
[সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাত থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু রপ্তানির গ্রাফ ১ বিলিয়ন ডলারের ঘরেই আটকে আছে। কেন কৃষকের উৎপাদিত ফসল কারখানার কাঁচামাল হতে পারছে না? কেন আন্তর্জাতিক সনদের অভাবে বিশ্ববাজার থেকে ফিরে আসছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত পণ্য? অলস চিংড়ি কারখানা আর নীল অর্থনীতির অপার সম্ভাবনাই বা কতটুকু কাজে লাগছে? কাঁচামাল সংকট, প্যাকেজিং প্রযুক্তি, ল্যাব সমস্যা, অপ্রচলিত পণ্যের বাজার এবং নীতিমালার জট নিয়ে একুশে পত্রিকার পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের শেষ পর্ব।]
টেবিলের ওপর রাখা চকচকে একটি ফাইল। মলাটের ওপর বড় করে লেখা—‘খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা’। এর ভেতরে আছে ২০৪১ সালের মধ্যে এই খাত থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের এক মহাউচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বপ্ন। কিন্তু ফাইলটি যখন সচিবালয়ের এসি রুম থেকে বেরিয়ে মাঠ পর্যায়ের একজন উদ্যোক্তার টেবিলে পৌঁছায়, তখন সেই স্বপ্ন যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
চট্টগ্রামের একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মো. নজরুল, যিনি স্থানীয়ভাবে লিচুর জুস তৈরির একটি ছোট কারখানা দিতে চেয়েছিলেন, তিনি গত দুই বছর ধরে ঘুরছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আর ব্যাংক ঋণের জন্য। তার কাছে মেশিন কেনার টাকা নেই, কারণ ব্যাংক বলছে—‘আপনার কোলাটারাল বা বন্ধকী সম্পত্তি কোথায়?’ অন্যদিকে লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে তাকে দিতে হচ্ছে টেবিলে টেবিলে ‘স্পিড মানি’।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘রোড ম্যাপ অন ফুড’-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, আগামী দেড় দশকে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাত হবে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের দ্বিতীয় প্রধান উৎস। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে পায়ে হাঁটা হবে, সেই পায়েই যদি শিকল পরানো থাকে, তবে দৌড়াবে কে? নীতিমালার জট, ঋণের উচ্চ সুদ, আর বন্দরের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা—এই তিনের চক্রব্যূহে আটকে আছে আমাদের ২৫ বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন।
এলডিসি উত্তরণ: মাথার ওপর ঝুলন্ত খড়গ
২০২৬ সাল দোরগোড়ায়। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য গর্বের, কিন্তু রপ্তানিকারকদের জন্য উদ্বেগের। কারণ, এলডিসি থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই রপ্তানিতে দেওয়া নগদ সহায়তা বা সাবসিডি বন্ধ হয়ে যাবে।
বর্তমানে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিতে সরকার ২০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল সতর্ক করে বলেছেন, “এলডিসি উত্তরণের পর নগদ প্রণোদনা সুবিধা থাকবে না। তাই যারা এখন শুধু প্রণোদনার ওপর নির্ভর করে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন, তারা বড় ঝুঁকিতে পড়বেন”।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিচালক আবু মোখলেছ আলমগীর হোসেন অবশ্য আশার কথা শোনাচ্ছেন। তিনি বলছেন, “আমরা বিকল্প সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে কাজ করছি। নগদ টাকার বদলে আমরা এখন গবেষণাগার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কুল চেইন ভ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনের সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করছি”। অর্থাৎ, মাছ ধরার জন্য জেলেকে টাকা না দিয়ে, তাকে আধুনিক জাল কিনে দেওয়ার পথে হাঁটতে চাইছে সরকার। কিন্তু ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই রূপান্তর এত দ্রুত করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও কর ছাড়।
লাইসেন্স রাজত্ব: এক টেবিলে সমাধান, নাকি এক টেবিলে ভোগান্তি?
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের একজন উদ্যোক্তাকে ব্যবসা শুরু করতে হলে কম করে হলেও ১৫ থেকে ১৮টি লাইসেন্স নিতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স, টিন, ভ্যাট, পরিবেশ ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিস, বিএসটিআই, কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর—তালিকার শেষ নেই।
বাংলাদেশ এগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন (বাপা)-এর সাধারণ সম্পাদক ইকতাদুল হক আক্ষেপ করে বলেন, “বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সনদ নিতে হয়রানি আর অতিরিক্ত ফি আমাদের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারের উচিত সব সনদ এক সংস্থা থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা”।
সরকার বিডা-র মাধ্যমে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করেছে ঠিকই, কিন্তু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ—এটি এখন ‘ওয়ান স্টপ হ্যাসেল’ বা এক জায়গায় সব ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। নীতিমালায় বলা আছে, দ্রুত সেবা দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি ছাড়পত্র পেতেই লেগে যাচ্ছে ৬ মাস। এই দীর্ঘসূত্রতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস কাগজে-কলমে আছে, বাস্তবে নেই। একটি ছাড়পত্র নিতে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়, যা ব্যবসার খরচ বা কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই হয়রানি দেখে ফিরে যাচ্ছেন।’
বিনিয়োগে খরা: ব্যাংক যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়
পোশাক শিল্পের একজন মালিক চাইলেই সহজে ঋণ পান, কিন্তু কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণের একজন উদ্যোক্তাকে ঋণ পেতে জুতার তলা ক্ষয় করতে হয়। ব্যাংকগুলো মনে করে, কৃষিপণ্য পচনশীল, তাই এখানে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেশি।
অথচ পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। করোনা মহামারির সময়েও যখন সব খাত ধুঁকছিল, তখন কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাত ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। তবুও ব্যাংক ঋণের সুদের হার এবং জটিল শর্তের কারণে অনেক সম্ভাবনাময় প্রজেক্ট আলোর মুখ দেখছে না।
‘এগ্রিকালচার বুকলেট’-এর তথ্য অনুযায়ী, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে, বিশেষ করে ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণে। কিন্তু নারী উদ্যোক্তারা যখন ঋণের জন্য যান, তখন তারা সবচেয়ে বেশি বাধার সম্মুখীন হন। তাদের নামে জমির দলিল না থাকায় তারা ঋণ পান না। ফলে কুটির শিল্পভিত্তিক হাজার হাজার উদ্যোগ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা খান বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকের বিশেষ স্কিম থাকলেও জামানত বা গ্যারান্টারের শর্তে অনেকেই আটকে যান। ফলে তৃণমূলের অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ অর্থের অভাবে ঝরে পড়ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি।’
ক্লাস্টার বেইজড ডেভেলপমেন্ট: কাগজেই সীমাবদ্ধ
সরকারের ‘কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২২’-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দেশের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী ‘পণ্য-ভিত্তিক ক্লাস্টার’ গঠন করা হবে। যেমন—রাজশাহীতে আম, রংপুরে আলু, নরসিংদীতে সবজি এবং উপকূলে মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ জোন।
নীতিমালাটি চমৎকার। সেখানে ‘কৃষি-খাদ্য প্রযুক্তি পার্ক’ বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু ২০২২ সালে নীতিমালা হওয়ার পর ২০২৫ সাল শেষ হতে চলল, মাঠ পর্যায়ে এর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। মুন্সিগঞ্জে আলুর জন্য বিশেষায়িত হিমাগার বা প্রক্রিয়াজাত জোন এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে কৃষকের আলু এখনো রাস্তায় পচছে।
লজিস্টিকস খরচ: প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ
আমরা প্রায়ই বলি, আমাদের শ্রম সস্তা। কিন্তু আমাদের পণ্য পরিবহনের খরচ বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। বাপার তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে একটি কন্টেইনার বিদেশে পাঠাতে যে খরচ হয়, তা ভারত বা ভিয়েতনামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি।
এর কারণ হলো বন্দরের অদক্ষতা এবং দুর্বল সড়ক যোগাযোগ। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পৌঁছাতেই যদি ৭-৮ দিন লেগে যায় (ট্রাফিক জ্যাম ও জট মিলে), তবে সেই পণ্যের লিড টাইম বেড়ে যায়। আর কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে সময় মানেই সতেজতা নষ্ট হওয়া। ক্যাব সিনিয়র সহ সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘আমাদের বন্দরের সক্ষমতা ও লজিস্টিকস সাপোর্টে দুর্বলতার কারণে পণ্য রপ্তানিতে খরচ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এটি কমাতে না পারলে বিশ্ববাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ব।’
সবুজ শিল্পায়ন: আগামীর বাধ্যবাধকতা
বিশ্ব এখন ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ বা পরিবেশবান্ধব কারখানার দিকে ঝুঁকছে। আমাদের নীতিমালায় ‘3R Policy’ (Reduce, Reuse, Recycle) বা বর্জ্য হ্রাস ও পুনর্ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের অধিকাংশ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় সঠিক ইটিপি নেই।
ভবিষ্যতে ইউরোপে পণ্য রপ্তানি করতে হলে ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ বা পরিবেশ দূষণের হিসাব দিতে হবে। আমাদের কারখানাগুলো যদি এখনই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত না হয়, তবে ২০৩০ সালের পর আমরা বড় বাজারগুলো হারাব। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আগামী দিনের বাণিজ্য হবে কমপ্লায়েন্স নির্ভর। পরিবেশ রক্ষা ও শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে না। তাই সবুজ শিল্পায়নে এখনই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’
রোডম্যাপ কী বলছে?
হতাশার মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রোডম্যাপ। সেখানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় (৫ বছর) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য পাঠ্যক্রম চালুর কথা বলা হয়েছে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম পরামর্শ দিয়েছেন, “এলডিসি উত্তরণের পর টিকে থাকতে হলে ব্র্যান্ডিং, বাজার সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। সরকারকেও সময়মতো প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দিতে হবে”।
চাকা ঘোরানোর সময় এখনই
আমরা পাঁচটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে দেখলাম—মাঠের কাঁচামাল সংকট, প্যাকেজিংয়ের দুর্বলতা, সনদের আস্থার সংকট, অপ্রচলিত পণ্যের অবহেলা এবং সবশেষে নীতিমালার জট। এই সমস্যাগুলো একে অপরের সাথে সম্পর্কিত।
আমাদের লক্ষ্য ২০৪১ সালে ২৫ বিলিয়ন ডলার আয় করা। এই লক্ষ্য পূরণ করা অসম্ভব নয়। ভিয়েতনাম পারলে, থাইল্যান্ড পারলে, উর্বর মাটির বাংলাদেশ কেন পারবে না? আমাদের আছে অদম্য কৃষক, আছে সাহসী উদ্যোক্তা। এখন শুধু দরকার সরকারের নীতিমালার চাকাটা একটু সচল করা।
ফাইলবন্দি রোডম্যাপকে টেবিলে না রেখে মাঠে নামাতে হবে। লাল ফিতার জট খুলে উদ্যোক্তাদের দৌড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। নতুবা আমাদের কৃষি পণ্য রপ্তানির স্বপ্ন কেবল সেমিনার আর সিম্পোজিয়ামেই সীমাবদ্ধ থাকবে। মনে রাখতে হবে, কৃষিই আমাদের শিকড়। আর শিকড় শক্ত হলে, ঝড় (এলডিসি চ্যালেঞ্জ) যত বড়ই হোক, গাছ ঠিকই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।
সমাপ্ত
প্রথম পর্ব: কৃষকের উদ্বৃত্ত ফসল কেন কারখানার কাঁচামাল হতে পারছে না?
দ্বিতীয় পর্ব: প্যাকেজিং-এর ভুলে হাতছাড়া বিলিয়ন ডলারের বাজার
তৃতীয় পর্ব: আস্থার সংকটে ডুবছে হাজার কোটি টাকার রপ্তানি
চতুর্থ পর্ব: চিংড়ির কারখানায় ঝুলে আছে তালা, অথচ কাদা-পানির নিচেই লুকিয়ে আছে বিলিয়ন ডলারের সম্পদ