সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

শুধু পুনর্গঠন আর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়িত্বেই প্রফেসর আরিফ!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, নভেম্বর ১৯, ২০২১, ৩:২৯ অপরাহ্ণ


আজাদ তালুকদার : মূল পরিচয় তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ধারার শিক্ষক। সকল প্রগতিশীল সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রথম সারির যোদ্ধা। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ও সম্প্রীতির আকাশে যখনই দুর্যোগ আর মেঘের ঘনঘটা; তখনই প্রতিবাদি ঝাণ্ডা হাতে দাঁড়িয়ে গেছেন, সংগঠিত করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রথম সারিতে থেকে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, মানুষটি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ও রাজনীতির উত্থাল সময়েই শুধু লড়ে গেছেন তা নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠন-পুনর্গঠনেও সময়ের প্রয়োজনে দায়িত্ব নিয়েছেন। নিতে হয়েছে চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জে চ্যালেঞ্জে জীবন পার করে দেওয়া মানুষটি প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ।

বুধবার (১৭ নভেম্বর) বাংলাদেশ টেলিভিশন,  চট্টগ্রাম কেন্দ্রের অতিথি লাউঞ্জে বসে কথা হচ্ছিল বরেণ্য এ শিক্ষাবিদের সঙ্গে। রেহানা বেগম রানুর ধারাবাহিক আয়োজন ‘নগরে নাগরিক’ অনুষ্ঠানে ‘সম্প্রীতির চট্টগ্রাম’ বিষয়ে অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। রেকর্ডিং এর পূর্বাহ্নে চট্টগ্রামের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নানা বাঁক নিয়ে বলতে বলতে একুশে পত্রিকার আগ্রহে কথার ঝাঁপি খুলে দেন আনোয়ারুল আজিম আরিফ। সেখান থেকে উঠে আসে তার জীবনের চ্যালেঞ্জিং দিকগুলো।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত আজকের সুপরিচিত প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব তাঁকে নিতে হয়েছিল এক কঠিন সময়ে। বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে দিতে বলা চলে প্রচুর শ্রম, ঘাম আর মেধা ঢেলেছেন তিনি। অনেকটা স্বেচ্ছাশ্রমে তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ডাকে বিশ্ববিদ্যালয়টির অগ্রযাত্রায় হাল ধরেছিলেন। নিজের চেয়ার-টেবিল নিজে জোগাড় করে অফিস সাজিয়েছেন। উপাচার্যের চেয়ারে বসে নিজের পকেটের পয়সায় চা কিনে খেয়েছেন, অতিথি আপ্যায়ন করেছেন। ধরে ধরে শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়েছেন।

ত্যাগ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান পূর্ণতা পায় না, শক্ত ভিতে দাঁড়ায় না– এই মন্ত্রে দীক্ষিত আনোয়ারুল আজিম আরিফ দুঃসময়ে নিজের সর্বোচ্চ, সর্বস্ব দিয়ে দাঁড় করিয়েছিলেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়।

তারও আগে একেবারে শুরুর দিকে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুক্ত হয়েছিলেন ইউএসটিসি গঠন-পুনর্গঠনে। এই গঠন-প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেছিলেন পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর এম এ মান্নান ও একে খান পরিবারের সন্তান সালাহ উদ্দিন কাশেম খানকে।

বলাবাহুল্য, ইউএসটিসির নামকরণটিও প্রফেসর আরিফের মস্তিষ্কপ্রসূত। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন’ বিভাগের সংযুক্তিও তাঁর হাত ধরে। তাঁর করা প্রোফাইল প্রজেক্টেই ইউএসটিসিতে বিভাগটির যাত্রা শুরু হয়। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারি নিয়োগের কাজটিও হতো তাঁর হাত দিয়ে।

শুধু কি তাই? ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন আহমেদের প্রতিষ্ঠিত বিজিসি ট্রাস্টের শহর-ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রাখেন প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অস্থিরতার চরম এক মুহূর্তে অসুস্থ হয়ে পড়েন তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর আবু ইউসুফ আলম। উন্নত চিকিৎসার জন্যে কোলকাতা গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। দেশেও ফিরেছেন বরেণ্য এ শিক্ষাবিদ। কিন্তু আকস্মিকভাবেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। এর পরপরই আনোয়ারুল আজিম আরিফকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেয় সরকার।

দায়িত্ব নিয়েই সেশনজট কমিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ও শৃংখলা ফিরিয়ে আনা, কথায় কথায় ছাত্র-আন্দোলন, ছাত্ররাজনীতির নামে অস্থিরতা ঠেকাতে গ্রহণ করেন বিভিন্ন সময়োপযোগী, সাহসী পদক্ষেপ।

স্বাধীন বাংলাদেশে (১৯৭২ সালে) চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করা প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ কণ্টকাকীর্ণ, অমসৃণ পথ মাড়াতে মাড়াতে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে এবার ভেবেছিলেন নিজের মতো করে সময় কাটাবেন। পড়াশোনা, গবেষণায় বাকি জীবন ব্যয় করবেন।

কিন্তু চ্যালেঞ্জ গ্রহণের ঐশ্বরিক তাগাদা এবারও তাঁকে পিছু ছাড়েনি। দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প পরিবার এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে হয় সরকার ও গ্রুপটির চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের আগ্রহে।

ব্যাংকটির অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিরলস কাজ করেছেন আনোয়ারুল আজিম আরিফ। এর মধ্যেই চলতি বছরের মার্চে সরকার মৌলবাদি, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর কবল থেকে মুক্ত হওয়া আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এর উপাচার্য নিয়োগ দেন আনোয়ারুল আজিম আরিফকে।

দেশের সর্ববৃহৎ এই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বশিক্ষায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সমূহ সম্ভাবনা থাকলেও তা তো হয়নিই; বরং বারে বারে জঙ্গি উৎপাদন ও জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি। তেমন এক নিকষ কালো সময়ে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়টি জামায়াতের কবল থেকে উদ্ধার করে পুনর্গঠন ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জিং দায়িত্বটি তুলে দিলো প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফের কাঁধে।

সরকারের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতিদান দিতে সত্তর বছর বয়সেও শ্রম আর সময়কে একাকার করছেন তিনি। একুশে পত্রিকাকে এ প্রসঙ্গে প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ বলেন, আল্লাহর কী হুকুম জানি না, আমি কখনো তৈরি মাঠের দায়িত্ব পাইনি, মাঠ তৈরির দায়িত্ব পেয়েছি। তাতে বরং আমি খুশি। চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব সৃষ্টিকর্তা তাকেই দেন, যিনি চ্যালেঞ্জ নিতে সক্ষম।

‘যখনই, যে দায়িত্ব পেয়েছি প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে সে দায়িত্ব পালনে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছি। সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছি। শিক্ষকতার মহান যে ব্রত সেই ব্রত পালনে সচেষ্ট থেকেছি। মহৎ, সৎ শ্রম ছাড়া পবিত্রতম কোনো লক্ষ্যই পূরণ হয় না। তাই সবসময় সৎ, সত্যনিষ্ঠ শ্রমের বিনিময়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি, গঠন-পুনর্গঠনের কাজ করেছি।’- বলেন বরেণ্য এ শিক্ষাবিদ।

আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামে মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও প্রগতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির সাথে সাথে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাঙ্গন হিসেবে গড়তে নিরন্তর চেষ্টা  চালাচ্ছেন জানিয়ে উপাচার্য প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের জন্মদিনসহ বেশকিছু কর্মসূচি পালন করেছি। আশার কথা, আমাদের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে বিভিন্ন বিভাগে শুধু চলতি শিক্ষাবর্ষেই বিক্রি হয়েছে ১৫ শ’ ফরম।’

এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান  ও সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজাম উদ্দিন নদভী ও ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বারদের অবদানের কথাও বিশেষভাবে স্মরণ করেন উপাচার্য আনোয়ারুল আজিম আরিফ।

বলেন, ‘আমরা একযোগে, ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত বদনামের বিষবৃক্ষ উপড়ে একটি আদর্শিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী গুণগতমানসম্পন্ন বিশ্বনন্দিত শিক্ষা প্লাটফর্ম গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চাই।’

প্রসঙ্গত, ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক পদে যোগ দিয়ে পরবর্তীতে ডিন ও ২০০১ সালে উপ উপাচার্যের  দায়িত্ব্ব পালন করেন প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ।