বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

শান্তনু চৌধুরীর ঈদসবিশেষ : বসবাসের সময় ফুরিয়ে গেলে যমদূত হাজির, তাকে ফেরানো যায় না

প্রকাশিতঃ Sunday, June 25, 2017, 8:09 pm

জীবন সুন্দর, আকাশ-বাতাস পাহাড়সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়।
বিদায়ের সেহনাই বাজে
অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি! (রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)

মৃত্যু বড় নির্মম নিষ্ঠুর। আত্মীয় পরিজনের মর্মবিদারী কান্না কাকুতি-মিনতি কিছুই তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না। এই ধরাধামে বসবাসের সময় ফুরিয়ে গেলে প্রাণবায়ু কেড়ে নিতে যমদূত এসে হাজির হয়। তাকে ফেরানো যায় না। জোহরা এসেছে কার্দির কাছে, মারাঠা শিবির থেকে নিয়ে যাবে ইব্রাহিম কার্দিকে।

আর সবই মৃত্যুর কবিতা, কেবল এইটে জীবনের আর সবই আমার কবিতা, কেবল এইটে তোমার।

কার্দি : কতোদিন তোমাকে দেখিনি। কতোকাল তোমার এই রূপ আমি দেখিনি। অশ^পৃষ্ঠে নয়, মাটির ওপর দাঁড়িয়ে তুমি। রক্তাক্ত তরবারি নয়, হাতে তোমার মেহেদী পাতার রঙ। ওই আনত মুখ। ওই নির্মলিত চোখ। এতো রূপ তোমার।
জোহরা : মুসলিম শিবির থেকে বেরিয়েছি পাঠান সৈনিকের বেশে। এখানে এসে ভর করেছি হিরণবালার ওপর। বাকিটুকু তুমি জানো। অতল সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে।

জোহরা : তুমি জানো কুঞ্জপুরের দুর্গকে আমরা দিল্লী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। মারাঠাকে উচিত শিক্ষা না দিয়ে তারা কেউ জীবন্ত ফিরে যাবে না।
কার্দি : আমি জানি।

জোহরা : আর একদিন কি দুদিন। তারপরই ঘোর সমর শুরু হবে। তুমি ফিরে এসো। আমার সঙ্গে ফিরো চলো।
কার্দি : যে ফিরে যাবে সে আমি হবো না। সে হবে বিশ^াসঘাতক। সে হবে ইব্রাহিম কার্দির লাশ। ভারতে মুসলিম শক্তি জয়যুক্ত হোক, তার পূর্ণ গর্ব ফিরে পাক বিশ্বাস করো এই কামনা আমার মনে মনে জ্বলছে। কিন্তু আমার সংকটের দিনে যারা আমাকে কর্মে নিযুক্ত করেছে, ঐশ্বর্য দান করেছে সে মারাঠাদের বিপদের দিনে আমি চুপ করে বসে থাকবো? আমি নিশ্চিত জানি, জয় পরাজয় যাই আসুক। মৃত্যু ভিন্ন আমার অন্য কোনো পথ নেই। কী হাসিমুখে মৃত্যু তাই না। এই মৃত্যু হয়তো গৌরবের। আর মৃত্যুর আগে জেনে যাওয়া সেই সত্যকে। কিংবা মৃত্যু নিয়ে ভাবনা। শেষ কথা বলে যাওয়া। শেষ কিছু লিখে যাওয়া। মানুষ নাকি মৃত্যু টের পায় আগে থেকেই। অনেক স্বজনের মৃত্যুর সময় সেটা যেনো উপলব্ধি করেছি। বিশেষ করে চোখের চাহনিতে। ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে, ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল, পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন। তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল, সব পাখি ঘরে ফেরে সব নদী ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন।’

