রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

ধান কাটা, ওরশ আর পিঠার সুবাসে ফটিকছড়ির শীত

সাইফুল ইসলাম | প্রকাশিতঃ ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | ৬:২৬ অপরাহ্ন


হালকা কুয়াশার আবেশ নামতে শুরু করেছে। আর এই কুয়াশা চট্টগ্রাম উত্তরের জনপদ ফটিকছড়িতে শুধু শীতের বার্তা নয়, নিয়ে আসে এক সজীব উৎসবের আমেজ। পাহাড়-ঝরনা, সবুজ চা-বাগান আর বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে ঘেরা এই অঞ্চলে শীত মানেই প্রকৃতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি আর আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মিলনমেলা।

স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলমের কথায়, “শীতের হালকা কুয়াশা নামতেই ফটিকছড়ির প্রকৃতি যেন অন্যরকম সৌন্দর্যে সেজে ওঠে।”

এই সৌন্দর্যের বড় অংশজুড়ে আছে ফটিকছড়ির ২২টি চা-বাগান এবং এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ রাবার বাগান। ভোরের কুয়াশায় মোড়া এই সবুজের সমারোহ পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য এক বিশেষ দৃশ্যকল্প তৈরি করে। হারুয়ালছড়ির বনপ্রাণীর আশ্রয়স্থলও এ মৌসুমে হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত।

প্রকৃতির এই সজীবতার পাশাপাশি মাঠজুড়ে এখন ফসলের ঘ্রাণ। সরেজমিনে দেখা যায়, কৃষকরা কাস্তে হাতে ধান কাটছেন, কেউবা ভ্যানগাড়িতে তুলছেন নতুন আমন। রাস্তার পাশে বিছিয়ে রাখা ধানের সোনালী আভা পুরো গ্রামীণ জীবনে নতুন ছন্দ এনেছে। সজল চক্রবর্তীর ভাষায়, “শীতের ভোর মানে ধানের সুবাস, ক্ষেতজুড়ে ব্যস্ততা আর গ্রামীণ জীবনের সজীব ছন্দ।”

শীতের আরেক রূপ সবজির মাঠে। নাজিরহাট, ভূজপুর, খিরাম, নানুপুর ও বাগানবাজার এলাকায় যেন সবুজের সাগর। টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম পরিচর্যায় কৃষকের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে।

তবে ফটিকছড়ির শীতের প্রধান আকর্ষণ এর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক আবহে। দেশের খ্যাতনামা তীর্থস্থান মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে শীতকাল মানেই ওরশের মৌসুম। দেশ-বিদেশ থেকে লাখো ভক্ত-অনুরাগীর সমাগমে পুরো এলাকা এক উৎসবমুখর রূপ নেয়। বিশেষ করে মাঘের মেলাকে ঘিরে মাজার কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যও পায় নতুন গতি।

একইভাবে উপজেলার প্রায় ১৩৫টি কওমি মাদরাসায় বসে বার্ষিক ওয়াজ-মাহফিলের আসর। মাওলানা হারুন বলেন, “শীতে ওয়াজ-মাহফিল বেশি হয়, বিয়েও হয় বেশি। পুরো এলাকা হয়ে ওঠে ব্যতিক্রমধর্মী উৎসবমুখর।”

শীতের উৎসব পূর্ণতা পায় ঘরের উষ্ণতায়। ঘরে ঘরে শুরু হয় পিঠার সুবাস। গরম খেজুরের রস দিয়ে শীতের পিঠা খাওয়ার আয়োজন পারিবারিক বন্ধনকে আরও উষ্ণ করে। বিকেল হলেই বিবিরহাট, নাজিরহাট ও তকিরহাটে বসে নানা পদের পিঠার আসর। প্রবাসে থাকা শহীদুল স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ছোটবেলায় মায়ের বানানো শীতের পিঠা খেতাম। এখন প্রবাসে থাকায় সে স্বাদ আর পাওয়া হয় না।”

এই মৌসুমে কেনাকাটাও জমে ওঠে। নানুপুর বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, ক্রেতাদের সামাল দিতে আগেভাগেই শীতের পোশাক মজুত করেছেন তারা। ক্রেতা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “শিশুদের জন্য শীতের পোশাক কেনাই আমাদের বিশেষ আনন্দ।”

ডিসেম্বরে পরীক্ষা শেষ হলে ফটিকছড়ির প্রকৃতিও মুখর হয় শিশুদের কোলাহলে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী আর পরিবারের সদস্যরা পিকনিক বা ভ্রমণের জন্য বেছে নেন পাহাড়ি ঝরনা, চা-বাগান আর রাবার বাগানগুলো।

সব মিলিয়ে ফটিকছড়ির শীত শুধু ঋতু পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি প্রকৃতির রূপ, মানুষের উচ্ছ্বাস, ফসলের ঘ্রাণ, পিঠার স্বাদ আর আধ্যাত্মিকতার এক সম্মিলিত আয়োজন। স্থানীয়দের ভাষায়, “ফটিকছড়ির শীত মানেই প্রকৃতির সজীবতা, মানুষের আনন্দ আর জীবনের উৎসব।”