রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

ডেকে আনতে গিয়ে বন্দুক উদ্ধার, ফটিকছড়িতে ‘হিরো’ চৌকিদার বশর

ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি | প্রকাশিতঃ ১ নভেম্বর ২০২৫ | ৮:১২ অপরাহ্ন


তিনি পুলিশের কোনও বড় কর্তা নন। তার নেই ভারী বুটজুতো কিংবা আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। আছে শুধু একটি খাকি পোশাক, গ্রামের মেঠোপথে হেঁটে চলার অভ্যাস আর হৃদয়ে পোষা এক অদম্য সাহস। বলছিলাম চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ আবুল বশরের কথা।

৫৮ বছর বয়সী এই মানুষটিই এখন পুরো ফটিকছড়িতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি এমন এক কাজ করেছেন, যা সচরাচর খবরের শিরোনাম হয় না, কিন্তু নীরবে সমাজের বড় উপকার করে যায়।

যেভাবে শুরু

ঘটনার শুরুটা আর দশটা গ্রামীণ অভিযোগের মতোই। হারুয়ালছড়ির পাটিয়ালছড়ি গ্রামের উর্মী আকতার নামে এক নারী তার স্বামী মো. রমজান আলীর বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) একটি লিখিত অভিযোগ দেন। বিষয়—সংসারের অশান্তি আর বিভেদ।

ইউপি চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী নিয়মমাফিক রমজান আলীর নামে নোটিশ পাঠান। একবার, দুইবার। কিন্তু ‘অসৎ প্রকৃতির’ রমজান আলী সেই নোটিশকে থোড়াই কেয়ার করলেন। পরিষদে হাজিরা দিলেন না।

বশরের প্রবেশ, অপরাধীর পলায়ন

চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন তখন তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নিষ্ঠাবান লোকটিকে পাঠালেন। দায়িত্ব পড়ল গ্রাম পুলিশ আবুল বশরের কাঁধে। চেয়ারম্যানের নির্দেশ—রমজানকে ‘স্ব-শরীরে’ ডেকে আনতে হবে।

শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে আবুল বশর যখন রমজানের বাড়িতে গিয়ে হাজির, অপরাধী রমজান তখন প্রমাদ গুনল। চৌকিদারের মুখোমুখি হওয়ার সাহস তার হলো না। বশরকে দেখেই সে চোরের মতো কৌশলে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।

কিন্তু আবুল বশরের চোখ ফাঁকি দেওয়া সহজ ছিল না। নতুন টিলা পাড়ার মো. বদন চৌকিদারের ছেলে বশরের রক্তেই আছে শৃঙ্খলা রক্ষার বোধ। স্বামীর এমন পলায়ন দেখে তার সন্দেহ হয়। তিনি রমজানের বসতঘরে তল্লাশি চালাতেই বেরিয়ে আসে আসল রহস্য। ঘরের ভেতর থেকে উদ্ধার হয় একটি পরিত্যক্ত একনলা বন্দুক!

পুলিশের জিডি, জনতার ‘স্যালুট’

আবুল বশর কালবিলম্ব না করে বন্দুকটি পরিষদে এনে চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেন। হারুয়ালছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, “বারবার তাগাদা দিয়েও রমজানকে পরিষদে আনা যায়নি। বশর বাড়িতে গিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হলো সে আসলেই অপরাধী। আমরা বন্দুকটি ভুজপুর থানায় হস্তান্তর করেছি।”

অবশ্য, ভুজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুল হক এটিকে ‘পরিত্যক্ত বস্তু সদৃশ’ বন্দুক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, এ নিয়ে একটি জিডি মূলে থানায় জব্দ দেখানো হয়েছে। কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের এই রুটিন প্রতিক্রিয়ার বাইরে, সাধারণ মানুষের কাছে আবুল বশর এখন এক ‘দুঃসাহসী’ নায়ক। এলাকাবাসীর বক্তব্য, যেখানে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা রাখার কথা, সেখানে একজন গ্রামপুলিশের এমন কাজ তাদের আশান্বিত করেছে।

ওই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য মো. জসিম উদ্দিনের কথায় সেই উচ্ছ্বাসই ঝরে পড়ল। তিনি বলেন, “আবুল বশর চৌকিদার আমাদের দৃষ্টান্ত। এলাকার শৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁর এই চিরচেনা রূপ আমাদের আশার আলো দেখায়। তিনি আমাদের অপার দৃষ্টান্ত।”

দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসা আবুল বশর হয়তো কোনো পদক পাবেন না, কিন্তু শুক্রবার বিকেলে তিনি যা করলেন, তাতে প্রমাণ হলো—নায়ক হতে পদের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় শুধু কর্তব্যের প্রতি ইস্পাতদৃঢ় আনুগত্যের।