসব ব্যয়বহুল ক্যামেরা স্থাপনের সুফল নিয়েও। যদিও সদরঘাট নৌ থানার ওসি এবিএম মিজানুর রহমানের মতে, হালদায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পর পূর্বের তুলনায় অনেকাংশেই কমেছে ডলফিনের মৃত্যুর হার। তার দাবি, বিগত সময়ে মানব সৃষ্ট কারণে ডলফিনের মৃত্যু হলেও বর্তমানে এমনটা আর হচ্ছে না। বর্তমানে যে মৃত ডলফিনগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করছে।

একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘জালে জড়ানো একটি ডলফিন সম্প্রতি পাওয়া গেছে, তবে সেটি কর্ণফুলীর তীরে। আর কর্ণফুলীতে জাল অবৈধ নয়। এছাড়া শরীরে আঘাতের চিহ্নসহ যে ডলফিনটি ভেসে এসেছিল সেটি বোয়ালখালীর খালে পাওয়া গিয়েছিল। শরীরে আঘাতের কারণে ডলফিনের মৃত্যু অস্বাভাবিক কিছু নয়, কারণ এই নদীতে জেলেরা মাছ ধরে পাশাপাশি বেশকিছু নৌযানও চলাচল করে। আর ওইসব এলাকা আমাদের সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাধীন নয়। তবে মদুনাঘাট এবং কর্ণফুলী-বোয়ালখালীর মোহনায় খুব তাড়াতাড়ি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে ওসি এবিএম মিজানুর রহমান বলেন, ‘যেসব পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে সেগুলো বাইপাস করে কোন যান্ত্রিক নৌযান চলাচলের সুযোগ নেই। আর আমাদের একটি টিম সার্বিকভাবে সেগুলো মনিটরিং করছে। তবে পুরো হালদাকে তো এখানো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি তাই জেলেদের জালের বিস্তার এখনো আছে। এটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হলে আরও অনেক পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। সেই পয়েন্টগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। সেই পর্যন্ত আমরা নিয়মিত টহলের মাধ্যমে এ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি।’

অন্যদিকে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে হালদায় ১৮টি মৃত ডলফিনের মৃত্যুর ঘটনা অনুসন্ধানে করতে নেমে সরকারের কাছে ৬ দফা সুপারিশ করে হালদা নদী রিচার্স ল্যাবরেটরি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- নদীতে গিয়ার জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, ড্রেজার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা, ডলফিন সম্পর্কে নদী তীরবর্তী মানুষকে সচেতন করা, ডলফিনসহ জলজ প্রাণী সংরক্ষণে বিদ্যমান মৎস্য আইন সংস্কার এবং নদীতে কারখানার বর্জ্য ও দূষিত পানি যাতে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ও হালদা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ড. মনজুরুল কিবরীয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের করা সুপারিশের কয়েকটি আমলে নেওয়া হলেও বেশিরভাগই এখনও কার্যকর করা হয়নি। আমাদের সুপারিশের পরও জেলেদের নিষিদ্ধ জালে আটকা পড়ে বেশ কয়েকটি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে। জলজ প্রাণী সংরক্ষণে বিদ্যমান মৎস্য আইন সংস্কারের একটি দাবি আমাদের ছিল, যা এখনও আমলে নেওয়া হয়নি। বর্তমান মৎস্য আইনে ডলফিনের রক্ষায় কোনো কিছু নেই। আইন সংস্কার করা হলে ডলফিন রক্ষায় আইনি সুবিধা পাওয়া যেতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘কারখানার বর্জ্য ও দূষিত পানি যাতে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা নিতে আমাদের সুপারিশ ছিল। বড় কারখানা থেকে বর্জ্য হালদায় না আসলেও ছোট ছোট অসংখ্য পোলট্রি ফার্মের বর্জ্য এখনো নদীতে ফেলা হয়। এসব বর্জ্যে বিষাক্ত এ্যামোনিয়া থাকে, যা ডলফিন ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। শহর এলাকার বর্জ্য অনন্যা আবাসিক এলাকায় গিয়ে পড়ে, যা বামনশায়ী খাল হয়ে হালদায় পড়ে। এই খালটি যদি পুনরুদ্ধার করে গতিপথ সংস্কার করা যায় তাহলে হালদাকে ৭০ ভাগ দূষণমুক্ত করা যাবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল হালদাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করতে, কিন্তু সেটা করা হয়নি। অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলে বনবিভাগের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকার পাশাপাশি হালদা আইনের আওতায় চলে আসতো। এছাড়া ডলফিন রক্ষায় বন বিভাগের ভূমিকা ও সহযোগিতা পর্যাপ্ত নয়। তাদের তৎপরতা আরও অনেকাংশে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আর হালদা পাড়ের মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করা হলেও এ বিষয়ে শতভাগ সফলতা আসেনি। এ বিষয়ে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।’