বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

হ্যালো পুলিশ স্টেশন— চেনাবে অচেনা অপরাধ

প্রকাশিতঃ ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২২ | ৯:০৬ অপরাহ্ন


শরীফুল রুকন : “..অনেক অপরাধ আছে যা না জেনেই সবাই করে ফেলে। আবার এমন কিছু অপরাধ আছে যা মানুষ অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করে না। কিন্তু করার পর কিংবা ধরা পড়ার পর হুঁশ ফেরে! এসব মানুষের জন্যই আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা ‘হ্যালো পুলিশ স্টেশন’।”

মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে সুপরিচিত মোহাম্মদ মহসীন তাঁর ‘হ্যালো পুলিশ স্টেশন’ বইয়ের ভূমিকায় উপরোক্ত কথাগুলো লিখেছেন। বইটি পড়ে আমার মনে হচ্ছে, মানুষের মধ্যে আইনগত সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য লেখকের প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়েছে। একেবারে সহজ ভাষায় প্রতিটি বিষয় তুলে ধরেছেন লেখক।

চট্টগ্রামের অক্ষরবৃত্ত প্রকাশনী থেকে বের করা বইটি ৪০টি বাস্তব ঘটনার আলোকে লেখা হয়েছে। লেখক মোহাম্মদ মহসীন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালীসহ চারটি থানায় ওসি হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চৌকস এ কর্মকর্তা। ২০ বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ‘হ্যালো পুলিশ স্টেশন‘ বইটি লিখেছেন তিনি।

বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘১৪ বছরের কিশোরীর অদম্য প্রেমের গল্প’ শিরোনামের লেখায় কিশোর বয়সের এমন কিছু অপরাধকে লেখক সাবলীল ভাষায় কেস স্টাডির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, যা অনেক কিশোর-কিশোরী অপরাধ হিসেবে নেন না। উক্ত লেখা পড়লে তারা এসব অপরাধ সম্পর্কে সচেতন হবেন, আশা করি। অভিভাবকরা নজর না রাখলে কিশোর-কিশোরীরা যে কতটা বিপদগামী হতে উঠতে পারে, সেটাও উঠে এসেছে- এ লেখায়। এর মাধ্যমে অভিভাবকদেরও সচেতন করে তোলার প্রচেষ্টা দেখা গেছে লেখককে।

ওসি মোহাম্মদ মহসীনের উদারতার কারণে হয়তো ওই মেধাবী ছেলে-মেয়েগুলো মামলা থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। কিন্তু সব ওসি এমন উদার না-ও হতে পারেন। তখন ফলাফল কী দাঁড়াবে? নিশ্চিত মামলা। মামলার আসামি হতেন কলেজিয়েট, মুসলিম হাই ও খাস্তগীর স্কুলের মতো নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। স্কুলজীবনে মামলার আসামি হলে পরবর্তীতে তাদের সরকারি চাকরি তো দূর, কর্মজীবন দুর্বিষহ হয়ে যেত।

‘কষ্টের অর্থে কেনা মোবাইলটাই যখন কষ্টের কারণ’ শিরোনামের লেখায় চোরাই মোবাইল কেনার কুফল তুলে ধরেছেন লেখক। নিজের অজান্তে সস্তায় চোরাই মোবাইল কিনে অনেকে দণ্ডনীয় অপরাধ করে বসেন। মোবাইল কেনার ক্ষেত্রে ‘ক্রয় রশিদ, মোবাইলের প্যাকেট’ এসবসহ কিনলে এ ধরনের ঝামেলা এড়ানো যায়। উক্ত ঘটনার বিবরণ পড়ার পর মোবাইল কেনার ক্ষেত্রে মানুষ সচেতন হবে, আশা করি।

সাহায্যের নামে প্রতারণা, টিউশন মিডিয়ার নামে প্রতারণা, ফেসবুক ও বিকাশে প্রতারণার ফাঁদ চেনার উপায় যেমন এসেছে বইটিতে, তেমনি ফেনসিডিলের নামে মানুষ কী খাচ্ছে, কিশোরদের ‘ঘুঁটি’ বানিয়ে যেভাবে মাদকের কারবার চলছে, তা-ও উঠে এসেছে গ্রন্থটিতে।

