শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

ডেটলাইন খুরুশিয়া: সড়কের বেহাল দশায় বিপন্ন জনজীবন

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২১, ৮:৩৬ অপরাহ্ণ


আবছার রাফি : চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের পূর্ব-খুরুশিয়া গ্রামের আব্দুল হামিদ সড়কের সংস্কার কাজ এক বছরের ভেতর শেষ করার কথা থাকলেও শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। রাস্তার ২০-২৫ শতাংশ কাজ সেরে অনেকটা দায়সারা সময় পার করছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে রাস্তায় চলাচলে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে এই গ্রামীণ এলাকার প্রায় দশ সহস্রাধিক বাসিন্দাকে।

জানা যায়, রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের পদুয়া রাজারহাট থেকে কমলাছড়ি ব্রীজ পর্যন্ত খুরুশিয়া আবুদল হামিদ সড়কের ৪ কিলোমিটার সংস্কার কাজের জন্য গত বছরের ৮ জুলাই সাড়ে ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে দরপত্র আহ্বান করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৯১ হাজার টাকায় সংস্কার কাজটির পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সালেহ কনস্ট্রাকশন। সড়কের সংস্কার কাজটি গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে এই বছর ২২ সেপ্টেম্বরের ভেতর শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সালেহ কনস্ট্রাকশন এখনো পর্যন্ত কাজটি শেষ করতে পারেননি।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারবিহীন পড়ে থাকায় এই রাস্তার অধিকাংশ স্থান খানাখন্দে ভরে গেছে। তারওপর বর্ষার বৃষ্টির পানি জমে কাদাপানিতে একাকার হয়ে গেছে রাস্তাটি। ফলে প্রতিনিয়ত বিপাকে পড়তে হচ্ছে পথচারীসহ যানবাহন চালককে। রাস্তায় বেড়ে চলছে নানা দুর্ঘটনা। বেহাল দশার কারণে যানচলাচলের প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে রাস্তাটি। এ নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী। ঠিকাদারের স্বেচ্ছাচারিতা ও স্থানীয় প্রশাসনের নজরধারীর অভাবকেই দুষছেন তারা। ঠিকাদার পরিবর্তন বা দ্রুত সময়ের ভেতর কাজ শেষ করার আহ্বান এলাকাবাসীর।

সোমবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, রাস্তাটির প্রায় ৭৫ শতাংশ অংশজুড়ে ইটের খোয়া বের হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব বড় বড় গর্তের কারণে রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী যানবাহন ডানে-বাঁয়ে কাত হয়ে হেলেদুলে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। যানবহানের পাশাপাশি পায়ে হেঁটে চলাও বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে পথচারীদের। যানবাহনে চাকা পড়ে খানাখন্দে জমে থাকা কাদাপানি ছিটকে পড়ছে পথচারীদের গায়ে। এতে পরিধেয় কাপড়-চোপড় নষ্ট হচ্চে পথচারী ও স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীদের। বিশেষত: পূর্ব খুরুশিয়ার ফকির টিলা, খাজারটিলা, মাইজপাড়া, স্কুলভিটা, গাইনবাড়ী, সন্ধীপটিলা, দলিয়ারমুখ এলাকার রাস্তার বিভিন্ন অংশে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা দেখা গেছে।

মো. জাবেদ হোসেন নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা একুশে পত্রিকাকে বলেন, পদুয়া ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় বাজার রাজারহাটে ব্যবসা থাকায় তাকে প্রতিনিয়ত চলাচল করতে হয় এই রাস্তা দিয়ে। ইট সরে গিয়ে গর্ত তৈরি হওয়ায় প্রতিনিয়ত জাবেদসহ অন্যান্য পথচারীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়, তারওপর বৃষ্টির কারণে এই ভোগান্তির মাত্রা এখন বেড়ে গেছে দ্বিগুণ পরিমাণে।

প্রতিদিন আসা-যাওয়া করার কারণে তিনি দেখতে পান, এই রাস্তায় ডেলিভারি মহিলা রোগী বা অন্যান্য গুরুত্বর অসুস্থ ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিতে কতটা অবর্ণনীয় কষ্টের মুখোমুখি হতে হয় ভুক্তভোগী পরিবারকে। সবচেয়ে বেশি নাজেহাল হতে হয় জরুরী রোগী হাসপাতালে নিতে। অনেক সময় যানবাহনের বদলে দোলনায় চড়িয়ে কাঁধে করে রোগীকে নিয়ে যাওয়া-আসা করতে হয়। নয়তো বা পাঁজাকোলা করে রোগীকে নিয়ে যেতে হয়। কারণ রাস্তায় ইট সরে গিয়ে উঁচুনিচু গর্ত হয়ে যাওয়ায় যানবাহনে তীব্র ঝাঁকুনির সৃষ্টি হয়; সেই ঝাঁকুনিতে অসুস্থ মানুষ আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে।

