২৫ জুন ২০১৯, ১০ আষাঢ় ১৪২৬, সোমবার

শুধু সাংবাদিক নয়, সবার চিকিৎসা হোক ৮৫ টাকায়!

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৬, ২০১৯, ১:২৩ পূর্বাহ্ণ

আজাদ তালুকদার : বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে বাম কানে ব্যথা, প্রজণ্ড শ্রবণসমস্যা। একপ্রকার ‘বন্ধ’ কান নিয়ে শুক্রবার সারাদিন পার করলাম। তীব্র ব্যথা নিয়ে পার করে দিই শুক্রবারের রাতটাও। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে হলে আজ (শনিবার) সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু রোগের তীব্রতা তা মানতে নারাজ।

কেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা? চমেক হাসপাতালের আউটডোরে তো এর চিকিৎসা হতে পারে! ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকারের প্রচেষ্টা, প্রণোদনার কমতি নেই। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে সেই সুবিধা তো আমি নিতেই পারি!

অগত্যা রওয়ানা হলাম চমেক হাসপাতালের নাক, নাক, গলা বিভাগের আউটডোরে। যেতে যেতে ফোন দিলাম মানবিক পুলিশ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া, চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনসপেক্টর জহিরুল ইসলামকে। বললেন, আসুন আপনাকে ভালো ডাক্তার দেখিয়ে দিব।

মেডিকেলের পশ্চিম কোণায় নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় নাক-কান-গলার আউটডোর। জহির ভাই তখনও পরিচালকের কক্ষে। দুপুর ১২টায় মেডিকেল কলেজ পরিদর্শনে আসবেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। সেজন্য মেডিকেল কর্তৃপক্ষের কিছুটা তাড়া, ব্যস্ততা আছে।

সময় তখন সোয়া ১১টা। পরিচালকের কক্ষ থেকেই ফোন দিলেন জহির ভাই। বললেন, কাউন্টার থেকে ১০ টাকার টিকিট নিয়ে অপেক্ষা করতে। কেটে নিলাম টিকিট।

কাউন্টারকর্মী আজিজ বললেন, এই বিভাগের আউটডোরে আজ প্রজণ্ড ভিড়। আজিজের মতে, চমেক হাসপাতালের আউটডোর-ইনডোরে প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে আজকের মতো রোগীর ভিড় গত ২০ বছরের চাকরিজীবনে দেখেননি তিনি।

শুক্রবার বন্ধের পরদিন শনিবার এমনিতেই রোগীর একটু চাপ থাকে। ৮টা থেকে ১টা পর্যন্ত চলে টিকেট-বিক্রি। শনিবার ১১টা পর্যন্ত আজিজের টিকিট বিক্রি হয়েছে সাড়ে ৪শ’। অবস্থাপন্ন রোগীরাও কিনেছেন টিকিট।

এর কারণ হিসেবে মেহের আলম নামের অপেক্ষমাণ এক রোগী বললেন, সরকারি মেডিকেলের চিকিৎসা ও সেবার মান আগের চেয়ে ভালো। তাই রোগী বাড়ছে। নির্ভর করতে চাইছে সবাই।

নাজমা নামের এক রোগী বললেন, সরকার স্বাস্থ্যখাতের উন্নতির জন্য যেভাবে দৌড়াচ্ছে, মেডিকেল কর্তৃপক্ষ তার অর্ধেক দৌড়ালেও সাধারণ মানুষ সরকারি ব্যবস্থাপনায় পেতে পারে সর্বোত্তম চিকিৎসা।

যাই হোক, আবারও ফোন দিলেন জহির ভাই। বললেন, অজিত নামের এক অ্যাসিস্টেন্টকে ফোনটি ধরিয়ে দিতে। অজিত দে, নাক-কানের স্পেশালিস্ট ডা. সঞ্জয় দাশের অ্যাসিস্ট্যান্ট। ফোনে কী-সব ব্রিফ পেয়ে আন্তরিকতার ঝাঁপি খুলে দিলেন অজিত। বললেন, একটু বসুন। স্যার (ডা. সঞ্জয়) পরিচালক স্যারের কক্ষে গেছেন। মিনিট দশেক পর অজিত নিজেই ফোন দিলেন ডাক্তারকে। একটা উচুমার্গের ভূমিকা টানলেন। বললেন স্যার, একজন সাংবাদিক এসেছেন। তিনি চিকিৎসা করবেন। ওপ্রান্ত থেকে ডাক্তার বলছেন, উঠছি, সিঁড়িতেই আছি।

দেখামাত্র ডাক্তার বলছেন, তিনি আমাকে কোথাও দেখেছেন, আমি তাঁর ‘নোন ফেস’। আলাপ বিস্তৃত হতেই বললেন, হ্যাঁ, টিভিপর্দায় দেখেছেন তিনি আমাকে। ২০১৩-১৪ সালে আগুন-সন্ত্রাসের সময় মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে কেটেছে আমার বহু দিবস, বহু রজনী। আগুনে পোড়া, পেট্রোল বোমায় জলসে যাওয়া অসহায় মুখগুলোর ছবিই ছিল আমার নিত্যদিনকার লাইভ ব্রডকাস্ট জার্নালিজম। সেই কথাই স্মরণ করলেন ডা. সঞ্জয় দাশ। একুশে পত্রিকার অনলাইন ভার্সনের তিনি নিয়মিত পাঠক-সেকথাও শোনালেন তিনি।

যাই হোক, ডাক্তারের ভাষায়- আমার কানের অসুখটি হল এক ধরনের ফাঙ্গাসজনিত রোগ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অটোমাইকোসিস’।

সাম্প্রতিক সময়গুলোতে গ্রামীণ জনপদে, পুকুর-দিঘিতে মাছ ধরতে যাওয়া হয়েছে বহুবার। মাছ ধরাশেষে কখনো-সখনো সাঁতার কেটেছি, দাপিয়ে বেড়িয়েছি পুকুরের এপাড়-ওপাড়। ঘন ঘন সাঁতার কাটা এবং গোসলের সময় কানে এলোপাতাড়ি পানি প্রবেশের ফলে এই রোগের সৃষ্টি। ট্যাবলেট কিলব্যাক, ফেক্সো সাথে ক্ল্যারিজল নামের একটি ড্রপ দিলেন ডাক্তার সাহেব। বললেন, এগুলো খান। এরপরও সমস্যা মনে হলে ফোন দিয়ে সোজা আমার চেম্বারে চলে আসবেন।

ডাক্তারের আন্তরিকতায় ঋদ্ধ মেজাজে চেম্বার থেকে বের হতেই অ্যাসিস্ট্যান্ট অজিত দে-র বাড়তি ‘ভালোবাসা’র অপেক্ষা। ডাক্তারের সিল-সাপ্পর মারা মেডিকেল থেকে ওষুধ সরবরাহের স্লিপ তুলে দেন হাতে। বলেন, নিচের মেডিসিন সাপ্লাই রুম থেকে ওষুধগুলো নিয়ে যান।

রেডিওথেরাপির পাশের কক্ষে ওষুধ বণ্টনকারি নারীকর্মীটি জানালেন ফেক্সো ছাড়া তাদের কাছে বাকি ওষুধ নেই। জহির ভাই পুরো বিষয়ের মনিটরিং করতে ভুলছেন না। ফের ফোনে জহির ভাই বললেন, তিনি এসে গেছেন। আমি যেন এখন ওষুধ না নিই। তিনিই করবেন কাজটি। এরপর ওষুধ সরবরাহের কক্ষে ঢোকে তিনি বের করে আনলেন মূল ওষুধ কিলব্যাক।

বাজারে ট্যাবলেটটির খুচরা মূল্য ৪০ থেকে ৪২ টাকা। জহির ভাইয়ের কল্যাণে দুটি ওষুধ সরকারি ব্যবস্থাপনায় সংগ্রহ করে বাইরের ফার্মেসি থেকে ৭৫ টাকায় কিনে নিলাম ক্ল্যারিজল ড্রপ। সাকূল্যে ৮৫ টাকায় শুরু হলো আমার ৭ দিনের ‘অটোমাইকোসিস’ রোগের ট্রিটমেন্ট।

আমি ‘সাংবাদিক’, সংশ্লিষ্টদের পরিচিত। ফলে নামমাত্র মূল্যে অনায়াসে মুঠোবন্দি হলো সরকারি চিকিৎসাসুবিধা। কিন্তু যাদের আইডেনটিটি নেই, একেবারে খেটে খাওয়া মানুষ তাদের কয়জন সেই সুবিধা পাচ্ছে? এখনো অনেকেই মেডিকেলের বারান্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা পায় না।

চিকিৎসা হোক পরিচিত-অপরিচিত সবার, সার্বজনিন, সব মানুষের। তবেই স্বার্থক হবে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার সরকারি প্রচেষ্টা।

একুশে/এটি