‘প্রেম যখন জেলে ঢোকায়’ শিরোনামের লেখায় প্রেমিকাকে জন্মদিনের উপহার দিতে গিয়ে রাফির চুরি করার ঘটনা নিয়ে লেখাটিও সবার জন্য শিক্ষণীয়। রাফির চোর হওয়ার ঘটনায় প্রেমিকা ও তার বাবা-মায়েরও যে দায় আছে, তা লেখকের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

‘মজার সুখে সাজার মুখে’ শিরোনামের লেখাটি তরুণদের সচেতন করবে ইভটিজিংয়ের বিষয়ে। কী কী কাজ করলে তা ইভটিজিংয়ের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, ইভটিজিংয়ের শাস্তি কী- এসব নিয়ে সহজে ধারণা পাওয়া যাবে বইটি পড়লে।

নানা ধরনের দুষ্টুমি বন্ধুমহলে প্রায়ই হয়ে থাকে। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে সেই ‘দুষ্টুমিই’ কাল হয় অনেক সময়। এমন একটি ঘটনার কেস স্টাডি রয়েছে বইটির ‘ভয় দেখানোর ভয়’ শিরোনামের লেখায়।

বইয়ের ২৭ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখক, পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসীন নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনটি ঘটনা শেয়ার করে অন্যের নামে ফেববুক আইডি খোলা, ইনবক্সে অশ্লীল ছবি পাঠিয়ে বিরক্ত করা ও ভুয়া সংবাদ শেয়ার করার পরিণাম উল্লেখ করেছেন।

অনেকে পরিকল্পিতভাবে আত্মগোপন করেন। তাদের পেছনে পুলিশের প্রচুর সময়, শ্রম, অর্থ ব্যয় হয়। এ ধরনের কাজ যারা করেন, তাদের সতর্ক করতে লেখকের প্রচেষ্টা দেখা গেছে বইটিতে।

হ্যালো পুলিশ স্টেশন- বইয়ে ‘ভাইরাল হওয়ার ভাইরাস’ শিরোনামের লেখাটি তাদের পড়া উচিত, যারা লাইক-কমেন্টের জন্য যাচাই-বাছাই না করেই যে-কোনো কিছু পোস্ট করেন, শেয়ার করেন। ভাইরাল হওয়ার নেশা কাননকে কীভাবে কারাগার পর্যন্ত নিয়ে গেছে- সেটা উক্ত লেখায় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক।

অনেকেই অবৈধ কাজে লেনদেন করে পাওনা আদায়ে পুলিশের কাছে যান। তারা কীভাবে বিপদে পড়েন, সে সম্পর্কে একটি সত্য ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, ‘শিকারে গিয়ে স্বীকারে’ শীর্ষক লেখায়।

অপরিচিত কারও কাছ থেকে কিছু খাওয়া যেমন বিপদজনক, তেমনি অপরিচিত কারও কাছে ঠিকানা জানতে চাওয়া ভয়ংকর। লাশ হয়ে যাওয়ার আশংকাও আছে। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে স্বামীর খোঁজে বের হয়ে প্রথমে ধর্ষণ ও পরে হত্যার শিকার হওয়া এক নারীর ঘটনা তুলে ধরেছেন লেখক।

‘বন্ধুত্বের ব্যবসায় বেহাত ২০ লাখ’ শীর্ষক লেখার মাধ্যমে লেখক যে-কোনো আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে পর্যান্ত প্রমাণ, যেমন চেক, স্ট্যাম্প রাখার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। অপরাধ দিয়ে কখনো ভুল ঢাকা যায় না- এই নির্মোহ সত্য উঠে এসেছে লেখকের নিষিদ্ধ প্রেমের অভিশপ্ত গল্প’ শীর্ষক লেখায়।

বাবা-মায়ের অমতে প্রেমের বিয়ের পরের একটি মর্মস্পশী কাহিনী উঠে এসেছে, ‘ভালোবাসা তাকে ফতুর করেছে’ শীর্ষক লেখায়। আসলে পৃথিবীতে বাবা-মায়ের চেয়ে আপন কেউ থাকতে পারে না। আবেগ-বিবেকের মিশেলে আমাদের জীবনের সর্বোচ্চ ভালো সিদ্ধান্ত তারাই নিতে পারেন।

হ্যালো পুলিশ স্টেশন- বইটির ৪৮ পৃষ্ঠায় ‘সুখে থাকলে কি ভূতে কিলায়’ শিরোনামের লেখাটি পড়ে হাসবো নাকি কাঁদবো বুঝতে পারছি না। ‘ভাবিয়া করিও বিয়ে, করিয়া কাঁদিও না’ শীর্ষক লেখাটি প্রত্যেক পুরুষের পড়া উচিত।

