বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

ইকোপার্ক ছড়া গিলে খাচ্ছে এলবিয়ন

প্রকাশিতঃ সোমবার, জানুয়ারি ১০, ২০২২, ১১:০২ অপরাহ্ণ


এম কে মনির, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক থেকে দক্ষিণ মহাদেবপুর, ঢালিপাড়া, মুরাদপুর, বাংলাবাজার ও হাসনাবাদ গ্রাম হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে ইকোপার্ক ছড়া (ছোট খাল)।

পাহাড়ি ঝিরিপথের এই ছড়া বর্ষাকালে সীতাকুণ্ডের কয়েক গ্রামের পানি চলাচলের একমাত্র মাধ্যমই শুধু নয়, উদ্ভিদ-জীববৈচিত্র্যের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও কৃষি জমিগুলোকে জিইয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ারও।

কিন্তু কালক্রমে পাহাড়ি বালু-মাটি জমে ছড়াটি ভরাট হয়ে শুধু সংকুচিতই হয়নি, কমেছে পানিপ্রবাহও। সেই সাথে বদলে গেছে এই ছড়ার গতিপথ।

দুই পাশের কয়েক হাজার একর কৃষিজমি চাষের জন্য কৃষকের ভরসা এই ছড়াটির কিছু অংশ চট্টগ্রামভিত্তিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড দখলে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইকোপার্ক সংলগ্ন ৩ একর কৃষিজমির উপর এলবিয়নের নির্মাণাধীন নতুন কারখানার উত্তর পাশে ইকোপার্ক ছড়ার অবস্থান। স্থানীয়দের অভিযোগ, নানা কৌশলে ছড়াটি খিলে খাচ্ছে এলবিয়ন। এতে ছড়াটি সংকুচিত হয়ে পাহাড়ি ঢলের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, বর্ষা মৌসুমে ছড়া সংলগ্ন গ্রামগুলো প্লাবিত হওয়ার।

গত ৪ ও ৯ জানুয়ারি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণ মহাদেবপুর গ্রামে রেললাইনের পূর্ব পাশে এলবিয়নের নির্মাণাধীন নতুন কয়েকটি কারখানার কাজ চলমান রয়েছে। এলবিয়নের কারখানার উত্তর পাশ দিয়েই বয়ে গেছে ইকোপার্ক ছড়াটি। ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ ছড়াটির শেষাংশ সম্পূর্ণ দখলে নিয়ে উঁচু গাইডওয়াল নির্মাণ করছে এলবিয়ন।

বর্তমানে ছড়ার উপরেই বিশাল আকৃতির বিম ঢালাইয়ের মাধ্যমে গাইডওয়াল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। গভীর ভিত্তি পিলার ঢালাইয়ের জন্য স্কেভেটর দ্বারা চলছে ছড়া খননের কাজ। ছড়ার দুপাশের গাছগাছালি কেটে সাবাড় করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই ওই ছড়া দখল করে অর্ধেক গাইডওয়াল নির্মাণের কাজ শেষ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, ‘খালের ৩শ’ মিটার জায়গাজুড়ে এলবিয়নের দখল-দূষণযজ্ঞে পুরোপুরি অদৃশ্য হতে বসেছে ছড়াটি। গাইডওয়াল ছাড়াও টিনের ঘেরা নির্মাণ, পিলার গেড়ে একাধিক স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে ইকোপার্ক ছড়াটি দখলে নিয়ে নিজেদের সীমানায় যুক্ত করতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে এলবিয়ন। এলবিয়নের একাধিক পিলার ও ওয়াল ছড়ায় করা হয়েছে। ঝোপঝাড় থাকায় নিরবে-নিভৃতে দখলযজ্ঞ চালাচ্ছে এ প্রতিষ্ঠান।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন কৃষক বলেন, ‘একসময় ছড়ার পানি দিয়েই আমরা কৃষিজমিতে সেচের কাজ চালাতাম। এখন ছড়াটি মৃত প্রায়। আয়তন আগের চেয়ে অনেক ছোট হয়ে গেছে। নানাভাবে খালের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে পানি চলাচল ব্যাহত হয়ে খালটি সরু ড্রেনে রূপ নিয়েছে। এখন তো পুরা খালটিই দখল করে গাইডওয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবাহের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। খালের শেষাংশ যদি দখল করা হয় তাহলে সম্মুখ অংশ রেখে কী লাভ?’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকত একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আপনাদেরকে এসব কথা কে বলে? কোথায় খাল দখল করছি? আপনি কিছু জানতে চাইলে ইউএনওকে জিজ্ঞেস করেন, ভূমি অফিসে জিজ্ঞেস করেন।’

ছড়া খনন ও গাইডওয়াল নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার অনেক জায়গায় কাজ চলতেছে। আপনাকে কয় জায়গার হিসাব দেব? আমি জানি না। সেখানে আমার লোকজন আছে, তারা জানবে। আপনাকে যদি জানাতে হয়, আমি জেনে তারপর জানাতে হবে।’

খাল দখলের বিষয়ে কিছু জানেন না বললেও সেখানে সরকারি কোনকিছুই নেই বলে দাবি করেন রাইসুল উদ্দিন সৈকত।

একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আপনার যদি নেগেটিভ কিছু লেখার থাকে লিখেন, সমস্যা নেই।’ যে কেউ চাইলেই খাল বা ছড়া খনন বা পরিবর্তন করতে পারে কিনা জানতে চাইলে রাইসুল উদ্দিন সৈকত প্রশ্নটির সরাসরি জবাব দেননি।

সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর দিদারুল আলম এ্যাপোলো বলেন, ‘খাল দখল হলে জলাবদ্ধতা তৈরি হবে। আমি বিষয়টি অবগত ছিলাম না। এখন জানলাম। সংশ্লিষ্টদের জানানো হবে। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা কাম্য নয়।’

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. শাহাদাত হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘খাল বা ছড়া সরকারি সম্পত্তি। যে কেউ চাইলেই সেটাতে হাত দিতে পারেন না। খাল বা ছড়া খননের কোন বিষয় থাকলে সেটা সরকার দেখবে। খালে কাজ করার কোন সুযোগ নেই এবং এ সংক্রান্ত কোন লিখিত দরখাস্তও তারা দেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘এলবিয়ন বলছে তারা কাজ বন্ধ রেখেছে এবং খালের ওপারে তাদের জায়গা রয়েছে। প্রয়োজনে সেই অংশে তারা খাল করে দেবে। তহশিলদারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি সেখানে গিয়ে দেখবেন খাল দখল হচ্ছে কিনা। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে স্থাপনা ভেঙে ফেলা হবে। সরকারি খাল দখল করার কোন সুযোগ নেই।’