
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার রাজনৈতিক ময়দান হঠাৎই সরগরম হয়ে উঠেছে। এতদিনকার নীরবতা ভেঙে প্রার্থীরা এখন সরাসরি ভোটারদের দোরগোড়ায়। তবে এবারের প্রচারণায় শুধু প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, প্রার্থীরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প ও সংগ্রামের কাহিনিও তুলে ধরছেন, যা ভোটারদের মাঝে তৈরি করছে নতুন আগ্রহ।
এই রাজনৈতিক উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী। মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই তিনি তার কাদের নগরের বাসভবনে নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় করছেন। কিন্তু তার কার্যক্রম শুধু চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
হুম্মাম কাদের চৌধুরী চষে বেড়াচ্ছেন রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দ্বীনি প্রতিষ্ঠান এমনকি ইউনিয়ন বিএনপি কার্যালয় পর্যন্ত। সম্প্রতি চট্টগ্রামের শস্যভান্ডার খ্যাত গুমাই বিলে কৃষকদের সঙ্গে তার সরাসরি সংযোগ স্থাপনের একটি চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তুলেছে, যেখানে তাকে নিজ হাতে ফসল কাটতে দেখা যায়। তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফা বাস্তবায়নের জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন এবং বলছেন, তিনি তার বাবা শহীদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দেখানো পথেই চলছেন।
তবে হুম্মাম কাদের চৌধুরীর প্রচারণার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো তার আবেগঘন স্মৃতিচারণ। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “বাবাকে হারানোর পর সবাই বলেছিল রাজনীতি ছেড়ে বিদেশ চলে যেতে। কিন্তু আমি ভেবেছি, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর লাখো ভাই-বোনদের আমি একা ফেলে যেতে পারি না।”
নিজের রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়ের কথা উল্লেখ করে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, “ওমরাহ থেকে দেশে ফিরে আমি গুম হয়েছি, সাত মাস আয়না ঘরে ছিলাম, নির্যাতনের শিকার হয়েছি— তবু রাজনীতি ছাড়িনি। তারেক রহমান আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি রাজনীতি করো বা না করো, আমি তোমার পাশে আছি।’ সেই সাহসেই আজ আবার মাঠে নেমেছি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আগের মতো নোংরা রাজনীতি ও কাদা ছোড়াছুড়ির দিন শেষ। এ নির্বাচন হবে একটি পরিবর্তনের নির্বাচন— চোর-ডাকাতের রাজনীতির অবসান ঘটাবে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে।” অসুস্থ শরীরেও বেগম খালেদা জিয়ার তিনটি আসনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টিকে তিনি নেতাকর্মীদের জন্য সাহসের প্রতীক এবং দেশের জন্য তার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করার প্রত্যয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, রাঙ্গুনিয়ার নির্বাচনী মাঠে আরেক প্রার্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডা. এটিএম রেজাউল করিমও ভিন্ন এক বার্তা নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। তিনি তার চিকিৎসক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে সেবার এক নতুন ধারা তৈরি করতে চাইছেন।
ডা. এটিএম রেজাউল করিম উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে জনসংযোগ কর্মসূচির পাশাপাশি বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন। এর মাধ্যমে তিনি জনগণের কাছে একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ডা. রেজাউল করিম বলেন, “আমি চিকিৎসক হিসেবে জীবনের অনেকটা সময় মানুষের সেবায় দিয়েছি। এবার নির্বাচিত হয়ে রাঙ্গুনিয়ার প্রতিটি ঘরে সেবার আলো পৌঁছে দিতে চাই। রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তনই আমার লক্ষ্য।”
তিনি স্পষ্টভাবে জানান, “আমি রাজনীতিতে এসেছি সেবার জন্য, ক্ষমতার জন্য নয়। এই নির্বাচন আমার একার নয়, এটি রাঙ্গুনিয়ার মানুষের আশা-ভরসার নির্বাচন। আপনাদের ভোটই হবে পরিবর্তনের সূচনা।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর রাঙ্গুনিয়ায় এই প্রাণবন্ত নির্বাচনী কার্যক্রম ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। হুম্মাম কাদের চৌধুরীর আবেগপূর্ণ প্রত্যাবর্তন এবং ডা. এটিএম রেজাউল করিমের সেবামূলক প্রচারণা—উভয়ই ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছে। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে, শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থীর সাংগঠনিক শক্তি এবং জনসমর্থনের গল্পটি ভোটারদের সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করতে পারে, তার ওপর।