জীবনানন্দ দাশ। আজীবন অপমানিত, অবহেলিত একজন কবি। কিন্তু তিনিই পরবর্তীকালে হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা সাহিত্যের কবিতার বাঁক বদলের স্র্রষ্টা। ১৯৫৪ সালের ১১ অক্টোবর বিকেলের দিকে হঠাৎ অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে কলকাতার ত্রিকোণ পার্কের কাছে ভাই অশোকানন্দের ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির। বাড়িতে কেউ ছিল না। কাজের লোকের কাছে জানতে চাইলেন, ‘এই ফ্ল্যাটের কেউ কি দেশপ্রিয় পার্কের কোনো জায়গায় ট্রামের নিচে পড়ে আহত হয়েছেন? কাজের মেয়ে লতিকা বললেন, ‘না তো এমন কিছুতো শুনিনি।’ পরদিন একই ঘটনা ঘটালেন তিনি। জীবনানন্দ কী বুঝে গিয়েছেন মৃত্যু দুয়ারে কড়া নাড়ছে। হাসপাতালের বিছানায় আহত জীবনানন্দ জড়ানো গলায় বললেন, ‘একটা কমলালেবু খেতে পারবো?’ ‘একবার যখন দেহ থেকে বের হয়ে যাব/আবার কি ফিরে আসবো না আমি পৃথিবীতে? আবার যেন ফিরে আসি, কোনো এক শীতের রাতে/কোনো এক হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে/কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষের বিছানার কিনারে।’ লিখেছিলেন জীবনানন্দ।

সারাজীবন তিনি বলে গেছেন, তাঁর আরো অনেক কিছু দেয়ার বাকি। তাই হয়তো তিনি ধানসিঁড়ির তীরে ফিরতে চেয়েছেন শঙ্খচিল শালিকের বেশে, ভোরের কাক হয়ে কার্তিকের নবান্নের দেশে।

কবি নজরুল পার্থ সারথীর কাছে প্রার্থনা করেছেন, মৃত্যুআতঙ্ক ভোলানোর জন্য। বলেছেন, ‘মৃত্যু জীবনের শেষ নহে নহে, অনন্ত কাল ধরে অনন্ত জীবন বহে।’

কিশোর বয়সে বন্ধুপ্রতিম বৌদি কাদম্বরী দেবীর অকালমৃত্যু ও আরো পরে স্ত্রীর মৃত্যু এবং একে একে প্রিয়জনদের মৃত্যুর নীরব সাক্ষী ও মৃত্যু শোক রবীন্দ্রনাথের এক অনন্য অভিজ্ঞতা লাভে সহায়ক হয়েছিল। কবি জীবনস্মৃতিতে ‘মৃত্যুশোক’ পর্যায়ে অকপটে লেখেন, ‘জগৎকে সম্পূর্ণ করিয়া এবং সুন্দর করিয়া দেখিবার জন্য যে দূরত্ব প্রয়োজন, মৃত্যু দূরত্ব ঘটাইয়া দিয়াছিল। আমি নির্লিপ্ত হইয়া দাঁড়াইয়া মরণের বৃহৎ পটভূমিকার ওপর সংসারের ছবিটি দেখিলাম এবং জানিলাম, তাহা বড়ো মনোহর।’

মৃত্যুশয্যায় মানুষ কতোকিছু বলে যান। সেসব কখনো কখনো হয়ে উঠে অর্থবহ। কখনো করুণ রস, নিপাট ঠাট্টা, দুরন্ত সাহস বা তীব্র ঘৃণা। সাধারণ থেকে অসাধারণ সবাই চেষ্টা করেন শেষ মুহূর্তে অনন্ত জগতের উপকার হয় এমন কিছু বলে যেতে। কেউবা উচ্চারণ করেন জীবন ধরে বয়ে বেড়ানো চরম সত্যটি। কারও শেষ ইচ্ছের কথা জানা যায়, তাঁর মৃত্যুর ১৭৮ বছর পরে, সাগরজলে ভেসে আসা কাগজের টুকরোয়!

আশ্বিনের মাঝামাঝি। দার্জিলিং-এ বেড়াতে গিয়েছেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী লেডি অবলা, আর ভগিনী নিবেদিতা, ওঁদের পারিবারিক বন্ধু। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন ভগিনী। বিজ্ঞানী ও তাঁর স্ত্রী দিনরাত এক করে যাবতীয় সেবাযতœ করে চললেন বান্ধবীটির। কিন্তু অদৃষ্টের কী পরিহাস! কাকভোর। মেঘে ঢাকা আকাশ। শেষ ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে হঠাৎ স্পষ্ট উচ্চারণ করলেন তিনি, ‘আমার জীবনতরী ডুবছে, কিন্তু সূর্যের উদয় দেখবই।’ আশ্চর্য! মেঘ কেটে যখন নতুন রোদের ছ’টায় ঝিকিয়ে উঠল আশপাশ, তখন তৃপ্ত প্রশান্ত মুখে চলে গেলেন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল।

আর একজন বিখ্যাত মানুষ মিখায়েল নস্ত্রাদামুস। যাঁর মূল খ্যাতি ছড়িয়েছিল পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মহাদেশেরই সহস্র্র বছরের নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনার আগাম ভবিষ্যদ্বাণী সম্বলিত ১০ খণ্ডের ‘লে প্রফেতিস’ তথা ‘দ্য প্রফেসিস’ গ্রন্থের জন্য। দেহাবসানের ঠিক আগের দিন, তিনি ব্যক্তিগত সচিবকে ডেকে বলেন, ‘কাল সকালের সূর্য উঠবে যখন, আমাকে আর পাবে না।’ এই শেষ কথাটি অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়। ১৫৬৬-র ২ জুলাই তাকে নিথর অবস্থায় ভূমিশয্যায় পাওয়া যায়। সূর্য উঠতে তখনও কিছুক্ষণ বাকি।

মৃত্যু মানে যে ভয়-ধরানো অন্ধকার, সে কথাই শোনা যায় কালজয়ী আমেরিকান ছোট গল্পকার ‘ও হেনরি’ তথা উইলিয়াম সিডনি পোর্টারের গলায়। দেহাবসানের ঠিক আগের মুহূর্তে এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দিকে ফিরে উনি চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘চার্লি! আলোগুলো সব জ্বেলে দাও! অন্ধকারে ঘরে ফিরতে খুব ভয় করবে আমার!’ পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার ক্ষণকাল আগে আমেরিকার এক জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক থিওডর ড্রেজার শেষবারের মতো চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘শেক্সপিয়র! আমি আসছি!’

মৃত্যুকালেও অটুট দম্ভ ছিল প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের গলায়। তিনি সেরিব্রাল স্ট্রোকের ধাক্কায় ৯ দিন শয্যাশায়ী থাকা অবস্থাতেও তাঁর শুভানুধ্যায়ীদের হঠাৎই বলে ওঠেন, ‘ভগবান লোকটার সামনে বসতে তৈরি আমি। তবে জানি না, আমার সামনে বসার সাহস উনি এখনও জুটিয়ে উঠতে পেরেছেন কিনা!’

পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যাওয়ার আগে কেউ রাগেন, কেউ হাসেন, কেউ বা অস্থির হয়েও ওঠেন। কোনও এক সকালে রোমান সৈন্যের হাতে দু’দিকেই ধার দেওয়া চওড়া তরবারি। অথচ তার সামনেই কারাগারের মেঝেতে বসে তখনও দুর্বোধ্য কী সব অঙ্ক কষে চলেছেন সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ আর্কিমিডিস। সৈন্যটির মুখে বধ্যভূমিতে যাওয়ার আদেশ শুনেও মুখ না তুলেই বললেন ‘না! যতক্ষণ এই অঙ্ক শেষ না হচ্ছে, যেতে পারব না আমি!’ পরমুহূর্তেই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মাথাটিকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল তাঁর অশক্ত দেহ থেকে মানুষের চিরকালীন মুর্খতার প্রমাণ হিসাবে।

১৯৬৫-তে কিউবার বহু বছরের সামরিক সরকারের পতন ঘটিয়ে ফের বছর দুয়েকের মধ্যেই চে বেরিয়ে পড়েন বলিভিয়ার সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধ চালাতে। ১৯৬৭-র ৮ অক্টোবর ১৮০০ বলিভিয়ান সৈন্যের এক বিশাল বাহিনীর সঙ্গে অসম যুদ্ধে আহত অবস্থায় তিনি ধরা পড়েন। পরদিন ৯ অক্টোবর বিকেলে লা হিগুয়েরা গ্রামের এক গ্রাম্য স্কুলঘরে বন্দি অবস্থায় ওঁকে হত্যা করা হয়। মোট ৯টি গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে চে যখন পৃথিবী ছেড়ে যান তার ঠিক আগের মুহূর্তটিতেই মৃত্যু আসন্ন জেনেও তিনি তাঁর ঘাতক মারিও টেরান নামের ৩১ বছর বয়সি বলিভিয়ান সৈন্যটিকে তীব্র শ্লেষের গলায় বলে উঠেছিলেন, ‘জানি, মারতে এসেছ আমায়! কাপুরুষ কোথাকার! মারো! কিন্তু মনে রেখো, স্র্রেফ একজন মানুষকেই মারছ!’

গ্রিক পণ্ডিত অ্যারিস্টটল মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে লিখে গিয়েছিলেন তাঁর শেষ ইচ্ছাপত্র। যাতে তিনি তাঁর সমস্ত ক্রীতদাসকেই মুক্তি দিয়ে যান এবং জানিয়ে দেন, কীভাবে কোথায় তাঁকে সমাহিত করতে হবে।

মৃত্যুর আগে স্ত্রীর প্রতি রাগ-অনুরাগের কাহিনীও কম নয়। আঠারো শতকে মুষ্টিমেয় যে ক’জন মানুষের সাহস ও দৃঢ়তায় ভর দিয়ে ইংল্যান্ডের শাসন হটানো এবং আলাদা আলাদা কয়েকটি রাজ্যের বদলে মিলিতভাবে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়, গুভেরনিয়ার মরিস ছিলেন তাঁদের অন্যতম। এমনকি আমেরিকার সংবিধানের মূল রচয়িতাও তিনি।

মরিস যখন মারা যান, তাঁর শেষ ইচ্ছাপত্রে লেখা ছিল, ‘আমার সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেকাংশ পাবেন আমার ৬২ বছর বয়সি স্ত্রী অ্যানি। অবশ্য একটি শর্তেই তিনি পূর্ণ সম্পত্তি পেতে পারেন। যদি তিনি আবার কাউকে বিয়ে করেন।’ স্ত্রীর প্রতি ভালবাসার উজ্জ্বলতম উদাহরণ বিখ্যাত ফরাসি জীবাণুবিজ্ঞানী লুই পাস্তুর। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির এক ধনী জমিদার ফ্রান্সিস তাঁর স্ত্রীর জন্য রেখে গিয়েছিলেন মাত্র এক শিলিং! ভারতীয় টাকায় এখনকার বিনিময়-মূল্যে যা ৪ টাকারও কম। তার থেকেও বড় কথা, শেষ ইচ্ছাপত্রে এই আণুবীক্ষণিক অর্থদানের কারণও উল্লেখ করে গিয়েছেন তিনি এক ঘৃণিত ভাষ্যে, ‘ট্রামভাড়া বাবদ এটি দিলাম, যাতে এই রাহাখরচ দিয়ে কোথাও গিয়ে ও ডুবে মরতে পারে!’

সারা দুনিয়ায় সবচেয়ে হাসির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনা প্রদেশের চেরোকি কাউন্টির এক বিপুল ধনী নারীর শেষ ইচ্ছাপত্র। নিঃসঙ্গ ওই নারীর মৃত্যুর পর ওঁর লেখা যে-ইচ্ছাপত্রটি পাওয়া গিয়েছিল, তাতে দেখা যায়, ওঁর সমস্ত সম্পত্তিই উনি ‘ভগবানকে’ দিয়ে গিয়েছেন! যত মন, তত বেশি পৃথক মনন। শেষ কথার ভাণ্ডারও ততই বিচিত্র। এলভিস প্রিসলির ‘বই পড়তে যাচ্ছি’, ফ্র্যাংক সিনাত্রার ‘সব হারিয়ে ফেলছি’, নবোকভের ‘বড় অদ্ভুত আর আলাদা রকমের একটা প্রজাপতি উড়ছে’ বা থমাস এডিসনের ‘কী অপূর্ব সুন্দর ওই দিকটা’র পাশেই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ‘একটিও সার্থক কাজ করে যেতে পারলাম না মানুষের জন্য’ অথবা কার্ল মার্ক্সের ‘শুধু বোকারাই শেষ কথা বলে যেতে চায়’ শুনলে মনে হয়, কী সীমাহীন পার্থক্য একেক জনের চিন্তার বা দর্শনের!

পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শেষ মুহূর্তে যে- দেয়ালে মায়ের ছবি টাঙানো, হঠাৎ সেদিকে ঘুরে গিয়ে নিষ্পলক ছবিটির দিকেই চেয়ে ছিলেন। তথাগত তখন ইহলীলা সংবরণের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। বয়স আশি। বহু জায়গা ঘুরে, বিল্বগ্রাম হয়ে বৈশালী ছেড়ে কুশীনগরে এলেন। অসহ্য দেহযন্ত্রণা শুরু হল। অথচ মুখে সেই চিরপ্রসন্ন হাসি। অতি কষ্টে হিরণ্যবতী নদী পার হয়ে সঙ্গি শিষ্য আনন্দকে একটি শালবৃক্ষতলে তাঁর শেষশয্যা প্রস্তুত করতে বললেন। মনে করিয়ে দিলেন, আশি বছর আগের এক বৈশাখী পূর্ণিমায় লুম্বিনী উদ্যানের এক শালবৃক্ষের নিচে তিনি যেমন পৃথিবীতে এসেছিলেন ঠিক তেমন আজ এই বৈশাখী পূর্ণিমার দিনেই এই বৃক্ষতল থেকেই পৃথিবী ছেড়ে যাবেন। ‘পঞ্চভূতে গড়া সবই নশ্বর। তাই আত্মমুক্তির জন্যই সচেষ্ট থেকো।’ দুর্লভ একমুখ তৃপ্তির হাসি নিয়ে চলে গেলেন সংসারত্যাগী রাজপুত্রটি!

কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, ‘আমি জন্মের প্রয়োজনে ছোট হয়েছিলাম, এখন মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় হচ্ছি।’ চান্নি পসর রাতে মরতে চেয়েছেন জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। মন ভরে বলেছেন, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’ মৃত্যু বিষয়ক নানা চিন্তা ছড়িয়ে আছে তার বইয়ে।

‘মানবজীবন অল্প দিনের। এই অল্প দিনেই যা দেখার দেখে নিতে হবে। মৃত্যুর পর দেখার কিছু নেই। দোজখে যে যাবে-সে আর দেখবে কি-তার জীবন যাবে আগুন দেখতে দেখতে। আর বেহেশতেও দেখার কিছু নাই। বেহেশতের সবই সুন্দর। যার সব সুন্দর তার সৌন্দর্য বোঝা যায় না। সুন্দর দেখতে হয় অসুন্দরের সঙ্গে।’

তিনি আরো লিখেছেন, ‘মৃত্যুর সময় পাশে কেউ থাকবে না, এর চেয়ে ভয়াবহ বোধহয় আর কিছুই নেই। শেষবিদায় নেয়ার সময় অন্তত কোনো একজন মানুষকে বলে যাওয়া দরকার। নিঃসঙ্গ ঘর থেকে একা একা চলে যাওয়া যায় না, যাওয়া উচিত নয়। এটা হৃদয়হীন ব্যাপার।’ এই হৃদয়হীন ব্যাপারটি তাঁর জীবনে ঘটেছিল কিনা তা আজো রহস্যই রয়ে গেলো।

শান্তনু চৌধুরী : কথাসাহিত্যিক; যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, সময় টেলিভিশন