স্থানীয় একজন সিএনজি চালক বলেন, ‘ইটের খোয়া বের হয়ে খানাখন্দের সৃষ্টি হওয়ায় গাড়ি নিয়ে দ্রুত চলাচল করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যে কারণে এই রাস্তায় চলাচল করতে অনেক সময় ব্যয় হয়। ফলে এই রাস্তায় নিয়মিত চলাচল করা যানবাহনের মেরামত ব্যয়ও বেড়ে যায়। রাস্তাটি সংস্কারের অভাবে আমাদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।’

ষাটোর্ধ্ব বয়সী আরেকজন পথচারী বলেন, ‘এমন কোনো ব্যক্তি নেই, যে একবার এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া-আসা করেছে অথচ মুখ থেকে একবার হলেও কষ্টের কথা বের করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেননি। এছাড়া পদুয়া ইউনিয়নের অন্যান্য রাস্তাগুলো ভালো আছে কিন্তু আমাদের রাস্তার বেহাল দশার কারণে শহর বা দূর থেকে কোনো মানুষ এলে তাদের কাছে লজ্জিত হতে হয়।’

তিনি অনেকটা আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে দূরের কোনো মানুষ এই এলাকার মানুষের সাথে বিয়ে-শাদীর সম্পর্কে জড়াতে চান না। রাস্তার অজুহাতে বিয়ে ভেঙে গেছে, এমন অনেক নজির আছে। রাস্তার এমন দুরবস্তার জন্য কাঠবোঝাই জিপ গাড়ি, মিনি ট্রাকও দায়ী। প্রায় সময় পাহাড় থেকে গাছ কেটে বড় ট্রাকে বোঝাই করে এখান থেকে অন্যত্র নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা।’

এ বিষয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স সালেহ কনস্ট্রাকশনের অংশিদার মো. মফজলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘রাস্তার কাজ শুরু করবো কেমনে? রাস্তার তো সমস্যা আছে। রাস্তার ব্রীজের কাজগুলো শেষ হয়েছে। চারটা ব্রীজের কাজ করছি।’

চারটা ব্রীজ কোথায় কোথায় করেছেন?- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না। আমি যাই না, সাইডে যায় একজন, নাম ফারুক। আপনি জানেন না কোথায় করছে? আমার থেকে আপনি যে রিপোর্ট নিচ্ছেন, যে আমার থেকে রিপোর্ট নিতে বলছে তাকে জিজ্ঞেস করবেন। আমি কাজ দেখি না, কাজ দেখে ফারুক। আমি এক সাইডে যাই, ও আরেক সাইডে যায়। ভাই, এটা মন্ত্রীর এলাকা। আমি থানা আওয়ামী লীগে আছি তো। মানুষের কষ্ট হচ্ছে আমি কী করবো এটা বলেন? আপনি বলেন? সরকার যদি রিটার্চ না করে আমি কাজ করতে পারবো? ওখানে যে ভাঙা আছে ওই ভাঙার ওপরে তো কাজ করতে পারবে না। টেন্ডার যারা দিছে তাদেরকে বলছি, এই জিনিস দিলে হবে না, এই জিনিস দিলে হবে না। তারা ওইটা দেখছে, তারপর অনুমোদনের জন্য ঢাকায় পাঠায়ছে। ওটার অনুমোদন না আসলে তো কাজ করতে পারবে না। আপনি এলজিইডিতে জিজ্ঞেস করবেন। আপনি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করেন কেন? আপনি জিজ্ঞেস করবেন- থানা ইঞ্জিনিয়ারের কাছে, এলজিইডির কাছে। কী জন্য বসে রইছে, কী জন্য কাজ করতেছে না। আপনি জিজ্ঞেস করবেন যে, এলজিইডিতে। আপনি আমাদের কন্ট্রাকটারকে জিজ্ঞেস করা তো ঠিক না। আপনি এলজিইডি থেকে জানেন। আমি কালকেই নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে দেন-দরবার করে আসছি।’

কিছুক্ষণ পর নিজেকে মেসার্স সালেহ কনস্ট্রাকশনের মালিক আর মো. মফজলকে পার্টনার হিসেবে পরিচয় দিয়ে ফোন করেন মো. ওমর ফারুক। তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে যদি কোনো অ্যাস্টিমেটের ভেতর দুর্বলতা থাকে, তা আমরা খুঁজে বের করি। এবং ডিসিশাসেন জন্য অপেক্ষা করি। এই রাস্তার মধ্যে দুইটা কালভার্ট আছে- একটা ছোট, আরেকটা বড়। দুইটা কালভার্ট করেছি। যেখানে রাস্তা ছোট বা পুকুর বেশি সেখানে কিছু প্লেওয়াল দিতে হবে। রাস্তার বর্তমান ওয়েট হচ্ছে ৫ ফিট। আর মাটি ভরাটের পর রাস্তা হবে যে ১৮ ফিট। কার্পেটিং হবে ১০ ফিট। আগে আমার কাজ হচ্ছে অফিসিয়াল অর্ডার অুনযায়ী স্ট্রাকচার করে ফেলতে হবে। স্ট্রাকচার করার পর প্লেওয়াল, রিটানিং ওয়াল বা যেই ওয়াল থাকুক, ওই সব ওয়ালের কাজ করতে হবে। এরপর রাস্তার সাইড ভরাট করতে হবে। এরপর বক্স কাটতে হবে। আড়াই ফুট যদি বক্স কাটি তাহলে দুইপাশে সেখানে পানি জমে যাবে। তখন মানুষ কষ্ট পাবে।

খুরুশিয়া খালের সাইড ভেঙে গেছে। যেখানে সাইড ভেঙে গেছে সেখানে ৩ মিটার উচ্চতার একটা রিটার্নিং ওয়াল দিয়েছিলো। এই দশফুটের ওয়ালের তিনভাগের দুইভাগ মাটির ভেতর চলে গেছে। আর উপরে আছে তিনফুট থেকে কিছু বাড়তি। আমি অ্যাডিশনাল চীফ, সুপারিটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সবাইকে দেখিয়েছি। তখন তারা মুল অ্যাস্টিমেট খুলে দেখেছে যে, সেখানে কিছু ঘানিব্যাগ দেওয়া হয়েছিলো। টেন্ডার হওয়ার আগে ওই ঘানিব্যাগগুলা কেটে ফেলা হয়েছে। এটা ধরা পড়ার পর তাদেরকে নিয়ে এসে দেখিয়েছি। তারপর কিছু কিছু পুকুরে প্লেওয়াল পড়েনি। ১৮০ মিটার প্লেওয়াল আরও ভরাট করতে হবে। ৭৪ মিটার ঘানিব্যাগ দিতে হবে। এগুলা অ্যাস্টিমেট করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে ঈদের আগে। যেটার প্রশাসনিক অনুমোদন এখনো আসেনি। এসব কাজ শেষ হওয়ার পরে বক্স করতে হবে , না হয় সাইডের মাটি নেমে যাবে। এখন মানুষ সাময়িক কষ্ট পাচ্ছে যেহেতু রাস্তা খারাপ। এখন বর্ষাকাল, মানুষ ধান রোপন করেছে। আর মাটি কাটতে হবে কৃষিজমি থেকে। আর যে কাজের অনুমোদনের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে তা না এলে আমরা কাজ আগাতে পারছি না, এটাই হচ্ছে মুল সমস্যা। তবে রাস্তার কাজ শুষ্ক মৌসুমে দ্রুত হবে।’

‘বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে গেল দুই-আড়াই মাস ধরে, এর আগে শুষ্ক মৌসুম ছিল- চাইলে তখন কিন্তু আপনারা কাজ শুরু করতে পারতেন’,- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা শুষ্ক মৌসুমে দুইমাস সময় পেয়েছি। তখন আমরা ব্রীজের কাজ করেছি।’

যোগাযোগ করা হলে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. দিদারুল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পদুয়া রাজারহাট থেকে একেবারে কমলাছড়ি প্রাইমারি স্কুলের একটু আগ পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার রাস্তার সংস্কার কাজের বরাদ্দ হয়েছে। ওখানে একটা বড় কালভার্টের কাজ সমাপ্ত হয়েছে ঠিকাদার কর্তৃক। বাকি রাস্তাটা হবে কার্পেটিং। বৃষ্টি বাদল-লকডাউনের কারণে কাজের ধীরগতি হচ্ছে। কাজের আশানুরুপ অগ্রগতি হয়নি, তবে এলজিইডি থেকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আর রাস্তার যে অংশ ভেঙে গেছে, ওই অংশের জন্য মূলত কাজ বন্ধ থাকবে না।

চট্টগ্রাম স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী এ. কে. এম আমিরুজ্জমানের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, এই সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। খালের পাড়ে যে কয়টা জায়গা ভেঙে গেছে, সে জায়গাটা অ্যাস্টিমেটে ছিল না। আমরা নতুন করে ব্লক দিয়ে অথবা অন্য কিছু দিয়ে আমরা অ্যাস্টিমেট করে ঢাকায় পাঠাইছি। ঢাকা থেকে এখনো ওইটার অনুমোদন আসেনি। আমি ঢাকায় কথা বলেছি, এই সপ্তাহের ভেতর নির্দেশ দিয়ে দিতে পারে। নির্দেশ দিয়ে দিলে কাজ শুরু হবে। নজরদারিতে রেখে দ্রুত কাজটি শেষ করানোর জন্য উপজেলা প্রকৌশলীকে বলে দিয়েছি। আর যে অংশ ভেঙে গেছে ওই অংশ বাকি রেখে অন্য অংশে কাজ শুরু করতে বলেছি যেহেতু খালের পুরো অংশ তো ভাঙে নাই। এই সপ্তাহ থেকে কাজ পুরোদমে শুরু। তিন তারিখ আমার ঢাকায় মিটিং আছে। আপনি যেহেতু বলেছেন, চার-পাঁচ তারিখ ঢাকা থেকে আসার পর আগামী সপ্তাহে আমি ওখানে পরিদর্শনে যাব।