সম্পদের জন্য বাবাকে অত্যাচারের একটি সত্য ঘটনা উঠে এসেছে ‘বাবাকে নিয়ে টানাটানি’ শিরোনামের লেখাটিতে। কথাগুলো পড়ামাত্রই পাঠকের মন খারাপ হয়ে যাবে। এ ধরনের ঘটনা খুবই দু:খজনক।

অনেক বাবা-মা আছেন, যারা সন্তানের কথামতো টাকা বের করে দেন। ওই টাকা কী কাজে ব্যয় হচ্ছে তার খোঁজখবর আর নেন না। এতে নিজের অজান্তে বিপদ ডেকে নিয়ে আসেন তারা। কী বিপদ- সেটা ৫৮ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘হায়রে বাবা! হায়রে ইয়াবা’ শিরোনামের লেখাটি পড়লে জানা যাবে।

কথায় আছে, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। এ কথাটি যদিও প্রবাদবাক্য, তবু্ দ্রুব সত্য। সঙ্গদোষে যে মানুষ পরিবর্তিত হয়ে যায়, তা ‘ঝরে পড়া ফুলের গল্প’ শিরোনামের লেখায় চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন লেখক মোহাম্মদ মহসীন।

পরিস্থিতির শিকার হয়ে কেউ কেউ মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন, তাদের গল্পই উঠে এসেছে, ‘যে গল্পের শেষ নেই’ অধ্যায়ে। মাদক শুধু ব্যক্তিকে নয় পরিবারকেও ধ্বংস করে। কীভাবে? বইটির ৭২ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘হত্যা দিয়ে শুরু, আত্মহত্যা দিয়ে শেষ’ লেখাটি পড়লেই জানতে পারবেন।

জটিল রোগে আক্রান্ত বলে প্রচার করলে সরলপ্রাণ অনেকে বিশ্বাস করে দান করেন। অথচ অনেক ক্ষেত্রে দান সংগ্রহের নামে চলছে প্রতারণা। তেমনই একটি ঘটনার বিবরণ ‘দান করতে সাবধান’ শিরোনামের অধ্যায়ে তুলে ধরেছেন লেখক মোহাম্মদ মহসীন।

বিয়ের আগে অনেকে ভালো করে পাত্র-পাত্রী সম্পর্কে খোঁজখবর নেন না। তাদের জীবনে কী ধরনের বিপদ নেমে আসতে পারে তার আঁচ পাওয়া যাবে ‘প্রকৌশলীর অপকৌশলে পরাস্ত বাবা’ লেখায়।

অন্যকে ফাঁসাতে অনেকে নানা কাণ্ড করে বসেন। এভাবে কাউকে ফাঁসাতে গেলে পরে নিজেকেই ফাঁসতে হয়। বিষয়টি উদাহরণ সহকারে ‘বাবাই যখন ধর্ষণ করান তার মেয়েকে’ শিরোনামের লেখাটির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন লেখক।

জাল বিদেশি মুদ্রা বিক্রির অভিনব ফাঁদ পেতে প্রতারণা করে আসছে বিভিন্ন চক্র। এসব প্রতারণার ফাঁদ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা হয়েছে, ‘৯০ হাজার টাকার লোভে ৯ লাখ টাকা গচ্চা’ শিরোনামের লেখায়। তিনটি কেস স্টাডি তুলে ধরে অনলাইন প্রতারণা সম্পর্কে পাঠককে সচেতন করার প্রয়াস নিতেও দেখা গেছে লেখককে।

বইটির একেবারে শেষে পুলিশকে ফাঁসাতে গিয়ে মাছ ব্যবসায়ীর ফেঁসে যাওয়ার কাহিনি অনেকের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।

পরিশেষে বলব, হ্যালো পুলিশ স্টেশন- বইটিতে আমি ওসি মোহাম্মদ মহসীনকে নতুন রুপে খুঁজে পেয়েছি। ভাষার ব্যবহারে তিনি ছিলেন সাবলীল ও মনোমুগ্ধকর। থানা ও পুলিশ নিয়ে বইটি লেখা হলেও এই বই পড়ে থানা-পুলিশ থেকে দূরে থাকা যাবে বলে আমারও বিশ্বাস।

লেখকের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। বইটি সকল শ্রেণির পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যাক৷

শরীফুল রুকন একুশে পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক