সোমবার, ২৫ মে ২০২০, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

এনবিআরের করনীতিতে ডুবতে বসেছে জাহাজ ভাঙা শিল্প

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, মে ৮, ২০২০, ৩:১৮ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম : করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে কঠিন সময় পার করছে দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অসংখ্য শ্রমিক। এ অবস্থায় মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন করনীতি। এতে স্থবির হয়ে পড়েছে জাহাজ ভাঙা শিল্প। এখন এই শিল্পটির ডুবু ডুবু অবস্থা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ক্রমশ: উন্নতি করে আসছিল। আগে জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আগাম কর দিতে হতো না। কেবল প্রতি টনে ৩০০ টাকা হারে ভ্যাট পরিশোধ করতে হতো।

কিন্তু নতুন ভ্যাট আইনে এ শিল্পে জাহাজের মোট মুল্যের ৫ শতাংশ আগাম কর আরোপ করা হয়, যা আমদানির সময় পরিশোধ করতে হয়। এ আগাম কর পরবর্তীতে সমন্বয় ও ফেরত প্রদানের বিধান থাকলেও তা ফেরত পাচ্ছেন না শিল্প মালিকরা।

সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে আগাম কর ফেরত দেওয়ার বিধান থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে একটি টাকাও ফেরত পায়নি বলে জানান শিল্পটির সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স এন্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) কর্মকর্তারা। ফলে ব্যবসায়ীদের মুলধন ঘাটতি অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। চলতি অর্থবছরে এখনও পর্যন্ত সরকারের নিকট ২৩৮ কোটি টাকা ফেরত পাবার কথা। অথচ ব্যবসায়ীরা একটি কানাকড়ি ফেরত পাননি।

জানা যায়, ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন এবং তার বিপরীতে মোটা অংকের সুদ গোনেন। তাছাড়া সার্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যেখানে তারল্যের ব্যাপক সংকট সেখানে আগাম কর আদায় করার ফলে একদিকে যেমন সুদ বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা মুলধন সংকটে পড়ছেন, যা ব্যবসা সহায়ক নীতির পরিপন্থি। এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে এ খাতে। এ খাতের আমদানী তথ্য থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট।

নতুন করনীতিতে ৫ শতাংশ আগাম কর ধার্য্য করায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জাহাজ আমদানির পরিমাণ ও সরকারকে রাজস্ব প্রদানের হার তুলনামুলকভাবে অনেক বেশি ছিল।

২০১৫-২০১৬ সালে আমদানি করা ২৫০টি জাহাজ থেকে (এলডিটি-৩১.০৫) রাজস্ব প্রদান করা হয় ৮২২ কোটি টাকা, ২০১৬-২০১৭ সালে ১৮৮টি জাহাজ থেকে (এলডিটি-২৩.৮৬) রাজস্ব প্রদান ৬৩২ কোটি টাকা, ২০১৭-২০১৮ সালে ২০২টি জাহাজ থেকে (এলডিটি-২২.৪৯) রাজস্ব প্রদান ৫৯৬ কোটি টাকা, ২০১৮-২০১৯ সালে ২৭২টি জাহাজ থেকে (এলডিটি-২৯.৯১) রাজস্ব প্রদান ৭৯২ কোটি এবং ২০১৯-২০২০ সালে ১৩৮টি জাহাজ থেকে (এলডিটি-১৫.৬৮) রাজস্ব প্রদান করা হয় ৪৭৮ কোটি টাকা।

বিগত অর্থবছর অর্থ্যাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে ২৭২ টি জাহাজ আমদানি করা হয় এবং সরকারকে মোট ৭৯২ কোটি টাকা রাজস্ব প্রদান করা হয়, সেখানে চলতি অর্থবছরে জাহাজ আমদানি কমে ১৩৮ টিতে দাঁড়িয়েছে। যার রাজস্ব ৪৭৮ কোটি টাকা আগাম কর ও ভ্যাট হিসেবে সরকারী কোষাগারে জমা দিতে হয়েছে। নতুন নীতির কারণে সরকারের কোষাগারে অর্থ জমছে কম। বিপরীতে আমদানীকারকরাও পুঁজিশূন্য হয়ে পড়ছেন। জাহাজ আমদানি কমে যাওয়ায় বেকার শ্রমিকের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আসন্ন বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) করনীতিতে পরিবর্তন এনে আগাম কর অব্যাহতি চান জাহাজ ভাঙা শিল্পের উদ্যোক্তারা। তাদের এ দাবিকে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ও এ খাত থেকে আগাম কর প্রত্যাহার ও ভ্যাটের পরিমাণ পুনঃনির্ধারণের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে সম্প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। এখন ব্যবসায়ীরা এর সফল বাস্তবায়ন দেখতে চান এবং একটি হয়রানিমুক্ত যৌক্তিক ব্যবসার পরিবেশ ফিরে পেতে চান বলে জানিয়েছেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের নতুন রাজস্ব নীতির কারণে এ শিল্পের উদ্যোক্তা এবং রাষ্ট্র উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। নতুন নীতিতে করদাতারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় এ খাত সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে, করোনাভাইরাসজনিত অথনৈতিক মন্দা মোকাবিলা ও এ খাতকে টিকিয়ে রাখার জন্য আসন্ন বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তথা সরকারের নীতিগত সহায়তা কামনা করেছেন এ খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স এ্যান্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম রিংকু বলেন, নতুন করনীতির কারণে গত একবছরে জাহাজ আমদানি অর্ধেক কমে গেছে। সে হারে রাজস্বও কমেছে অর্ধেক। আমরা চাই শিল্প মন্ত্রণালয় যে অনুরোধ করেছে, এনবিআর যেন তা বাস্তবায়ন করে। তাহলে এই শিল্পটাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত, প্রতি বছর সারা বিশ্বে পুরনো জাহাজ আমদানি করে উপকূলীয় এলাকায় কেটে বিক্রি করা হয় আনুমানিক এক কোটি মেট্রিক টন। এরমধ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে আমদানি হয় ৭৫ শতাংশ। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ লাখ মেট্রিক টন পুরনো জাহাজ আমদানি করে যা মোট পুরনো জাহাজের আমদানির ২৫ শতাংশের বেশি।

এ শিল্পের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৫০০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকারের কোষাগারে শুল্ক ও অন্য খাতে রাজস্ব হিসেবে জমা হয় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের বক্তব্য জানা যায়নি।